হিংসা সমাজ জীবনকে কলুষিত করে : এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

007

হিংসা একটি ভয়ানক সংক্রামক ব্যাধি। মানুষের হীন মনমানসিকতা, ঈর্ষাপরায়ণতা, সম্পদের মোহ, পদমর্যাদার লোভ-লালসা থেকে হিংসা-বিদ্বেষের উৎপত্তি ও বিকাশ হয়। মানবচরিত্রে যেসব খারাপ দিক আছে, তার মধ্যে হিংসা মারাত্মক ক্ষতিকারক। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষাকাতরতা, কলহ-বিবাদ প্রভৃতি মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবনকে অত্যন্ত বিষময় করে তোলে। এতে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অন্যের সুখ-শান্তি ও ধন-সম্পদ বিনষ্ট বা ধ্বংস করে নিজে এর মালিক হওয়ার কামনা-বাসনাকে আরবিতে ‘হাসাদ’ অর্থাৎ হিংসা বলা হয়।
হিংসা মানুষকে কত অধঃপতনে নিয়ে যায়, তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। ঈর্ষা ও হিংসা প্রায় একই রকম আবেগ, তবে হিংসাকে বলা হয় ঈর্ষার চরম বহিঃপ্রকাশ। ঈর্ষাকাতরতা হিংসার পর্যায়ে চলে গেলে আক্রোশবশত মানুষ হত্যাকা- পর্যন্ত ঘটিয়ে ফেলতে পারে। হিংসুক ব্যক্তি  অন্যের ভালো কিছু সহ্য করতে পারে না, কাউকে কোনো উন্নতি বা ক্ষমতায় অভিষিক্ত দেখলে অন্তরে জ্বালা অনুভব করে।
হিংসুকের জীবন কখনই সুখের হয় না। হিংসা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। কেননা হিংসুক ব্যক্তি সবসময় সব জিনিসের অধিকারী হতে চায়। তার সর্বদা এই চেষ্টাই থাকে যে, অন্যের কাছে যা আছে তার চেয়ে তার জিনিসটা ভালো হওয়া চাই। আর এই হিংসুক ব্যক্তি সমাজের অন্যান্য সম্মানিত ব্যক্তিদের ব্যক্তিত্বকে হেয় করার চেষ্টা করে। কেননা তার দৃষ্টিতে সে একাই সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি, বাকিরা সবাই তার চেয়ে নগণ্য। হিংসুককে কেউ ভালো দৃষ্টিতে দেখে না। সবার মাঝে তার প্রতি একটা খারাপ ধারণা জন্ম নেয়- তার কর্মকা-ের কারণে। সমাজের আর অন্য সবার সাথে বসবাস করলেও হিংসুক ব্যক্তি মানুষের মনে কোনো স্থান করে নিতে পারে না।
দৈনন্দিন জীবনে হিংসার বহুবিধ কারণ পরিলক্ষিত হয়। যেমন পারস্পরিক ঈর্ষাপরায়ণতা, পরশ্রীকাতরতা, শত্রুতা, দাম্ভিকতা, নিজের অসৎ উদ্দেশ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, নেতৃত্ব বা ক্ষমতার আকাক্সক্ষা, অনুগত লোকদের যোগ্যতাবান হয়ে যাওয়া এবং কোনো সুযোগ-সুবিধা হাসিল হওয়া, ব্যক্তি বা  গোষ্ঠীর নীচুতা বা কার্পণ্য প্রভৃতি।
ধর্মপ্রাণ মানুষের চরিত্র গঠনে হিংসা-বিদ্বেষ বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এতে মানুষে-মানুষে ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি, হানাহানি ও দ্বন্ধ-সংঘাতের উদ্ভব ঘটে।
আজকের সভ্য সমাজের দিকে তাকালেই আমরা হিংসার ব্যাপকতা লক্ষ্য করতে পারবো। আমাদের সামনে ফুটে উঠবে সমাজের বাস্তব চিত্র। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত আজ হিংসার জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়ছে। সারাদেশ জ্বলছে আর জ্বলছে। কারণ শুধু হিংসা। কেউ কাউকে সইতে পারছে না। সবাই নিজেকে নিয়েই মহাব্যস্ত। কাউকে একটু ছাড় দেয়ার মানসিকতাও নেই।
হিংসুকের চিহ্ন ও লক্ষণ প্রসঙ্গে লোকমান আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্রকে উপদেশ প্রদানকালে বলেন, ‘হিংসুকের তিনটি চিহ্ন রয়েছে- পিছনে গীবত করা, সামনা সামনি তোষামোদ করা এবং অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়া।’ [আল খেসাল, পৃষ্ঠা ১২১, হাদীস নং : ১১৩]
ইসলাম অন্যের প্রতি হিংসা করা বা প্রতিহিংসাপরায়ণ হওয়াকে সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ করেছে। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষের স্থলে সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন, সে জন্য কি তারা তাদের ঈর্ষা করে?’ [সূরা আন-নিসা : ৫৪]
হিংসা-বিদ্বেষ মুমিনের সৎ কর্ম ও পুণ্যকে তার অজান্তে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। মানুষ হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, শঠতা-কপটতা, অশান্তি, হানাহানি প্রভৃতি সামাজিক অনাচারের পথ পরিহার করে পারস্পরিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবে এবং ইসলামের পরিশীলিত জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ হবে এটিই ধর্মের মূলকথা। তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে নিবৃত্ত থাকবে। কেননা, হিংসা মানুষের নেক আমল বা পুণ্যগুলো এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেভাবে আগুন লাকড়িকে জ্ব¡ালিয়ে নিঃশেষ করে দেয়।’ [আবু দাউদ : ৪৯০৩]
হিংসুক ব্যক্তি যখন হিংসাত্মক কাজে লিপ্ত থাকে, তখন তাকে পরিত্যাগ করা অবশ্যকর্তব্য। এ জন্য হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকার লক্ষ্যে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার জন্য পবিত্র কুরআনে দিকনির্দেশনা প্রদান করে বলা হয়েছে, ‘আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই, যখন সে হিংসা করে।’ [সূরা আলফালাক : ৫]
ইমাম কুরতুবি রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেছেন, ‘হিংসা ও বিদ্বেষকারী ব্যক্তি সর্বদা  শোকার্ত হয়। কারণ সে অন্যের ভালো কোনো কিছু সহ্য করতে পারে না। তাই মনে কষ্টে নীল হতে থাকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘হিংসা ও বিদ্বেষ মানুষের কোনো উপকারে আসে না।’
হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারী লোকেরা শরীয়তের পরিপন্থী কাজ করে দ্বীন ইসলামের মূলে কুঠারাঘাত করে। হিংসার কারণে সামাজিক জীবনে অশান্তি বিরাজ করে। তাই কোনো কিছু নিয়ে হিংসা-বিদ্বেষ করা উচিত নয়। নিজের যা কিছু আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা দরকার। অন্যের দিকে তাকিয়ে বিদ্বেষ পোষণ করে হিংসার আগুনে জ্বলেপুড়ে মরা ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ নেই।
ইমাম বাকির রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই যেভাবে আগুন কাঠকে ভক্ষণ করে [জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে], হিংসাও ঈমানকে ভক্ষণ করে’। [আল কাফী, খ- ২, পৃষ্ঠা ৩০৬, হাদীস নং ১]
ইমাম সাদিক রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেছেন, ‘একে অপরের সাথে হিংসা করা থেকে বিরত থাকো, কেননা হিংসা হল কুফরের ভিত্তি স্বরূপ’। [আল কাফী, খ- ৮, পৃ. ৮, হাদীস নং ১]
আমরা মানুষ, আমাদের মাঝে মানবীয় দোষ-ত্রুটির অন্যতম হিংসা কোনো না কোনোভাবে প্রবেশ করতেই পারে। এটা বিচিত্র কিছু নয়। তবে আমাদের সদা সচেষ্ট থাকতে হবে, যেসব কারণে এমন বদঅভ্যাস আমাদের মনে জায়গা করে নিতে পারে, সেসব কারণ থেকে দূরে থাকা। সদা সর্বদা বিনম্রচিত্তে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে এমন খারাপ গুণ থেকে পানাহ চাওয়া। আর বেশি বেশি দু‘আ করা, হে আল্লাহ! এমন ধরনের ত্রুটি হতে আমাকে সদা রক্ষা করো।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight