এক দুঃখিনি মায়ের আশা / আতিকুর রহমান

বেশ কয়েক বছর হলো গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয়নি। ছোট বেলায় গিয়েছিলাম। তারপর আর যাওয়া হয়নি। তাই এবার ইরাদা করলাম যে, পরীক্ষার ছুটিতে গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসবো। সময় মত পরীক্ষা শেষ হলো। তাই ঠিক করলাম আগামীকাল ভোরে রওয়ানা দিবো। যেইভাবা সেই কাজ। ফজরের নামাজ পড়েই রওয়ানা দিলাম। তাই সকাল শেষ হবার পূর্বেই গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। দীর্ঘদিন পর গ্রামের বাড়িতে আসার কারণে সকালের নাস্তা বেশ ভালোই হলো। সকালের নাস্তা খেয়ে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে বের হয়ে পরলাম গ্রামের বিচিত্রময়, মনজুড়ানো, সবুজ-শ্যামল দৃশ্য দেখার জন্য। বহুদিন পর গ্রামের সবুজ-শ্যামল মাঠ-ঘাট, খাল-বিল দেখে বেশ ভালোই লাগছে। গ্রামের অনেক কিছুই বেশ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এভাবে অনেক্ষণ ঘুড়াঘুড়ি করে বাড়ি ফিরে এলাম। তারপর দিন গেলাম আত্মীয়দের সাথে দেখা করার জন্য। আমাদের বাড়ির পাশের বাড়িতে থাকে এক বৃদ্ধা মহিলা। আমরা তাকে দাদিমা বলে ডাকতাম। তার একটি মাত্র ছেলে ছিল। আমরা প্রথমে তার বাড়িতে যাই। তিনি প্রথমে আমাকে চিনতে পারেনি। আমার ভাই পরিচয় দিলে তিনি আমাকে চিনতে পারেন। কিছুক্ষণ তাঁর সাথে কথা-বার্তা বললাম। আমরা ছোট বেলায় দেখেছিলাম তিনি সেলাই কাজ করেন। আজও সেই একই পেশা নিয়ে আছেন। অনেক্ষণ তার সাথে কথা-বার্তা বলার পর তাঁকে তার ছেলে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি তাঁর ছেলের কথা শুনে নীরব হয়ে গেলেন। এবং দেখলাম যে, তাঁর চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি বেশ সময় কাঁদলেন। আমরা তাঁকে কিছুই বললাম না। যখন তার কান্না সামান্য থামলো, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনার কান্নার কারণ কি? তিনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বলতে লাগলেন। একদিন আমার ছেলে হঠাৎ আমার নিকট এসে বললো, আম্মা আমি বিদেশ যেতে চাই। তখন আমি বললাম, তুমি বিদেশ গিয়ে কি করবে? দেশে থেকেও তো ভালো কিছু করতে পারো। সে তো নাছোর বান্দা, বিদেশ যাবেই। আমাকে বললো, বিদেশ গিয়ে অনেক টাকা-পয়সা রোজগার করবে। এবং আমাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করবে। তাই আমি রাজি হয়ে গেলাম। অনেক কষ্ট করে টাকা-পয়সা রোজগার করে তাকে বিদেশ পাঠালাম। তারপর বেশ কয়েক বছর ভালোই চলতে ছিল। সে ওখানে ভালো চাকরী পেল; এবং প্রতি মাসে টাকা পাঠাতো। আমার দুঃখ শুরু হয় তখন থেকে; যখন হঠাৎ সে আমাকে ফোনে বললো, মা আমি বিয়ে করে ফেলেছি। আমি বেশি আনন্দিত হইনি। তারপরও মেনে নিলাম। কয়েক মাস পর থেকে দেখি সে আমাকে টাকা পাঠায় না। এক মাস পাঠায় তো দুই মাস পাঠায় না। এভাবে দু এক বছর যায়। এবং সে আমাকে ভালোভাবে এখন খবরও নেয় না। এভাবে আমার দিন-কাল চলতে থাকে। প্রায় এক বছর হয়ে গেছে তার কোন খোঁজ-খবর নেই। আমি এখনও তার আসার অপেক্ষা করছি। এবং যতদিন বেঁচে থাকবো তার অপেক্ষা করে যাবো। যদি সে ফিরে আসে। দাদিমার কথাগুলো শুনে খুব ব্যথিত হলাম। এবং আল্লাহর নিকট দোয়া করলাম যে, তার ছেলে যেন তার নিকট ফিরে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight