হৃদয় তাঁর আকাশের চেয়ে বড়ো / নাজিব আল-কিলানি

কাফেলার সবাই ক্লান্ত। দীর্ঘ কষ্টকর সফরের পর তাঁরা সবাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু মুসাফিরদের সান্ত¡না যে তাঁরা একটি পবিত্র ও সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন। এই স্বপ্নই কষ্টভোগে তাঁদের প্রেরণা যুগিয়েছে। রাসূলের ভূমিতে পৌঁছার মাধ্যমে অচিরেই এই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নেবে। পবিত্র ভূমি ভ্রমণের মাধ্যমে তাঁদের স্বপ্ন সফল হবে। কষ্ট-ক্লান্তি যাই হোক। কাফেলার শায়খ ও প্রধান হলেন আবদুল্লাহ বিন আল-মুবারক। যখনই তিনি রাসূলের ভূমির উদ্দেশে প্রেম-ভালোবাসা ও আকাক্সক্ষা নিয়ে যাত্রা করেছেন, সামনে বেড়েছেন, তীব্র আস্বাদ ও দারুণ উচ্ছলতা অনুভব করেছেন। সফরের ক্লান্তি ও ক্লেশ ভুলে গেছেন। আবদুল্লাহ বিন আল-মুবারক সামনে তাকালেন এবং কিছু ঘরবাড়ি দেখতে পেলেন। সেগুলোকে বড়োজোর কুটির বা কুঁড়েঘর বলা চলে। ঘরগুলোর পাশে আছে ছোটো কিছু গাছ। গাছগুলোর পাশে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু পশু। তিনি তাঁর নির্বাহীকে বললেন, ‘এখন আমাদের কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার সময় হয়েছে। খুরাসান থেকে এখানে পৌঁছুতে আমাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
‘তাই ঠিক, শায়খ।’
‘নিশ্চয় তোমার দেহেরও হক আছে। এই উট আর ঘোড়াগুলোরও বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন আছে, ঘাসপানি খাওয়ার প্রয়োজন আছে।’
‘আমি যা বলার বলেছি।’ তাঁর নির্বাহী বললেন। ‘আমি সঙ্গীদের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ দেখেছি। তাঁরা বিশ্রাম নিতে চান।’
কাফেলা থেকৈ গেলো। উটগুলোকে বসানো হলো। মুসাফিরগণ তাঁদের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে সফরের ধুলোবালি ঝাড়তে লাগলেন। তাঁদের এসব কাজের  ফাঁকে আবদুল্লাহ বিন আল-মুবারক কিছুটা দূরে সরে গেলেন। কেবলামুখো হলেন। চাদর বিছালেন। আল্লাহপাকের দরবারে কাকুতি-মিনতি করতে শুরু করলেন। তাঁর হৃদয়ে মুমিনের বিশ্বাস, দুনিয়াত্যাগীর একনিষ্ঠতা এবং তিনি বীর মুজাহিদের মতো ধৈর্যশীল। সঙ্গীরা তাঁর দিকে তাকালেন। বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় তাঁদের দৃষ্টি ঝুলে গেলো। কী আশ্চর্য কিসিমের লোকরে বাবা! সবার থেকে ভিন্ন। সঙ্গীদের একজন বিড়বিড় করে বললেন, ‘আপনার জন্য আফসোস হে ইবনুল মুবারক! আমার মনে হয় আপনি এই পৃথিবীর কেউ নন।’
‘ভাই, তুমি এতো অবাক হচ্ছো কেনো?’ তাঁর পাশে দাঁড়ানো সঙ্গীটি বললেন। ঘন শ্মশ্রƒম-িত মানুষটির চেহারা ও মাথায় বার্ধক্যের উজ্জ্বলতা।
‘আমি প্রায় সময়ই এই লোকটির ব্যাপারে চিন্তা করি। আমি যা দেখি তা বিশ্বাস করে উঠতে পারি না। ইলমের ময়দানে তিনি মুহাদ্দিসগণের ইমাম। যে-চারজন মহান আলেম হাদিস বর্ণনা করেন তিনি তাঁদের অন্যতম। যাঁরা ইলমে নববির উত্তরাধিকার চর্চা করেন তাদেরও তিনি অন্যতম। ইবাদত-বন্দেগি ও আধ্যাত্মিক সাধনায় তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। গোটা পৃথিবী যদি তার সমস্ত ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য নিয়ে এই মানুষটির সামনে উপস্থিত হয়, তাঁকে সামান্যও বিচ্যুত করতে পারবে না। তিনি যা আঁকড়ে ধরেছেন তা থেকে পিঁপড়ের পা পরিমাণও নাড়াতে করতে পারবে না। যুদ্ধে তিনি এক মহাবিস্ময়। আমাদের এবং শত্রুদের মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের সময় তিনি দ্রুত এগিয়ে যান। তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা এমনভাবে বিজয় নিশ্চিয় করেন যে তা আমাদের বোধেরও বাইরে থেকে থেকে যায়। আবার দুনিয়ার বিষয়-আশয় ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও তিনি স্বতন্ত্র। শায়খ, আপনি তাঁর কাছে এর চেয়ে বেশি আর কী চান?’
‘বাছা, সত্য মুমিন আল্লাহপাকের আলোয় পথ চলেন।’ শুভ্র শ্মশ্রƒম-িত শায়খ মাথা দুলিয়ে বললেন। ‘দুনিয়াতেও তিনি পর্যাপ্ত অর্জন করেন এবং তাঁর আখেরাতের অর্জনও পর্যাপ্ত। আমাদের শায়খ আবদুল্লাহ বিন আল-মুবারক অনেক বড়ো আলেম। প্রজ্ঞার প্রতিটি পর্যায় তিনি অতিক্রম করেছেন। আল্লাহপাক তাঁর অন্তরকে প্রেম ও মারেফাতে পূর্ণ করেছেন। তাঁকে পান করানো হয়েছে ইমানের অমৃত। তাই তিনি হয়ে উঠেছেন অন্যরকম চরিত্র।’
বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁরা আলোচনা করছিলেন। আবদুল্লাহ বিন আল-মুবারকের প্রশংসা ও গুণগান করছিলেন। তিনি তখনও আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতিতেই রত ছিলেন। এবার তাঁদের সঙ্গে তৃতীয়জন যুক্ত হলেন।
‘এতো বকবক করছো কী ব্যাপারে? তৃতীয়জন বললেন। তোমরা আমার নাসুদনুদুস পাখিটার কথা জানো তো? সেটি আমি মজা করে খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পাখিটার গলা টিপে দেওয়ার পর দেখি বেচারা মরে গেছে। বন্ধুরা, ক্ষুধা সুন্দর পাখিটির প্রতি আমার প্রচ- দুঃখ ও আফসোস বাড়িয়ে দিয়েছিলো।’
‘তুমি যে বেঁচে আছো এটাই যথেষ্ট।’ শুভ্র শ্মশ্রƒম-িত শায়খ মৃদু তিরস্কার করে বললেন। ‘বনি আদমের জন্য মেরুদ- সোজা রাখতে পারে এতোটুকু খাবারই তো যথেষ্ট।’
তৃতীয়জন অনুতাপে দুই ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। তাঁরা যে-বাড়িগুলোর পাশে শিবির স্থাপন করেছেন সেখানে একটি ভাগাড় ছিলো। তিনি মৃত পাখিটিকে সেই ভাগাড়ে ফেলে এলেন। আসার পথে ইবনুল মুবারক তাঁকে দেখলেন। নামায শেষ করে তিনি এগিয়ে এলেন। তাঁকে বললেন, ‘আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে এই কঁড়েঘরগুলোর কাছে যাবো। দেখি সেখানে কী আছে। এখানে যারা বসবাস করে তাদের সম্পর্কেও জানবো।’
ইবনুল মুবারক এবং মৃত পাখির মালিক সেদিকে হাঁটা ধরলেন। ঘরগুলোর কাছে পৌঁছার পর ইবনুল মুবারক ডানেবাঁয়ে দেখতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি একটি মেয়েকে দেখলেন ভাগাড়টির দিকে এগিয়ে আসছে। এসেই সে মরা পাখিটি কুড়িয়ে নিলো। পাখিটি নিয়ে এমন ভঙ্গিতে বাড়ির দিকে ছুটলো যেনো সে অমূল্য ধন কুড়িয়ে পেয়েছে। ব্যাপারটি দেখে ইবনুল মুবারক আশ্চর্য ও ঘৃণাবোধ করলেন। তিনি মেয়েটির পেছনে ছুটলেন। তাকে ধরে ফেলতেই সে ভীষণ চমকে উঠলো। তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেলো। ভীত চোখে সে ইবনুল মুবারকের দিকে তাকালো। তার ছলছল চোখদুটিতে কাকুতি-মিনতি ও অনুনয়ের ছাপ। হঠাৎ তার ধূসর চোখের পাতা থেকে অশ্রুর ফোয়ারা ছুটলো। ভীত কণ্ঠে ফিসফিস করে বললো, ‘জনাব, আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। আপনি কী করতে চান?’
‘ভয় পেয়ো না, মা।’ ইবনুল মুবারক মেয়েটিকে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করলেন। ‘তুমি কেনো মরা পাখিটিকে কুড়িয়ে নিলে? এটা দিয়ে তো খেলা করাও যাবে না!’
‘মেয়েটি মাথা নিচু করলো। সে কিছুটা শান্ত হলো। কান্নায় হেঁচকি ওঠা স্বরে বললো, ‘দুদিন ধরে আমরা ক্ষুধার জ্বালায় পুড়ছি। আমি ও আমার ভাই। জনাব, ক্ষুধা খুবই ভয়ঙ্কর… খুবই যন্ত্রণাদায়…।’
‘তুমি এসব কথা বলে কী বুঝাতে চাচ্ছো? ইবনুল মুবারক না বোঝার ভান করে বললেন।
‘আমার কথার অর্থ হলো আমরা এই মরা পাখিটিকে খাবো!’
‘মরা পাখি খাবে!!’
‘ক্ষুধা খুবই নিষ্ঠুর… কাউকে দয়া দেখায় না…।’
‘আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো… এটা তো হারাম…।’
‘জনাব, ক্ষুধায় মরে যাওয়ার চেয়ে হারামও খাওয়া ভালো।’ নিশ্চিত ও দৃঢ় ভঙ্গিতে বললো মেয়েটি।
কিশোরীটি ইবনুল মুবারকের কাছে তার অশ্রুসিক্ত জীবনকথা বলতে শুরু করলো। কীভাবে তারা দুই ভাইবোন একাকী বসবাস করে। তাদের কোনো অভিভাবক নেই, সহায়-সম্বল নেই। দান-সদকা ও মেগেচেয়ে তাদের জীবন কাটে। মৃত পশু-পাখিও তাদের খেতে হয়।
‘কিন্তু মেয়ে, তোমার বাবা কোথায়?’ ইবনুল মুবারক তার কথা কেটে দিয়ে বললেন।
মেয়েটির দু’গাল বেয়ে চোখের জল নামতে লাগলো। তার রুগ্ণ-পাতলা শরীরে লজ্জা-বেদনা-বঞ্চনা কেঁপে কেঁপে উঠলো।
‘আমরা সুখীই ছিলাম,’ বলতে লাগলো মেয়েটি, ‘বাবা আমাদের জন্য অনেক পরিশ্রম করতেন। আমরা যা চাইতাম তাই এনে খাওয়াতেন। আমাদের অর্থ-সম্পদও ছিলো। আমরা কখনো দুনিয়ার কষ্ট জীবনের কষ্ট কী বুঝি নি। আমরা বুঝতাম যে আমাদের জীবনে কোনো দুঃখ নেই… আহ… এরপর একদিন তারা এলো…।’ মেয়েটি কথা শেষ করতে পারলো না। দুঃখে কেঁপে উঠলো।
‘মা, তুমি তোমার কথা শেষ করো।’ ইবনুল মুবারক আদরে তার হাত ধরে বললেন। ‘ঘটনা কি বলো। কারা এসেছিলো?’
‘নেকড়ে…।’
‘নেকড়ে…?’
‘অবশ্যই… মানব নেকড়ে। ওরা আমাদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করতো। তারা বাবার ওপর অত্যাচার করে এবং যা কিছু ছিলো সব ছিনিয়ে নেয়। তারাপর বাবাকে হত্যা করে। তিনি ছাড়া আমাদের কেউ নেই। আজ আমরা – আমি এবং আমার ভাই – নিঃস্ব; গায়ের কাপড়টি ছাড়া আমাদের কিছুই নেই।’
কিশোরীটি চুপ করে গেলো। জমাট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মরা পাখিটি তার হাতে। ইবনুল মুবারক বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিশোরীটির ব্যাপারে তিনি চিন্তা করছেন, নিজের কথাও চিন্তা করছেন। তিনি প্রায় প্রত্যেক বছরই হজ করার জন্য বাইতুল্লাহ সফর করেন। একটি বড় কাফেলা তাঁর সঙ্গী হয়। তিনি সবার জন্য অঢেল খরচ করেন। দরিদ্রদের দান করেন। আর এই নিঃস্ব মেয়েটি তার ভাইয়ের সঙ্গে বাস করে। মৃত পশু-পাখি ছাড়া তারা কিছু খেতে পায় না। তাদের বাবা নির্যাতিত ও নিহত হয়েছেন। মেয়েটির জীবন এখন শূন্য-নিঃস্ব-বুনো ও পীড়িত। তার পেট ও পিঠ ক্ষুধায় পুড়ছে। আর তিনি…। তাঁর মধ্যে আর মেয়েটির মধ্যে কী ভয়ঙ্কর পার্থক্য! মানুষ তাকে কীসের দুনিয়াত্যাগী বলে? তাঁর প্রতি কী ধরনের বীরত্ব আরোপ করে? আর এই কিশোরীটি কীভাবে জীবন-যাপন করছে? যন্ত্রণায়-অস্থিরতায় নির্ঘুম রাত কাটায়। ক্ষুধার শৈত্য তাকে কাঁপায়। মানব নেকড়ের ভয় তাকে কম্পিত রাখে।
ইবনুল মুবারকের মাথায় কিছু মানুষের বেদনার্ত-করুণ ছবি ঘুরপাক খাচ্ছে। আতঙ্কগ্রস্ত ও অভাবগ্রস্তদের ছবি। নিপীড়িতদের ছবি যারা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেছিলো। কবরের মতো কুঁড়েঘরে যারা বাস করে তাদের অহর্নিশ কান্নার ছবি। যারা জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকে এবং জীবিত থাকতেই দাফন হয়ে যায় তাদের ছবি। রাতদিন যারা বেদনার ঢেউয়ে হাবুডুবু খায় তাদের ছবি। হায়! তিনি যদি এখন তরবারি কোষমুক্ত করে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতেন। না শত্রুর ওপরে নয়। সম্মুখ যুদ্ধে শত্রুরা তার কাছে কিছু নয়! তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তে চান অন্যায়-অত্যচার, পীড়ন ও যন্ত্রণা এবং মানবিক দুর্দশার ওপর এবং সেগুলোকে দূরীভূত করতে চান। ইবনুল মুবারকের চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে এলো। তিনি কেঁদে উঠলেন। হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। এভাবে তাঁর জীবনে কখনো কাঁদেন নি। নিজে নিজেই লজ্জা পেলেন। কারণ তিনি অনেক বড়ো মানুষ। ক্ষুধার্ত-ভীত-মলিন কিশোরীটির সামনে তিনি দুর্বল হয়ে পড়লেন। সে এখনো তার হাতে মরা পাখিটি ঝুলিয়ে রেখেছে। যেনো সে তাঁর সামনে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আশ্রয় খুঁজছে। করুণা প্রার্থনা করছে। তাঁর কান্নাভেজা চোখ থেকে, নীরব মলিন মুখ থেকে, পুরনো জীর্ণ কাপড় থেকে, শীর্ণ নগ্ন পা থেকে, উষ্কখুষ্ক ধূসর চুল থেকে, কষ্টে-ক্ষুধায় ক্লিষ্ট-কাতর দেহ থেকে অদৃশ্য আর্তনাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
‘তুমি যাও। এখনই আমার নির্বাহীকে এখানে উপস্থিত করো।’ সঙ্গীকে চিৎকার করে বললেন ইবনুল মুবারক।
‘আপনি যা বলবেন তাই করবো, হে মহান শায়খ।’
‘তুমি যাও। আমরা অনেক উদাসীন।’
কিছুক্ষণ পরেই তাঁর নির্বাহী উপস্থিত হলেন।
‘তোমার কাছে কী পরিমাণ অর্থ আছে?’ ইবনুল মুবারক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন।
‘এক হাজার দিনার, শায়খ।
‘বিশ দিনা তোমার কাছে রেখে দাও… বাকিগুলো আমাকে দাও।’
তিনি নির্বাহীর হাত থেকে দিনারগুলো নিলেন। ভালোবাসা ও স্নেহের সঙ্গে মেয়েটির সামনে তুলে ধরলেন।
‘মেয়ে, এই টাকা তোমার জন্য। আশা কির এগুলো তোমার বিপদে কাজে আসবে এবং মরা পাখি খাওয়া থেকে তোমাকে বাঁচিয়ে দেবে। তুমি তোমার ভাইয়ের কাছে যাও। কাপড়, খাবার, ছাগল-ভেড়া… যা কিছু লাগে কিনে নাও। আল্লাহপাক তোমাদের হেফাযত করুন।
‘জনাব, আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন?’ ভয়ে কেঁপে উঠে বললো মেয়েটি।
‘মা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো। সব টাকাই তোমার জন্য। তোমাকে আমি দিয়েছি।’
‘এ..এখানে তো অনে..ক টাকা, আমার আমির মালিক।’ ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে বললো মেয়েটি।
‘আমি আমির নই, মেয়ে। আমি আল্লাহপাকের একজন নগণ্য বান্দা। আমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদম আ. মাটির সৃষ্টি।’
মোহাবিষ্টের মতো মেয়েটি দিনারগুলো হাতে নিলো। যেনো সে স্বপ্নের ঘোরে আছে। এরপর তাদের কুঁড়েঘরটির দিকে ছুটতে শুরু করলো। মুখে তার কথা ফুটছে; কিন্তু কথাগুলো কী তা বুঝা গেলো না।
শায়খ আবদুল্লাহ বিন মুবারক কাফেলার কাছে ফিরলেন। তাঁদের কাছে আসামাত্রই তাঁর নির্বাহীর নিচু কণ্ঠ শুনতে পেলেন।
‘আমরা কীভাবে আমাদের সফর শেষ করবো? কীভাবে রাসূলের ভূমিতে যাবো? বিশ দিনার দিয়ে তো কিছুই হবে না।’
‘মারু পর্যন্ত ফিরে যেতে তা আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে। এ-বছর হজ করা থেকে এটাই ভালো – আমরা ফিরে যাই।’ ইবনুল মুবারক নির্বাহীর দিকে তাকিয়ে বললেন।
তিনি সবার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার মতো বললেন, ‘আমার সঙ্গীরা, তোমরা আসবাবপত্র গুছিয়ে নাও। আমরা যেখান থেকে এসেছি সেখানেই ফিরে যাবো। আমাদের নির্ধারিত সময় আগামী বছর। সে-বছর আমরা হজ করবো, ইনশাআল্লাহ।’
কাফেলা তাদের নিজেদের ভূমিতে ফিরে এসেছে। পথে আর কোনো ঘটনা ঘটে নি। ঘটনা সেই একটি ঘটেছে যা তাদেরকে মাঝ পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। তাদেরকে এ-বছর আর হজে যেতে দেয় নি। তাদের শায়খ… তিনিই হলেন মানুষ। হৃদয় তাঁর আকাশের চেয়ে বড়ো।
শায়খ আবদুল্লাহ বিন মুবারক প্রায়ই মেয়েটির কথা মনে করেন। তাদের জীবনের কথা ভাবেন। তাঁর চোখ থেকে জল ঝরতে থাকে…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight