হাদীসে আদম আ.-এর সৃষ্টি প্রসঙ্গ : সংকলন : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

হাবিল ও কাবিলের কাহিনী
আল্লাহ তা’লা বলেন- আদমের দু’পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযতভাবে শোনাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানি করেছিল তখন একজনের কুরবানি কবূল হলো, অন্যজনের কবূল হলোনা। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব-ই। অপরজন বলল, আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানি কবূল করেন।
আমাকে হত্যা করার জন্য তো জগতসমূহের রব আল্লাহকে ভয় কর। আমি চাই যে, তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করে জাহান্নামী হও এবং এটা জালিমদের কর্মফল। তারপর তার প্রবৃত্তি তাকে তার ভাইকে হত্যায় প্ররোচিত করল এবং সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো। তারপর আল্লাহ তা’লা একটি কাক পাঠালেন, যে তার ভাইয়ের লাশ কিভাবে গোপন করা যায় তা দেখাবার জন্য মাটি খুঁড়তে লাগল। সে বলল, হায় আমি কি এ কাকের মতও হতে পারলাম না যাতে আামার ভাই এর লাশ গোপন করতে পারি? তারপর সে অনুতপ্ত হলো। [সূরা মায়েদা : ২৭-৩১]
তাফসীর গ্রন্থে আমরা সূরা মায়িদার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এ কাহিনী সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা করেছি। এখানে শুধু পূর্বসূরী আলেমগণ এ বিষয়ে যা বলেছেন তার সারাংশ উল্লেখ করব।
সুদ্দী ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রা. সহ কতিপয় সাহাবা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আদম আ. এক গর্ভের পুত্র সন্তানের সঙ্গে অন্য গর্ভের কন্যা সন্তানের বিয়ে দিতেন। হাবীল সে মতে কাবীলের যমজ বোনকে বিয়ে করতে মনস্থ করেন। কাবীল বয়সে হাবীলের চাইতে বড় ছিল। আর তার বোন ছিল অত্যাধিক রুপসী।
তাই কাবীল ভাইকে না দিয়ে নিজেই আপন বোনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাইল এবং আদম আ. হাবীলের সাথে তাকে বিবাহ দেয়ার আদেশ করলে সে তা অগ্রাহ্য করল। ফলে আদম আ. তাদের দু’জনকে কুরবানি করার আদেশ দিয়ে নিজে হজ্জে চলে যান। যাওয়ার প্রক্কালে তিনি আসমানসমূহকে তার সন্তানদের দেখাশুনার দায়িত্ব দিতে চান কিন্তু তারা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। যমীন এবং পাহাড় পর্বতসমূহকে তা নিতে বললে তারাও অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে কাবীল এ দায়িত্বভার গ্রহণ করে।
তারপর আদম আ. চলে গেলে তারা তাদের কুরবানি করে। হাবীল একটি মোটা তাজা বকরী কুরবানি করেন। তার অনেক বকরী ছিল। আর কাবীল কুরবানি দেয় নিজের উৎপাদিত নিন্মমানের এক বোঝা শস্য। তারপর অগুন  এসে হাবীলের কুরবানি গ্রাস করে নেয় আর কাবীলের কুরবানি অগ্রাহ্য করে। এতে কাবীল ক্ষেপে গিয়ে বলল, তোমাকে আমি হত্যা করেই ছাড়ব। যাতে করে তুমি আমার বোনকে বিয়ে করতে না পার। উত্তরে হাবীল বললেন, আল্লাহ তা’লা কেবল মুত্তাকীদের কুরবানিই কবূল করে থাকেন।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে আরো একাধিক সূত্রে এবং আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকেও এটা বর্ণিত আছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, আল্লাহর কসম তাদের দুজনের মধ্যে নিহত লোকটিই অধিকতর শক্তিশালী ছিল। কিন্তু  নির্দোষ থাকার প্রবণতা তাকে হত্যাকারীর প্রতি হাত বাড়ানো থেকে বিরত রাখে।
আবূ জাফর আল বাকির রহ. বলেন, আদম আ. হাবীল ও কাবীলের কুরবানি করার এবং হাবীলের কুরবানি কবূল হওয়ার আর কাবীলের কুরবানি কবূল না হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তখন কাবীল বলল, ওর জন্য আপনি দু’আ করেছিলেন বিধায় তার কুরবানি কবূল হয়েছে আর আমার জন্য আপনি দু’আই করেন নাই। সাথে সাথে সে ভাইকে হুমকি প্রদান করে। এর কিছুদিন পর এক রাতে হাবীল পশুপাল নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিলম্ব করেন। ফলে আদম আ. তার ভাই কাবীল কে বললেন, দেখতো ওর আসাতে এত দেরী হচ্ছে কেন? কাবীল গিয়ে হাবীলকে চারণ ভূমিতে দেখতে পেয়ে তাকে বলল, তোমার কুরবানি কবূল হলো আর আমারটা হয়নি। হাবীল বললেন, আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের কুরবানিই কবূল করে থাকেন। এ কথা শুনে চটে গিয়ে কাবীল সাথে থাকা একটি লোহার টুকরা দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে।
কেউ কেউ বলেন, কানীল ঘুমন্ত অবস্থায় হাবীলকে একটি পাথর খণ্ড নিক্ষেপ করে তার মাথা চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়। কেউ কেউ বলেন, কাবীল সজোরে হাবীলের গলা টিপে ঘরে এবং হিংস্র পশুর ন্যায় তাকে কামড় দেয়াতেই তিনি মারা যান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমাকে খুন করার জন্য তুমি আমার প্রতি হাত বাড়ালেও তোমাকে খুন করার জন্য আমি তোমার প্রতি হাত বাড়াবার নই। [সূরা মায়েদা : ২৮]
কাবীলের হত্যার হুমাকির জবাবে হাবীলের এ বক্তব্য তার উত্তম চরিত্র খোদাভীতি এবং ভাই তার ক্ষতি সাধন করার যে সংকল্প ব্যাক্ত করেছিল তা প্রতিশোধ নেয়া থেকে তার বিরত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, তরবারি উচিয়ে দু’মুসলিম মুখোমুখি হলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যাক্তি দু’জনেই জাহান্নামে যাবে। একথা শুনে সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল হাত্যাকারী জাহান্নামে যাওয়ার কারণটা তো বুঝালাম, কিন্তু নিহত ব্যাক্তি জাহান্নামে যাবে তার কারণ? উত্তরে বাসূলুল্লাহ সা. বললেন: এর কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যার জন্য লালায়িত ছিল। আহমদ রহ. বর্ণনা করেন যে, ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেন : অন্যায়ভাবে যে ব্যাক্তিই নিহত হয় তার খুনের একটি দায় আদমের প্রথম পুত্রের ঘাড়ে চাপে। কারণ সেই সর্বপ্রথম হত্যার রেওয়াজ প্রবর্তন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight