হযরত মুগিরাহ বিন হারিছ হাশেমী রা. : সংকলন: সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

নবুয়াত প্রাপ্তির পূর্বে যেসব ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, মুগিরাহ বিন হারিছ রা. ছিলেন তাঁদের অন্যতম। ইতিহাসে তিনি আবু সুফিয়ান পদবীতে মশহুর হয়ে আছেন। তিনি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচাতো এবং দুধ ভাইও ছিলেন। কেননা উভয়েই হযরত হালিমা সাদিয়া রা. এর দুধ পান করেছিলেন। হযরত আবু সুফিয়ান মুগিরাহ রা. এর বংশনামা হলো: মুগিরাহ বিন হারিছ বিন আবদুল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আবদে মান্নাফ বিন কুসাই।
মাতার নাম ছিল গাযনাহ (অন্য রেওয়ায়েত অনুযায়ী গাযিয়াহ)। তাঁর সম্পর্ক ছিল বনু ফাহর গোত্রের সাথে। তাঁর নসবনামা হলো: গাযনাহ (গাযিয়াহ) বিনতে কায়েস বিন তুরায়েফ বিন আবদুল উজ্জা বিন আমিরাহ বিন উমাইরাহ বিন ওয়াদিয়াহ হারিছ বিন ফাহর।
মুগিরাহ রা. প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম বয়সী এবং অন্তরের দোস্ত ছিলেন। চরিতকারদের বর্ণনা মতে তিনি আকৃতিতে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাদৃশ্য রাখতেন। সুদর্শন, যুদ্ধবিদ্যা, এবং কাব্য সাহিত্যের প্রতি তিনি ছিলেন আসক্ত। যৌবন কালেই কুরাইশের অত্যন্ত ভালো অশ্বারোহী এবং কবিদের মধ্যে পরিগণিত হতে থাকেন। নিকটাত্মীয়ের সম্পর্ক এবং এক বয়সী হওয়ার কারণে উভয়ের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম বয়সী কুরাইশ যুবকদের মধ্যে তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো যে, মানবতার মুক্তির দিশারী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হকের দাওয়াত প্রদান শুরু করলেন মুগিরাহ তখন সে দাওয়াতের প্রতি ইতিবাচক সাড়া প্রদান এবং সাহায্য সহযোগিতার পরিবর্তে উল্টো তাঁর বিরোধীদের কাতারে শামিল হয়ে গেলেন। এবং হকের বিরোধিতা করা যেন একমাত্র দায়িত্ব হিসেবে বেছে নিলেন। তার বিরোধিতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে শত্রুতায় পর্যবসিত হয়। এমনকি তিনি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালমন্দ করা এবং হক পন্থীদের যুলুম-নির্যাতন প্রশ্নে অন্যান্য নিকৃষ্ট কুরাইশদের থেকে পিছিয়ে রইলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনা মুনাওয়ারাহ তাশরীফ রাখলেন। এ সত্ত্বেও মুগিরাহ ইসলামের দুশমনীতে ভাটা পড়লো না। ইমাম হাকিম র. “মুসতাদরাকে হাকিমে” লিখেছেন, মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমান ও মক্কার মুশরিকদের মধ্যে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাতে আবু সুফিয়ান মুগিরাহ  মুশরিকদের পক্ষে অত্যন্ত সোৎসাহে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনিভাবে হকের বিরোধিতা করতে করতে তিনি বিশ বছর কাটিয়ে দেন। আশার বিপরীত তাঁর এ কাজ এবং শত্রুতামূলক আচরণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য অত্যন্ত দুঃখের কারণ হয়েছিল।
এ জন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ওপর ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। অষ্টম হিজরীতে মুগিরাহ রা. খবর পেলেন যে, বিশ্ব নবী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বিরাট বাহিনীসহ মক্কা দখল করতে আসছেন। এ খবর শুনে তিনি অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লেন এবং স্ত্রী ও শিশুদেরকে বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরাট বাহিনীসহ মক্কা আগমন করছেন। কুরাইশের এমন শক্তি নেই যে, তাঁকে বাধা দেবে। আমি যদি মুসলমানদের হস্তগত হই তাহলে তারা আমাকে জীবিত রাখবে না। এ জন্যে এখান থেকে চলে যাওয়াই আমাদের জন্যে উত্তম।
স্ত্রী অত্যন্ত নেকবখত এবং সমঝদার ছিলেন। তিনি অত্যন্ত দরদ ভরা কণ্ঠে বললেন, এখনো কি তোমার চোখ খুলেনি। আরব এবং আজমের লোক দলে দলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য কবুল করছে। তোমার জন্যে আফসোস যে, তুমি এখনো শত্রুতামূলক আচরণ করে চলছো। প্রকৃতপক্ষে অন্যান্যদের চেয়ে বেশি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাহায্য-সহযোগীতা করা তোমার উচিত ছিল।
স্ত্রীর কথায় হযরত মূগিরাহ রা. বিশেষভাবে প্রভাবিত হলেন এবং যখন তার সন্তানরাও মায়ের কথার প্রতি সমর্থন জানালো তখন তাঁর অন্তরজগত সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ তিনি গোলাম “মাজকুরকে” একটি উটনী এবং ঘোড়ী তৈরীর নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি নবজাত শিশু জাফরকে সাথে নিলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে হাজির হওয়ার ইচ্ছায় মদীনার দিকে রওয়ানা দিলেন। সে সময় মুসলমানদের অগ্রবর্তী বাহিনী আবওয়া নামক স্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁদের দেখে মুগিরাহ রা. নিজের বেশ পরিবর্তন করে নিলেন এবং সওয়ারীকে এক স্থানে বেঁধে রেখে চুপিসারে এক মাইল পায়ে হেঁটে বৃহৎ ইসলামী বাহিনীতে গিয়ে পৌঁছলেন। সে সময় তিনি ছিলেন ভীত সন্ত্রস্ত। প্রতি মুহূর্তে ভয়ে পা কাপছিল এ বুঝি কোন মুসলমানের হাতে পড়ে কতল হয়ে গেল। অগ্রসর হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং মুখ থেকে চাদর সরিয়ে নিলেন। তাঁর ধারণা ছিল হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে পেয়ে খুশী হবেন। কিন্তু স্বরণ ছিল না যে, বিগত ২০ বছরে দ্বীনে হকের বিরোধিতায় তিনি কত কি করেছেন। তখন তার জন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্তরে আর কোন স্থান নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি ঘৃণা পোষণকারী হয়ে গেছেন। দৃষ্টি যেই মুগিরাহর ওপর পড়লো ওমনি তিনি পবিত্র মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন। মুগিরাহ আবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। মুসলমানরা তাকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে এ অবস্থায় দেখলেন। তারাও তার সাথে একই আচরণ করলো। আনসার সাহাবী হযরত নুয়াইমান রা. এমন আবেগতাড়িত হয়ে পড়লো যে, কর্কশ কণ্ঠে মুগিরাহকে সম্বোধন করে বললেন, “এই আল্লাহর দুশমন তুইতো সে ব্যক্তি যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর সর্ব পন্থায় নির্যাতন চালিয়েছিস এবং তাঁর শত্রুতায় আসমান জমিন একাকার করে ফেলছিস। সময় এসে গেছে এখন তুই সকল অপকর্মের স্বাদ গ্রহণ কর।
হযরত নুয়াইমান রা. এর স্বর ক্রমেই উচ্চ মার্গে চড়তে লাগলো। এদিকে ভয়ে মুগিরার জীবনও যায় যায় অবস্থা। তিনি দৌড়ে নিজের চাচা হযরত আব্বাস রা. এর আশ্রয় নিলেন। হযরত আব্বাস রা. প্রথমে তাঁর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না কিন্তু যখন তিনি খুব করে অনুনয় বিনয় এবং আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে নুয়াইমান রা. ও অন্যান্য  মুসলমানদের হাত থেকে তাঁর জীবন রক্ষার আবেদন জানালেন তখন হযরত আব্বাস রা. এর দয়া হলো এবং তিনি হযরত নুয়াইমান রা. কে সম্বোধন করে বললেন, “হে নুয়াইমান! আবু সুফিয়ান (মুগিরাহ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচাতো ভাই এবং আমার ভ্রাতুষ্পুত্র। এটা ঠিক যে, বর্তমানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি অসন্তুষ্ট রয়েছেন। কিন্তু তিনি ভবিষ্যতে তাকে ক্ষমাও তো করতে পারেন।
হযরত আব্বাস রা. এর কথা শুনে হযরত নুয়াইমান রা. চুপ মেরে গেলেন এবং অন্যান্য মুসলমানও তার আস্থার ওপর ছেড়ে দিলেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজফাহ আগমন করলেন। এ সময় মুগিরাহ পুত্রসহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  আবাসস্থলের বাইরে বসে গেলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইরে বেরিয়ে তাঁকে দেখে বিরক্তির সাথে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। হযরত মুগিরাহ রা. খুব দুঃখিত হলেন ঠিকই কিন্তু নিরাশ হলেন না। যেভাবেই হোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছে নিজের অপরাধ ক্ষমা করিয়ে নেয়ার অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানেই যেতেন সেখানেই যেতেন। সেখানেই তিনি পৌঁছতেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিতেন। সব শেষে হযরত মুগিরাহ রা. উম্মুল মুমিনিন হযরত উম্মে সালমাহ রা. এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তাঁর প্রশ্নের সুপারিশ পেশ করার নিবেদন জানালেন। তিনি রাজী হলেন এবং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে আরজ করে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার চাচার পুত্রকে নিরাশ করবেন না”।
ইরশাদ হলো, আমার এমন চাচার পুত্রের প্রয়োজন নেই। সে আমার ওপর কম নির্যাতন চালায়নি।
হযরত মুগিরাহ রা. হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জবাব শুনলেন। তাঁর অন্তর ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। নিরাশ হয়ে তিনি স্ত্রীকে বললেন, আমার জন্যে ক্ষমার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন জীবিত থেকে কি লাভ?
আমি এ অপ্রাপ্ত বয়স্ক পুত্রকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাচ্ছি। আমরা দু’জন উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক সেদিক চলতে থাকবো এবং একদিন ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হয়ে মৃত্যুবরণ করবো।
কোন মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হযরত মুগিরাহর এ অবস্থার খরব পৌঁছলো। এ সময় দয়ার সাগর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্তরও আবেগময় হয়ে উঠলেন। তিনি হযরত মুগিরাহ রা. কে তার সামনে আগমনের অনুমতি মঞ্জুর করলেন। পিতা-পুত্র উভয়েই চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে হাজির হলেন এবং আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ বলে অগ্রসর হলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদেমদেরকে তাদের মুখের ওপর থেকে চাদর হটানোর নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, মুখতো দেখা যাক। তারা তৎক্ষণাৎ, চাদর সরিয়ে দিলেন। পিতা-পুত্র উভয়েই সে সময় কালেমা শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুগিরাহ রা. এর দিকে ইরশাদ করে বললেন, “আবু সুফিয়ান! তুমি আমাকে কবে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছিলে”?
তিনি আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি প্রথমেই খুব লজ্জিত আছি। এরপর আরো গালাগালি করে লজ্জা দেবেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “এখন আর কোন গালাগালি নয়”।
অতঃপর তিনি হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে চাচার পুত্রকে সাথে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাকে ওজু এবং সুন্নাতের তালিম প্রদান এবং গোসল দিয়ে পুনরায় তার নিকট নিয়ে আসতে বললেন। হযরত আলী রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ পালনের পর হযরত মুগিরাহ রা. কে দ্বিতীয়বার হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে পেশ করলেন। তিনি তাকে নামায পড়ালেন এবং ঘোষণা করে দিলেন যে, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল আবু সুফিয়ানের প্রতি রাজী হয়ে গেছেন। এ জন্যে সকল মুসলমানও যেন রাজী হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ ঘোষণায় হযরত মুগিরাহ রা. খুশীতে মাটিতে আর পা রাখতে পারছিলেন না। এখন তার জীবনে বিপ্লব এসে গেল এবং দ্বীনে হকের একজন জানবাজ সৈনিক বনে গেলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আবু সুফিয়ান মুগিরাহ রা. মক্কা বিজয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে অংশ গ্রহণকারী ১০ হাজার মুসলমানের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেলেন। অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসে হুনাইনের যুদ্ধ সংঘটিত হলো এ যুদ্ধেও হযরত মুগিরাহ রা. অত্যন্ত উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে অংশ নিলেন। যুদ্ধের সূচনায় বনু হাওয়াযেনের প্রচ- তীর বর্ষণে মুসলমানদের মধ্যে বিশৃংখলা দেখা দেয়। এ সময় হযরত মুগিরাহ রা. কতিপয় সাহাবীসহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে যুদ্ধের ময়দানে অটল পাহাড় হিসেবে দ-ায়মান ছিলেন। যখন শত্রুর চাপ বেশি বেড়ে গেল তখন তিনি নাঙ্গা তলোয়ার হাতে নিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়লেন এবং শত্রুর দিকে অগ্রসর হতে চাইলেন। হযরত আব্বাস রা. এ জীবন বাজী দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে আরয করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! চাচার পুত্রের প্রতি রাজি হয়ে যান। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি রাজি হয়ে গেলাম। সে আমার সাথে যত শত্রুতাই করে থাকুক না কেন আল্লাহ তাকে মাফ করুন। অতঃপর তিনি হযরত মুগিরাহ রা. কে সম্বোধন করে বললেন, আমার বয়সের কসম। তুমি আমার ভাই। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইরশাদ শুনে, তিনি খুশিতে আত্মহারা হয়ে তাঁর কদম মুবারক চুমু দিলেন। এক রেওয়ায়েতে আছে যে, সে সময় হযরত আব্বাস রা. হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাদা খচ্চরের লাগাম ধরে রেখেছিলেন এবং মুগিরাহ রা. জিনের পিছনের অংশ ধরা অবস্থায় ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইরশাদ শুনেই তিনি মুশরিকদের ওপর অমিতবিক্রমে হামলা করে বসলেন। অন্যান্য মুসলমানও তাঁর অনুসরণ করলো এবং মুশরিকদের পিছনে হটিয়ে দিল। ইবনে সায়াদ র. বর্ণনা করছেন যে, হযরত মুগিরাহ রা. এর বাহাদুরী এবং জীবন উৎসর্গের এ আবেগ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত খুশি করেছিল এবং তিনি তাঁকে “আসাদুল্লাহ” এবং “আসাদুর রাসূল” উপাধিতে ভূষিত করলেন।
হুনাইনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে সংঘটিত অন্যান্য যুদ্ধেও হযরত মুগিরাহ রা. হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহগামী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
ইসলাম কবুলের পর হযরত মুগিরাহ রা. শুধুমাত্র যুদ্ধসমূহে অংশ গ্রহণ করেই অতীত জীবনের কাফফারা আদায় করেননি বরং দিন রাত্রির অধিকাংশ সময় ইবাদত এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। ইবনে সায়াদ রা. বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সমগ্র রাত ধরে নামায পড়তেন এবং গরমের দীর্ঘ দিনে সকাল থেকে অর্ধ দিন পর্যন্ত নফল পড়তেন। কিছু বিরতির পর আবার নামায শুরু করতেন এবং আছর পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখতেন। একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ রা. কে বললেন, আয়েশা! জানো এ কে?
তিনি আরয করলেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ! না”।
ইরশাদ হলো: সে আমার চাচার পুত্র আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিছ। দেখো সে সবার আগে মসজিদে প্রবেশ করেছে এবং সকলের শেষে বের হয়ে আসবে। তার দৃষ্টি জুতোর চামড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।
ইমাম হাকিম র. “মুসতাদরাকে হাকিমে” এ রেওয়ায়েত উপস্থাপন করেছেন, হযরত মুগিরাহ রা. এর ইবাদত এবং আধ্যাত্মিক সাধনার একাগ্রতা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে “জান্নাতের যুবকদের সরদার” উপাধি প্রদান করেন। সে যুগে হযরত মুগিরাহ রা. সাইয়্যেদুল আনামের প্রশংসায় অনেক কবিতা রচনা করেন।
হযরত মুগিরাহ রা. জীবনের নতুন যুগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বের যুগের মত নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে পরিগণিত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশিতে তাঁকে উত্তম পরিজন বলতেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি হযরত মুগিরাহরও সীমাহীন ভালোবাসা ছিল। ১১ হিজরীতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাত হলে দুনিয়া তাঁর নিকট অন্ধকার হয়ে গেল এবং তিনি এক অন্তরস্পর্শী মারছিয়াহ রচনা করেন। তিন-চার বছর পর তাঁর প্রিয় ভাই নাওফিল বিন হারিছ রা. মারা গেলে তাঁর অন্তর একদম শীতল হয়ে গেল। সে সময় তিনি আল্লাহর নিকট দোয়া করে বললেন, হে আল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ভাইয়ের পর জীবন বিস্বাদ ও দুনিয়া নিরানন্দ হয়ে পড়েছে। এ জন্য শীঘ্র দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নাও। এ দোয়ার কিছুদিন পরই হজের মওসুম এলো। তিনি হজে শরীক হলেন। মিনায় মাথা মু-ালেন। এ সময় মাথায় ক্ষুর লেগে এমন বেগে রক্ত প্রবাহিত হতে লাগলো যে, তা আর বন্ধ হয় না। মদীনা মুনাওয়ারাহ ফিরে গিয়ে নিজেই নিজের কবর খুঁড়লেন। অবস্থার অবনতি ঘটলে আত্মীয়-স্বজন ক্রন্দন করতে লাগলো। তিনি সাবইকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ পাক প্রতিটি গুনাহ থেকে মাহফুজ রেখেছেন। কবর খোঁড়ার তিন দিন পর আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ফারুক রা. নামাযে জানাযা পড়ালেন এবং জান্নাতুল বাকীতে দাফন করলেন। তিনি অনেক ছেলে-মেয়ে রেখে যান। কিন্তু তাদের দিয়ে বংশ পরম্পরা অব্যাহত থাকেনি।
লেখিকা:  গ্রন্থ প্রণেতা, সম্পাদক ও প্রকাশক ‘মাসিক আল জান্নাত’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight