জীবন জিজ্ঞাসা

al-jannatbd.com, আল জান্নাত । মাসিক ইসলামি ম্যাগাজিন, al-jannatbd.com, quraner alo, মাসিক জান্নাত, islamer alo, www.al-jannatbd.com, al-jannat, bangla islamic magazine, bd islam, islamic magazine bd, ব্লগে জান্নাত, জান্নাতের পথ, আল জান্নাত,

মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হুসাইন, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা।
প্রশ্ন : কোনো কাফির মুশরিক জান্নাতে যাবে কি না ?
উত্তর : কোনো কাফির মুশরিক ঈমান না আনলে জান্নাতে যাবে না। তারা চিরদিন জাহান্নামে থাকবে। তবে তাদের বিভিন্ন ভালো কাজের বিনিময় পৃথিবীতে বিভিন্নভাবে তাদেরকে দিয়ে দেয়া হবে।-সূরা আল-বাইয়িনাহ  ৬,  সূরা আল-আ‘রাফ: ৪০, তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/২১৩-২১৪।

মুহাম্মদ ইউসূফ নাদীম, চাঁদপুর সদর।
প্রশ্ন : অনেক ওয়াজে শুনেছি নবী কারীম (সা.) নিষ্পাপ। তাই যদি হয়, তাহলে ফিরিশতারা কেন ছোটকালে তাঁর বক্ষ জমজমের পানি দ্বারা ধৌত করেন?
উত্তর : রাসূলে আকরাম (সা.)সহ সকল নবী-রাসূল (আ.) নিষ্পাপ। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তথাপি রাসূলে আকদাস (সা.)-এর বক্ষ চার বার বিদীর্ণ করা হয়েছে এ জন্য যে, যেহেতু রাসূলে আকদাস (সা.) মানুষ ছিলেন। আর মানুষ হিসেবে তাঁর (সা.) মধ্যে মানব সুলভ কিছু থাকতে পারে। তাই ছোট বেলাতেই তাঁর বক্ষ মুবারক বিদীর্ণ বরে জমজমের পানি দ্বারা ধুয়ে তাতে ইল্ম, হিকমাত, ঈমানসহ সব ধরনের ভালো গুণাবলী দিয়ে বক্ষ মুবারককে পরিপূর্ণ করে দেয়া হয়েছে।- হাশিয়া জালালাইন: ১৬, পৃষ্ঠা ৫০২, তাফসীরে রূহুল মা‘আনী: ১৫/১৯২, তাফসীরে মাযহারী: ১০/২৯১-২৯২।

মুহাম্মাদ এনামুল হাসান, টঙ্গী, গাজীপুর।
প্রশ্ন : হুযূরে পাক (সা.) কি গাইব জানতেন ? এক ব্যক্তি বলছেন, হুযূরে পাক (সা.) গাইব জানতেন। এ ব্যাপারে সঠিক বিধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর : হুযূরে আকরাম (সা.) গাইব জানতেন না। কোনো ব্যক্তি যদি এরূপ বলে, তাহলে তাকে তাওবা করে নেয়া উচিত। আর যদি সে বিশ্বাস করে যে, হুযূরে আকদাস (সা.) গাইব জানতেন, তাহলে তার ঈমান থাকবে না। কেননা গাইব জানা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার গুণ।- সূরা আন‘আম: আয়াত-৫৯, সূরা নামল: আয়াত-৬৫।

হাফেজ দীন মুহাম্মাদ, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী।
প্রশ্ন : জনৈক ব্যক্তি বলেন, মানুষের উভয় কাঁধে বসে দু‘জন ফিরিশতা নেকী-বদী লেখার যে কথা প্রচলিত আছে, কুরআন হাদীসের কোথাও এর কোনো উদ্ধৃতি নেই। এ ধরনের উদ্ধৃতি প্রকৃতপক্ষে আছে কি না?
উত্তর : প্রশ্নে উল্লিখিত ব্যক্তির উক্তি ভিত্তিহীন। কুরআন-হাদীসের অসংখ্য স্থানে এ ধরনের উদ্ধৃতি রয়েছে। যথা: ১. কুরআনে কারীমের সূরায়ে ‘কাফ’- এর ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘‘যখন দুই ফিরিশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”
২. তাফসীরে কাশ্শাফ- এর চতুর্থ খণ্ডে ৩৮৫ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে, দুই কাঁধের দুই ফিরিশতা কি লিপিবদ্ধ করেন, তা নিয়ে উলামায়ে কিরামের মাঝে মতোবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তাঁরা সব কিছুই লিখেন। এমনকি অসুস্থ অবস্থায় কেউ যদি উহ বলে, তাও তাঁরা লিখে রাখেন। আর কেউ কেউ বলেন, তাঁরা শুধু এমন বিষয় লিখেন, যার বিনিময় রয়েছে। অর্থাৎ, কেবল সাওয়াবের কাজ অথবা গুনাহের কাজগুলো তাঁরা লিখেন। আর দ্বিতীয় মতটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হযরত আবূ উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযূরে আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন, নেক কাজসমূহ লিপিবদ্ধকারী ফিরিশতা রয়েছেন ডান কাঁধে। আর গুনাহ লিপিবদ্ধকারী ফিরিশতা রয়েছেন মানুষের বাম কাঁধে।
৩. তাফসীরে হাসান বাসরী (রা.)- এর পঞ্চম খণ্ডে ৬৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, হযরত আব্দুর রায্যাক মা‘মার থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, হযরত হাসান বাসরী (রাহ.) উক্ত ১৭ ও ১৮ নং আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন, হে আদম সন্তানেরা! তোমাদের জন্য দু‘জন ফিরিশতা নির্ধারণ করা আছে। তাদের একজন তোমাদের ডান কাঁধে, আরেকজন বাম কাঁধে। যিনি ডান কাঁধে রয়েছেন, তিনি তোমাদের নেক আমল সংরক্ষণ করেন। আর যিনি বাম কাঁধে আছেন, তিনি তোমাদের গুনাহের কাজসমূহ লিখে সংরক্ষণ করেন।
৪. তাফসীরে রূহুল মা‘আনী- এর ১৩তম খণ্ডের ১৭৯ নং পৃষ্ঠায় উল্লিখিত সূরায়ে কাফ- এর ১৭ ও ১৮ নং আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে, মানুষের দুই কাঁধে দু‘জন ফিরিশতা রয়েছেন। যারা মানুষের কথা লিখে সংরক্ষণ করেন। যদি ভালো কথা হয়, তাহলে তা ডান কাঁধের ফিরিশতা আর যদি মন্দ কথা হয়, তাহলে তা বাম কাঁধের ফিরিশতা সংরক্ষণ করেন।
৫. তাফসীরে ইবনে কাসীর- এর চতুর্থ খন্ডের ২২৪ নং পৃষ্ঠায় উল্লিখিত             আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত আছে, আয়াতে                  দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দু‘জন ফিরিশতা রয়েছেন, যারা মানুষের সমস্ত আমল লিখেন। হযরত আহনাফ ইবনে কাইস (রাহ.) বলেন, যিনি ডান কাঁধে আছেন, তিনি নেক আমল লিখেন। আর যিনি বাম কাঁধে আছেন, তিনি বদ আমল লিখেন।
৬. মিশকাত শরীফের ২৬৯ পৃষ্ঠায় আছে, হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযূরে আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা বিবস্ত্র হয়ো না। কেননা তোমাদের সাথে এমন দু‘জন ফিরিশতা (দুই কাঁধে) রয়েছেন, যারা তোমাদের আমলসমূহ লিখে রাখেন। তারা তোমাদের থেকে দু‘টি সময় তথা স্ত্রী-সহবাস এবং পেশাব-পায়খানার সময় ব্যতীত পৃথক হয় না।- সূরায়ে কাফ-এর ১৭ ও ১৮ নং আয়াত, সূরায়ে ইনফিতার-এর ১০ ও ১২ নং আয়াত, তাফসীরে কাশ্শাফ: ৪/৩৮৫, তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/২২৪, মাজমাউয যাওয়ায়িদ: ১/৬০১।
মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ, কাউনিয়া, বরিশাল
প্রশ্ন: গম, ধান ইত্যাদি মাড়াই করার সময় গরু প্রায় সময় পেশাব করে দেয়। এগুলো পাক করার পদ্ধতি কী? অনেক সময় পেশাবকৃত স্থান জানা থাকে না, এক্ষেত্রে করণীয় কী?
উত্তর: উল্লিখিত অবস্থায় যদি পেশাবকৃত স্থান জানা থাকে, তাহলে তা উঠিয়ে ধুয়ে নিবে। আর যদি পেশাবকৃত স্থান জানা না থাকে, তাহলে অনির্দিষ্টভাবে কিছু শস্য উঠিয়ে ধুয়ে সবগুলোর সাথে মিলিয়ে নিবে অথবা বণ্টন করে ফেলবে, তাহলে উভয় অবস্থায় বাকি সবগুলোকে পাক ধরে নেয়া হবে।- আদ্-দুররুল মুখতার: ১/৪৫, নাফ‘উল মুফতী ওয়াস্ সায়িল: ১১৭, ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ: ১/৩৫৭, ইমদাদুল আহকাম: ১/৩৯৯, জাদীদ ফিকহী মাসায়িল: ১/১১৭।

মুহাম্মাদ আমীনুল ইসলাম, চান্দিনা কুমিল্লা
প্রশ্ন: গ্রামাঞ্চলে গোবর দিয়ে ঘর লেপা হয়। এ ধরনের ঘর পাক না নাপাক? এসব ঘরের মেজেতে নামায পড়া যাবে কি না?
উত্তর: যেসব এলাকায় গোবর দিয়ে ঘর লেপা হয়, সেসব এলাকার জন্য মাসআলা হলো, গোবর দিয়ে লেপা ঘরের মেজে পাক এবং তাতে নামায পড়া যাবে। তবে উত্তম হলো, কোনো কিছু বিছিয়ে নামায পড়া। উল্লেখ্য, আজকাল ঘর মজবুত করার অনেক ধরনের নির্মাণসামগ্রী বের হয়েছে। তাই মুসলমানদের উচিত ঘর লেপাতে গোবর ব্যবহার পরিহার করা।- আদ্-দুররুল মুখতার: ১/৩২০, মাজমাউল আনহুর: ১/৬২, আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু: ১/১৬০-১৬২।

মুহাম্মাদ মুহসিনুদ্দীন, কচুয়া, চাঁদপুর।
প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তির লাশের পাশে তিলাওয়াত করা যাবে কি না? বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার পূর্বে তার লাশের পাশে কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহে তাহরীমী। গোসল দেয়ার পর কোনো সমস্যা নেই। তাই উত্তম হলো, মারা যাওয়ার পর কালবিলম্ব না করে, মাইয়িতকে গোসল দিয়ে দেয়া। অবশ্য গোসল দেয়ার আগে অন্য ঘরে বা রুমে বসে তিলাওয়াত করা যাবে।- আদ্-দুররুল মুখতার: ৩/১৯৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৫৭, আল-বাহরুর রায়িক: ২/১৭১, তাবয়ীনুল হাকায়িক: ১/২৩৫, কিতাবুল ফিকহি আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আ: ১/৪৫৬, মাজমাউল আনহুর: ১/১৭৯।
ফাতাওয়া: ৩৬৫

রেদওয়ান, কুমিল্লাহ
প্রশ্ন: দু’জন জমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। তন্মধ্যে একজন মৃত অবস্থায় ভূমিষ্ট হয়েছে। অপরজন ভূমিষ্ট হওয়ার দু’ঘন্টা পর মারা গেছে। তাদের উভয়কে জানাযা না দিয়েই একটি কাপড়ে একত্রে পেঁচিয়ে দক্ষিণ দিকে মাথা দিয়ে দাফন করা হয়েছে। শরী‘আতের দৃষ্টিতে এটি সঠিক হয়েছে কি না?
উত্তর: শরী‘আতের দৃষ্টিতে প্রশ্নোক্ত কাজটি সঠিক হয়নি। এক্ষেত্রে শরী‘আতের বিধান হলো, বাচ্চা যদি জীবিত ভূমিষ্ট হয়, এরপর মারা যায়, তাহলে সেই বাচ্চার নাম রাখতে হবে এবং তাকে গোসল দিয়ে কাফন পরিয়ে জানাযা দিতে হবে। এরপর সুন্নাত তরীকায় তাকে দাফন করতে হবে। উল্লেখ্য মুসলমান লাশকে উত্তর শিয়রে কিবলামুখী করে দাফন করা জরুরী; দক্ষিণ শিয়রে নয়। কাজেই যে সন্তানটি জীবিত ভূমিষ্ট হয়েছিলো, তাকে উক্ত নিয়মে দাফন করা জরুরী ছিলো। তা না করায়, যারা একাজটি করেছে, তারা গোনাহগার হয়েছে। হ্যাঁ, যে বাচ্চা মৃত অবস্থায় ভূমিষ্ট হয়, তাকে শুধু গোসল দিয়ে একটি কাপড়ে পেঁচিয়ে দাফন করে দিবে। জানাযা দিবে না।- হিদায়া: ১/১৪০, ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ: ৪/৬২-৩১৫, ফাতাওয়া শামী: ৩/৩২৭, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৫৯, আল-বাহরুর রায়িক: ১/১৮৮, বাদায়িউ‘স সানায়ি‘উ: ১/২১১, কিফায়াতুল মুফতী: ৪/৮৮।

মুহাম্মাদ কিফায়াতুল্লাহ, বরুড়া, কুমিল্লা।
প্রশ্ন : মহিলাদের জন্য কোনো পীরের বাই‘আত হওয়া, পীরের সাথে সাক্ষাৎ করা এবং পীরের পায়ে চুমু খাওয়ার ব্যাপারে শরয়ী বিধান কী ?
উত্তর : মহিলাদের জন্য পীরের বাই‘আত হওয়া জায়িয আছে। তবে শর্ত হলো, কোনো অবস্থাতেই যেন পর্দা লঙ্ঘন না হয়। পীরের সাথেও তাদের পর্দা করা জরুরী। মহিলাদের বাই‘আত হওয়ার জন্য পীরের সামনে গিয়ে হাতে হাত রাখার বিধান নেই। কাজেই কখনোই বেপর্দা অবস্থায় পীর বা অন্য কোনো গাইরে মাহরাম পুরুষের সামনে যাওয়া যাবে না। পীরের হাতে চুমু খাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। বাই‘আত হলে যদি পর্দা লঙ্ঘনের আশংকা থাকে, তাহলে বাই‘আত হওয়া জায়িয হবে না। – সহীহ মুসলিম: ১/১৩১, ফাতাওয়া শামী: ৯/৫৫০, আল-বাহরুর রায়িক: ৮/১৯৮, হিদায়া: ৪/৩৯৬, ফাতাওয়া রশীদিয়া: ৫৯৯।

মুহাম্মাদ মুস্তাফিজুর রহমান, পিরোজপুর সদর।
প্রশ্ন : আমাদের দেশে মৃত্যুবরণের পর তৃতীয় দিন, সপ্তম দিন, চল্লিশতম দিন এবং প্রতি বছর মৃত্যু তারিখে ঈসালে সাওয়াবের জন্য কুরআন খতম বা অন্য কোনো খতম উপলক্ষে খানার আয়োজন করা হয়। এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান কী ? যারা সদকা ফিতরা প্রদান করে, কুরবানী দেয় তথা ধনী, তারা উক্ত খানা খেতে পারবে কি না ?
উত্তর : মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াব করা পূণ্যের কাজ। তবে আমাদের দেশে নির্দিষ্ট দিন তারিখ তথা  মৃত্যুর তৃতীয় দিন, সপ্তম দিন, চল্লিশতম দিন এবং প্রতি বছর মৃত্যু তারিখে যে খতম ও খানার আয়োজন করা হয়, তা সম্পূর্ণরূপে বিদ‘আত। ঈসালে সাওয়াব কোনো নির্দিষ্ট দিন তারিখে নয়, বরং সুবিধে মতো কোনো এক দিনে করা চাই। আরো লক্ষ্য রাখা চাই, ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন খতম বা অন্য কোনো খতম ও দু‘আ করিয়ে বিনিময় আদান প্রদান এবং খানা খাওয়া ও খাওয়ানো সবই নাজায়িয। বরং দুটির যে কোনো একটি করতে হবে। হয়তো শুধু খতম বা দু‘আ। নতুবা কেবল খানা খাওয়ানো। আর ঈসালে সাওয়াবের খানা নফল সদকার অন্তর্ভূক্ত বিধায় ধনী-গরীব সবার জন্যই খাওয়া জায়িয আছে। তবে গরীবদেরকে খাওয়ানোতে সাওয়াব বেশি।- ফাতাওয়া শামী: ২/২৪০, আল-বাহরুর রায়িক: ২/২৪৬, ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৭৭।

মুহাম্মাদ হাসান আলী সিরাজী, শেরপুর সদর।
প্রশ্ন : কবর পাকা করা জায়িয আছে কি না ? ফাতাওয়া শামীতে আছে,

সঠিক মাসআলা জানিয়ে বাধিত করবেন। সাথে সাথে উল্লিখিত উদ্ধৃতির উত্তরও কাম্য।
উত্তর : কবর পাকা করা জায়িয নেই। চাই মৃত ব্যক্তি কোনো বিশিষ্ট আলিম, বুযুর্গ বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হোক অথবা সাধারণ মানুষ হোক; সবার জন্য একই হুকুম। প্রশ্নে উল্লিখিত ফাতাওয়া শামীর উদ্ধৃতিটি দূর্বল। কারণ এটি সহীহ হাদীস এবং হানাফী মাযহাবের বর্ণনার পরিপন্থী। তাই এর উপর আমল করা যাবে না। উপরন্তু ফাতাওয়া শামীতেই ইমাম আবূ হানীফা (রা.) থেকে গ্রহণযোগ্য মত বর্ণিত আছে যে, কবরের উপর কোনো ঘর, গম্বুজ বা অনুরূপ কোনো কিছু নির্মাণ করা মাকরূহে তাহরীমী। মুসলিম শরীফে হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস দ্বারাও এর প্রতি কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত। বিশেষত: কবর পুজার মতো চরম ফিতনার এ যুগে এরূপ বিভ্রান্তিকর কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা একান্ত জরুরী।- ফাতাওয়া শামী: ২/২৩৭, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৬৬, মাজমাউল আনহুর: ১/১৮৬, তাবয়ীনুল হাকায়িক: ১/২৪৬, আল-বাহরুর রায়িক: ২/১৯৪।

মুহাম্মাদ গোলাম মুস্তফা, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ।
প্রশ্ন : বর্তমানে এক শ্রেণীর লোক বিশেষ বিশেষ রাতে কবরে বাতি জ্বালিয়ে থাকে। আরেক শ্রেণী পীর-বুযুর্গদের কবরে বিশেষ রাত ছাড়াও বাতি জ্বালিয়ে থাকে। এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : কবরে বাতি জ্বালানো নাজায়িয ও বিদ‘আত। এ ক্ষেত্রে পীর-বুযুর্গ, জন সাধারণ এবং সব রাতের একই হুকুম।- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৫১, সুনানু আবী দাউদ: ২/১০৫, ফাতাওয়া শামী: ২/৪৩৯, আল-বাহরুর রায়িক: ২/১৯৬।

মুহাম্মাদ আবূ ইউসূফ, আটপাড়া, নেত্রকোণা।
প্রশ্ন : এক শ্রেণীর লোক মুহাররামের ১০ তারিখ শোক পালন করে। এ জন্য তারা তাজিয়া বানায়। শোকের গান করে। মার্সিয়া-ক্রন্দন করে। ইদানিং নির্দিষ্ট শ্রেণীর লোক ছাড়া অন্য লোকেরাও এসব কাজে জড়িত হচ্ছে। এতদসংক্রান্ত শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : ১০ মুহাররামে হযরত হুসাইন (রা.) কে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিলো বলে প্রতি বছর শোক প্রকাশার্থে এক শ্রেণীর লোক প্রশ্নোক্ত কাজগুলো করে থাকে। এ ব্যাপারে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি হলো, হযরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত নিঃসন্দেহে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক একটি ঘটনা। সকল মুসলমানকে এ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত যে, সত্যের উপর কিভাবে শিশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় দৃঢ় ও অটল থাকতে হয়। অত্যাচারী কোনো শাসকের সামনে মাথা নত করার চেয়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করার স্থান অনেক উর্ধ্বে। এটাই হলো, কারবালার শিক্ষা। কিন্তু ১০ই মুহাররামে হযরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে শোক পালনের নামে শীয়া এবং বিদ‘আতী সম্প্রদায় যা কিছু করে, তা অত্যন্ত আপত্তিকর ও শরী‘আত পরিপন্থী। এ দিনে তাজিয়া বানানো, গান-বাদ্য করা, ঢোল বাজানো, মার্সিয়া গাওয়া, মিছিল করা, মাথায় মাটি মাখানো, মান্নত করা, বিলাপ করা, খালি মাথায় থাকা, তেল ব্যবহার না করা, শরীরে আঘাত করে রক্ত বের করা ইত্যাদি সবই নাজায়িয ও বিদ‘আত। সকল মুসলমানকে এ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কোনো অবস্থাতেই এসবে শরীক হওয়া বা সমর্থন দেয়ার সুযোগ নেই।- ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: ১২/২০১, ফাতাওয়া রহীমিয়া: ২/২৭৫, ইমদাদুল আহকাম: ১/১৮৬, কিফায়াতুল মুফতী: ১/২২৮।

মুহাম্মাদ আব্দুল আউয়াল, পালং, শরীয়তপুর।
প্রশ্ন : অনেকে বলে পৌষ ও মুহাররাম মাসে বিয়ে করা ঠিক নয়। এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : প্রশ্নোক্ত কথাটি ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও আকীদা-বিশ্বাস পরিপন্থী। আইয়ামে জাহিলিয়্যাত তথা মূর্খতার যুগে সাধারণ লোকদের মধ্যে এ ধরনের বিশ্বাস ছিলো। তারা মুহাররাম ও সফর মাসকে বিয়ে, সফর ইত্যাদির জন্য অশুভ মনে করতো। এসব কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়। ইসলামী শরী‘আতে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। তাই এহেন জঘন্য কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।- সহীহ বুখারি: ২/৮৫১, সুনানু আবী দাউদ: ২/১৯০, সহীহ মুসলিম ২/২৩০।

মুহাম্মাদ নোমান, মিরপুর, ঢাকা।
প্রশ্ন : প্রচলিত মীলাদের ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : মীলাদ পড়ার জায়িয পদ্ধতি হলো, কোনো হাক্কানী আলেম রাসূলে আকরাম (সা.) এর জীবনাদর্শ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ দিকসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করবেন। বিভিন্ন কাজের সুন্নাত তরীকা বর্ণনা করবেন। রাসূলে আকদাস (সা.) এর উপর দরূদ পাঠের ফযীলত বর্ণনা করবেন। অতঃপর উপস্থিত প্রত্যেকে পৃথক পৃথকভাবে মহাব্বাত এবং আন্তরিকতার সাথে রাসূলে আকরাম (সা.) এর উপর সেসব দরূদ পাঠ করবেন, যেগুলো হাদীসে বর্ণিত আছে। আর দাঁড়ানো, বসা ও শোয়া সর্বাবস্থায়ই দরূদ পড়া জায়িয আছে। পরিশেষে আলিম সাহেব সকলকে নিয়ে মহান আল্লাহর নিকট দু‘আ করবেন।
মীলাদ শব্দের শাব্দিক অর্থ জন্ম। আর মীলাদুন্নাবী অর্থ হলো নবী কারীম (সা.) এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করা। এটা নিশ্চয়ই সাওয়াবের কাজ। কিন্তু এক শ্রেণীর লোক মীলাদ শরীফ নামে গদবাধা যে অনুষ্ঠান করে থাকেন, সাহাবায়ে কিরাম (রা.), তাবিয়ীন তাবে তাবিয়ীন সালফে সালেহীনদের স্বর্ণযুগে এর কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। অথচ সর্বজন স্বীকৃত যে, তাঁরাই ছিলেন প্রিয় নবীর প্রকৃত অনুসারী। কাজেই এটা পরিত্যাজ্য।
উপরন্তু, দরূদ পড়ার সময় যারা দাঁড়ানোকে জরুরী মনে করেন এবং বলেন, তাদের আকীদা হলো এ অনষ্ঠানে রাসূলে আকদাস (সা.) তাশরীফ আনেন। কাজেই তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক দাঁড়ানো অবশ্য কর্তব্য। তাদের এ আকীদা সম্পূর্ণ ভুল ও মনগড়া; বরং শিরকের পর্যায়ভূক্ত। তাদের সপক্ষে কুরআন হাদীসের কোনো দলীল নেই। অপর দিকে জীবদ্দশায় তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনকে তিনি অপছন্দ করতেন। এমনকি এমনটি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
তারা রাসূলে আকরাম (সা.) কে হাজির নাজির মনে করে কিয়াম করে থাকে। অথচ হাজির নাজির থাকা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ গুণ। কাজেই এর দ্বারা আল্লাহর বিশেষগুণে নবী কারীম (সা.) কে শরীক করা হচ্ছে; যা মারাত্মক শিরীক কাজ।
অবশ্য এ ধরনের আকীদা পোষণ না করে কেউ যদি একা একা দাঁড়িয়ে দরূদ পড়ে, আর যারা না দাঁড়ায় তাদেরকে খারাপ দৃষ্টিতে না দেখে, তাহলে এরূপ করা গুনাহ নয়। তথাপি বিদ‘আত ও কুসংস্কারের এ যুগে এমনটি না করা চাই।
অতএব প্রচলিত মীলাদ ও কিয়াম যেহেতু গর্হিত আকীদা ও পন্থায় আদায় করা হচ্ছে, যা শরী‘আতের নিয়ম বহির্ভূত। আর সাহাবায়ে কিরাম (রা.), তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন (রহ.) থেকে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না, কাজেই প্রচলিত মীলাদ ও কিয়াম বিদ‘আত।- ফাতাওয়া রশীদিয়া: ১৬৬, সহীহ মুসলিম: ২/৭৭, মিশকাতুল মাসাবীহ: ৩০।

মুহাম্মাদ মনজুর নোমানী, মনোহরগঞ্জ, কুমিল্লা।
প্রশ্ন: শুনেছি একটি সুদী ব্যাংকে প্রত্যহ কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু করা হয়। এভাবে সুদী ব্যাংকের কাজ শুরু করার পূর্বে কুরআন তিলাওয়াত করার ব্যাপারে শরয়ী বিধান কী? যিনি তিলাওয়াত করেন, তার কোনো গুনাহ হবে কিনা?
উত্তর: ইসলামী শরী‘আতে সুদী লেনদেন সম্পূর্ণরূপে নাজায়িয ও হারাম। কুরআনে কারীমে আল্লাহ পাক এ ব্যাপারে কঠোর ধমকী এবং হুঁশিয়ারী বাণী ব্যবহার করেছেন। সুতরাং এ ধরনের একটি জঘন্য হারাম কাজের শুরুতে কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত মারাত্মক গর্হিত কাজ। এমনকি কুরআনে কারীমের সাথে উপহাস করার শামিল। যদ্দরুন এতে কুফরীর আশংকা রয়েছে। আর যদি উপহাস করার উদ্দেশ্যেই তা করা হয়, তাহলে তো আয়োজকদের ঈমান চলে যাবে (নাউযুবিল্লাহ)। কাজেই তিলাওয়াতকারী এবং আয়োজক সকলেই এর মাধ্যমে গোনাহগার হবে।- সূরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯, তাফসীরে রূহুল মা‘আনী: ১/৬৭, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩১৫, মাজমা‘উল আনহুর: ২/৫৫১।

মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান, কোতোয়ালী ফরিদপুর।
প্রশ্ন: পহেলা এপ্রিলে মে দিবস পালন করা জায়িয আছে কিনা? এদিনে এক শ্রেণীর লোকের মাঝে ধোকা দেয়ার যে রীতি চালু আছে এ ব্যাপারে শরয়ী দৃষ্টিভিঙ্গ কী? আর কেন-ই বা এ দিনটিতে এভাবে ধোকা দেয়ার রীতি চালু হয়েছে? বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে মে দিবস নামে যে প্রথা প্রচলিত, তা মূলতঃ মুসলিম জাতির জন্য লজ্জাস্কর ও বেদনাদায়ক একটি স্মৃতি। এটি বাস্তবে তদানীন্তন ইংরেজদের চক্রান্তমূলক হীন তৎপরতার নিদর্শন। তারা মুসলমানদেরকে ধোকা দিয়ে বোকা বানাতে পেরে এদিনটিকে স্মরণীয় হিসাবে পালন করে আসছে। উপরন্তু শরী‘আতে চিত্ত-বিনোদন জায়িয হলেও তার একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি রয়েছে। এ গণ্ডির বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ নাজায়িয। কাজেই দিনকাল নির্দিষ্ট করে এবং সরাসরি মিথ্যা ও কষ্টদায়ক কথা-কাজের মাধ্যমে চিত্ত-বিনোদন এবং ধোকা দেয়ার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। অথচ পহেলা মে তা-ই করা হয় খুব উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে। সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্য মে দিবস পালন করা এবং এ দিবসে একে অন্যকে ধোকা দেয়া সম্পূর্ণরূপে নাজায়িয ও হারাম।
এ দিনটির ইতিহাস: ইসলামের শ্বাশ্বত সৌন্দর্য ও কল্যাণে আকৃষ্ট হয়ে সমগ্র বিশ্বে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে জোয়ার উঠেছিলো, সেই জোয়ারের স্রোত ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের মাটিতেও। এর ধারাবাহিকতায় অষ্টম শতাব্দীতে স্পেনে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী শাসন ব্যবস্থা।    মুসলমানদের নিরলস প্রচেষ্টায় স্পেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর উন্নতি লাভ করে। দীর্ঘ আটশো বছর একটানা অব্যাহত থাকে উন্নতির এ ধারা। মুসলমানদের এ উন্নতির ধারা খৃস্টান ও ইংরেজদের সহ্য হলো না। তাই তারা প্রগতি ও উন্নতির এ উর্ধ্ব গতিকে  রোধ করার লক্ষ্যে লিপ্ত হলো কুটিল ষড়যন্ত্রে। তারা সিদ্ধান্ত নিলো, স্পেনের মাটি থেকে মুসলমানদেরকে উচ্ছেদ করে দিবে। এ চক্রান্ত সফল করার উদ্দেশ্যে পর্তুগীজ রানী ইসাবেলা চরম মুসলিম বিদ্বেষী পার্শ্ববর্তী খৃস্টান সম্রাট ফার্ডিনেন্ডকে বিয়ে করে। বিয়ের পর দু’জন মিলে মুসলিম নিধনের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। অন্যান্য খৃস্টান রাজারাও এগিয়ে আসলো তাদের সহযোগিতায়। তারা চক্রান্ত করে স্পেনের যুবরাজকে হাত করে নিলো।
এরপর শুরু হলো স্পেন থেকে মুসলিম নিধনের অভিযান। হাজার হাজার মুসলিম নারী-পুরুষকে হত্যা করা হলো। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে উল্লাস করতে করতে তারা ছুটে গেলো শহরের দিকে। অবশেষে একদিন খৃস্টানদের যৌথ বাহিনী এসে পৌঁছলো রাজধানী গ্রানাডায়। এতোদিনে টনক নড়ে উঠলো মুসলিম বাহিনীর। তারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মুসলমানদের গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াতে দেখেই ভড়কে গেলো যৌথ খৃস্টান বাহিনী। শহরের বাইরে দাঁড়িয়ে আলহামরার মিনারের দিকে লোভাতুর তৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো রাজা ফার্ডিনেন্ড ও রাণী ইসাবেলা।
কখনো সম্মুখ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজিত করতে পারেনি বলে চতুর ফার্ডিনেন্ড পা বাড়ালো ভিন্ন পথে। জ্বালিয়ে দিলো আশ-পাশের সব শষ্য খামার। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলো শহরের খাদ্য সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র ভেগা উপত্যকা। যার ফলে দুর্ভিক্ষ নেমে এলো সমগ্র শহরে।
দুর্ভিক্ষ যখন প্রকট আকার ধারণ করলো, তখন প্রতারক ফার্ডিনেন্ড ঘোষণা দিলো, মুসলমানরা যদি শহরের প্রধান ফটক খুলে দেয় এবং নিরস্ত্র অবস্থায় মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করে, তাহলে তাদেরকে বিনা রক্তপাতে মুক্তি দেয়া হবে।
দিনটি ছিলো ১৪৯২ সালের পহেলা মে। দুর্ভিক্ষ তাড়িত গ্রানাডাবাসী অসহায় নারী ও মাসূম বাচ্চাদের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে খৃস্টানদের আশ্বাসকে সত্য মনে করে খুলে দিলো শহরের প্রধান ফটক। সবাইকে নিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলো আল্লাহর ঘর মসজিদে।
শহরে প্রবেশ করে খৃস্টান বাহিনী মুসলমানদেরকে মসজিদের ভিতর আটকে রেখে প্রতিটি মসজিদে তালা লাগিয়ে দিলো। এরপর একযোগে শহরের সমস্ত মসজিদে আগুন লাগিয়ে বর্বর উল্লাসে মেতে উঠলো জালিম হায়েনার দল। লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ ও শিশু আর্তনাদ করতে করতে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারালো মসজিদের ভিতর। প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখায় দগ্ধ অসহায় মুসলমানদের আর্তচিৎকার যখন গ্রানাডার আকাশ-বাতাস ভারি ও শোকাতুর করে তুললো, তখন রাজা ফার্ডিনেন্ড ও রাণী ইসাবেলা বাঁকা হাসি হেসে বলতে লাগলো “হায় মে ফুল (এপ্রিলের বোকা)! শত্র“র আশ্বাসকে কেউ বিশ্বাস করে?
সেই থেকে খৃস্টান জগত প্রতি বছর পহেলা মেকে আড়ম্বরের সাথে পালন করে আসছে। মে ফুল মানে এপ্রিলের বোকা উৎসব। গ্রানাডার বুকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে খৃস্টানরা মুসলমানদের উপর সেদিন যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো, পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোনা নজির নেই। সেদিন শহরের সাত লাখ অধিবাসীর একজনও প্রাণ নিয়ে নিরাপদ আশ্রস্থলে ঠাঁই নিতে পারেনি।- জাদীদ ফিকহী মাসায়িল: ১/৪৬১, ফাতাওয়া রহীমিয়া: ২/১৫১, আপকে মাসায়িল আওর উনকা হল: ১/৩৯৮।

মু হাম্মাদ আব্দুল করীম, মনিরামপুর, যশোর।
প্রশ্ন: অনেক কবিরাজ তাবীযের মাধ্যমে জ্বীন পুড়িয়ে মেরে ফেলে। তাদের এ কাজটি শরী‘আত সম্মত কিনা?
উত্তর: দুষ্ট প্রকৃতির জ্বীনের অনিষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাব্য সকল তদবীর ও কৌশল ব্যর্থ হলে এবং কোনো কিছুতেই তারা অনিষ্ট সাধন থেকে নিবৃত না হলে, তাবীযের মাধ্যমে তাদেরকে পুড়িয়ে মারা জায়িয আছে। তদুপরি উত্তম হলো, তাবীযের মধ্যে এরূপ বাক্য লিখে দেয়া, ক্ষতি সাধন থেকে বিরত না থাকলে যেন পুড়ে যায়।- সূরা বাকারা: ২৮৬, ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৮৯, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৬১, খুলাসাতুল ফাতাওয়া: ৪/৩৭৪, ফাতাওয়া সিরাজিয়া: ৭৪।

মুহাম্মাদ শফীকুল ইসলাম, ধুনট, বগুড়া।
প্রশ্ন: ভারত-পাকিস্তানের অনেক লোক বলেন, চিংড়ি মাছ খাওয়া হালাল নয়। আবার অনেকে বলেন মাকরূহ। এ ব্যাপারে শরয়ী সুষ্ঠু সমাধান জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন।
উত্তর: গ্রহণযোগ্য মতানুসারে চিংড়ি একপ্রকার মাছ। তাই শরয়ী দৃষ্টিতে চিংড়ি মাছ খেতে কোনো অসুবিধা নেই।- ফাতাওয়া শামী: ৬/৩০৬, ফাতাওয়া রহীমিয়া: ৬/২৫৭-২৬০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/২৮৯, হায়াতুল হাইওয়ান উর্দূ: ২/৪২৪, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/১২৪।

মিজানুর রহমান, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: আমাদের দেশের প্রায় হাসপাতালেই একটা বিভাগ আছে, যেখানে স্বেচ্ছায় রক্তদান, মরণোত্তর চক্ষুদান কিংবা দেহদান করার ব্যবস্থা রয়েছে। শরী‘আতের দৃষ্টিতে এসব জায়িয আছে কিনা?
উত্তর: শরী‘আতের দৃষ্টিতে মানুষ তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও দেহের মালিক নয়। এর মালিক আল্লাহ তা‘আলা। তিনি মানুষকে তা আমানত স্বরূপ দিয়েছেন। আর অন্যের মালিকানাধীন আমানতের কোনো বস্তু দান করা কিংবা বিক্রি করার অধিকার কারো নেই।
উপরন্তু মানুষ আশরাফুল মাখলূকাত। সে হিসেবেও তার প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সম্মানের হকদার। আর তা বিক্রি কিংবা কেটে অন্যের অঙ্গে প্রতিস্থাপন করার অর্থ হলো তাকে অসম্মান করা। সুতরাং মরণোত্তর কিংবা জীবিত অবস্থায় কোনো হাসপাতালে অথবা কোনো ব্যক্তিকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা দেহ দান করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়িয ও হারাম।
অবশ্য রক্তের ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। যদি কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতে কোনো রোগী এমন হয় যে, তাকে রক্ত না দিলে, সে মারা যাওয়ার আশংকা আছে, তাহলে এমতাবস্থায় কোনো বিনিময় ছাড়া উক্ত রোগীকে কিংবা এ ধরনের রোগীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রক্ত দান করা যাবে। যদি কোনো রোগী বিনিময় ছাড়া রক্ত না পায়, তাহলে সে রক্ত ক্রয় করতে পারবে। তবে রক্তদাতার জন্য কোনোক্রমেই রক্তের বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয় নেই।- সূরা মায়িদা: ৩, তিরমিযী শরীফ: ১/৩০৬, মিশকাতুল মাসাবীহ: ১/১৪৯, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৩৮, শারহু সিয়ারিল কাবীর: ৪/১৫৬২।

হাফেজ মুহাম্মাদ জহীরুল ইসলাম, সদর-বিবাড়ীয়া।
প্রশ্ন: আমাদের বাংলাদেশের বাজারেও অনেক পণ্য পাওয়া যায়, যেগুলোর মোড়কে আরবী লেখা থাকে। যেমন বিস্কুট, চানাচুর, নুডুলস, সেমাই ইত্যাদি। এমনকি সাধারণ পঞ্চাশ পয়সার একটি চকোলেটের প্যাকেটেও আরবী লেখা থাকে।
এখন আমার প্রশ্ন হলো, আমরা তো আর এরাবিয়ান নই। আমাদের ভাষাও আরবী নয়। আমাদের দেশের রাস্তা ঘাটের আনাচে কানাচে আরবী লেখা পণ্যের মোড়ক পড়ে থাকে। আমাদের মনের অজান্তেই এগুলোর মাঝ দিয়ে হাটতে হয়। আবার অনেক মোড়কে কুরআন শরীফের শব্দও থাকে। এভাবে আরবী লিখা পণ্যের মোড়ক পদপিষ্ট হলে আমাদের গুনাহ হবে কিনা?
উত্তর: কাগজ ইলম অর্জনের অন্যতম একটি উপকরণ। এতে কুরআন-হাদীস লেখা হয়। তাই সব ধরনের কাগজই সম্মানের পাত্র। সুতরাং কোনো কাগজই পদপিষ্ট করা যাবে না। এমনিভাবে আরবী শব্দ বা বাক্য লিখা কাগজ রাস্তা ঘাটে চলার পথে পড়ে থাকতে দেখলে, সম্ভব হলে, তা উঠিয়ে কোনো নিরাপদ স্থানে রেখে দিবে। অন্তত নিজে তা পদপিষ্ট করা থেকে বেঁচে থাকা।- ফাতাওয়া শামী: ১/৩৪০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩২৩, আহসানুল ফাতাওয়া: ৮/১৩।

মুহাম্মাদ শহীদুল ইসলাম, বি, বাড়ীয়া সদর।
প্রশ্ন: অপারেশনের মাধ্যমে কিংবা এক্সিডেন্টের মাধ্যমে কোনো মহিলার শরীর থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া অঙ্গ গাইরে মাহরাম পুরুষদের জন্য দেখা জায়িয হবে কিনা?
উত্তর: শরীর হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বে যে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করা নাজায়িয, যে কোনো কারণে শরীর হতে পৃথক হওয়ার পরও সেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করা নাজায়িয। তবে একান্ত প্রয়োজনে যতোটুকু দৃষ্টিপাত না করলেই নয়, শুধু ততোটুকুর অনুমতি আছে।- ফাতাওয়া শামী: ৬/৩৭০-৩৭১, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৩০, মাজমাউল আনহুর: ২/৫৩৮, আল-বাহরুর রায়িক: ৮/১৯২, আল-মুহীতুল বুরহানী: ৬/৭০-৭১, ফাতাওয়া খানিয়া আলা হামিশি হিন্দিয়া: ৩/৪০৯।

মুহাম্মাদ আল আমীন, কোতুয়ালী, কুমিল্লা।
প্রশ্ন: মাজারগুলোতে দেখা যায় অনেক মোমবাতি, আগরবাতি, অপচয় করা হয়। তাই আমি প্রায় সময় মাজার থেকে গোপনে মোমবাতি, আগরবাতি নিয়ে আসি এবং মসজিদে ব্যবহার করি। এটা চুরির মধ্যে পড়বে কিনা? এ জন্য আমার চুরির গুনাহ হবে কিনা? দয়া করে বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।
উত্তর: মাজারে মোমবাতি, আগরবাতি ইত্যাদি যা কিছু দান করা হয়, শরী‘আতের মূলনীতি অনুযায়ী তার মালিক মূলতঃ দাতা ব্যক্তিগণই থেকে যায়। তাদের অনুমতিক্রমে যে কোনো সৎকাজে তা ব্যবহার করা যাবে। আর তাকে না পাওয়া গেলে, তা গরীব মিসকীনের মাঝে বন্টন করে দিতে হবে কিংবা কোনো ইয়াতীম খানায় দিয়ে দিতে হবে। এ ধরনের বস্তু বা অর্থ মসজিদে ব্যবহার করা যাবে না। সুতরাং মাজার থেকে মোমবাতি আগরবাতি এনে মসজিদে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। এ জন্য খালিস দিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করা চাই। সাথে সাথে মাজারে এ ধরনের দানের বিরুদ্ধে জনমত তেরী করার ফিকির করা চাই।- আদ্-দুররুল মুখতার মা‘আ ফাতাওয়া শামী: ৩/৪২৭, আল-বাহরুর রায়িক: ২/২৯৮, মা‘আরিফুল কুরআন মুফতী শফী (রাহ.): ২/৫৫৪।

মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম, ফুলপুর, মোমেনশাহী।
প্রশ্ন: প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের জন্য যেমন স্বর্ণ ব্যবহার করা হারাম, তেমনি অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদের জন্যও কি হারাম?
উত্তর: প্রাপ্ত অপ্রাপ্ত সর্বশ্রেণীর পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার করা হারাম। তবে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে গুনাহগার হবে অভিভাবকগণ।- ফাতাওয়া শামী: ৯/৫২২, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৩১, হিদায়া: ৪/৪৫৭, বাদায়ি‘উ সানায়ি‘উ: ৫/১৩১, তাবয়ীনুল হাকায়িক: ৬/১৬, আল-বাহরুর রায়িক: ৮/৩৫০, আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু: ৩/৫৪৯।

উত্তর : কবর পাকা করা জায়িয নেই। চাই মৃত ব্যক্তি কোনো বিশিষ্ট আলিম, বুযুর্গ বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হোক অথবা সাধারণ মানুষ হোক; সবার জন্য একই হুকুম। প্রশ্নে উল্লিখিত ফাতাওয়া শামীর উদ্ধৃতিটি দুর্বল। কারণ এটি সহীহ হাদীস এবং হানাফী মাযহাবের বর্ণনার পরিপন্থী। তাই এর উপর আমল করা যাবে না। উপরন্তু ফাতাওয়া শামীতেই ইমাম আবূ হানীফা (রা.) থেকে গ্রহণযোগ্য মত বর্ণিত আছে যে, কবরের ওপর কোনো ঘর, গম্বুজ বা অনুরূপ কোনো কিছু নির্মাণ করা মাকরূহে তাহরীমী। মুসলিম শরীফে হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস দ্বারাও এর প্রতি কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত। বিশেষত: কবর পুজার মতো চরম ফিতনার এ যুগে এরূপ বিভ্রান্তিকর কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা একান্ত জরুরী।- ফাতাওয়া শামী: ২/২৩৭, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৬৬, মাজমাউল আনহুর: ১/১৮৬, তাবয়ীনুল হাকায়িক: ১/২৪৬, আল-বাহরুর রায়িক: ২/১৯৪।

মুহাম্মাদ গোলাম মুস্তফা, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ।
প্রশ্ন : বর্তমানে এক শ্রেণীর লোক বিশেষ বিশেষ রাতে কবরে বাতি জ্বালিয়ে থাকে। আরেক শ্রেণী পীর-বুযুর্গদের কবরে বিশেষ রাত ছাড়াও বাতি জ্বালিয়ে থাকে। এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : কবরে বাতি জ্বালানো নাজায়িয ও বিদ‘আত। এ ক্ষেত্রে পীর-বুযুর্গ, জন সাধারণ এবং সব রাতের একই হুকুম।- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৫১, সুনানু আবী দাউদ: ২/১০৫, ফাতাওয়া শামী: ২/৪৩৯, আল-বাহরুর রায়িক: ২/১৯৬।

মুহাম্মাদ আবূ ইউসূফ, আটপাড়া, নেত্রকোণা।
প্রশ্ন : এক শ্রেণীর লোক মুহাররামের ১০ তারিখ শোক পালন করে। এ জন্য তারা তাজিয়া বানায়। শোকের গান করে। মার্সিয়া-ক্রন্দন করে। ইদানিং নির্দিষ্ট শ্রেণীর লোক ছাড়া অন্য লোকেরাও এসব কাজে জড়িত হচ্ছে। এতদসংক্রান্ত শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : ১০ মুহাররামে হযরত হুসাইন (রা.) কে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিলো বলে প্রতি বছর শোক প্রকাশার্থে এক শ্রেণীর লোক প্রশ্নোক্ত কাজগুলো করে থাকে। এ ব্যাপারে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি হলো, হযরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত নিঃসন্দেহে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক একটি ঘটনা। সকল মুসলমানকে এ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত যে, সত্যের উপর কিভাবে শিশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় দৃঢ় ও অটল থাকতে হয়। অত্যাচারী কোনো শাসকের সামনে মাথা নত করার চেয়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করার স্থান অনেক উর্ধ্বে। এটাই হলো, কারবালার শিক্ষা। কিন্তু ১০ই মুহাররামে হযরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে শোক পালনের নামে শীয়া এবং বিদ‘আতী সম্প্রদায় যা কিছু করে, তা অত্যন্ত আপত্তিকর ও শরী‘আত পরিপন্থী। এ দিনে তাজিয়া বানানো, গান-বাদ্য করা, ঢোল বাজানো, মার্সিয়া গাওয়া, মিছিল করা, মাথায় মাটি মাখানো, মান্নত করা, বিলাপ করা, খালি মাথায় থাকা, তেল ব্যবহার না করা, শরীরে আঘাত করে রক্ত বের করা ইত্যাদি সবই নাজায়িয ও বিদ‘আত। সকল মুসলমানকে এ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কোনো অবস্থাতেই এসবে শরীক হওয়া বা সমর্থন দেয়ার সুযোগ নেই।- ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: ১২/২০১, ফাতাওয়া রহীমিয়া: ২/২৭৫, ইমদাদুল আহকাম: ১/১৮৬, কিফায়াতুল মুফতী: ১/২২৮।

মুহাম্মাদ আব্দুল আউয়াল, পালং, শরীয়তপুর।
প্রশ্ন : অনেকে বলে পৌষ ও মুহাররাম মাসে বিয়ে করা ঠিক নয়। এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : প্রশ্নোক্ত কথাটি ইসলামি ধ্যান-ধারণা ও আকীদা-বিশ্বাস পরিপন্থী। আইয়ামে জাহিলিয়্যাত তথা মূর্খতার যুগে সাধারণ লোকদের মধ্যে এ ধরনের বিশ্বাস ছিলো। তারা মুহাররাম ও সফর মাসকে বিয়ে, সফর ইত্যাদির জন্য অশুভ মনে করতো। এসব কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়। ইসলামী শরী‘আতে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। তাই এহেন জঘন্য কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।- সহীহ বুখারি: ২/৮৫১, সুনানু আবী দাউদ: ২/১৯০, সহীহ মুসলিম ২/২৩০।

মুহাম্মাদ নোমান, মিরপুর, ঢাকা।
প্রশ্ন : প্রচলিত মীলাদের ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি ?
উত্তর : মীলাদ পড়ার জায়িয পদ্ধতি হলো, কোনো হাক্কানী আলেম রাসূলে আকরাম (সা.) এর জীবনাদর্শ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ দিকসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করবেন। বিভিন্ন কাজের সুন্নাত তরীকা বর্ণনা করবেন। রাসূলে আকদাস (সা.) এর উপর দরূদ পাঠের ফযীলত বর্ণনা করবেন। অতঃপর উপস্থিত প্রত্যেকে পৃথক পৃথকভাবে মুহাব্বাত এবং আন্তরিকতার সাথে রাসূলে আকরাম (সা.) এর উপর সেসব দরূদ পাঠ করবেন, যেগুলো হাদীসে বর্ণিত আছে। আর দাঁড়ানো, বসা ও শোয়া সর্বাবস্থায়ই দরূদ পড়া জায়িয আছে। পরিশেষে আলিম সাহেব সকলকে নিয়ে মহান আল্লাহর নিকট দু‘আ করবেন।
মীলাদ শব্দের শাব্দিক অর্থ জন্ম। আর মীলাদুন্নাবী অর্থ হলো নবী কারীম (সা.) এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা করা। এটা নিশ্চয়ই সাওয়াবের কাজ। কিন্তু এক শ্রেণীর লোক মীলাদ শরীফ নামে গদবাধা যে অনুষ্ঠান করে থাকেন, সাহাবায়ে কিরাম (রা.), তাবিয়ীন তাবে তাবিয়ীন সালফে সালেহীনদের স্বর্ণযুগে এর কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। অথচ সর্বজন স্বীকৃত যে, তাঁরাই ছিলেন প্রিয় নবীর প্রকৃত অনুসারী। কাজেই এটা পরিত্যাজ্য।
উপরন্তু, দরূদ পড়ার সময় যারা দাঁড়ানোকে জরুরী মনে করেন এবং বলেন, তাদের আকীদা হলো এ অনুষ্ঠানে রাসূলে আকদাস (সা.) তাশরীফ আনেন। কাজেই তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক দাঁড়ানো অবশ্য কর্তব্য। তাদের এ আকীদা সম্পূর্ণ ভুল ও মনগড়া; বরং শিরকের পর্যায়ভূক্ত। তাদের সপক্ষে কুরআন হাদীসের কোনো দলীল নেই। অপর দিকে জীবদ্দশায় তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনকে তিনি অপছন্দ করতেন। এমনকি এমনটি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
তারা রাসূলে আকরাম (সা.) কে হাজির নাজির মনে করে কিয়াম করে থাকে। অথচ হাজির নাজির থাকা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ গুণ। কাজেই এর দ্বারা আল্লাহর বিশেষগুণে নবী কারীম (সা.) কে শরীক করা হচ্ছে; যা মারাত্মক শিরীক কাজ।
অবশ্য এ ধরনের আকীদা পোষণ না করে কেউ যদি একা একা দাঁড়িয়ে দরূদ পড়ে, আর যারা না দাঁড়ায় তাদেরকে খারাপ দৃষ্টিতে না দেখে, তাহলে এরূপ করা গুনাহ নয়। তথাপি বিদ‘আত ও কুসংস্কারের এ যুগে এমনটি না করা চাই।
অতএব প্রচলিত মীলাদ ও কিয়াম যেহেতু গর্হিত আকীদা ও পন্থায় আদায় করা হচ্ছে, যা শরী‘আতের নিয়ম বহির্ভূত। আর সাহাবায়ে কিরাম (রা.), তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন (রহ.) থেকে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না, কাজেই প্রচলিত মীলাদ ও কিয়াম বিদ‘আত।- ফাতাওয়া রশীদিয়া: ১৬৬, সহীহ মুসলিম: ২/৭৭, মিশকাতুল মাসাবীহ: ৩০।

উত্তর প্রদান-
দারুল ইফতা ওয়াল ইরশাদ
আল-মারকাজুল ইসলামী, বাংলাদেশ।
(উচ্চতর ইসলামী আইন গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বিভাগ)
২১/১৭ বাবর রোড, মুহাম্মাদপুর, ঢাকা-১২০৭।
মোবাইল : ০১৯২৩১১৩৭৭২।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight