হযরত নূহ আ. এর কাহিনী পর্ব (৩) সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

আল্লাহ তাআলা বলেন, এভাবে যখন আমার আদেশ আসল এবং উনুন উথলে উঠল; তখন আমি বললাম, এতে তুমি প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া এবং যাদের বিরুদ্ধে পূর্বে সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা ব্যতীত তোমার পরিবার-পরিজনকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আরোহণ করাও। আর অল্প সংখ্যক ব্যতীত কেউ ঈমান আনেনি।
এখানে আদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাদের প্রতি আযাব আপতিত হলে যেন তিনি তাতে প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া তুলে নেন। আর আহলে কিতাবদের গ্রন্থে আছে, আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে প্রতি হালাল পশু-পাখির সাত জোড়া করে, আর নিষিদ্ধগুলোর নর-মাদা দুই জোড়া করে তুলে নেয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ কথাটি কুরআনের “ইছনাইনে” শব্দের অর্থে সাথে সংঘাতপূর্ণ, যদি একে আমরা কর্মকারক হিসেবে গণ্য করি। আর যদি একে “যাওজাইনে” শব্দের তাকীদ রূপে সাব্যস্ত করে কর্মকারক উহা মানি; তাহলে কোন সংঘাত থাকে না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
কেউ কেউ বলেন এবং ইবনে আব্বাস রা. থেকেও এরূপ বর্ণিত আছে যে, পক্ষীকুলের মধ্যে সর্বপ্রথম নৌকায় যা প্রবেশ করেছিল তাহলো টিয়া আর প্রাণীকুলের মধ্যে সর্বশেষ যা প্রবেশ করেছিল তাহলো গাধা এবং ইবলীস গাধার লেজের সাথে ঝুলে প্রবেশ করে।
ইবনু আবূ হাতিম আসলাম রহ. সূত্রে বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নূহ আ. নৌযানে প্রতি জীবের এক এক জোড়া তুলে নিলে তাঁর সংগীরা বললেন, সিংহের সঙ্গে আমরা কিভাবে বা গৃহপালিত প্রাণীরা কিভাবে নিরাপদ বোধ করবে? তখন আল্লাহ তাআলা সিংহকে জ্বরাক্রান্ত করে দেন। পৃথিবীতে এটাই ছিল সর্বপ্রথম জ্বরের আবির্ভাব। তারপর তাঁরা ইঁদুুরের ব্যাপারে অনুযোগ করে বললেন, “পাজিগুলো তো আমাদের খাদ্যদ্রব্য ও জিনিসপত্র সব নষ্ট করে ফেলল! তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে সিংহ হাঁচি দিয়। এতে বিড়াল বের হয়ে আসে। বিড়াল ইঁদুররা সব আত্মগোপন করে।” এ হাদিসটি ‘মুরসাল’ পর্যায়ের। “ওয়া আহলাকনা ইল্লা মান সাবাকা আলাইহি ওয়াল কাওলু” এর অর্থ হলো, কাফির হওয়ার কারণে তোমার পরিবারের যাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে গেছে তাদের ব্যতীত অন্য সকলকে নৌকায় তুলে নিও। এদের মধ্যে নূহ আ. এর পুত্র য়ামও ছিল যে নিমজ্জিত হয়েছিল। এর আলোচনা পরে আসছে।
“ওয়ামান আমানা” এর অর্থ, তোমার উম্মতের যারা তোমার সাথে ঈমান এনেছে তাদেরকেও তুমি নৌকায় তুলে লও।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ওয়ামা আমানা মাআহু ইল্লা কালীল” অর্থাৎ, সম্প্রদায়ের মধ্যে নূহ আ. এর এত দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং রাতে-দিনে নরম গরম নানা প্রকার কথা ও কাজের মাধ্যমে দীনের দাওয়াত দেয়া সত্ত্বেও অল্প সংখ্যক ব্যতীত কেউ ঈমান আনেনি।
নূহ আ. এর সঙ্গে নৌকায় যারা ছিল, তাদের সংখ্যা কত এ ব্যাপারে আলিমগণের মতভেদ আছে। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত যে, নারী-পুরুষ মিলে তারা ছিলেন আশিজন। কা‘ব ইবনে আহবাব থেকে বর্ণিত যে, তাঁরা ছিলেন বাহাত্তর জন। কারো কারো মতে দশজন। কেউ কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন নূহ, তাঁর তিন পুত্র ও য়াম এর স্ত্রীসহ তাঁর চার পুত্রবধু, যে য়াম মুক্তির পথ থেকে সরে গিয়েছিল। তবে এ অভিমতটি স্পষ্ট আয়াতের পরিপন্থী। কারণ, নূহ আ. এর সঙ্গে তাঁর পরিবারের লোকজন ব্যতীত অন্য একদল ঈমানদার লোকও ছিল বলে কুরআনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। যেমন নূহ আ. বলেছিলেন, “ওয়া নাজ্জিনী ওয়া মাম্মায়িআ মিনাল মুমিনীন” অর্থাৎ, “আমাকে ও আমার সঙ্গী মুমিনগণকে মুক্তি দাও।” [সূরা নং ২৬ : আয়াত নং ১১৮]
কেউ কেউ বলেন, তাঁরা ছিলেন সাঁতজন। আর নূহ আ. এর স্ত্রী তথা তাঁর সব কটি ছেলে হাম, সাম, য়াফিস ও য়াম আহলে কিতাবদের মতে যার নাম কানআন এবং তাঁর এ ছেলেটিই ডুবে মরেছিল। এদের মা প্লাবনের আগেই মারা গিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, সেও নিমজ্জিতদের সঙ্গে ডুবে মরেছিল। আর আহলে কিতাবদের মতে সে নৌকায় ছিল। একথাটি সঠিক হলে বলতে হবে যে, সে প্লাবনের পরেই কুফরী করেছিল কিংবা তাকে কিয়ামত দিবসের জন্য অবকাশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রথম অভিমতটিই যুক্তিসঙ্গত।
কারণ, নূহ আ. বলেছিলেন, “তুমি পৃথিবীতে কাফিরদের একটি গৃহবাসীকেও অব্যাহতি দিও না।” [সূরা নং ৭১ : আয়াত নং ২৬]
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবে, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আমাদেরকে জালিম সম্প্রদায় থেকে উদ্ধার করেছেন। আরো বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও যা হবে কল্যাণকর, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী।” [সূরা নং ২৩ : আয়াত নং ২৮-২৯]
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে তাঁর প্রতিপালকের প্রশংসা করার আদেশ দিয়েছেন। কারণ তিনি এ নৌযানকে তাঁর বশীভূত করে দিয়ে তা দিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেছেন, তাঁর ও তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে মীমাংসা করে দিয়েছেন এবং যারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছিল এবং তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল তাদের শাস্তি দানের মাধ্যমে তার প্রাণ জুড়িয়েছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “যিনি জোড়াসমূহের প্রত্যেককে সৃষ্টি করেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও পশু যাতে তোমরা আরোহণ কর। যাতে তোমরা তাদের পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার। তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন তোমরা তার উপর স্থির হয়ে বস এবং বল, পবিত্র ও মহান তিনি যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা এদেরকে বশীভূত করতে সমর্থ ছিলাম না। আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছে অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করব।” [সূরা নং ৪০ : আয়াত নং ১২-১৪]
এভাবে যাবতীয় কাজের শুরুতে দু‘আ করার আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে তা মঙ্গলজনক ও বরকতময় এবং তার শেষ পরিণাম শুভ হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করেন তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছিলেন, “বল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে বের করাও কল্যাণের সাথে এবং তোমার কাছ থেকে আমাকে দান কর সাহায্যকারী শক্তি।” [সূরা নং ১৭ : আয়াত নং ৮০]
বলাবাহুল্য যে, নূহ আ. এ উপদেশ মত কাজ করেন। এবং বলেন, “তোমরা এতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি, আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অর্থাৎ এর চলার শুরু এবং শেষ আল্লাহরই নামে। আমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল ও দয়ালু হওয়ার সাথে সাথে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিদাতাও বটে। অপরাধী সম্প্রদায় থেকে তার শাস্তি রোধ করার সাধ্য কারো নেই যেমনটি আপতিত হয়েছিল তাদের প্রতি, যারা আল্লাহর সাথে কুফরী করেছিল এবং তাকে বাদ দিয়ে অন্যের পূজা করেছিল।” [সূরা নং ১১ : আয়াত নং ৪১]
আল্লাহ তাআলা বলেন, “পাহাড়তুল্য তরঙ্গমালার মধ্যে তা তাদেরকে নিয়ে চলল।” [সূরা নং ১১ : আয়াত নং ৪২]
তা এভাবে হয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা আকাশ হতে এমন বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যা পৃথিবীতে ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি এবং এমন বৃষ্টি পরেও আর কখনো হবার নয়, যা ছিল মশকের খোলা মুখের মত অঝোর ধারায়। আর আল্লাহ তাআলা ভূমিকে আদেশ দেন, ফলে তা সর্বদিক থেকে উৎসারিত হয়ে উঠে।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “তখন নূহ তাঁর প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল, আমি তো অসহায়, অতএব তুমি প্রতিবিধান কর। ফলে আমি উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারি বর্ষণে এবং মাটি থেকে উৎসারিত করলাম প্রবল ঝর্ণাধারা। তারপর সকল পানি মিলিত হলো এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে। তখন নূহকে আরোহণ করলাম কাঠ ও পেরেক নির্মিত এক নৌযানে যা চলত আমার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। এটা ছিল প্রতিশোধ তার পক্ষ থেকে যাকে (নূহকে) প্রত্যাখান করা হয়েছিল।” [সূরা নং ৫৪ : আয়াত নং ১০-১৪]
ইবনে জারীর রহ. প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেন যে, কিবতীদের বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী এ মহাপ্লাবন ‘আব’ মাসের ১৩ তারিখে শুরু হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখন জলোচ্ছাস হয়েছিল তখন আমি তোমাদেরকে আরোহণ করিয়েছিলাম নৌযানে, আমি তা করেছিলাম তোমাদের শিক্ষার জন্যে এবং এজন্য যে, শ্রুতিধর কান তা সংরক্ষণ করে।” [সূরা নং ৬৯ : আয়াত নং ১১-১২]
অনেক মুফাসসির বলেন, পানি পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ার পনের হাত উপর পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল। আহলি কিতাবদের অভিমতও এটাই। কেউ কেউ বলেন, আশি হাত। সে প্লাবনে সমগ্র পৃথিবীর সমভূমি, পাথুরে ভূমি, পাহাড়, পর্বত ও বালুকাময় প্রান্তর সবই প্লাবিত হয়েছিল, ভূপৃষ্ঠে ছোট-বড় কোন একটি প্রাণীও অবশিষ্ট ছিল না। ইমাম মালিক রহ. যায়দ ইবনে আসলাম রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, সে যুগের অধিবাসীরা সমতল ভূমি ও পাহাড়-পর্বত সবকিছু পরিপূর্ণ করে রেখেছিল। আবদুর রহমান ইবনে যায়দ ইবনে আসলাম রা. বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি ভূখ-েরই কেউ না কেউ মালিক ছিল। ইবনে আবু হাতিম এ দুটি বর্ণনা দিয়েছেন।
নূহ তার পুত্র যে তাদের থেকে পৃথক ছিল, তাকে আহ্বান করে বলল, “হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গী হয়ো না। সে বলল, আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব যা আমাকে প্লাবন থেকে রক্ষা করবে। সে বলল, আজ আল্লাহর বিধান থেকে রক্ষা করার কেউ নেই, যাকে আল্লাহ দয়া করবেন সে ব্যতীত। এরপর তরঙ্গ তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিল এবং সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হলো।” [সূরা নং ১১ : আয়াত নং ৪২-৪৩]
এ পুত্রই হলো সাম, হাম ও য়াফিছ এর ভাই য়াম। কেউ কেউ বলেন, এর নাম কানআন। কাফির ও বদ আমল হওয়ায় সে পিতার দীন-ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করে। ফলে ধ্বংসপ্রাপ্তদের সেও ধ্বংস হয়ে যায়। অপরদিকে তার দীন-ধর্মের সমর্থক অনেক অনাত্মীয়ও তার পিতার সঙ্গে মুক্তিলাভ করেন।
এরপর বলা হলো “হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করে নাও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। এরপর বন্যা প্রশমিত হলো এবং কার্য সমাপ্ত হলো, নৌকা জূদী পর্বতের উপর স্থির হলো এবং বলা হলো, জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হোক।” [সূরা নং ১১ : আয়াত নং ৪৪]
অর্থাৎ প্লাবনে গাইরুল্লাহর পূজারীদের সকলে সমূলে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে তার পানি গ্রাস করে নেয়া এবং আকাশকে বারি বর্ষণ ক্ষান্ত করার আদেশ দেন। পানি পূর্বে যা ছিল তার চেয়ে কমে গেল। আর আল্লাহ তাআলা ইলম ও তাঁর নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে তাদের প্রতি যে আযাব ও ধ্বংস আপতিত হওয়ার কথা ছিল তা বাস্তবায়িত হলো। অর্থাৎ, কুদরতের ভাষায় ঘোষণা দেয়া হলো যে, ওরা রহমত ও মাগফিরাত থেকে দূর হোক। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “তারপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে। ফলে আমি তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল তাদেরকে উদ্ধার করি এবং যারা আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখান করেছিল তাদেরকেও নিমজ্জিত করি। তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।” [সূরা নং ৭ : আয়াত নং ৬৪]
অর্থাৎ, “আর তারা তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে। তারপর তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল তাদেরকে আমি উদ্ধার করি এবং তাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করি ও যারা আমার নিদর্শনসমূহকে প্রত্যাখান করেছিল তাদেরকে নিমজ্জিত করি। সুতরাং দেখ, যাদেরকে সতর্ক করা হয়েছিল তাদের পরিণাম কী হয়েছিল?” [সূরা নং ১০ : আয়াত নং ৭৩]
অর্থাৎ “আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম সে সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করেছিল, তারা ছিল এক মন্দ সম্প্রদায়। এজন্য তাদের সকলকেই আমি নিমজ্জিত করেছিলাম।” [সূরা নং ২১ : আয়াত নং ৭৭]
অর্থাৎ, “তারপর আমি তাকে ও তার সঙ্গে যারা ছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম বোঝাই নৌযানে। তারপর অবশিষ্ট সকলকে নিমজ্জিত করলাম। এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয় এবং তোমার প্রতিপালক! তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।” [সূরা নং ২৬ : আয়াত নং ১১৯-১২২]
অর্থাৎ “তারপর আমি তাকে এবং যারা নৌকায় আরোহণ করেছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং বিশ্বজগতের জন্য একে করলাম একটি নিদর্শন।” [সূরা নং ২৯ : আয়াত নং ১৫]
“তারপর অবশিষ্ট সকলকে আমি নিমজ্জিত করি।” [সূরা নং ৩৭ : আয়াত নং ৮২]
অর্থাৎ, আমি একে রেখে দিয়েছি এক নিদর্শনরূপে। অতএব, উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? কি কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী! কুরআনকে আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য, কে আছে উপদেশ গ্রহণের জন্য? [সূরা নং ৫৪ : আয়াত নং ১৫-১৭]
অর্থাৎ, তাদের অপরাধের জন্য তাদেরকে নিমজ্জিত করা হয়েছিল এবং পরে তাদেরকে দাখিল করা হয়েছিল আগুনে; তারপর তারা কাউকেও আল্লাহর মুকাবিলায় সাহায্যকারী পায়নি।
নূহ আরো বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য থেকে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না। তুমি তাদেরকে অব্যাহতি দিলে তারা তোমার বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল দুষ্কৃতকারী ও কাফির। [সূরা নং ৭১ : আয়াত নং ২৫-২৭]
বলাবাহুল্য যে, আল্লাহ তাআলা নূহ আ. এর বদদুআ কবুল করেছিলেন। সমস্ত প্রশংসা ও অনুগ্রহ তাঁরই। ফলে তাদের একটি প্রাণীও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর ও আবু মুহাম্মদ ইবনে আবু হাতিম আপন আপন তাফসীরে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এর বরাতে বলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নূহের সম্প্রদায়ের কারো প্রতি যদি আল্লাহ দয়া করতেন, তাহলে অবশ্যই শিশুর মায়ের প্রতি দয়া করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নূহ আ. তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে (পঞ্চাশ কম) এক হাজার বছর অবস্থান করেন এবং বৃক্ষ রোপণ করে একশ বছর অপেক্ষা করেন। বৃক্ষটি বড় হয়ে পোক্ত হলে তা কেটে তা দিয়ে নৌকা নির্মাণ করেন। নৌকা নির্মাণকালে সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁর নিকট দিয়ে অতিক্রম করত, তাকে ঠাট্টা করত এবং বলত, তুমি ডাঙ্গায় নৌকা নির্মাণ করছ, এ চলবে কিভাবে? নূহ আ. বলতেন অচিরেই তোমরা জানতে পারবে।
যখন তিনি নৌকা নির্মাণ শেষ করলেন এবং পানি উৎসারিত হলো ও তা অলিতে-গলিতে ঢুকে পড়ল, তখন একটি শিশুর মা তার ব্যাপারে আশংকা বোধ করল। সে তাকে অত্যন্ত ¯েœহ করত। অগত্যা শিশুটিকে নিয়ে সে এক পাহাড়ের এক তৃতীয়াংশ উপরে গিয়ে উঠে। পানি বাড়তে বাড়তে তার পর্যন্ত পৌঁছুলে এবার সে শিশুটিকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ওঠে। এবার পানি তার ঘাড় পর্যন্ত পৌঁছুলে সে তার দু হাত দ্বারা শিশুটিকে উপরে তুলে ধরে। তারপর তারা দুজনই ডুবে যায়। আল্লাহ যদি তাদের কাউকে দয়া করতেন, তাহলে ঐ শিশুর মাকে অবশ্যই দয়া করতেন।
এ হাদীস ‘গরীব’ পর্যায়ের। কা’ব আল আহবার ও মুজাহিদ প্রমুখ থেকে এর অনুরূপ কাহিনী বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিও কা’ব আল আহবারের ন্যায় কারো থেকে মওকুফ হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। আল্লাহ ভালো জানেন।
মোটকথা, আল্লাহ তাআলা কাফিরদের একটি গৃহবাসীকেও অবশিষ্ট রাখেননি। সুতরাং কোন কোন মুফাসসির কিভাবে ধারণা করেন যে, আওজ ইবন উনুক মতান্তরে ইবনে আনাক নূহ আ. এর পূর্বে থেকে মূসা এর আমল পর্যন্ত বেঁচে ছিল। অথচ তাঁরাই বলেন যে, সে ছিল সীমালংঘনকারী, উদ্ধত ও বিরুদ্ধচারী কাফির। তাঁরা আরো বলেন যে, সে ছিল আদমের কন্যা আনাকের জারজ সন্তান। সমুদ্রের তলদেশ থেকে মাছ ধরে এনে সে সূর্যের তাপে তা সিদ্ধ করত। নূহ আ. কে সে উপহাস ছলে বলত, তোমার এ ছোট্ট পেয়ালাটি কি হে? তারা আরো উল্লেখ করেন যে, তার উচ্চতা ছিল তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ হাত ছয় ইঞ্চি। এ ধরনের আরো অনেক অলীক কাহিনী রয়েছে। এ সংক্রান্ত বিবরণসমূহ এতই প্রসিদ্ধ যে, তাফসীর ইতিহাস ইত্যাদির বহু গ্রন্থে যদি এসব কথার উল্লেখ না থাকত; তাহলে আমরা তা আলোচনাই করতাম না। তাছাড়া এসব কথা যুক্তি এবং নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতের পরিপন্থী।
যুক্তি বলে, আল্লাহ তাআলা নূহ আ. এর পুত্রকে তার কুফরীর কারণে ধ্বংস করবেন, অথচ তার পিতা হলেন উম্মতের নবী ও ঈমানদারদের প্রধান আর আওজ ইবনে আনাক বা আনাককে ধ্বংস করবেন না, অথচ সে হলো চরম অত্যাচারী ও অবাধ্য; এটা হতেই পারে না। তাছাড়া অপরাধীদের কাউকে আল্লাহ দয়া করবেন না, এমনকি শিশুর মাকেও না, শিশুকেও না, আর এ স্বেচ্ছাচারী, অবাধ্য, চরম পাপাচারী কাফির ও বিতাড়িত শয়তানকে অব্যাহতি দিবেন এটা তো হতে পারে না!
লেখিকা : গ্রন্থ প্রণেতা, সম্পাদক ও প্রকাশক ‘মাসিক আল জান্নাত’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight