গাড়িওয়ালা : মেহেরুন নেসা

3 Taka Horse Ride_ Dhaka Zoo_ Mirpur

আমার গরুর গাড়ি চলে ধীরে ধীরে,
কাস্তুল হতে আটগাঁও মানুষ বহন করে।
রোদ বৃষ্টি দিন রাত আমার গাড়ি আছে,
বিপদ হলে যে কোনো জন পায় যে আমায় কাছে।..  ..

রজব আলী মনের অজান্তেই এই গান ধরেছে। গরুর জোয়ালের পাশে বসে। এখন দ্বিপ্রহর। বাম হাতে একখান ছাতা। বেশ পুরনো।  হাতলটা কাঠের।  ডান হাতে গরু চড়ানোর ছোটকা। মাথায় লাইলং এর একটি রশি বাঁধা। লাঠিটা নাড়িয়ে একটু পরপর বলে, এই ডাইনে ডাইনে….বাম বাম…। গরুগুলো তখন ডানে বামে ঘুরে। যেন ওরা রজব আলীর কথা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পেরেছে। বৃষ্টির মৌসুম ছাড়া সকালবেলা সাথে কোন ছাতা রাখেনা রজব আলী। একটি গামছা হলেই হয়। মাথায় প্যাঁচিয়ে রাখে।
রজব আলী বংশসূত্রে গরীব ছিলনা। তার পিতা শমসের বেশ জমিজমার মালিক ছিল। বাড়িতে সবসময় একজোড়া মহিষ, গোয়ালভরা গরু আর অতিরিক্ত দুইটা বলদ থাকতো। গ্রামের নামি দামি লোক ছিলেন এই শমসের মিয়া। শেষ বয়সে এসে মামলায় পড়েন।  মিথ্যে মামলা। মামলা টানতেই তার সম্পত্তির বারটা বেঁজেছে। শমসের মিয়া সবকিছু বিক্রি করে দেন। দুইটা বলদ ছাড়া। বলদ দুইটা একমাত্র ছেলে রজব আলীর প্রিয় ছিল বলে। মামলার ভার বইতে বইতে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন শমসের মিয়া। ছেলের জন্য রেখে যান শুধু এক ভিটে মাটি আর দুইটা বলদ। পিতার মৃত্যুর পর দু চোখে সর্ষে দেখেন রজব আলী। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া রজব এখন চারদিকে শুধু অন্ধকার দেখেন। জীবনসংসার কীভাবে চালাবেন? ভেবে কূল পায়না। মা স্ত্রী আর এক ছেলে নিয়েই রজবের সংসার। সংসার যদিও সংখ্যায় ছোট। কিন্তু অভিজ্ঞতার ব্যপারে রজব একেবারেই আনাড়ি। ঝামেলা যতসব এ কারণেই। শশুরবাড়ি থেকে কোন সহযোগিতা পাওয়ার আশাও নেই। রজবের শশুর তাদের বিয়ের কিছুদিন পরেই ইন্তেকাল করেন। সম্বন্ধীদের অবস্থাও তেমন স্বচ্ছল নই। উপায়ান্তর না দেখে মায়ের সাথে পরামর্শ করে রজব  সিদ্ধান্ত নিল,তার বলদ দুইটাকে কাজে লাগাবে। কিছুদিন পরেই ধানকাটা শুরু হবে। রজব বলদ দুটি দিয়ে গরুর গাড়ি বানাবে। এর দ্বারা মানুষের ধান টানবে। বিনিময়ে যা পাবে তা দিয়েই সংসার চালাবে। কিছুদিন পর শুরু হল ধানকাটা। শুরু হল রজবের রোজগার।  বেশভালই রুজি হচ্ছে গরুগাড়ি দ্বারা। রজব এখন সংসারের চিন্তা বাদ দিয়ে কিছুটা স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে। ছেলেটা দিনে দিনে বেশ ডাঙ্গর হয়ে উঠেছে। বোধ হয় সামনের রোযার পরেই মাদরাসায় ভর্তি করা যাবে। বৈশাখ শেষে মায়ের  জন্য স্ত্রীর জন্য নতুন শাড়ি কিনতে হবে। এর জন্য টাকার প্রয়োজন। রজব তাই দিন নেই রাত নেই, সুযোগ পেলেই টিপ মারে। মৌসুম শেষে রজব হিসেব করে দেখে, সংসারের খরচ বাদে তার হাতে অনেক টাকা রয়ে গেছে।  এই টাকা দিয়ে স্ত্রী সন্তান, মা এবং নিজের জন্য নতুন কাপড় কিনে আনে। এই মৌসুমটা অনেক সুখেই কাটাল তার পরিবার।
পুরো হাওর এখন খালি। রজব এখন কী করবে?  রজব সিদ্ধান্ত নিল, এখনও প্রিয় বলদ দুটিকে কাজে লাগাবে। যে গাড়ি দিয়ে রজব ধান টানতো, এই গাড়ি দিয়ে এখন মানুষ বহন শুরু করল। কাস্তুল হতে আটগাঁও। জনপ্রতি পাঁচ টাকা ভাড়া। প্রতিদিন ভোরে বের হয়। সন্ধ্যায় ফিরে আসে। সারাদিনে যা রুজি হয় তাতে মোটামুটি চলে। মাঝে মাঝে কষ্ট হয়। কষ্ট হলেই কী?  অন্য কোন উপায় তো নেই। অল্প কিছু দিনেই মানুষমেলে রজবের গাড়ি পরিচিত হয়ে উঠে। মানুষ এখন আর তাকে শুধু রজব আলী ডাকে না। ডাকে গাড়িওয়ালা রজব। আবার অনেকে ডাকে শুধু “গাড়িওয়ালা “বলে।
দেখতে দেখতে রমজান এসে গেল। এক রাতে সাহরি খেতে খেতে রজব তার স্ত্রীকে বলে, রওশন! আমাদের মুস্তাকীম ভাল হয়েছে।  আমি চাই ওকে ঈদের পর মাদরাসায় ভর্তি করে দিতে। রওশনা বলে, এটাতো আমিও চাই। কিন্তু আপনি পারবেন তো? সংসার চালাতেই আপনার অনেক কষ্ট হয়। লেখা পড়ার খরচ কিভাবে জোগাবেন?  রজব বলে, দেখ রওশনা! পৃথিবীতে ওকে সবচেয়ে বেশী কেউ ভালবাসলে আমিই সেই ব্যক্তি। আমি চাইনা, পৃথিবীর যে নিষ্ঠুরতা আমার কপালে জুটেছে; আমার ছেলে এর ভাগী হোক।  আমি চাইনা, আমার ছেলে আমার মত গাড়িওয়ালা হোক। আমি চাইনা, আমার ছেলে আমার মত দু’ চোখে অন্ধকার দেখুক। শুধু আমি কেন?  পৃথিবীর কোনো পিতায় এমনটা চাইনা। তাই যেভাবেই হোক, আমি আমার ছেলেকে আদর্শমানুষ বানাবো। আল্লাহওয়ালা বানাবো। আর এরজন্য প্রয়োজন মাদরাসা শিক্ষা। তাই আমি কড়া নিয়ত করেছি, বরং বলতে পার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি; ঈদের পর আমাদের সোনামণিকে মাদরাসায় ভর্তি করে দেব। ইনশাল্লাহ।
রোযা প্রায় শেষ। আর ক দিন পরই ঈদ। ঈদ উপলক্ষে সবার ঘরে চলছে নতুন কাপড় কেনার উৎসব। রজব আলীকেও কিনতে হবে। ঈদের দিন স্ত্রী সন্তান আর মায়ের মুখে হাসি ফোঁটাতে হবে। এ জন্য রোযার শেষ দিকে বাড়তি কষ্ট করতে হল  রজব আলীর। এই ক দিনে যে টাকা জমেছে এর দ্বারা সবার কাপড় কেনা সম্ভব নয়। রজব চিন্তা করল কী করা যায়?  কারো থেকে ধার নেব?  আর এ মূহুর্তে ধার দেবেইবা কে?  ধার পাইলেও পরে শোধ করব কিভাবে? সাত পাঁচ ভেবে রজব মার্কেটে চলে যায়। নিজের ছাড়া সবার জন্যই কাপড় কেনে। মুস্তাকীম তার পোশাক দেখে খুশিতে আতœহারা। রওশন বলে, তোমার কাপড় কই? রজব বলে, আমি সামনের ঈদে কিনবো। এই ঈদে লাগবেনা। তবুও রওশন আপত্তি তোলে। রজব কোনভাবে রওশন কে থামায়। কিন্তু নাছোড়বান্দা রজবের মা। তিনি বলেন, বাবা! তুমি এটা ভাবলে কী করে যে, ঈদের  দিন তুমি পরবে পুরান কাপড় আর আমি পরব নতুন কাপড়।  বাবা! কষ্টে আমার কলিজা ফেটে যাবে।  রজব বলে, মা! আমি যখন ছোট ছিলাম তখন অনেক সময় নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়েছো। নিজে না ঘুমিয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়েছো। মা! এখন আমার সুযোগ এসেছে নিজে না পরে তোমাকে পরানোর।  মা! তুমি দয়া করে আমাকে সুযোগ দাও। মায়ের প্রতি ছেলের ভালবাসার গভীরতা দেখে মা নিঃশব্দে কাঁদতে থাকেন। আসমানের দিকে চোঁখ তোলে বিড়বিড় করে কী যেন বললেন।  রজব তা বুঝতে পারেনি।
রজব তার ছেলেকে সে বছরই মায়ের অনুমতি নিয়ে মাদরাসায় ভর্তি করে দিয়েছিল। ভর্তির পর থেকেই মুস্তাকীম মাদরাসায় নিয়মিত আসা যাওয়া করে। ছাত্র হিসেবে ভাল প্রমাণিত হয়। অল্পদিনেই সব উস্তাদের নজর কাড়ে।
কালের পরিক্রমায় রজব এখন অনেকটা দুর্বল।  তার এই জীবনে বয়ে গেছে অনেক কালবৈশাখী ঝড়। সবচেয়ে বড় ঝড় তার মায়ের মৃত্যু।  কিছুদিন হল তার মায়ের ইন্তেকাল হয়েছে। কোন অসুখ ছিলনা। জানাযার নামায পড়িয়েছে মুস্তাকীম।  রজবের মা একদিন মুস্তাকীমকে কাছে টেনে বলে ছিল, ভাই! আমিতো বুড়া হয়ে গেছি। কোনদিন জানি মারা যাই। আমি মারা গেলে তুই আমার জানাযা পড়াবি। আমার আতœাটা তাহলে শান্তি পাবে।  মুস্তাকীম তার দাদীর খায়েশ পূরণ করেছে।
একদিন রজব গামছাটা হাতে নিয়ে বের হওয়ার সময় দেখে, মুস্তাকীম চুপ করে দাড়িয়ে আছে। রজব বলে, বাবা কী হয়েছে? মুস্তাকীম চুপ। রজব বলে বাবা টাকা লাগবে?  রজব জানে, আল্লাহ তাকে এমনই একটি সুসন্তান দান করেছেন ; যে কোনদিন টাকার জন্য চাপতো দিবেই না, বরং নিজ থেকে মুখ ফুঁটিয়ে কোন টাকা চাইবে না।  তাই আগ বাড়িয়ে রজব নিজ থেকেই কথাটা জিজ্ঞেস করেছে।  মুস্তাকীম মাথা নেড়ে হা বলল। রজব বলল, বাবা! দুপুরে যখন খেতে আসব ; তখন নিয়ে যেয়ো। মুস্তাকীম আচ্ছা বলে বের হয়ে গেল।  রজব গাড়ি রেডি করে জোয়ালের কাছে বসল।  আজ তাকে অনেকটা বিষন্ন দেখাচ্ছে। আগের ছাতাটা এখন আর নেই। একদিন ঝড় এসে ছাতাটা ভেঙ্গে দিয়েছে। এরপর আর নতুন ছাতা কেনা হয়নি। গামছাটার রং ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।  বৃষ্টিতে ভিজে রোদে  পুড়ে অনেক নরম হয়ে গেছে। রজব এই ওঠ.. ওঠ বলে গাড়ি চালাতে শুরু করে। মনে মনে বলে, সন্তান মা বাপের কলিজার টুকরা। দুনিয়ার সব মাতা পিতায়  চায়, তাদের সন্তান সবসময় সুখে থাকুক।  তাদের সন্তানের ভবিষ্যত উজ্জল হোক। তাদের চেহারায় সদা হাসি লেগে থাকুক। আমিও চাই। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রজব স্বপ্নজগতে হারিয়ে যায়। রজব স্বপ্ন দেখে,অচিরেই তার ছেলে মুস্তাকীম বড় আলেম হবে।  মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকবে।  সত্যের দিকে আহ্বান করবে। রজব আলী মারা গেলে তার জানাযা পড়াবে। মুস্তাকীমের ওসিলায় সে জান্নাতে যাবে।  দুনিয়ার সব কষ্ট যাতনা তখন ভুলে যাবে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। এমন সময় কেউ একজন পেছন থেকে ডেকে উঠে “ঐ গাড়িওয়ালা……

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ গাড়িওয়ালা : মেহেরুন নেসা

  1. maimunal Jannat says:

    গল্পটি চমৎকার হয়েছে। ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight