হাদীসে আদম আ.-এর সৃষ্টি প্রসঙ্গ : সংকলন- আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

পূর্ব প্রকাশিতের পর..
আবূ মূসা আশ’আরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা আদম আ.-কে সমগ্র পৃথিবী থেকে সংগৃহিত এক মুঠো মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেন। তাই মাটি অনুপাতে আদমের সন্তানদের কেউ হয় সাদা, কেউ হয় গৌরবর্ণ, কেউ হয় কালো, কেউ মাঝামাঝি বর্ণের। আবার কেউ হয় নোংরা, কেউ হয় পরিচ্ছন্ন, কেউ হয় কোমল, কেউ হয় পাষাণ কেউ বা এগুলোর মাঝামাঝি। ঈষৎ শাব্দিক পার্থক্যসহ তিনি ভিন্ন সূত্রে উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আবূ দাঊদ, তিরমিযী এবং ইবনে হিব্বান রহ. আবূ মূসা আশআরী রা. যাঁর আসল নাম আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস রা. সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেন। ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটি হাসান সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন।
সুদ্দী রহ. ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসঊদ রা.-সহ কতিপয় সাহাবা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তারা বলেন, আল্লাহ তা’আলা কিছু কাদামাটি নেয়ার জন্য জিবরাঈল আ.-কে যমীনে প্রেরণ করেন। তিনি এসে মাটি নিতে চাইলে যমীন বলল, তুমি আমার অঙ্গহানি করবে বা আমাতে খুঁত সৃষ্টি করবে; এ ব্যাপারে তোমার নিকট থেকে আমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। ফলে জিবরাঈল আ. মাটি না নিয়ে ফিরে গিয়ে বললেন, হে আমার রব! যমীন তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করায় আমি তাকে ছেড়ে এসেছি। এবার আল্লাহ তা’আলা মীকাঈল আ.-কে প্রেরণ করেন। যমীন তাঁর নিকট থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করে বসে। তাই তিনিও ফিরে গিয়ে জিবরাঈল আ.-এর মতই বর্ণনা দেন। এবার আল্লাহ তা’আলা মালাকুল মউত আ. বা মৃত্যুর ফেরেশতাকে প্রেরণ করেন। যমীন তার কাছ থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি বললেন, আর আমিও আল্লাহ তা’আলার আদেশ বাস্তবায়ন না করে শূন্য হাতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর পানাহ চাই। এ কথা বলে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে সাদা, লাল ও কালো রঙ্গের কিছু মাটি সংগ্রহ করে মিশিয়ে নিয়ে চলে যান। এ কারণেই আদম আ.-এর সন্তানদের এক একজনের রঙ এক এক রকম হয়ে থাকে।
আজরাঈল আ. মাটি নিয়ে উপস্থিত হলে আল্লাহ তাআলা মাটিগুলো ভিজিয়ে নেন। এতে তা আঠালো হয়ে যায়। তারপর ফেরেশতাদের উদ্দেশে তিনি ঘোষণা দেন- ‘কাদামাটি দ্বারা আমি মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার রূহ সঞ্চার করব; তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।’ [সূরা হিজর : ২৮-২৯]
তারপর আল্লাহ তা’আলা আদম আ.-কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেন, যাতে ইবলীস তার ব্যাপারে আহংকার করতে না পারে। তারপর মাটির তৈরি এ মানব দেহটি থেকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত যা জুম’আর দিনের অংশ বিশেষ ছিল (ঊর্ধ্ব জগতের একদিন পৃথিবীর হাজার বছরের, বর্ণনান্তরে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান বলে কুরআনের বর্ণনায় পাওয়া যায়। [বি.দ্র. : ২২ঃ৪৭ ও ৭০ঃ৪] একইভাবে পড়ে থাকে। তা দেখে ফেরেশতাগণ ঘাবড়ে যান। সবচাইতে বেশি ভয় পায় ইবলীস। সে তাঁর পাশ দিয়ে আনাগোনা করত এবং তাঁকে আঘাত করত। ফলে দেহটি ঠনঠনে পোড়া মাটির ন্যায় শব্দ করত। এ কারণেই মানব সৃষ্টির উপাদানকে পোড়ামাটির ন্যায় ঠনঠনে মাটি বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর ইবলীস তাঁকে মুখ দিয়ে প্রবেশ করে পেছন দিয়ে বের হয়ে এসে ফেরেশতাগণকে বলল, একে তোমাদের ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। কেননা, তোমাদের রব হলেন সামাদ তথা অমুখাপেক্ষী আর এটি শূণ্যগর্ভ বস্তুমাত্র। কাছে পেলে আমি একে ধ্বংস করেই ছাড়ব।
এরপর তাঁর মধ্যে রূহ সঞ্চার করার সময় হয়ে এলো আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাগণকে বললেন, আমি যখন এর মধ্যে রূহ সঞ্চার করব; তখন তার প্রতি তোমরা সিজদাবনত হয়ো। যথাসময়ে আল্লাহ তা’আলা তাঁর মধ্যে রূহ সঞ্চার করলেন। যখন রূহ তাঁর মাথায় প্রবেশ করে, তখন তিনি হাঁচি দেন। ফেরেশতাগণ বললেন, আপনি আল-হামদুলিল্লাহ বলুন। তিনি ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বললেন। জবাবে আল্লাহ তা’আলা বললেন, (ইয়ার হামু কাল্লাহ) অর্থাৎ, তোমার রব তোমাকে রহম করুন!। তারপর রূহ তাঁর পেটে প্রবেশ করলে তাঁর মনে খাওয়ার আকাঙ্খা জাগে। ফলে রূহ পা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই তড়িঘরি করে তিনি জান্নাতের ফল-ফলাদির প্রতি ছুটে যান। এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা বলেন-

অর্থাৎ, ‘মানুষ সৃষ্টিগত ভাবেই ত্বারাপ্রবণ।’ [সূরা আম্বিয়া : ৩৭]
তখন ইবলীস ব্যতীত ফেরেশতারা সকলেই সিজদা করল। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকার করল। [সূরা হজ্জ :  ৩০]
সুদ্দী রহ. এভাবে কাহিনিটি শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেন। এ কাহিনীর সমর্থনে আরো বেশ ক’টি হাদীস পাওয়া যায়। তবে তার বেশির ভাগই ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে গৃহীত।
ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন যে, আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করে নিজের ইচ্ছানুযায়ী কিছুদিন তাঁকে ফেলে রাখেন। এ সুযোগে ইবলীস তাঁর চতুরপার্শে চক্কর দিতে শুরু করে। অবশেষে তাঁকে শূন্যগর্ভ দেখতে পেয়ে সে আঁচ করতে পারল যে, এটাতো এমন একটি সৃষ্টি যার সংযম ক্ষমতা থাকবে না।”
উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ.  বলেন, “আদম আ.কে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাগণকে আদেশ করা হলে সর্বপ্রথম হযরত ইসরাফীল আ. সিজদাবনত হন। এর পুরষ্কারস্বরূপ আল্লাহ তা’আলা তাঁর ললাটে কুরআন অঙ্কিত করে দেন। ইবনে আসাকির এ উক্তিটি উদ্ধৃত করেছেন।
হাফিজ আবূ ইয়া’লা রহ. বর্ণনা করেন যে, আনাস রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন আল্লাহ তা’আলা হযরত আদম আ.-কে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেন। প্রথমে মাটিগুলোকে ভিজিয়ে আটালো করে কিছু দিন রেখে দেন। এতে তা ছাঁচে-ঢালা মাটিতে পরিণত হলে আদম আ.-এর আকৃতি সৃষ্টি করে কিছুদিন এ অবস্থায় রেখে দেন। এবার তা পোড়া মাটিরমত শুকনো ঠনঠনে মাটিতে রূপান্তরিত হয়। বর্ণনাকারী বলেন, ইবলীস তখন তাঁর কাছে গিয়ে বলতে শুরু করে যে, তুমি এক মহান উদ্দেশ্যে সৃষ্ট হয়েছ। তারপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর মধ্যে রূহ সঞ্চার করেন। রূহ সর্বপ্রথম তাঁর চোখ ও নাকের ছিদ্রে প্রবেশ করলে তিনি হাঁচি দেন। হাঁচি শুনে আল্লাহ বললেন, ‘তোমার রব তোমার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন!
তারপর আল্লাহ তা’আলা বললেন, হে আদম! তুমি ঐ ফেরেশতা দলের কাছে গিয়ে দেখ তারা কী বলে? তখন তিনি ফেরেশতা দলের কাছে গিয়ে তাঁদেরকে সালাম দেন। আর তারা (আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু) বলে উত্তর দেন। তখন আল্লাহ বললেন, হে আদম! এটা তোমার এবং তোমার বংশধরের অভিবাদন। আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আমার রব! আমার বংশধর আবার কি? আল্লাহ বললেন, আদম! তুমি আমার দু’হাতের যে কোন একটি পছন্দ কর। আদম আ. বললেন, আমি আমার রবের ডান হাত পছন্দ করলাম। আমার রব-এর উভয় হাতই তো ডান হাত- বরকতময়।
এবার আল্লাহ তা’আলা নিজের হাতের তালু প্রসারিত করলে আদম আ. কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী তাঁর সকল সন্তানকে আল্লাহর হাতের তালুতে দেখতে পান। তন্মধ্যে কিছুসংখ্যকের মুখমণ্ডল ছিল নূরে সমুজ্জ্বল। সহসা তাদের মধ্যে একজনের নূরে অধিক বিমুগ্ধ হলে আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আমার রব! ইনি কে? আল্লাহ বললেন, ইনি তোমার সন্তান দাঊদ। জিজ্ঞাসা করলেন, এর আয়ু কত নির্ধারণ করেছেন? আল্লাহ বললেন, ষাট বছর। আদম আ. বললেন, আমার থেকে নিয়ে এর আয়ূ পূর্ণ একশ’ বছর করে দিন। আল্লাহ তাঁর আবদার মঞ্জুর করেন এবং এ ব্যাপারে ফেরেশতাগণকে সাক্ষী রাখেন। তারপর যখন আদম আ.-এর আয়ু শেষ হয়ে আসলো তখন তাঁর রূহ কবয করার জন্য আল্লাহ তা’আলা আযরাঈল আ.-কে প্রেরণ করেন। তখন আদম আ. বললেন, কেন, আমার আয়ুতো আরো চল্লিশ বছর বাকি আছে! ফেরেশতা বললেন, আপনি না আপনার আয়ুর চল্লিশ বছর আপনার সন্তান দাঊদ আ.-কে দিয়ে দিয়েছিলেন! কিন্তু আদম আ. তা অস্বীকার করে বসেন এবং পূর্বের কথা ভুলে যান। ফলে তার সন্তানদের মধ্যে অস্বীকৃতি ও বিস্মৃতির প্রবণতা সৃষ্টি হয়। হাফিজ আবূ বকর বাযযার রহ. তিরমিযী ও নাসাঈ রহ. তাঁর ‘ইয়াওম ওয়াল লাইলা’ কিতাবে আবু হুরায়রা সূত্রে এ হাদীসটি বর্ণনা করেন। তিরমিযী রহ. হাদীসটি হাসান গরীব পর্যায়ের এবং ইমাম নাসাঈ রহ. ‘মুনকার’ তথা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ. বর্ণনা করেন যে, হাসান রহ. বলেন, “আদম আ.-কে সৃষ্টি করে আল্লাহ তাআলা তাঁর ডান পার্শ্বদেশ থেকে জান্নাতিদের আর বাম পার্শ্বদেশ থেকে জাহান্নামিদের বের করে এনে তাদেরকে যমীনে নিক্ষেপ করেন। এদের মধ্যে কিছু লোককে অন্ধ, বধির ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত দেখে আদম আ. বললেন, হে আমার রব! আমার সন্তানদের সকলকে এক সমান করে সৃষ্টি যে করলেন না তার হেতু কি? আল্লাহ বললেন, “আমি চাই যে, আমার শুকরিয়া আদায় হোক।” আব্দুর রাযযাক অনুরূপ রিওয়ায়ত বর্ণনা করেছেন।

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা জিলহজ্জের নয় তারিখে নু’মান নামক স্থানে আদম আ.-এর পিঠ থেকে অঙ্গীকার নেন। তারপর তাঁর মেরুদণ্ড থেকে (কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী) তাঁর সকল সন্তানকে বের করে এনে তাঁর সম্মুখে ছড়িয়ে দেন। তারপর তাদের সাথে সামনা-সামনি কথা বলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলল, নিশ্চয়ই, আমরা সাক্ষী থকলাম। এ স্বীকৃতি গ্রহণ এ জন্য যে, তোমরা যেন বলতে না পার যে, আমাদের পূর্ব-পুরুষগণই তো আমাদের পূর্বে শিরক করে। আর আমরা তো তাঁদের পরবর্তী বংশধর, তবে কি পথভ্রষ্টদের কৃত-কর্মের জন্য তুমি আমাদের ধ্বংস করবে? [সূরা আরাফ : ১৭২, ১৭৩]
আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “কিয়ামতের দিন কোন এক জাহান্নামিকে বলা হবে- আচ্ছা, যদি তুমি পৃথিবীর সমুদয় বস্তু-সম্ভারের মালিক হতে; তাহলে এখন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তার সমস্ত কিছু মুক্তিপণ রূপে দিতে প্রস্তুত থাকতে? উত্তরে সে বলবে, হ্যাঁ। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি তো তোমার নিকট থেকে এর চাইতে আরো সহজটাই চেয়েছিলাম। আদম আ.-এর পিঠে থাকা অবস্থায় আমি তোমার নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, আমার সাথে তুমি কাউকে শরীক করবে না। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করে তুমি শরীক না করে ছাড়োনি। [শু’বার বরাতে বুখারি রহ. এবং মুসলিম রহ. হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।]

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ হাদীসে আদম আ.-এর সৃষ্টি প্রসঙ্গ : সংকলন- আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

  1. Sobuj Ahmed says:

    আমাদের আদি পিতার ইতিহাস জেনে খুব ভাল লাগল। ধন্যবাদ লেখককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight