বিভাগ : নভেম্বর-14

মুসলিম উম্মাহর একমাত্র জীবন ব্যবস্থা আল কুরআন : নূর হোসাইন

quran

বিজ্ঞানময় কুরআন মানবজাতির মুক্তির সনদ। এটা সর্বকালের ও সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশীগ্রন্থ। এতে মানবজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান পেশ করা হয়েছে। তাছাড়া জাগতিক সকল সৃষ্টির বিজ্ঞানভিত্তিক বর্ণনা রয়েছে এই কুরআনে। আর উক্ত কুরআনকে সহজে উপলব্ধি করার জন্য এবং ক্রমান্বয়ে অধ্যয়ন করার সুবিধার্থে সূরা এবং আয়াতে বিভক্ত করে দিয়েছেন। যার ফলে মানুষ সহজে কুরআন অধ্যয়ন করে তা

বান্দার সাথে আল্লাহর ব্যবসা : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

বেহেশতের ব্যবসার জন্য আল্লাহ পাকের আহবান আল কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ঈমানদারদের সম্বোধন করে বলেন : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ হে ঈমানদারগণ, আমি কি তোমাদের এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দিবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন

যেভাবে কোরাইশ বংশে বিশ্ব নবী সা. এর ঐতিহাসিক আবির্ভাব! : মোঃ আবুল খায়ের (স্বপন)

1904049_1475373812713486_3803293563363009027_n

বিশ্ব জগতের একক স্রষ্টা মহান আল্লাহ তাআলার নিগুঢ় মহৎ এবং মহান ইচ্ছার বহমানতায় গোটা সৃষ্টি জগতের সর্বোত্তম, সর্ব শ্রেষ্ট এবং বিশ্ব পরিমণ্ডলের রহমতের কাণ্ডারী, বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ট উপহার হিসেবে প্রেরিত হন হযরত মোহাম্মদ সা.। হযরত মহাম্মদ সা. এমন একটি অনন্য নাম যে নাম প্রতিদিন পৃথিবীর দিগ

সুশিক্ষা ও সফলতা : কাজী সিকান্দার

University

যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে দু’ধরনের শিক্ষা পর্যায়ক্রমে চলে আসছে। প্রত্যেকেই নিজ লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সাধনা করেছে এবং সফলতার চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছার চেষ্টা করেছে। উভয় শিক্ষারই ধারক-বাহকগণ স্ব-স্ব স্থানে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে কারো সফলতায় আছে মঙ্গল ও কামিয়াবীর উচ্চতা আর কারো সফলতার ভিতরে যেন ব্যর্থতার আল্পনায় কালিমা আঁকা। একটি উপমায়

অলৌকিক কুরআনে দিন-রাতের উপকারিতা : মূল- ড. শাহ মোহাম্মদ হেমায়াতুল্লাহ

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

দিন-রাতে পরিবর্তনের উপর অনেকগুলো আয়াত রয়েছে পবিত্র কুরআনুল কারীমে। রাতের পর দিন আর দিনের পর রাত এটা একটা সাধারণ নিয়ম। অথচ এ সাধারণ ঘটনাটি সম্পর্কে এতগুলো আয়াত নাযিল হয়েছে- বিনা কারণে? শুধু তাই নয় আরো দাবি করা হয়েছে, দিন রাতের পরিবর্তন জ্ঞানীদের চিন্তার বিষয়। “নিশ্চয়ই দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা

মুরতাদের নির্মম পরিণতি : মুফতী পিয়ার মাহ্মুদ

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

যুগে যুগে মুসলিম নামধারী কিছু অজ্ঞলোকের বিষবাক্যে আক্রান্ত হয়েছে আল্লাহ, রাসূল ও মহাগ্রন্থ আল কুরআন। আরো আক্রান্ত হয়েছে ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস কিংবা কোন বিধান। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে এখনও। মুরতাদের চূড়ান্ত পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা মুরতাদের পরিচয়, শাস্তি বিধান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করব। যেন পরিণাম চিন্তা করে ভবিষ্যতে এই অভিশপ্ত পথে আর

আলেম সমাজের প্রতি অবজ্ঞা একটি ধ্বংসাত্মক ব্যাধি : বিচারপতি আল্লামা তাকী উসমানী

quran

হযরত আমর ইবনে আওফ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. এরশাদ করেন- اتقوا زلة العالم وانتظروا هيئته “উলামায়ে দ্বীনের ত্র“টি-বিচ্যুতি দেখা থেকে বেচে থাক এবং তাদেরকে বিচ্যুতি থেকে ফিরে আসার অপেক্ষাকর।” [সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী : হা.১৯২৬৩, আল মুদখালু ইলাস সুনানিল কুবরা লিল বায়হাকী : হা.৬৭৩] আলেম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যাকে আল্লাহ তা’আলা দ্বীন ইসলামের তথা

লেখালেখির প্রয়োজনীয়তা : মু. ইবরাহীম খলীল

sompadokio

একটি উন্নত ও প্রতিষ্ঠিত জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাড়াবার জন্য কলমের রয়েছে এক শক্তিশালী প্রভাব। যে জাতির কলম যত শক্তিশালী হবে সে জাতি তত সমৃদ্ধশীল ও উন্নত হতে পারবে। কুরআনের সাড়ে ছয় হাজারের বেশি আয়াতের মধ্যে প্রথম বাক্যটি হল, পড়! তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আর তৃতীয় কথাটি হল, যিনি তোমাদের কে

নারীর প্রকৃত মর্যাদা চাই : মোছা. নূর নাহার জান্নাত

Porda

সমস্ত প্রশংসা মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য। যিনি আমাদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এবং বিন্দু বিন্দু করে আমাদেরকে কুরআন হাদীসের বিশাল ভাণ্ডার থেকে সামান্য জ্ঞানার্জনের সুযোগ দিয়েছেন। এবং তারই দেওয়া শক্তিতে হাতে কলম নেয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমরা নারী জাতি। মুসলিম নারী, মুসলিম দেশের নাগরিক। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক  বিষয় হলো, আমরা মুসলিম নারী, আমরা দীনের নিবেদিত

নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন বৈপ্লবিক ঈমান : মাকসুদুর রহমান মারুফ

Iman Akida

নতুন প্রজন্মের চিন্তাচেতনা নতুন প্রজন্ম মনে করে, ইসলাম ধর্ম হলো কিছু সেকেলে ধারণার সমষ্টি এবং এমন একটি জীবন বিধানের নাম, যা আধুনিক যুগের দাবি ও চাহিদা পূরণে অক্ষম; বরং অকার্যকরই বটে।  এটি পার্সন্যাল ও ব্যক্তিগত ধর্ম; সংস্কৃতি, কালচার ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। এটি বিজ্ঞান ও প্রগতির এ যুগে সংস্কৃতি, কালচার, শাস্ত্রীয়

সাক্ষাতকার : সাহিত্যাঙ্গনে কওমি পড়–য়াদের এগিয়ে আসা জরুরী -মুফতী আবদুল খালেক

sompadokio

মুফতী আবদুল খালেক একজন প্রবীণ আলেম। জন্ম ১৯৪০ সালে শরীয়তপুরে। প্রাথমিক শিক্ষা নিজ গ্রামে। লেখা পড়া করেছেন কওমি আলিয়া উভয় অঙ্গনে। পরীক্ষা দিয়েছেন দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল। উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছেন করাচী দারুল উলূম। সেথায় সম্পন্ন করেন মেশকাত, দাওরা ও ইফতা। বুখারী পড়েছেন মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ.-এর নিকট। আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন

আশুরা ও কারবালা: করণীয়-বর্জনীয় : মাও. মাহবুবুর রহমান নোমানি

Karbala

মুহাররম মাসের দশম তারিখকে আরবীতে আশুরা বলা হয়। এ দিবসটি অত্যন্ত বরকতময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এ দিবসটির সাথে জড়িয়ে আছে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঐতিহাসিক হাজারো ঘটনা। ইতিহাসে পাওয়া যায়, আসমান-যমীন সৃষ্টি হয়েছে মুহাররম মাসের দশ তারিখে। পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম আ.কে সৃষ্টি করা হয়েছে এই তারিখে। এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় পাঠানো হয় এবং

হাদীস ও ফেকাহ শাস্রবিদ ইমাম আবু হানীফা রহ. : মাওলানা জামাল উদ্দীন রাহমানী

najaf

১ম পর্ব সমাজের অধঃপতনের সময় আলোক বার্তিকা নিয়ে যে সকল মনিষীরা পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন, পার্থিব লোভলালসা ও ক্ষমতার মোহ যাদেরকে ন্যায় ও সত্যের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র পদস্খলন ঘটাতে পারেনি, যারা অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি, ইসলাম ও মানুষের কল্যাণে সারাটা জীবন যারা পরিশ্রম করে গিয়েছেন, সত্যকে আকড়ে থাকার কারণে যারা জালেম সরকার

হে তরুণ তোমার পরশে গড়ে উঠুক নতুন পৃথিবী : হাকীমুত তুল্ল্ল­াব মুফতী হাবীবুল্লাহ

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

হে তরুণ, হে যুবক, হে নওজোয়ান। তোমার জীবনে একটি সুন্দর স্বপ্ন আছে। আছে সুন্দর স্বপ্নের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ। স্বপ্ন ও স্বপ্নের ভবিষ্যৎ দেখা ও ভাবা যুবকের হাজার বছরের তারুণ্যের দাবী। তোমাদের প্রতিটি স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মধ্যে দিয়েই জ্বলে উঠবে জাতি ও ধর্মের নতুন ইনকিলাব। কিন্তু সেই শক্তি ও সম্ভাবনাকে মুছে ফেলার জন্য এখানে ওখানে আরও

ইতিহাসের টুকরো কাহিনী : মাও. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

নববী আদর্শের বাস্তব প্রতিচ্ছবিহিন্দুস্থানে মাওলানা মুজাফফর হুসাইন নামক এক বুযুর্গ ছিলেন। ইবাদত বন্দেগীতে তিনি কঠোর নীতি অনুসরণ করতেন। কোনদিন তার তাহাজ্জুদের নামায পর্যন্ত কাযা হয়নি, এমনকি সফরেও না। সেই মহান বুযুর্গ একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এক বৃদ্বকে দেখতে পেলেন, ভারী এক বোঝা মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন। চেহারায় তার ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৃদ্বের এই

হাদীসে আদম আ.-এর সৃষ্টি প্রসঙ্গ : সংকলন : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

Neyamot

হাবিল ও কাবিলের কাহিনী আল্লাহ তা’লা বলেন- আদমের দু’পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযতভাবে শোনাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানি করেছিল তখন একজনের কুরবানি কবূল হলো, অন্যজনের কবূল হলোনা। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব-ই। অপরজন বলল, আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানি কবূল করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তো জগতসমূহের রব আল্লাহকে ভয় কর। আমি চাই যে, তুমি

নীলের তীরে মরুকন্যা : নজিবুল্লাহ সিদ্দিকী

Upnnas

শেষ পর্ব.. এরপর তিনি হাততালি দিলে প্রধান পরিচারিকা ভয়ে হাপাতে হাপাতে এসে বলল, মনিবা! কিছুক্ষণপূর্বে শত্র“পক্ষের একজন সৈনিক বাসভবনে ঢুকে পড়েছে। আমি তাকে এই মাত্র দেখে এসেছি। কিন্তু সে ঢুকেই মহলের ভিতরে লুকিয়ে পড়েছে। বিনতে ইখশীদ বললেন, ভয় পেয়ো না। এই সৈনিকটিই আমাদের জন্য নিরাপত্তার ঝাণ্ডা নিয়ে এসেছে। তুমি এখনই সালামার কামরায় গিয়ে এ মুহূর্তে

দেশ-বিদেশের খবর

Des-Bideser Khobor copy

লণ্ডনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে বাংলাদেশী মাওলানা জুবাইর আহমদ হামিদী নিহত সিলেট বিভাগের ঐতিহ্যবাহী বরুণা খান্দানের বিশিষ্ট আলেমেদীন লণ্ডন শাহজালাল মেনপার্ক মসজিদের সাবেক ইমাম মাওলানা জুবাইর আহমদ হামিদী আজ (মঙ্গলবার) সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন ইংল্যণ্ড সময় অনুমানিক ভোর ৫টার সময় আততায়ীরা ঘরে প্রবেশ করে গুলি চালায়। এসময় মাওলানা জুবায়ের সাথে তাঁর এক ভাই

কবিতাগুচ্ছ : হৃদয়ে মদীনা মোনাওয়ারা, রাত্রির আহ্বান, তুমি মহান, সত্যকে ধারণ

Kabita

[হৃদয়ে মদীনা মোনাওয়ারা] সৈয়দা সুফিয়া খাতুন মক্কা থেকে মদীনাতে এলেন নবীজী কতো যে কষ্ট করে, রহমতেরই বার্তা নিয়ে। পিছন ফিরে চোখের জলে কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন নবীজী, হে আমার প্রিয় জন্মভূমি মক্কাবাসী আমি তোমাদের ভালবাসি। এসি গাড়িতে এসে আমার পথ ফুরায়না সহজে, আমার দয়াল নবী পায়ে হেঁটে উটে চড়ে পথ বিহীন রোদ্রের তাপে, অন্ধকারে শক্ত মাটির

কাব্যগুচ্ছ : শিক্ষা দিয়ে গড়ি, সংগ্রামী কলম, কবি হওয়ার আশা, ব্যথা, বিদায়ী ঝাণ্ডা, আল্লাহ মহান

Kabita

[শিক্ষা দিয়ে গড়ি ] মু . আহমদ আলী মোস্তাফী যেই বয়সে শিশুর হাতে , থাকবে কলম খাতা । সেই বয়সে তারা কেন, কুড়ায় ঝড়া পাতা । কেউবা আবার রিক্সা চালায়, কেউবা ঠেলায় গাড়ি । সারাদিন পায়না খাবার , ঘুরে বাড়ি বাড়ি । এসো আমরা সবে মিলে , একই শপথ করি । ফুলের মতো জীবন মোদের

জীবন জিজ্ঞাসা

Sowal Jowab

মুহাম্মাদ আশিকুর রহমান, আড়াই হাজার, নারায়ণগঞ্জ। প্রশ্ন : কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে কেউ যদি বলে, ‘‘ আমি মিথ্যে বলে থাকলে আল্লাহ তা‘আলাও মিথ্যে বলেন’’, তাহলে তার ঈমান চলে যাবে কি না ? উত্তর : কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে কেউ যদি এ উদ্দেশ্যে উপরোক্ত উক্তি করে যে, আল্লাহ তা‘আলা যেমন মিথ্যে বলেন না, তদ্রুপ আমিও মিথ্যে বলিনি,


Hit Counter provided by Skylight