হাদীসে আদম আ. এর সৃষ্টি : সংকলন : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

bd014

পূর্ব প্রকাশিতের পর…
হযরত জাফর রাযী রহ. বর্ণনা করেন যে, উবাই ইবনে কা’ব রা. وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۖ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا
উল্লেখিত আয়াত তেলাওয়াত করে বলেন, কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মানুষ সৃষ্টি করে আল্লাহ তা’লা তাদের এক স্থান সমবেত করেন। এবং তাদের নিজেদের সাথে কথা বলেন ও তাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন এবং তাদের নিজেদেরকেই তাদের সাক্ষী রুপে রেখে তিনি জিজ্ঞাস করেন, আমি কি তোমাদের রব নই। তারা বলল জী হ্যাঁ। আল্লাহ বললেন এ ব্যাপারে আমি সাত আসমান সাত যমীন এবং তোমাদের পিতা আদমকে সাক্ষী রাখলাম যাতে কিয়ামতের দিন তোমারা এ কথা বলতে না পার যে, এ ব্যাপােের তো আমরা কিছুই জানতাম না। তোমরা জেনে রাখ যে, আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি ব্যতীত কোন মা’বুদ নেই। আর আমার সাথে তোমরা কাউকে শরীক করো না। তোমাদের নিকট পর্যায়ক্রমে আমি নবী রাসূল পাঠাব। তারা তোমাদেরকে আমার এ অঙ্গীকার ও প্রতিশ্র“তির ব্যাপারে সতর্ক করবেন। আর তোমাদের কাছে আমি আমার কিতাব নাযিল করব। তারা বলল আমরা সাক্ষ্য দিলাম যে আপনি আমাদের রব ও ইলাহ। আপনি ব্যতীত আমাদের আর কোন রব নেই। মোটাকথা, সেদিন তারা আল্লাহর আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিল।এরপর উপর থেকে; দৃষ্টিপাত করে আদম আ. তাদের মধ্যে ধনী গরীব ও সুশ্রী কুশ্রী সকল ধরনের লোক দেখতে পেয়ে বললেন: হে আমার রব আপনার বান্দাদের সকলকে যদি সমান করে সৃষ্টিকরতেন। আল্লাহ বললেন, আমি চাই আমার শুকরিয়া আদায় করা হোক। এরপর আদম আ. নবীগণকে তাদের মধ্যে প্রদীপের মত দীপ্তিময় দেখতে পান। আল্লাহ তা’লা তাদের নিকট থেকে রিসালাত ও নবুওয়াতের বিশেষ অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা’লা বলেন: স্মরণ কর যখন আমি নবীগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম এবং তোমার নিকট থেকেও এবং নূহ ইবরাহীম মূসা ও মারইয়াম তনয় ঈসার নিকট থেকে, এদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার। [সূরা আহযাব : ৭]
ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন যে , আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন- আদমের সন্তানরা সিজদার আয়াত পাঠ করে যখন সিজদা করে; ইবলিস তখন একদিকে সরে গিয়ে কাঁদতে শুরু করে। এবং বলে, হায় কপাল! আল্লাহর আদেশ পালনার্থে সিজদা করে আদম সন্তান জান্নাতী হলো আর সিজদার আদেশ অমান্য করে আমি হলাম জাহান্নামী। ইমাম মুসলিমও হদীসটি বর্ণনা করেছেন।
যাহোক আদম আ. ও তার সহধর্মিনী হাওয়া আ. জান্নাতে তা আসমানেরই হোক বা যমীনেরই কোন উদ্যান হোক  যে মতভেদের কথা পূর্বে বিবৃত হয়েছে কিছুকাল বসবাস করেন এবং অবাধে ও স্বাচ্ছন্দে সেখানে আহারাদি করতে থাকেন। অবশেষে নিষিদ্ব বৃক্ষের ফল আহার করায় তাদের পরিধানের পোশাক ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তাদের পৃথিবীতে নামিয়ে দেয়া হয়। অবতরণের ক্ষেত্র সম্পর্কে মতভেদের কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
জান্নাতে আদম আ. এর অবস্থানকাল সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। কারো মতে দুনিয়ার হিসাবের একদিন এর কিছু অংশ। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, এক হাদীসে আছে যে, আদম আ. কে জুমআর দিনের শেষ প্রহরে সৃষ্টি করা হয়েছে। আরেক বর্ণনায় এও আছে যে, জুম’আর দিন আদম আ. কে সৃষ্টি করা হয় এদিনেই তাকে জান্নাত থেকে বহিস্কার করা হয়। সুতরাং যদি এমন হয়ে থাকে যে, যেদিন আদম আ. এর সৃষ্টি হয় ঠিক সেদিনই জান্নাত থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন, তাহলে একথা বলা যায় যে, তিনি একদিনের কিছু অংশ জান্নাতে ছিলেন। তবে এ বক্তব্যটি বিতর্কের উর্ধ্বে নয়। পক্ষান্তরে যদি তার বহিষ্কার সৃষ্টির দিন থেকে ভিন্ন কোন দিন হয় কিংবা ঐ ছয় দিনের সময়ের পরিমাণ ছয় হাজার বছর হয়ে থাকে তাহলে সেখানে তিনি সুদীর্ঘ সময়ই অবস্থান করে থাকবেন। যেমন ইবনে আব্বাস রা. মুজাহিদ ও যাহহাক র. থেকে বর্ণিত এবং ইবনে জারীর র. কর্তৃক সমর্থিত হয়েছে বলে পূর্বেই উল্ল্যেখিত হয়েছে।
ইবনে জারীর রহ. বলেন এটা জানা কথা যে, আদম আ. কে সৃষ্টি করা হয়েছে জুম’আর দিন শেষ প্রহরে। আর তথাকার এক প্রহর দুনিয়ার তিরাশি বছর চার মাসের সমান। এতে প্রমাণিত হয় যে, রুহ সঞ্চারের পূর্বে মাটির মূর্তিরপে আদম আ. চল্লিশ বছর এমনিতেই পড়ে রয়েছিলেন। আর পৃথিবীতে অবতরণের পূর্বে জান্নাতে অবস্থান করেছেন তেতাল্লিশ বছর চার মাস কাল। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
ইবনে আব্বাস রা. কর্তৃক সর্বজন স্বীকৃত বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহ তা’লা আদম আ. কে ষাট হাত দীর্ঘ করে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তার সন্তানদের উচ্চতা কমতে কমতে এ পর্যন্ত এসে পৌছেছে। এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আদম আ. কে সৃষ্টিই করা হয়েছে ষাট হাত দৈর্ঘ করে তার বেশি নয়। আর তার সস্তান দের উচ্চতা হ্রাস পেতে পেতে এখন এ পর্যন্ত এসে উপনীত হয়েছে।
ইবনে জারীর রহ. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন; যে আল্লাহ তা’আলা বলেন। হে আদম আমার আরশ বরাবর পৃথিবী তে আমার একটি সম্মানিত স্থান আছে। তুমি গিয়ে তথায় আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে তওয়াফ কর। যেমন ফেরেশতারা আমার আরশ তওয়াফ করে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তার কাছে একজন ফেরেশ্তা প্রেরণ করেন। তিনি আদম আ. কে জায়গাটি দেখিয়ে দেন এবং তাকে হজ্জের করনীয় কাজসমূহ শিখিয়ে দেন। ইবনে জারীর রহ. আরো উল্লেখ করেন যে দুনিয়ার যেখানে যেখানে আদম আ. এর পাদাচারণা হয়। পরবর্তীতে সেখানেই এক একটি জনবসতি গড়ে ওঠে।
ইবনে আব্বাস রা . থেকে বর্ণিত আছে যে পৃথিবীতে আদম আ. এর প্রথম খাদ্য ছিল গম। জিবরাইল আ. তার কাছে সাতটি গমের বীজ নিয়ে উপস্থিত হলে তিনি জিজ্ঞাস করেন, এগুলো কি? জিবরাঈল আ. বললেন: এই তো আপনার সেই নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল যা আপনি খেয়েছিলেন। আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন এগুলো আমি কি করব? জিবরাঈল আ. বললেন যমীনে বপন করবেন। উল্লেখ্য যে তার প্রতিটি বীজের ওজন ছিল দুনিয়ার এক লক্ষ দানা অপেক্ষা বেশি। বীজগুলো রোপণ করার পর ফসল উৎপন্ন হলে আদম আ. তা কেটে মাড়িয়ে পিষে আটা বানিয়ে খামিরা করে রুটি বানিয়ে বহু ক্লেশ ও শ্রমের পর তা আহার করেন। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা’আলা বলেন। সুতরাং সে যেন তোমাদের কিছুতেই জান্নাত থেকে বের করে না দেয়। দিলে তোমরা দুঃখ পাবে। [সূরা ত্বাহা:১১৭]
আদম ও হাওয়া আ. সর্বপ্রথম যে পোশাক পরিধান করেন, তা ছিল ভেড়ার পশমের তৈরী। প্রথমে চামড়া থেকে পশমগুলো খসিয়ে তা দিয়ে সুতা তৈরী করেন। তারপর আদম আ. নিজের জন্য একটি জুব্বা আর হাওয়ার জন্য একটি কামীজ ও একটি উড়না তৈরী করে নেন।
জান্নাতে থাকাবস্থায় তাদের কোন সন্তানাদি জন্মেছিল কিনা এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে কারো কারো মতে, পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও তাদের কোন সন্তান জন্মেনি। কেউ বলেন; জন্মেছে। কাবীল ও তার বোনের জন্ম জান্নাতেই হয়েছিল। আল্লাহ ভাল জানেন।
উল্লেখ্য যে প্রতি দফায় আদম আ. এর এক সঙ্গে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিত। আর এক গর্ভের পুত্রের সাথে পরবর্তী গর্ভের কন্যার ও কন্যার সাতে পুত্রের বিবাহ দেওয়ার হুকুম ছিল। পরবতীতে একই গর্ভের দু ভাই বোনের বিবাহ নিষিদ্ব করে দেওয়া হয়।  সমাপ্ত


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight