কুরআন-হাদিসের আলোকে কিয়ামতের বর্ণনা : মাওলানা আলী উসমান

3_islamic_art_1024-275813

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ. يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُم بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ

‘হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার।
যেদিন তোমরা তা দেখবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্য দানকারিণী আপন দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভধারিণী তার গর্ভপাত করে ফেলবে, তুমি দেখবে মানুষকে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা মাতাল নয়। তবে আল্লাহর আযাবই কঠিন। [সূরা হজ্জ : ১-২]’
হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রা. থেকে বর্ণিত। নবী করীম সা. বলেছেন, অচিরেই একটি সময় আসবে, যখন নাম-নিশানা ব্যতিত ইসলামের কোন কিছু বহাল থাকবে না। অনুরূপ প্রথাগত অনুষ্ঠান ব্যতিত ধর্মের কোন কিছু থাকবে না এবং কুরআনের শুধু গঠন-পঠন বাকি থাকবে। তারা মসজিদসমূহ নির্মাণ করবে, কিন্তু তা আল্লাহর জিকির থেকে বিরাণ হবে। সেই সময়ে আকাশের নিচে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হবে ওলামাগণ। তাদের থেকে ফেতনার উৎপত্তি ঘটবে এবং তাদের দিকে ফিরে যাবে। এগুলো হলো কিয়ামতের আলামত। [বায়হাকী- শু’আবুল ঈমান ৩/৩১৭-৩১৮, হা.২৭৬]
হযরত হুযাইফা ইবনে উসাইদ আল গিফারী রা. বলেন, আমরা কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম, ইতোমধ্যে নবী করীম সা. আগমন করে বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা দশটি নিদর্শন দেখবে। অতঃপর নবী করীম সা. তা উল্লেখ করলেন, (১) ধোঁয়া বের হবে। (২) দাজ্জাল আভির্ভূত হবে। (৩)  দাব্বাতুল আরদ বের হবে। (৪) সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। (৫) ঈসা আ. অবতরণ করবেন। (৬) ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে। (৭) তিনটি ভূকম্পন সৃষ্টি হবে:  একটি পশ্চিমে। (৮) একটি পূর্বে (৯) একটি আরব ভূখন্ডে। (১০) সর্ব শেষ আলামত হলো ইয়ামান হতে একটি অগ্নিকুণ্ড বের হয়ে লোকদেরকে সিরিয়ার ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। [আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ, হা.১৫৭০৮]
দাজ্জাল একটি মহা-পরীক্ষা, যা আদম আ. থেকে কিয়ামত পর্যন্ত এরকম দ্বিতীয় কোন পরীক্ষা আসবে না। সে প্রভুত্ব দাবী করবে এবং স্বভাববিরুদ্ধ অগণিত যাদু দেখাবে। তার দুই চোখের এক চোখ অন্ধ হবে এবং দুই চোখের মাঝে কাফের লেখা থাকবে। পূর্ব-পশ্চিম ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ থাকবে এবং চল্লিশ দিন পর্যন্ত এটা বাকি থাকবে। মু’মিন সর্দিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মতো হয়ে যাবে, আর কাফের হবে মাতালের মতো। তার নাক, কান ও নিতম্ব থেকে ধোঁয়া বের হবে। [শরহে বারাকী]
দাব্বাতুল আরদ মক্কায় সাফা পর্বতের নিকট বের হয়ে বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে থাকবে। তার সাথে মুসা আ. এর লাঠি এবং সুলাইমান আ. এর আংটি থাকবে। মু’মিনের কপালে লাঠি দ্বারা আঘাত করে           (অর্থাৎ এই বক্তি মু’মিন) লিখে দেবে, আর কাফেরদের চেহারায় আংটি দ্বারা সীল মেরে লিখে দেবে


(অর্থাৎ এই ব্যক্তি কাফের)  [সূরা নামল : ৮২, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, শরহে বুরকাভী লিল কেনাভী]
ঈসা আ. সিরিয়ার সাদা মিনারায় অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন। যদি তিনি দাজ্জালকে হত্যা নাও করতেন, তাহলেও সে বিগলিত হয়ে যেত, যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায়। অতঃপর মুহাম্মদ সা. এর শরীয়ত অনুযায়ী আমল করবেন। [বুখারী, মুসলিম, শরহে বুরকাভী]
ইয়াজুজু-মাজুজ গোষ্ঠী বের হবে। তারা মূলত দু’টি দল। একটি অত্যন্ত ছোট, অপরটি অত্যন্ত বড়। বর্তমানে তারা যুলকারনাইন বাদশাহ কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরের পিছনে রয়েছে। সময় ঘনিয়ে এলে উভয় দল বেরিয়ে পড়বে। তাদের সংখ্যা এত অগণিত ও অধিক হবে যে, তারা কোথাও পানি পান করলে সেখানে জমিনের এক ফোটা পানিও অবশিষ্ট থাকবে না। [বুখারী, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ, শরহে বুরকাভী]
নবী করীম সা. ইরশাদ করেন, কিয়ামতের অনেক আলামত  রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো যে, বাজারে মন্দাভাব দেখা যাবে, অনাবৃষ্টি ও শস্য উৎপাদন কম হবে। গীবতের ব্যাপক প্রচলন দেখা যাবে, বেপরোয়া সুদ খাওয়ার প্রচলন শুরু হবে, ব্যাপকভাবে জারজ সন্তানের প্রাদুর্ভাব ঘটবে, ফাসিক ব্যক্তিরা মসজিদে জোর গলায় কথা বলবে, আহলে হকের মোকাবেলায় বাতিলের প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখা যাবে। [তাম্বীহুল গাফেলীন]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন, কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে কিছু দাজ্জাল, মিথ্যুক বের হবে তারা তোমাদের কাছে এমন সব হাদিস বর্ণনা করবে যা তোমরা এমনকি তোমাদের পূর্ব পুরুষরাও ইতিপূর্বে শুননি। তোমরা তাদের থেকে দূরে থাকবে। [মুসলিম]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাতীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করা হবে, আমানতকে গনিমত মনে করা হবে, যাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে, দ্বীন ব্যতিত অন্য উদ্দেশ্যে এলেম হাসিল করা হবে, পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে, মায়ের নাফরমানী করবে, আর বন্ধুকে খুব নিকটে স্থান দিবে এবং আপন পিতাকে দূরে সরিয়ে রাখবে। মসজিদসমূহে শোরগোল করা হবে। ফাসেক ব্যক্তিই গোত্রের সর্দার হবে। ক্ষতির ভয়ে মানুষের সম্মান করা হবে, আল্লাহর আযাবের ভয়ে সম্মান করা হবে না। এগুলো হলো কিয়ামতের আলামত। [মুসনাদে আহমদ, মাওয়াজেহা]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা  আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার সময় শিঙ্গা সৃষ্টি করেছেন। শিঙ্গার ১১টি শাখা রয়েছে, আল্লাহ তা’আলা যা হযরত ইসরাফীল আ. কে দান করেছেন। তিনি তা মুখে রেখে আরশের দিকে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় অপলক নেত্রে তাকিয়ে রয়েছেন। [মুসনাদে ইসহাক বিন রাহবিয়্যাহ: ৮] হযরত আবু হুরাইরা  রা. বলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! শিঙ্গা কি জিনিস?  নবী সা. বললেন,  নূর দ্বারা তৈরি বিশাল শিং। সেই সত্তার কসম! যিনি আমাকে সত্যের সাথে নবী করে প্রেরণ করেছেন, প্রত্যেক শাখা গোটা আসমান-জমিনের প্রস্থের মতো বিশাল। সেই শিঙ্গা দ্বারা তিনবার ফুৎকার দেয়া হবে। প্রথমবার ফুৎকার দেয়া হবে ভীত সন্ত্রস্ত করার জন্য। দ্বিতীয়বার বেহুশ করার জন্য এবং তৃতীয়বার পুনরুত্থানের জন্য। আল্লাহ তা’আলা হযরত ইসরাফীল আ. কে প্রথমবার ফুৎকারের আদেশ দিলে তিনি ফুঁক দিবেন। ফলে গোটা আসমান ও জমিনবাসী ভীত সন্ত্র হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন- ‘ আর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, সেদিন আসমানসমূহ ও যমীনে যারা আছে সবাই ভীত হবে; তবে আল্লাহ যাদেরকে চাইবেন তারা ছাড়া। আর সবাই তাঁর কাছে হীন অবস্থায় উপস্থিত হবে। [সূরা নমল : ৮৭] প্রত্যেকেই ভয়ে সাহায্য কামনা করবে। এমনকি সেদিন প্রত্যেক স্তন্য দানকারিণী আপন দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভধারিণী তার গর্ভপাত করে ফেলবে, তুমি দেখবে মানুষকে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা মাতাল নয়। তবে আল্লাহর আযাবই কঠিন। [সূরা হজ্জ : ১-২]’ প্রত্যেক স্তন্য দানকারিণী তার দুধের শিশু কে বিস্মৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং শিশুরা বৃদ্ধে পরিণত  হবে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবেক অবস্থান করবে। আল্লাহ তা’আলা ইস্রাফীল আ. কে বেহুশির জন্য ফুঁক দেয়ার আদেশ দিলে তিনি ফুঁক দিবেন। ফলে আসমান ও জমিনের সকলেই মারা যাবে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,  ‘ফলে আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া (অর্থাৎ জিবরাঈল, মিকাঈল, ইসরাফীল, আযরাঈল ও আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ।) আসমানসমূহে যারা আছে এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে। তারপর আবার শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। আর যমীন তার রবের নূরে আলোকিত হবে, আমলনামা উপস্থিত করা হবে এবং নবী ও সাক্ষীগণকে আনা হবে, তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা হবে। এমতাবস্থায় যে, তাদের প্রতি যুলম করা হবে না।  [সূরা যুমার : ৬৮-৬৯]
আল্লাহ তা’আলা আযরাঈল আ.-কে তাদের রুহ কবজ করার আদেশ দিবেন। তিনি আল্লাহর আদেশানুযায়ী তাদের রুহ কবজ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে আযরাঈল! আমার মাখলুকের মধ্য হতে কে জীবিত রয়েছে? তিনি বলবেন, হে আমার প্রতিপালক আমি। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি কি আমার বাণী শুননি যে, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’[সূরা আল-ইমরান : ১৮৫] এখন তুমি তোমার রুহ কবজ কর। অতঃপর আযরাঈল জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে আগমন করে স্বীয় রুহ কবজ করবেন। তিনি এত বিকট চিৎকার দিবেন যে, যদি তখন সকল মাখলুক জীবিত থাকত, তাহলে সকলেই তার চিৎকারের কারণে মারা যেত। অতঃপর তিনি বলবেন, যদি আমার মৃত্যু যন্ত্রণা সম্পর্কে ধারণা থাকত, তাহলে আমি অত্যন্ত কোমলভাবে মু’মিনদের রুহ কবজ করতাম। এভাবে আযরাঈল আ. মারা যাওয়ার পর কেউ জীবিত থাকবে না। জমিন চল্লিশ বছর পর্যন্ত বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হে নিকৃষ্ট দুনিয়া, কোথায় রাজা-বাদশাহরা? কোথায় রাজপুত্ররা? কোথায় অহংকারীরা? কোথায় তারা যারা আমার রিজিক খেয়ে অন্যের ইবাদত করতো। ‘আজ রাজত্ব কার?’ [সূরা গাফের : ১৬] তখন উত্তর দেয়ার কেউ থাকবে না। বিধায় নিজেই উত্তর দিবেন যে, ‘পরাক্রমশালী এক আল্লাহর জন্য।’ [সূরা ইবরাহীম : ৪৮]
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা অশুভ বায়ু প্রেরণ করবেন। যে বায়ু ইতোপূর্বে আদ সম্প্রদায়ের ওপর সুইয়ের ছিদ্র পরিমাণ প্রেরণ করেছিলেন। আর তা পাহাড়-পর্বত ও টিলা সবকিছু ধ্বংস করে দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘তাতে তুমি কোন বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না’।’ [সূরা তাহা : ১০৭] ‘অতঃপর আল্লাহ তা’আলা আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণের জন্য আদেশ করবেন। ফলে আকাশ চল্লিশ দিন পর্যন্ত বৃষ্টি বর্ষণ করবে, এমনকি প্রত্যেক বস্তুর বার হাত ওপরে পানি থাকবে, ফলে প্রত্যেক সৃষ্টি শস্যের মতো উৎপন্ন হবে এবং তাদের দেহ পরিপূর্ণ হয়ে যাবে এবং পূর্বের মতো হয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণকে জীবিত করবেন। অতঃপর ইস্রাফীল, মিকাঈল, আযরাঈল ও জিবরাঈল সকলকে আল্লাহ তা’আলা জীবিত করবেন। তারা আল্লাহর আদেশে জীবিত হবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা রেজওয়ানকে তাদের নিকট বোরাক, টুপি, সম্মানের পোশাক, অহংকারের চাদর, সম্মানের পায়জামা ও পতাকা দান করার জন্য আদেশ দিবেন। ফলে তারা আসমান ও জমিনের মাঝে অবস্থান করবে। তখন জিবরাঈল আ. বলবেন, হে জমিন, মুহাম্মদা সা. এর কবর কোথায়? জমিন বলবে, সেই সত্তার কসম! যিনি তোমাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা’আলা অশুভ বায়ু প্রেরণ করে আমাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছেন। বিধায় আমি তার কবরের সন্ধান জানি না। অতঃপর নবী করীম সা. -এর কবর থেকে উচ্চাকাশ পর্যন্ত নূরের খুঁটি উঠবে। জিবরাঈল আ. অনুধাবন করতে পারবেন যে, এটা মুহাম্মদ সা. এর কবর। তখন উল্লেখিত ফেরেশতাগণ তাঁর নিকট এসে অবস্থান করবেন। এদিকে হযরত জিবরাঈল আ. ক্রন্দন করতে থাকবেন। তারা বলবে, আপনি কেন ক্রন্দন করছেন? তিনি বলবেন, আমি কেন ক্রন্দন করব না! মুহাম্মদ সা. কবর থেকে উঠে তার উম্মত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন, অথচ তার উম্মতের অবস্থান সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। তার কবর প্রকম্পিত হয়ে জমিন বিদীর্ণ হয়ে যাবে। আর তিনি কবর থেকে উঠে স্বীয় মাথা থেকে মাটি ঝেড়ে ফেলবেন। আর ডানে-বামে তাকিয়ে কোন কিছু দেখতে পাবেন না। শুধু চারজন ফেরেশতা- জিবরাঈল, মিকাইল, ইসরাফীল ও আযরাঈল আ.-কে দেখতে পাবেন। তিনি জিবরাঈল আ.কে  লক্ষ্য করে বলবেন, এটা কোন দিন? তিনি বলবেন, এটা আক্ষেপ ও অনুশোচনার দিন। এটা কিয়ামত ও আপনার সুপারিশের দিন। নবী করীম সা. বলবেন, হে জিবরাঈল আমার উম্মত কোথায়? আমার মনে হচ্ছে, আপনি আমার উম্মাতকে জাহান্নামের দোরগোড়ায় রেখে আমাকে তাদের ব্যাপারে সংবাদ দেয়ার জন্য এসেছেন। জিবরাঈল আ. বলবেন, আল্লাহর নিকট পানাহ চাচ্ছি। সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য নবী করে প্রেরণ করেছেন। আপনার পূর্বে কারো জন্য জমিন বিদীর্ণ হয়নি। এদিকে তাঁর মাথায় মুকুট রাখা হবে, মূল্যবান পোশাক পরিধান করানো হবে এবং বোরাকে আরোহণ করানো হবে। নবী সা. বলবেন, হে আমার ভাই জিবরাঈল, আমার সাহাবী আবু বকর, ওমর উসমান ও আলী কোথায়?
তখন তাঁরা আল্লাহর আদেশে কবর থেকে উঠবেন। আর একজন ফেরেশতা পোশাক ও বোরাক নিয়ে আগমন করবেন। তারা পোশাক পরিধান করবেন এবং বোরাকে আরোহন করে নবী সা. এর নিকট আসবেন। অতঃপর নবী করীম সা. সেজদায় পড়ে ক্রন্দন করতে করতে বলবেন, হায়! আমার উম্মত, হায়! আমার উম্মত। অতঃপর আল্লাহ  তা’আলা ইসরাফীল আ. কে শিংগায়  ফুঁক দেয়ার জন্য আদেশ দিলে তিনি ফুঁক দিবেন। আর রূহসমূহ মৌমাছির মতো বের হয়ে আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে দেবে। অতঃপর রুহসমূহ দেহে প্রবেশ করবে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন- ‘অতঃপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে। তৎক্ষণাৎ তারা দণ্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে।’ [সূরা যুমার : ৬৮] তারপর জ্বীন-ইনসানসহ সকল মাখলুক হাশরের ময়দানে সমবেত হবে। [যুবদাতুল ওয়ায়েজীন, দুররাতুন নাসেহীন : ১৬৯]
হযরত মুআজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম সা. কে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আল্লাহর এই এরশাদ সম্পর্কে অবহিত করুন যে, যেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে সমাগত হবে। একথা শুনে নবী সা. এত  জোরে ক্রন্দ করলেন যে, তার কাপড় মোবারক ভিজে গেল। নবী সা. বললেন, হে মুআজ! তুমি আমাকে বড় ধরনের প্রশ্ন করেছো। আমার উম্মাতকে ১২টি শ্রেণীতে সমবেত করা হবে।
১. তাদেরকে হাত-পা ব্যতিত সমবেত করা হবে। সুতরাং ঘোষক রহমানের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেবে যে, এরা হলো সেই সকল লোক যারা নিজেদের প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতো। সুতরাং এটাই তাদের শাস্তি এবং তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আল্লাহর এই ইরশাদের কারণে যে, ‘তোমরা নিকটপ্রতিবেশী ও দুরপ্রতিবেশীদের সাথে সদ্ব্যবহার কর।’ [সূরা নিসা : ৬৩]
২. শূকরের আকৃতিতে কবর থেকে উঠানো হবে। অনন্তর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষক ঘোষণা দিবে যে, এরা ওই সকল লোক যারা নামাজে অলসতা করেছে। আর এটাই তাদের শাস্তি এবং তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। আল্লাহর এই এরশাদের কারণে যে, ‘অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর যারা তাদের নামাযের ব্যাপারে বেখবর।’ [সূরা মাঊন : ৪-৫]
৩. কবর থেকে পর্বতসম পেট নিয়ে বের হবে। তাদের পেট গাধার মতো সাপ-বিচ্ছুতে ভরপুর হবে। এদিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষক ঘোষণা দিবে যে, এরা সেই সব লোক যারা যাকাত দিত না। এটাই তাদের শাস্তি এবং তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। কেননা, আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন ‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে রাখে আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। ’ [সূরা তাওবা : ৩৪]
৪. একদল যাদেরকে তাদের কবর থেকে উঠানো হবে এমতাবস্থায় তাদের মুখ দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হবে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষক ঘোষণা দিবে যে, এরা সেই সকল লোক, যারা বেচাকেনার সময় মিথ্যা কথা বলত। এটাই হলো তাদের শাস্তি, আর তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘নিশ্চয় যারা আল্লাহর অঙ্গীকার ও তাদের শপথের বিনিময়ে খরিদ করে তুচ্ছ মূল্য, পরকালে এদের জন্য কোন অংশ নেই।’ [সূরা আল-ইমরান : ৭৭]
৫. একদল যারা কবর থেকে পেট ফুলা অবস্থায় উঠবে। তাদের দেহ মানুষের লাশ থেকেও অধিক দুর্গন্ধযুক্ত হবে। এদিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষক ঘোষণা  দিবে যে, এরা সেই সকল লোক! যারা মানুষের ভয়ে অপরাধ গোপন করত। কিন্তু আল্লাহকে ভয় করত না। আর এ অবস্থায় তারা মারা গেল।  এটাই হলো তাদের শাস্তি এবং তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন- ‘এরা মানুষের নিকট গোপন করে, কিন্তু আল্লাহর নিকট গোপন করে না।’ [সূরা নিসা : ১০৮]
৬.  একদল গলা ও পিঠ কাটা অবস্থায়  উঠবে। এদিকে ঘোষক আল্লাহ পক্ষ থেকে ঘোষণা দিবে যে, এরা সেই সকল লোক যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিত। সুতরাং এটাই তাদের শাস্তি এবং তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দিগুণ হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে।’
৭. একদল তারা কবর থেকে জিহ্বা ব্যতীত উঠবে তাদের মুখ থেকে রক্ত ও পুঁজ বের হবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষক ঘোষণা দিবে যে, এরা সেই সকল লোক যারা সঠিক সাক্ষ্য দিতে বাঁধা দিতো। এটাই হলো তাদের শাস্তি এবং তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না এবং যে কেউ তা গোপন করে, অবশ্যই তার অন্তর পাপী।’ [সূরা বাকারা : ২৮৩]
৮. একদল কবর থেকে এভাবে উঠবে যে, তাদের মাথা উল্টানো থাকবে এবং তাদের মাথার ওপর পা থাকবে। ঘোষক আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা দেবে যে, এরা সেই সকল লোক! যারা ব্যভিচার করেছে এবং তওবা না করে মারা গিয়েছে। এটাই হলো তাদের শাস্তি এবং তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেওনা। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।’ [সূরা আল-ইসরা : ৩২]
৯. একদল কবর থেকে কালো চেহারা, নীল চক্ষু এবং পেট ভর্তি আগুনসহ উঠবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষক ঘোষণা দিবে যে, এরা সেই সকল লোক! যারা ইয়াতিমের মাল-সম্পদ জুলুম করে ভক্ষণ করেছে। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘যারা ইয়াতিমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেরদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে এবং সত্ত্বরই তারা অগ্নিতে প্রবেশ করবে।’ [সূরা নিসা : ১০]
১০. একদল শ্বেত ও কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত অবস্থায় উঠবে। ঘোষক আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা দেবে যে, এরা সেই সকল লোক যারা পিতা-মাতার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘তোমরা পিতামাতার সাথে সদাচরণ কর।’ [সূরা বাকারা : ৮৩]
১১. একদল কবর থেকে চোখ অন্ধ অবস্থায় উঠবে, তাদের দাঁত ষাঁড়ের শিংয়ের মতো দেখা যাবে। তাদের ঠোঁটসমূহ বুকের ওপর নিক্ষিপ্ত হবে, যবান পেটের এবং রানের উপর নিক্ষিপ্ত হবে। তাদের পেট থেকে ঢেকুর বের হবে। আর ঘোষক ঘোষণা দিবে যে, এরা সেই সকল লোক! যারা মদ পান করত। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাক।’ [সূরা মায়েদা : ৯০]
১২. এক দল পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট অবস্থায় উঠবে। তারা ক্ষিপ্র বিদ্যুতের মতো পুলসিরাত পার হবে। আর ঘোষক ঘোষণা দিবে যে, এরা নেক কাজ করেছে এবং গোনাহ বর্জন করেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েছে এবং তওবা অবস্থায় মারা গিয়েছে। সুতরাং তাদের প্রতিদান হলো জান্নাত, ক্ষমা, অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, তোমরা ভয় করো না এবং বিচলিত হয়ো না। [তাফসীরে কাবীর, তাম্বীহুল গাফেলীন,  দুররাতুন নাসেহীন : ১৬৬]                                চলবে।..

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ কুরআন-হাদিসের আলোকে কিয়ামতের বর্ণনা : মাওলানা আলী উসমান

  1. মো: সেলিম মিয়া says:

    kiamat ar alamat

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight