হাশরের ময়দানে উপস্থিতদের বিভিন্ন অবস্থা

সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন :

ভিখারীর অবস্থা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, মানুষ অন্য মানুষদের কাছে ভিক্ষা চাইতে চাইতে এমন অবস্থায় উপনীত হয় যে, কেয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে, যখন তার চেহারায় গোশতের কিছুই থাকবে না।  [বুখারি, মুসলিম]
অর্থাৎ ভিখারীদের লাঞ্ছিত, অপমানিত করার জন্যই এমন অবস্থায় হাশরের ময়দানে উঠানো হবে। তাদের চেহারায় বিন্দুমাত্র গোশত থাকবে না। সবাই তাদের দেখে চিনতে পারবে, তারা দুনিয়াতে ভিক্ষা করত এবং নিজেদের মান-সম্মান নিজেরাই নষ্ট করত। আজকেও তাদের কোনো সম্মান নেই। তারা সকলের সামনে লাঞ্ছিত অপমানিত হচ্ছে।
যে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ করবে না তার অবস্থা
হযরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যার দুজন স্ত্রী থাকবে আর সে তাদের মাঝে ইনসাফ করবে না, কেয়ামতের দিন সে এক পাশ ঝুঁকে পড়া অবস্থায় আসবে। [মেশকাত শরিফ]
যে কুরআন শরিফ ভুলে গেছে তার অবস্থা
হযরত সাদ ইবনে ওবাদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কুরআন শরিফ পড়েছে, অতঃপর (অলসতা অমনোযোগিতার কারণে) ভুলে গেছে, সে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে। [মেশকাত শরিফ]
হাদিসে বর্ণিত ‘আজ্যাম’ শব্দের অর্থ কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত, তার হাত অথবা হাতের আঙ্গুল পড়ে যাবে। কোনো কোনো সম্মানিত মনীষী বলেন, এর মর্ম হল, তার দাঁত পড়ে যাবে। [আশি আতুল লামআত]
প্রকাশ্যত : শেষের উক্তিই বেশি সমীচীন মনে হয়। কেননা কুরআন শরিফ অনবরত তেলাওয়াত করতে থাকলে তবেই তা স্মরণ থাকে। আর তেলাওয়াত জিভ এবং দাঁতের কাজ। এজন্য তার শাস্তি দন্তহীন হওয়াই সংগত, আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন।
এক হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, হুযূর সা. ইরশাদ করেন, আমার সামনে উম্মতের গোনাহসমূহ পেশ করা হয়েছে আমি তার মধ্যে এর চেয়ে বড় আর কোন গুনাহ দেখিনি যে, কেউ কুরআন শরিফের কোন সূরা অথবা আয়াত মুখস্থ করে অতঃপর তা ভুলে গেছে। [তিরমিযি শরিফ]
বেনামাজির হাশর
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে নামাজের পাবন্দী করল না, তার জন্য নামাজ নূর হবে না, দলীলও হবে না এবং নাজাতের উসিলাও হবে না। কেয়ামতের দিন তার হাশর হবে ফেরাউন, কারুন, হামান এবং উবাই
ইবনে খালফের সাথে। [আহমদ, দারেমি]
হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তির অবস্থা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে এমনভাবে ধরে আনবে, যখন হত্যারীর কপাল এবং মাথা নিহতের হাতের মুঠোয় থাকবে। আর নিহতের ঘাড়ের রগ থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। সে আল্লাহর দরবারে আরজ করবে, হে রব, এ ব্যক্তি আমাকে হত্যা করেছে। নিহত ব্যক্তি (এমনিভাবে) হত্যাকারীকে নিয়ে আরশের কাছে পৌঁছবে। [তিরমিযি, নাসাঈ]
হত্যায় সাহায্যকারীর অবস্থা
হযরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের হত্যায় একটু কথার দ্বারাও সাহায্য করেছে, (কেয়ামতের দিন) সে আল্লাহ তাআলার সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করবে যে, তার উভয় চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে  (আ’য়েসুম্ মির রাহমাতিল্লাহ) আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ। [ইবনে মাজাহ]
ওয়াদা-অঙ্গীকার ভঙ্গকারীর অবস্থা
হযরত সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ওয়াদা অঙ্গীকার ভঙ্গকারীর জন্য একটি ঝাণ্ডা হবে, যা তার পায়খানার রাস্তায় লাগানো থাকবে। [মুসলিম শরিফ]
অন্য রেওয়ায়েতে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যার ওয়াদা ভঙ্গ যত বড় হবে, তার ঝাণ্ডাও তত বড় হবে। (এরপর ইরশাদ করেন) সাবধান! যে ব্যক্তি জনগণের শাসক হয় তার ওয়াদা ভঙ্গ থেকে অন্য কারো ওয়াদা ভঙ্গ বড় নয়। যদি কোন শাসক ওয়াদা ভঙ্গ করে তাহলে সমগ্র জনগণই তার ভুক্তভোগী হয়, এর আজাব সবচেয়ে বড়। [মেশকাত শরিফ]
আমির অথবা বাদশাহর অবস্থা
হযরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে মাত্র দশ জন লোকের আমির হবে, কেয়ামতের দিন সে হাত বাঁধা অবস্থায় উপস্থিত হবে। যদি সে তার অধীনস্থদের মধ্যে ইনসাফ করে তবে ইনসাফ তার বাঁধন ছুটিয়ে দেবে, অথবা জুলুম করলে তাকে ধ্বংস করে দেবে। [দারেমি]
অন্য হাদিসে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে শাসকই লোকদের মাঝে নির্দেশ করে, কেয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় আসবে যে, একজন ফেরেশতা তার কোমরে ধরে রাখবে। ফেরেশতা এভাবে তাকে ধরে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে। অতঃপর ফেরেশতারা (আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায়) আসমানের দিকে মাথা উঠিয়ে রাখবে। যদি আল্লাহ হুকুম করেন তাকে নিক্ষেপ কর, তখন ফেরেশতারা তাকে এমন গভীর গর্তে নিক্ষেপ করবে, যে গর্তের তলদেশে পৌঁছতে চল্লিশ বছর সময় লাগবে। [মেশকাত শরিফ]
এমনিভাবে জালেম শাসক প্রশাসকদের কেয়ামতের দিন গর্তে নিক্ষেপ করা হবে।
যে যাকাত আদায়  করে না তার অবস্থা
হযরত আবু হোরায়রা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যাকে আল্লাহ তাআলা মাল সম্পদ দান করেছেন, আর সে তার যাকাত আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন তার সম্পদকে বিষাক্ত সাপ বানিয়ে দেয়া হবে, যেটির চোখের উপর দুটি বিন্দু হবে। সেই সাপকে বেড়ি বানিয়ে তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর সেই সাপ তার উভয় চোয়ালে কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ। আমি তোমার গচ্ছিত ধনভাণ্ডার। এরপর রাসুলুল্লাহ সা. এ আয়াত তেলাওয়াত করেন-
‘আর যারা আল্লাহর দানকৃত বস্তুতে কার্পণ্য করে (যাকাত দেয় না), যা তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদের দান করেছেন, তারা যেন এরূপ ধারণা না করে যে, এটা তাদের জন্য ভাল; বরং এটা তাদের জন্য অনিষ্টকর বিপদ, অতি সত্ত্বরই কেয়ামতের দিন তাদের সে মালের বেড়ি পারানো হবে, যাতে তারা কার্পণ্য করেছিল।’ [বুখারি শরিফ]

হযরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, স্বর্ণ-রুপার মালিক যদি তার হক (যাকাত) আদায় না করে, তাহলে কেয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের ফলক বানানো হবে, যা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তার কাঁধে এবং মাথায় (কপালে) দাগ দেয়া হবে। আর যখনই ফলকগুলো ঠাণ্ডা হয়ে যাবে তখনই তা আবার জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে। বার বার এভাবে উত্তপ্ত করে তাকে দাগ দেয়া হতে থাকবে। (এ শাস্তি) পঞ্চাশ হাজার বছর চলতে থাকবে। এমন কি সকল মানুষের হিসাব-নিকাশও শেষ হয়ে যাবে। অতঃপর সে (এ শাস্তি থেকে মুক্তি লাভকরে) জান্নাত বা জাহান্নামের রাস্তা ধরবে।
উপস্থিত সাহাবাদের একজন প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা. উটের কি হুকুম? রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে সব উটের মালিক তাদের উটের হক আদায় না করে; তাদের হকের মধ্যে রয়েছে- যেদিন সেগুলোকে পানি পান করাবে সেদিন সেগুলোর দুধও দোহাবে, তাহলে কেয়ামতের দিন তাদের পরিষ্কার ময়দানে উটের পায়ের নিচে শুইয়ে দেয়া হবে। উটগুলো খুব মোটাতাজা হবে এবং সবগুলোই উপস্থিত হবে। এমন কি সেগুলোর একটি বাচ্চাও অনুপস্থিত থাকবে না। অতঃপর উটগুলো তাদের মালিককে পায়ে এবং মুখে মাড়াতে থাকবে। যখন একদলের মাড়ানো শেষ হবে তখন আরেক দল মাড়ানো শুরু করবে। এমনিভাবে পালাক্রমে উটগুলো তাদের মালিককে মাড়াতে থাকবে। পঞ্চাশ হাজার বছরের একদিনে (কেয়ামতের পূর্ণ দিন) সকল লোকের বিচার ফয়সালা শেষ হওয়া পর্যন্ত এভাবেই তাদের উপর শাস্তি চলতে থাকবে। অতঃপর উটের মালিক জান্নাত বা জাহান্নামের দিকে তার পথ পাবে।
আরজ করা হল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বকরী এবং গরুর হুকুমও বলুন। বললেন, গরু-ছাগলের যে মালিক সেগুলোর হক আদায় করবে না, কেয়ামতের দিন তাদের পরিষ্কার মাঠে সেগুলোর পায়ের নিচে শোয়ানো হবে, সেগুলোর একটিও অনুপস্থিত থাকবে না এবং কোনটির শিং কাটা অথবা কোনটি শিংবিহীনও হবে না, আর না কোনটার শিং ভাঙ্গা থাকবে। অতঃপর এসব গরু-ছাগল সেগুলোর মালিককে আঘাত করতে এবং খুর দিয়ে মাড়াতে থাকবে। যখন একদল অতিক্রম করবে তখন অন্য দল এসে মাড়াতে থাকবে। পঞ্চাশ হাজার বছরের একটি পুরো দিন চূড়ান্ত- ফয়সালা হওয়া পর্যন্ত এভাবেই শাস্তি দেয়া হতে থাকবে। অতঃপর সে জান্নাত বা জাহান্নামের দিকে নিজের পথ পাবে। [মুসলিম শরিফ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight