হযরত সালিহ আ.: সংকলন- আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

Upnnas

ছামূদ একটি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ জাতি। তাদের পূর্বপুরুষ ছামূদ এর নামানুসারে এ জাতির নামকরণ করা হয়েছে। ছামূদ এর আর এক ভাই ছিল জুদায়াস। তারা উভয়ে আবির ইবন ইরাম ইবন সাম ইবন নূহ  এর পুত্র। এরা ছিল আরবে আরিবা তথা আদি আরব সম্প্রদায়ের লোক। হিজায ও তাবূকের মধ্যবর্তি হিজর নামক স্থানে তারা বসবাস করত। তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সা. এই পথ দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন। আদ জাতির পর ছামূদ জাতির অভ্যুদয় ঘটে। তাদেরমত এরাও মূর্তি পূজা করত। এদেরই মধ্য থেকে আল্লাহ তার এক বান্দা, সালিহ আ. কে রাসূলরুপে প্রেরণ করেন। তার বংশ তালিকা হচ্ছে সালিহ ইবন আবদ ইবন মাসিহ ইবন উবায়দ ইবন হাজির ইবন ছামূদ ইবন আবির ইবন ইরাম ইবন সাম ইবন নূহ আ.। তিনি তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত করতে, তার সাথে কাউকে শরীক না করতে এবং মূর্তিপূজা ও শিরক বর্জনের নির্দেশ দেন। ফলে কিছু সংখ্যক লোক তার প্রতি ঈমান আনে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই কুফুরিতে লিপ্ত থাকে এবং কথায় কাজে তাকে কষ্ট দেয়, এমনকি এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করতেও উদ্যত হয়। তারা নবীর সেই উটনীকে হত্যা করে ফেলে, যাকে আল্লাহ তাআলা নবুওয়াতের প্রমাণস্বরুপ প্রেরণ করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাদেরকে শক্তভাবে পাকড়াও করেন। এ প্রসঙ্গে সূরা আরাফে আল্লাহ বলেন- ছামূদ জাতির নিকট তাদের স্বগোত্রীয় সালিহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এ উটনী তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন।
একে আল্লাহর যমীনে চরে খেতে দাও এবং  একে ক্লেশ দিও না। দিলে তোমাদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হবে। স্মরণ কর, আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রসাদ ও পাহাড় কেটে বাস গৃহ নির্মাণ করছ। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটিয়ো না। তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানরা সেই সম্প্রদায়ের ঈমানদার যাদের দুর্বল মনে করা হত তাদের বলল, তোমরা কি জান যে, সালিহ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত? তারা বলল, তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী। দাম্ভিকেরা বলল, তোমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। তখন তারা সেই উটনীটি বধ করে এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করে বলে, হে সালিহ! তুমি রাসূল হলে, আমাদের যার ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো। তারপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হয়। ফলে তাদের প্রভাত হল নিজ গৃহে অধমুখে পতিত অবস্থায়। আর সে তাদের নিকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো আমার প্রতিপালকের বাণী তোমাদের নিকট পৌঁছিয়েছিলাম এবং তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু তোমরা তো হিতাকাক্সক্ষীদেরকে পছন্দ করো না [সূরা হুদ ৬১-৬৮]। এমনি ভাবে সূরা হুদ, হিজর, ইসরা, শুআরা, নামল, হা মীম সেজদা, কামার, ইবরাহীম সহ বিভিন্ন সূরায় তাদের আলোচনা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন করেছেন।
আদ জাতি মূলত পাহাড় কেটে গৃহ নির্মাণ করে থাকত এবং তারা তাদের গৃহের উপর পুরাপুরি ভরসা করত। তবে এগুলো তাদের কোন কাজে আসেনি, যখন আল্লাহর আযাব তাদের উপর আপতিত হয়েছে। যেমন সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,  মূসা বলেছিল, তোমারা এবং পৃথিবীর সকলেই যদি অকৃতজ্ঞ হও, তথাপি আল্লাহ অমুখাপেক্ষী এবং প্রশংসার্হ। তোমাদের নিকট কি সংবাদ আসেনিÑ তোমাদের পূর্ববর্তীদের নূহের সম্প্রদায়ের, আদের, ছামূদের এবং তাদের পরবর্তীদের? তাদের বিষয় আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের রাসূল এসেছিল [ সূরা ইবরাহীম ৮-৯] এ আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এখানে সবগুলো কথাই মুসা আ. এর যা তিনি নিজের জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন। কিন্তু আদ ও ছামূদ সম্প্রদায় দুটি যেহেতু আরব জাতির অন্তুর্ভুক্ত, তাই বনী ইসরাইলরা এদের ইতিহাস ভালভাবে সংরক্ষণ করেনি এবং গুরুত্ব সহকারে স্মরণও রাখেনি, যদিও মূসা আ. এর সময়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রবন্ধটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্যে হলো ছামূদ জাতির অবস্থা ও তাদের ঘটনা বর্ণনা করা। অর্থাৎ আল্লাহ তার নবী হযরত সালিহ আ. কে ও যারা তার উপর ঈমান এনেছিল তাদেরকে কিভাবে আযাব থেকে বাচিয়ে রাখেন, আর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণকারী, অত্যাচারী কাফিরদেরকে কিভাবে নির্মূল করেছিলেন এখানে তা বর্ণনা করা হবে। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, ছামূদ সম্প্রদায় জাতিতে ছিল আরব। আদ সম্প্রদায়ের ধ্বংস হবার পর ছামূদ সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়। তারা তাদের অবস্থা থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করেনি। এ কারণেই তাদের নবী তাদেরকে বলেছিলো, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন ইলাহ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর এই উটনী তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। একে আল্লাহর যমীনে চরে খেতে দাও, এবং একে কোন ক্লেশ দিও না, দিলে তোমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হবে। স্মরণ কর! আদ জাতির পর তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ ও পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করেছ। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটিয়ো না [সূরা আরাফ ৪৩-৭৪]। অর্থাৎ আদ জাতিকে ধ্বংস করে তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করার উদ্দেশ্য হলো এই যে, তাদের ঘটনা থেকে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে। তারা যেসব অন্যায় অপরাধ করেছে তা তোমরা করবে না। তোমরা সৎ কর্ম করবে। অন্যথায় কিয়ামতের পরিণতি হবে খুব ভয়াবহ ও জঘন্য। এমনিভাবে সালিহ আ. তাদেরকে খুব কোমল ভাষায় আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করছিলেন কিন্তু তাদের উত্তর ছিল উল্টো। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন। সালেহ আ. এর আহ্বানে তার উম্মতেরা বলতে লাগল, আমাদের বাপ দাদারা যাদের পূজা করত, তুমি কি আমাদেরকে তাদের পূঁজা থেকে নিষেধ করছো? তুমি আমাদেরকে যে বিষয়ে আহ্বান জানাচ্ছ, সে বিষয়ে আমরা অবশ্যই বিভ্রান্তিকর সন্দেহ পোষণ করি। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কি ভেবে দেখেছো আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি, আর তিনি যদি আমাকে তার নিজ অনুগ্রহ দান করে থাকেন, তারপর আমি যদি তার অবাধ্যতা করি, তবে তার শাস্তি থেকে আমাকে কে রক্ষা করবে? তোমরা তো কেবল ক্ষতিই বাড়িয়ে দিচ্ছো [সূরা হুদ৬২-৬৩]। সালিহ আ. এর আহ্বান শুনে তারা আরো বলতে লাগল যে, তুমি তো একজন জাদুগ্রস্তÍ লোক, অর্থাৎ তোমার উপর জাদুর প্রভাব পড়েছে, তাই সকল দেবতাকে বাদ দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদত করার জন্য তুমি যে আমাদেরকে আহ্বান জানাচ্ছো তাতে যে তুমি কি বলছো তা তুমি নিজেই বলতে পারোনা। তারা আরো বলত যে, তুমিও তো আমাদের মতো একজন মানুষ। সুতরাং যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে তোমার নিদর্শন নিয়ে আসো তথা অলৌকিক কোন জিনিষ দেখিয়ে নিজের দাবির সত্যতা প্রামণ করো। এই পরিপ্রেক্ষিতে ছামূদ সম্প্রদায়ের লোকেরা একবার এক স্থানে সমবেত হয়। ঐ সমাবেশে আল্লাহর নবী সালিহ আ. আগমন করেন। আল্লাহর দিকে তাদের কে দাওয়াত দেন। তাদের কে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করেন এবং আরো অনেক নসীহত করেন। তখন সমবেত সবাই তাকে বলল, ঐ যে একটা পাথর দেখা যায়, ওর মধ্য থেকে যদি অমুক অমুক গুনসম্মপন্ন একটি দীর্ঘকায় দশ মাসের গর্ভবতী উটনি বের করে দেখাতে পার, তবে দেখাও। সালিহ আ. বললেন, তোমাদের বর্ণিত গুনাবলীসম্পন্ন  উটনি যদি আমি বের করতে পারি তাহলে কি তোমরা আমার আনীত দ্বীন ও আমার নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে? তারা সবাই বলল, হ্যাঁ, বিশ্বাস করব। তখন তিনি এ কথার উপর তাদের থেকে অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। এরপর সালিহ আ. সালাত আদায়ের জন্য দাড়িয়ে যান এবং সালাত শেষে আল্লাহর নিকট তাদের আবদার পূরণ করার প্রার্থনা করেন। আল্লাহ ঐ পাথর থেকে অনুরুপ গুনসম্পন্ন একটি উটনি বের করে দেয়ার নির্দেশ দেন। যখন তারা স্বচক্ষে এরুপ উটনি দেখতে পেল। তখন তারা সত্যি সত্যি এক বিম্ময়কর বিষয়, ভীতিপ্রদ দৃশ্য, সুস্পষ্ট কুদরত ও চূরান্ত প্রমাণই প্রত্যক্ষ করল। এ দৃশ্য দেখার পর উপস্থিত বহু লোক ঈমান আনে বটে, কিন্তু অধিকাংশ লোকই  তাদের কুফুরী গুমরাহী ও বৈরিতার উপর অটল হয়ে থাকল।
মোটকথা আল্লাহ তাদের সামনে উটনি বের করে দিলেন, তার নবী সালেহ আ. এর পক্ষে, কিন্তু তারা তাদের ওয়াদা রাখল না। তারা জুলুম করল। যেমন আল্লাহ বলেন, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। আল্লাহর এ উটনি তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। অতএব একে আল্লাহর যমীনে চরে খেতে দাও। একে কোন কষ্ট দিও না, তাহলে তোমরা আযাবে আপতিত হবে [সূরা আরাফ ৭৩]। কিন্তু তারা জুলুম করেছে। আল্লাহ বলেন, আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরুপ ছামূদ জাতিকে উটনি দিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা তার প্রতি জুলুম করেছিল [ সূরা বনি ইসরাঈল ৫৯]। তাদের মধ্যে অনেকে যারা ঈমান এনেছিলো তাদের প্রধান ছিলো জানদা ইবন আমর ইবন মুহাল্লাত ইবন লাবীদ ইবন জুওয়াস। এ ছিল ছামূদ সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। তাদের মধ্যে আবার অনেকে ঈমান আনতে উদ্যত হয়, কিন্তু কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তাদেরকে ফিরিয়ে রাখে। তারা হলো, যাওয়াব ইবন ওমর ইবন লাবীদ ও খাববাব এ দুজনই ছিল তাদের ধর্মগুরু। মুসলামনদের পক্ষে ছিল জানদা। জানদা ইসলাম গ্রহণ করার পর আপন চাচাত ভাই শিহাব ইবন খলীফ কে ঈমান আনার জন্যে আহ্বান জানায়। কিন্তু ঐ ব্যক্তিরা তাকে উল্টো বুঝায় এবং সে তাদের দিকেই ঝুকে পড়ে। যাহোক হযরত সালেহ আ. পাথরের ভিতর থেকে উটনি বের করে দেখালেন এবং তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল যে, তারা একে কষ্ট দিবে না। কিন্তু তার কওম তাদের কথা রাখেনি তারা উল্টো ঐ আল্লাহর নিদর্শন উটটিকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। ইবন জারীর রহ. বলেন, ছামূদ সম্প্রদায়ের দুই মহিলা একজনের নাম সাদূক। সে মাহয়া ইবন যুহায়র ইবন মুখতারের কন্যা এবং প্রচুর ধন সম্পদ ও বংশীয় গৌরবের অধিকারী। তার স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে। ফলে স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে এবং নিজের চাচাত ভাই মিসরা ইবন মিহরাজ ইবন মাহয়াকে বলে, যদি তুমি উটটিকে হত্যা করতে পারো তবে আমি তোমাকে বিয়ে করব। অপর মহিলাটি ছিল উনায়যা বিনত গুনায়ম ইবন মিজলায, তাকে উম্মে উছমান বলে ডাকা হতো। মহিলাটি ছিল বৃদ্ধ এবং কাফির। তার স্বামী ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম সর্দার যুওয়াব ইবন আমর। এই স্বামীর ঔরসে তার চারটি কন্যা ছিল। মহিলাটি কিদার ইবন সালিফকে প্রস্তাব দেয় যে, সে যদি উটনীটি হত্যা করতে পারে তবে তার এ চার কন্যার মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা বিয়ে করতে পারবে। তখন ঐ যুবকদ্বয় উটনি হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সম্প্রদায়ের লোকদের সমর্থন লাভের চেষ্টা চালায়। সেমতে অপর সাত ব্যক্তি তাদের ডাকে সাড়া দেয়। এভাবে তারা নয়জন ঐক্যবদ্ধ হয়। কুরআনে সে কথায় বলা হয়েছে। আর সে শহরে ছিল এমন নয় ব্যক্তি যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং সৎকর্ম করত না [সূরা নমল ৪৮]। তারপর সেই নয়জন পুরো কওমের কাছে সাহায্য চাইল। সবাই সাহায্যের আশ্বাস দিল। তখন তারা উটনির খোঁজে বের হলো এবং দেখতে পেল যে, উটনিটি কুয়া থেকে পানি পান করে ফিরে আসছে। আগে থেকেই মিসরা নামক ব্যক্তিটি ওৎ পেতে ছিল সে প্রথম উটনিটির দিকে একটি তীর নিক্ষেপ করে। তীর তার পায়ের গোছা ভেদ করে চলে যায়। এদিকে মহিলারা তাদের মুখমন্ডল অবারিত করে গোটা কবিলার লোকদের কে উটনি হত্যার সংবাদ দিয়ে সবাইকে উৎসাহিত করতে লাগল। কিদার ইবন সালিফ অগ্রসর হয়ে উটনিকে তরবারির মাধ্যমে আঘাত করে, উটনিটি তখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং জোরে চিৎকার করে। চিৎকারের মাধ্যমে মূলত সে তার বাচ্চাকে সতর্ক করে। বাচ্চাটি ছিল পাহাড়ের উপর। বাচ্চাটি তখন ইয়া রাব্বি আইনা উম্মি অর্থাৎ হে আল্লাহ আমার মা কোথায় বলে ডাক দেয়। তারপর বাচ্চাটি একটি পাথরের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যায়। কেউ কেউ বলেন, তারা বাচ্চাটিকে পিছু ধাওয়া করে সেটিকেও হত্যা করেছিল। আল্লাহ বলেন, ওদের মধ্যে যে সর্বাধিক হতভাগ্য সে যখন তৎপর হয়ে উঠলো, তখন  আল্লাহর রাসূল বলল, আল্লাহর উটনি ও তার পানি পান করার ব্যাপারে সতর্ক হও। অর্থাৎ তোমরা একে ভয় কর। কিন্তু তারা রাসূলকে  অস্বীকার করল এবং উটনীকেও হত্যা করে ফেল। সালেহ আ. তখন তাদের কে বলে দিল যে, তোমরা তিন দিন তোমাদের ঘরবাড়িতে জীবন উপভোগ কর। এর অর্থ হলো যে, তিন দিন পরই আসছে সেই আযাব যার প্রতিশ্রুতি করা হয়েছে। কিন্তু এতো কঠিন সতর্কবানী সত্যেও তাদের টনক নড়েনি। তারা তার কথা তো বিশ্বাস করলই না উল্টো আল্লাহর নবী সালেহ আ. কেই হত্যা করার ফন্দি করল। তারা পরস্পর আল্লাহর নামে কসম করে বলল, আমরা রাত্রি বেলায় আক্রমণ চালাব এবং সপরিবারে নির্মূল করব। আর তার অভিভাবকরা যদি রক্তপণ চায় তাহলে আমরা হত্যা করার কথা অস্বীকার করব। কথা মত যারা সালেহ আ. কে হত্যা করতে সংকল্প করে প্রথমে তাদের কে পাথর মেরে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া হল। পরে গোটা সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেন। যে তিন দিন তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়েছিলো তার প্রথম দিন ছিল বৃহস্পতিবার। এই দিন আসার সাথে সাথে সম্প্রদায়ের সকলের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। যখন সন্ধ্যা হল তখন পরস্পর বলাবলি করল, জেনে রেখ, নির্ধারিত সময়ের প্রথম দিন শেষ হয়ে গেল। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তাদের চেহারা লাল রঙ্গের রঙ ধারণ করে। সন্ধাকালে তারা বলাবলি করে যে, শুনে রেখ, নির্ধারিত সময়ের দুই দিন কেটে গেছে। তৃতীয় দিন শনিবার সকলের চেহারা কালো রঙ ধারণ করে। সন্ধাবেলা তারা বলাবলি করে যে, জেনে রেখ, নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। রবিবার সকালে তারা খোশবু লাগিয়ে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষায় থাকল। কি শাস্তি ও আযাব গজব নাযিল হয় তা দেখার জন্য। তাদের কোন ধারণাই ছিল না যে, তাদেরকে কি করা হবে। কিছু সময় গেলে সূর্য উপরে উঠে উজ্জল হয়ে গেল। তখন আসমানের দিকে বিকট  আওয়াজ হলো এবং নিচের দিক থেকে প্রবল ভূমিকম্প শুরু হলো। সাথে সাথে তাদের প্রাণ বায়ূ উড়ে গেল। সকল নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। শোরগোল স্তব্ধ হয়ে গেল এবং যা সত্য তাই বাস্তবে ঘটে গেল। ফলে সবাই লাশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। আর তাদের পল্লীটা এমন হয়ে গেল যেন ইতিপূর্বে এখানে কেউ বসবাসই করেনি। ইতিহাসবিদরা লিখেন এই আযাব থেকে একজন মহিলা ছাড়া আর কেউ রেহায় পায়নি। মহিলাটির নাম কালবা বিনত সালাকা, ডাকনাম যারীআ। সে ছিল কট্টর কাফির ও হযরত সালিহ আ. এর চরম দুশমন। আযাব আসতে দেখেই সে দ্রুত বের হয়ে দৌঁড়ে এক আরব গোত্রে গিয়ে উঠল। এবং ঘটনার বর্ণনা দিল। তখন সে চরম পিপাসায় কাতর হলো এবং পানি পান করতে চাইল কিন্তু পানি পান করার সাথে সাথে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। এই মহিলা ছাড়া ছামূদ গোত্রের এমন কেউ ছিল না যারা আল্লাহর আযাবে আপতিত হয়নি। আল্লাহ তাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিয়েছেন তার নিদর্শনের সাথে কিরুপ আচরণের দরুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight