বিভাগ : বিশেষ প্রবন্ধ

জান্নাত কোথায় অবস্থিত ? : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান, হুজুর সা. হযরত জিবরাইল আ. কে আরেকবার তার আসল ছুরতে দেখেছিলেন, সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। [নাজম ১৩-১৫] বিশেষ আলোচনা : বড়ই বৃক্ষকে বলা হয় সিদরুন, মুনতাহা বলা হয় চুড়ান্ত গন্তব্য স্থানকে। সুতরাং হাদীস শরীফে এসেছে যে, সপ্তম আকাশে ইহা একটি বড়ই বৃক্ষ। উর্ধ্ব জগৎ থেকে যে সমস্ত

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড একটি পর্যালোচনা : মুফতী আলী হুসাইন

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড কথাটি স্বতসিদ্ধ একটি বাণী। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের শ্লোগান এটি। কিন্তু কী এর মর্ম, কিইবা এর দাবী? অনেকেরই হয়ত ভেবে দেখার সুযোগ হয়নি! কাজেই আসুন এ নিয়ে একটু ভেবে দেখি। দেখুন একজন মানুষের সমস্ত শক্তিমত্তার মূল হল এই শিক্ষা নামক মেরুদণ্ড। যে মানুষের মেরুদণ্ড নেই, তার কোন সৌর্য-বির্য নেই, নেই মাথা উচু

গুনাহের ইহকালীন শাস্তি : মাওলানা মাকসুদুর রহমান

আমরা আল্লাহ তাআলার বান্দা। আল্লাহ তাআলা আমাদের মাবূদ। তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা পালনকর্তা রিযিকদাতা। তার অসংখ্য অগণিত নেয়ামত আমরা প্রতিমূহুর্তে ভোগ করছি। তাই বান্দা হিসেবে আমাদের একান্ত কর্তব্য হল, সদা তার হুকুমমত চলা এবং তার নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ তাআলা তার অনুগত্যের উপর আমাদের জন্য পুরুষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, আর অবাধ্যতা ও নাফরামনীর উপর দিয়েছেন বহু

মহিলা মাদরাসা রমনীর আদর্শ পাঠশালা : মিযানুর রহমান জামীল

শুরু করছি মহান আল্লাহ তাআলার নামে যিনি পরম করুণাময় অতীব দয়ালু। সমস্ত প্রসংশা আল্লাহ তাআলার জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে জানে এবং যে জানেনা, উভয়ে এক না।’ আর হাদীসের মধ্যে এসেছে, ‘দীনি ইলম শিক্ষা করা প্রত্যেক নর-নারীর উপর ফরজ।’ ইসলাম শান্তি ও মানবতার ধর্ম। নর-নারী উভয়ের জন্য এর বিধানের রয়েছে

উম্মতের ফিকিরে হযরত ইলিয়াছ রহ. : হাকীমুত্ব তুল্লাব মুফতী হাবীবুল্লাহ

বনী আদম দুনিয়াতে আল্লাহর খলীফা। ইলম ও জ্ঞান হতে বঞ্চিত অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে সে এক জ্ঞানবান সৃষ্টি। তার জ্ঞান চর্চার সঠিক ও উত্তম পাত্র হলো, আল্লাহর জ্ঞান ও তার মারেফত হাসিল করা। যেই দৌলতের কারণে তাকে যমীনের খেলাফত দান করা হয়েছে সেই দৌলত ও নেয়ামত লাভের প্রথম সিঁড়ি হলো তার রবের উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন

ইসলাম ও নারীর কর্মসংস্থান : নাজমা সুলতানা

নারী ও পুরুষ অখণ্ড মানব সমাজের দু’টি অপরিহার্য অঙ্গ। এই দু’টি অঙ্গই একে অপরের পরিপূরক। এর কোনটিকে বাদ দিয়ে সমাজ গঠিত হয়না। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, নারী-পুরুষের সুষম উন্নয়ন তথা সমাজ প্রগতিতে নারীর ভূমিকা কোথায় এবং কতটুকু? নারী অর্ধেক মানবতা। পুরুষ মানবতার মাত্র একাংশের প্রতিনিধি, অপর অংশের প্রতিনিধিত্ব করে নারী। তাই নারী সমাজকে বাদ দিয়ে

সুশিক্ষা ও সফলতা : কাজী সিকান্দার

যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে দু’ধরনের শিক্ষা পর্যায়ক্রমে চলে আসছে। প্রত্যেকেই নিজ লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সাধনা করেছে এবং সফলতার চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছার চেষ্টা করেছে। উভয় শিক্ষারই ধারক-বাহকগণ স্ব-স্ব স্থানে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে কারো সফলতায় আছে মঙ্গল ও কামিয়াবীর উচ্চতা আর কারো সফলতার ভিতরে যেন ব্যর্থতার আল্পনায় কালিমা আঁকা। একটি উপমায়

হজ্জ ও ওমরাহ আদায়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : হাফেজ মু. মিনহাজ উদ্দিন

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

মুসলিম জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্ববৃহৎ মহাসম্মেলন হলো হজ্জ।  পবিত্র হজ্জ ইসলামের পঞ্চ বেনা বা ভিত্তির অন্যতম। এ পুণ্যময় হজ্জ মুসলিম জাতির সামাজিক, রাজনৈতিক, আধ্যাতিক ঐক্য এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ সৃষ্টির প্রকৃষ্ট নিদর্শন। যাদের আর্থিক এবং শারীরিক সামর্থ আছে তাদের জন্য জীবনে অন্ততঃ একবার আল্লাহর ঘর বাইতুল্লাহর হজ্জ আদায় করা ফরযে আইন। হজ্জের আভিধানিক অর্থ

হাজরে আসওয়াদ বৈশিষ্ট্য ফযীলত ও ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা : মাওলানা আমীরুল ইসলাম

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

হাজরে আসওয়াদ হলো, পবিত্র কাবার গায়ে এটে দেয়া একটি পাথর। হাজীগণ হজ্জ করতে গিয়ে তাতে সরাসরি বা ইশারা করে চুমু দিয়ে থাকেন। হ্যাঁ, আজ সেই হাজরে আসওয়াদ নিয়েই বলছি। হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের কথা পাওয়া যায়। যা মোটেও সঙ্গত নয়। বলা যায় এগুলো অনেক দূরবর্তী চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এমনকি বড় পরিতাপের বিষয় হলো, কিছু মুসলিম

মেয়ে জন্মের আনন্দ ও সৌভাগ্য : মাহবুবুর রহমান নোমানি

মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীতে মানব বিস্তারের পরিক্রিয়া হিসেবে পিতা-মাতা বা নর-নারীকে বাহ্যিক মাধ্যম বানিয়েছেন। কিন্তু সন্তান প্রজননে তাদের কোনো ক্ষমতা বা দখল নেই। এ বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও ক্ষমতার উপর নির্ভর। তিনিই কন্যা বা পুত্র সন্তান দান করেন। আবার কাউকে সন্তান থেকে বঞ্চিত করেন। এ মর্মে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা হয়েছে- ‘নভোমন্ডল

যে জাতি নিজের অবস্থা বদলায় না, আল্লাহ তাদের অবস্থা বদলান না : মানসুর আলী

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন যে, ‘যে জাতি বা যারা নিজের অবস্থা বদলায় না, আল্লাহ সে জাতির বা তাদের অবস্থা বদলান না। [সূরা রাদ:১১] আসলে কুরআনকে বিশ্বাস করতে হবে। এটা একটা বাধ্যতা। তবে এটা হলো আল্লাহর দেয়া অসংখ্য বাস্তবতার মাঝে একটি বাস্তবতা। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাবিশ্ব এবং এর প্রতিটি নিয়ম বা বাস্তবতা তৈরি করেছেন।

জুয়ার সামাজিক ও সামগ্রিক ক্ষতি : মো. মাসউদুর রহমান

জুয়া সম্পর্কে কুরআনে শরাব বিষয়ের প্রদত্ত আদেশেরই অনুরুপ বিধান প্রদান করেছে যে, এতে কিছুটা উপকারও রয়েছে, কিন্তু ক্ষতি অনেক বেশি। জুয়ার উপকার সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত যে, যদি কেহ খেলায় জয় লাভ করে তবে একজন দরিদ্র লোক একদিনেই ধনী হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এর আর্থিক, সামাজিক এবং আত্মিক ক্ষতি সম্পর্কে অনেক কম লোকই অবগত। এর

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য ও অধিকার : নাজমা সুলতানা

আল্লাহ তা’আলা মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার জীবন যাপনের পন্থা বাতলে দিয়েছেন। তার জৈবিক ও আত্মিক চাহিদা পূরণের নিয়ম কানূন বলে দিয়েছেন। আর মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এই বিধি বিধান মেনে চলার মাধ্যমেই ইহলৌকিক মুক্তি ও সমৃদ্ধি এবং পরলৌকিক শান্তি ও সফলতা নিহিত। আল্লাহ তা’আলা নারী ও পুরুষের মধ্যে যে পারস্পরিক আকর্ষণ সৃষ্টি করে

সাহরি খাওয়ার ফযীলত ও কতিপয় জরুরি মাসআলা : মাওলানা আলী উসমান

আল্লাহ তা’আলার বিধি-বিধান বড় আশ্চর্যময়। তাঁর কাছে সবকিছুর ভাণ্ডার রয়েছে। তিনি  প্রত্যেকটি বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি নিজের সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন-“আমি রিযিক চাইনা; রিযিক দান করি।” [সূরা তাহা : ১৩২] প্রসিদ্ধ আছে, আল্লাহ তাআলার রহমত, উসিলা তালাশ করে। এখন সাহরি খাওয়ার কথাই ধরুন। সাহরি বান্দার স্বীয় চাহিদা এবং উদ্দেশ্যের জন্যই হয়। যেহেতু রোযা একমাত্র আল্লাহ তাআলার

আপনি আপনার জন্যই দান করুন : আবদুল্লাহ মুকাররম

সে দিন এক বন্ধু ফেইসবুকে একটি করুন ছবি পোষ্ট করেছেন। সেখানে একটি খোলা ডাষ্টবিন। ময়লা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। একটি কুকুর সেখান থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে। তার পেছনেই ছোট্র একটি পথশিশু উচ্ছিষ্ট খাবারের প্যাকেট নিয়ে চাটছে। মাঝ বয়সের আরেকটি মানুষ কুকুরটির সামনে দিয়ে তার ঘার ডিঙ্গে খাবারের আশায় ছেড়া একটি প্যাকেট হাতে নিচ্ছে। ডাষ্টবিনে একই সঙ্গে

আল্লাহ কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করেননি : আজমেরী মরিয়াম মেরী

“তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিয়োজিত করেছেন?” [সূরা লোকমান  : ২০] “আকাশ ও পৃথিবী এবং এদের অন্তর্বর্তী কোন কিছুই আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করি নাই।’’ [সূরা আম্বিয়া : ১৬, সূরা দুখান : ৩৮] উক্ত আয়াতসমূহের দাবি অনুসারে বলা যায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবকিছুই মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি

রমযানে দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি এক অমানবিক ক্রিয়া : ইবরাহিম খলিলুল্লাহ ছাদেকী

রমযান মাস আল্লাহ প্রদত্ত এক বড় নেয়ামত আল্লাহু রাব্বুল আ’লামীন যখন থেকে মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, ঠিক সেই মুর্হত থেকেই এ জাতিকে কোটি কোটি নেয়ামত এর মাঝে ডুবিয়ে রেখেছেন। যেমন: জীবন-যৌবন, আকাশ-বাতাস, শ্বাস-প্রশ্বাস, ফল-ফলাদি, রাত-দিন, মাস-বছর ইত্যাদি। তবে আমাদের সবার উপর পরম করুণা করে আল্লাহ জাল্লা জালালুহু রমযান মাসকেও এক বড় নেয়ামত হিসেবে দান করেছেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ ‘আমার মা’ : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই পৃথিবীতে অনেক নিয়ামত দিয়েছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মা-বাবা। জগৎ সংসারের শত দুঃখ-কষ্টের মাঝে যে মানুষটির একটু সান্ত্বনা আর স্নেহ-ভালোবাসা আমাদের সমস্ত বেদনা দূর করে দেয় তিনিই হলেন মা। মায়ের চেয়ে আপনজন পৃথিবীতে আর কেউ নেই। দুঃখে-কষ্টে, সংকটে-উত্থানে যে মানুষটি স্নেহের পরশ বিছিয়ে দেয় তিনি হচ্ছেন আমাদের সবচেয়ে আপনজন মা। মা

যৌতুকের ভয়াবহতা : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

আজকের সমাজের অতি পরিচিত ও বহুল আলোচিত একটি শব্দের নাম যৌতুক। বিবাহের সকল আলোচনার সঙ্গে সমাজের একটি বড় অংশে আলোচনা হয় যৌতুক নামের এই ‘দেনা-পাওনা’ নিয়ে। এই দেনা- পাওনার আলোচনাটা অনেক সময় হয় একদম শুরুতেই বর-কনে পছন্দের আগে। কখনো কখনো বর-কনে পছন্দের পর। বহু পরিবারে বিয়ের ক্ষেত্রে এটা প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ নিয়ে হয় বিস্তর

ইসলামের দৃষ্টিতে সাংবাদিকতা : মুহাম্মদ আমিনুল হক

সাংবাদিকতা মহৎ পেশা। সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। সাংবাদিকরা সমাজের খুটিনাটি সংবাদপত্রের মাধ্যমে মানুষের কাছে তুলে ধরেন। বর্তমান সময়ে সংবাদপত্র বা মিডিয়াকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়। উইকিপিডিয়া থেকে জানলাম, জোহান কারোলাস (ঔড়যধহ  ঈধৎড়ষঁং) ১৬০৫ সালে ‘জবষধঃরড়হ ধষষবৎ ঋহৃৎহবসসবহ ঁহফ মবফবহপশহিৃৎফরমবহ ঐরংঃড়ৎরবহ’ নামে সর্ব প্রথম পত্রিকা প্রকাশ করেন। জার্মান ভাষায় এটি ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে

নারী অধিকার ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি : হাফেজ রিদওয়ানুল কাদের উখিয়াভী

পৃথিবীতে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে ঐ সময়, যখন মানবতা চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছিলো। অত্যাচার এবং নির্যাতনে জর্জরিত মানবতার করুণ বিলাপ ছাড়া করার কিছুই ছিলোনা। ন্যায়-নীতি ও সমতা যেন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছিলো।  ইসলাম এরূপ প্রতিকূল অবস্থায়ও সুবিচার ও ন্যায়ের শ্লোগান তুলে বাস্তব ক্ষেত্রে তার হুবহু প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হলো। শাসক-শাসিত, মালিক-ভৃত্য এবং উঁচু-নীচুই ভরা অশান্ত


Hit Counter provided by Skylight