হযরত নূহ আ. এর কাহিনী পর্ব (১) : সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

তিনি হলেন নূহ ইবন লামাক ইবন মুতাওশশালিখ ইবন খানুখ। আর খানুখ হলেন ইদরীস ইবন য়ারদ ইবন মাহলাইল ইবন কীনন ইবন আনূশ ইবন শীছ ইবন আবুল বাশার আদম আ.। ইবন জারীর প্রমুখের বর্ণনা মতে, আদম আ. এর ওফাতের একশ ছাব্বিশ বছর পর তাঁর জন্ম। আহলি কিতাবদের প্রাচীন ইতিহাস মতে নূহ আ. এর জন্ম ও আদম আ. ও আদম আ. এর ওফাতের মধ্যে একশ ছেচল্লিশ বছরের ব্যবধান ছিল। দু’জনের মধ্যে ছিল দশ করন (যুগ) এর ব্যবধান। যেমন হাফিজ আবূ হাতিম ইবন হিব্বান র. তাঁর সহীহ গ্রন্থে আবূ উমামা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! আদম আ. কি নবী ছিলেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করল, তাঁর ও নূহ আ. এর মাঝে ব্যবধান ছিল কত কালের? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দশ যুগের। বর্ণনাকারী বলেন, এ হাদীসটি মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। তবে তিনি তা রেওয়ায়েত করেননি। সহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আদম আ. ও নূহ আ. এর মাঝখানে ব্যবধান ছিল দশ যুগের। তাঁরা সকলেই ইসলামের অনুসারী ছিলেন।
এখন করন বা যুগ বলতে যদি একশ বছর বুঝানো হয় যেমনটি সাধারণ্যে প্রচলিত তাহলে তাঁদের মধ্যকার ব্যবধান ছিল নিশ্চিত এক হাজার বছর। কিন্তু এক হাজার বছরের বেশি হওয়ার কথাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। কেননা, ইবনে আব্বাস রা. তাঁকে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আর তাদের দুজনের মধ্যবর্তী সময়ে এমন কিছু যুগও অতিবাহিত হয়ে থাকবে, যখন লোকজন ইসলামের অনুসারী ছিল না। কিন্তু আবূ উমামার হাদীস দশ করন এ সীমাবদ্ধ হওয়ার কথা প্রমাণ করে আর ইবন আব্বাস রা. একটু বাড়িয়ে বলেছেন, ‘তাঁরা সকলে ইসলামের অনুসারী ছিলেন।’ এসব তথ্য আহলি কিতাবদের সে সব ঐতিহাসিক ও অন্যদের এ অনুমানকে বাতিল বলে প্রমাণ করে যে, কাবীল ও তার বংশধররা অগ্নিপূজা করতো। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
আর যদি করন দ্বারা প্রজন্ম বুঝানো হয়ে থাকে : যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “নূহের পর আমি কত প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি।” [১৭ : ১৭]
“তারপর তাদের পরে আমি বহু প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি।” [২৩ : ৪২]
“তাদের অন্তবর্তীকালের বহু প্রজন্মকেও।” [২৫ : ৩৮]
‘তাদের পূর্বে কত প্রজন্মকে আমি বিনাশ করেছি।” [১৯ : ৭৪]
আবার যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, উত্তম প্রজন্ম আমার প্রজন্ম। এই যদি হয়, তাহলে নূহ আ. এর পূর্বে বহু প্রজন্ম দীর্ঘকাল যাবত বসবাস করেছিল। এ হিসাবে আদম আ. ও নূহ আ. এর মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় কয়েক হাজার বছরের। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
মোটকথা, যখন মূর্তি ও দেব-দেবীর পূজা শুরু হয় এবং মানুষ বিভ্রান্তি ও কুফরীতে নিমজ্জিত হতে শুরু করে, তখন মানুষের জন্য রহমতস্বরূপ আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে প্রেরণ করেন। অতএব, জগদ্বাসীর প্রতি প্রেরিত তিনিই সর্বপ্রথম রাসূল, যেমন কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে উপস্থিত লোকজন তাঁকে সম্বোধন করবে। আর ইবন জুবায়ের রা. প্রমুখের বর্ণনা মতে নূহ আ. এর সম্প্রদায়কে বনূ রাসিব বলা হতো।
নবুওয়ত লাভের সময় নূহ আ. এর বয়স কত ছিল, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল পঞ্চাশ বছর। কেউ বলেন, তিনশ পঞ্চাশ বছর। কারো কারো মতে চারশ আশি বছর। এ বর্ণনাটি ইবন জারীরের এবং তৃতীয় অভিমতটি ইবন আব্বাস রা. এর বলে তিনি বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে নূহ আ. এর কাহিনী তাঁর সম্প্রদায়ের যারা তাঁকে অস্বীকার করেছিল প্লাবন দ্বারা তাদের প্রতি অবতীর্ণ শাস্তির কথা এবং কিভাবে তাঁকে ও নৌকার অধিবাসীদেরকে মুক্তি দান করেছেন তার বিবরণ উল্লেখ করেছেন। সূরা আ‘রাফ, ইউনুস, হুদ, আম্বিয়া, মু’মিনূন, শুআরা, আনকাবূত, সাফ্ফাত ও সূরা কমরে এসবের আলোচনা রয়েছে। তাছাড়া এ বিষয়ে সূরা নূহ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরাও অবতীর্ণ হয়েছে। সূরা আ‘রাফে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি তো নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের নিকট এবং সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন ইলাহ নেই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করছি। তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলেছিল আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি।
সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমাতে কোন ভ্রান্তি নেই। আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল। আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের নিকট পৌঁছাচ্ছি ও তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিচ্ছি এবং তোমরা যা জান না আমি তা আল্লাহর নিকট হতে জানি।
তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ যে, তেমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে তোমরা সাবধান হও এবং তোমরা অনুকম্পা লাভ কর।
তারপর তারা তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে। তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল আমি তাদেরকে উদ্ধার করি এবং যারা আমার নিদর্শন প্রত্যাখান করেছিল আমি তাদেরকে ডুবিয়ে দিই। তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়। [৭ : ৫৯-৬৪]
সূরা ইউনুসে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তাদেরকে তুমি নূহ এর বৃত্তান্ত শোনাও। সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার অবস্থিতি ও আল্লাহর নিদর্শন দ্বারা আমার উপদেশ দান তোমাদের নিকট যদি দুঃসহ হয় তবে আমি তো আল্লাহর উপর নির্ভর করি, তোমরা যাদেরকে শরীক করেছ সেগুলোর সঙ্গে তোমাদের কর্তব্য স্থির করে নাও, পরে যেন কর্তব্য বিষয়ে তোমাদের কোন সংশয় না থাকে। আমার সম্বন্ধে তোমাদের কর্ম নিষ্পন্ন করে ফেল এবঙ আমাকে অবকাশ দিও না।
তারপর তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে নিতে পার, তোমাদের নিকট আমি তো কোন পারিশ্রমিক চাইনি, আমার পারিশ্রমিক আছে আল্লাহর নিকট। আমি তো আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে আদিষ্ট হয়েছি।
আর তারা তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে, তারপর তাকে ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল তাদেরকে আমি উদ্ধার করি এবং তাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করি ও যারা আমার নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল তাদেরকে নিমজ্জিত করি। সুতরাং দেখ যাদেরকে সতর্ক করা হয়েছিল তাদের পরিণাম কি হয়েছে? [১০ : ৭১-৭৩]
সূরা হুদ এ আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি তো নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী। যাতে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর ইবাদত না কর, আমি তোমাদের জন্য এক মর্মন্তুদ শাস্তির আশংকা করি।
তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা যারা ছিল ফাফির বলল, আমরা তো তোমাকে আমাদের মতই মানুষ দেখছি। অনুধাবন না করে তোমার অনুসরণ করছে তারাই, যারা আমাদের মধ্যে অধম এবং আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পাচ্ছি না, বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদি মনে করি।
সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর নিজ অনুগ্রহে দান করে থাকেন, অথচ এ বিষয়ে তোমরা জ্ঞানান্ধ হও, আমি কি এ বিষয়ে তোমাদেরকে বাধ্য করতে পারি, যখন তোমরা এটা অপছন্দ কর?
হে আমার সম্প্রদায়! এর পরিবর্তে আমি তোমাদের নিকট ধন-সম্পদ কামনা করি না। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহরই নিকট এবং ম’মিনদেরকে তাড়িয়ে দেয়া আমার কাজ নয়, তারা নিশ্চিতভাবে তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভ করবে। কিন্তু আমি দেখছি, তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়।
হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দেই তবে আল্লাহর শাস্তি থেকে আমাকে কে রক্ষা করবে? তবুও কি তোমরা চিন্তা করবে না?
আমি তোমাদেরকে বলি না, আমার নিকট আল্লাহর ধন-ভা-ার আছে, আর না অদৃশ্য সম্বন্ধে আমি অবগত এবং আমি এও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। তোমাদের দৃষ্টিতে যারা হেয় তাদের সম্বন্ধে আমি বলি না যে, আল্লাহ তাদেরকে কখনো মঙ্গল দান করবেন না, তাদের অন্তরে যা আছে, আল্লাহ তা সম্যক অবগত। তাহলে আমি অবশ্যই জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হব।
তারা বলল, হে নূহ! তুমি আমাদের সাথে বচসা করেছ, তুমি আমাদের সাথে অতিমাত্রায় বচসা করছ। তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে আস। সে বলল, ইচ্ছা হলে আল্লাহই তা তোমাদের নিকট উপস্থিত করবেন এবং তোমরা তা ব্যর্থ করতে পারবে না। আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের উপকারে আসবে না, যদি আল্লাহ তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চান। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তন করবে।
তারা কি বলে যে, সে তা রচনা করেছে? বল, আমি যদি তা রচনা করে থাকি তবে আমিই আমার অপরাধের জন্য দায়ী হব। তোমরা যে অপরাধ করছ তার জন্য আমি দায়ী নই।
নূহের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছিল, যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেউ ঈমান আনবে না। সুতরাং তারা যা করে সে জন্যে তুমি ক্ষোভ করো না।
তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ কর এবং যারা সীমালংঘন করেছে তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলো না, তারা তো নিমজ্জিত হবে। সে নৌকা নির্মাণ করতে লাগল এবং যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা তার নিকট দিয়ে যেত, তাকে উপহাস করত; সে বলত, তোমরা যদি আমাকে উপহাস কর তবে আমরাও তোমাদেরকে উপহাস করব, যেমন তোমরা উপহাস করছ। এবং তোমরা অচিরেই জানতে পারবে, কার উপর আসবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আর কার উপর আপতিত হবে স্থায়ী শাস্তি।
অবশেষে যখন আমার আদেশ আসল এবং উনুন উথলে উঠল, আমি বললাম, এতে উঠিয়ে নাও প্রত্যেক শ্রেণীর যুগল, যাদের বিরুদ্ধে পূর্ব সিদ্ধান্ত পূর্ব সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা ব্যতীত তোমার পরিবার পরিজনকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে। তার সঙ্গে ঈমান এনেছিল গুটি কতেক লোক।
সে বলল, এতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি। আমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। পর্বত-প্রমাণ ঢেউয়ের মধ্যে তা তাদের নিয়ে বয়ে চলল, নূহ তার পুত্র যে তাদের থেকে পৃথক ছিল, তাকে আহ্বান করে বলল, হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে আরোহণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গী হয়ো না।
সে বলল, আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নিব যা আমাকে প্লাবন থেকে রক্ষা করবে। সে বলল, আজ আল্লাহর বিধান থেকে রক্ষা করার কেউ নেই, যাকে আল্লাহ দয়া করবেন সে ব্যতীত। তারপর ঢেউ তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিল এবং সে নিমজ্জিতদের অন্তর্ভুক্ত হলো।
এরপর বলা হলো, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করে লও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। তারপর বন্যা প্রশমিত হলো এবং কার্য সমাপ্ত হলো, নৌকা জূদী পর্বতের উপর স্থির হলো এবং বলা হলো জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হোক।
নূহ তার প্রতিপালককে সম্বোধন করে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য এবং আপনি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।
তিনি বললেন, হে নূহ! সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে অসৎ কর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তুর্ভুক্ত না হও।
সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে যাতে আপনাকে অনুরোধ না করি এ জন্য আমি আপনার শরণ নিচ্ছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।
বলা হলো, হে নূহ! অবতরণ কর আমার দেয়া শান্তিসহ এবং তোমার প্রতি ও যে সমস্ত সম্প্রদায় তোমার সঙ্গে আছে তাদের প্রতি কল্যাণসহ। অপর সম্প্রদায় সমূহকে জীবন উপভোগ করতে দেব, পরে আমার পক্ষ থেকে মর্মন্তুদ শাস্তি তাদেরকে স্পর্শ করবে।
এ সমস্ত অদৃশ্য লোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করছি, যা এর আগে তুমি জানতে না এবং তোমার সম্প্রদায়ও জানতো না। সুতরাং ধৈর্যধারণ কর, শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্যই। [১১ : ২৫-৪৯]
সূরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলা বলেন, “স্মরণ কর নূহকে, পূর্বে সে যখন আহ্বান করেছিল, তখন আমি তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পরিজনবর্গকে মহা সংকট থেকে উদ্ধার করেছিলাম, এবং আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম সে সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে, যারা আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করেছিল, তারা ছিল এক মন্দ সম্প্রদায়। এ জন্য আমি তাদের সকলকেই নিমজ্জিত করেছিলাম। [২১ : ৭৬-৭৭]
সূরা মুমিনূনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি তো নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের নিকট। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য অন্য কোন ইলাহ নেই। তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না?
তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ যারা কুফুরী করেছিল তারা বলল, এতো তোমাদের মত একজন মানুষই তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চাচ্ছে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে ফেরেশতাই পাঠাতেন, আমরা তো আমাদের পূর্ব পুরুষদের কালে এরূপ ঘটেছিল এমন কথা শুনিনি। এতো এমন লোক, একে উন্মত্ততা পেয়ে বসেছে। সুতরাং এর সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর।
নূহ বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর, কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করছে। তারপর আমি তার প্রতি ওহী নাযিল করলাম, তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহী অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ কর, তারপর যখন আমার আদেশ আসবে ও উনুন উথলে উঠবে, তখন উঠিয়ে নিও প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া এবং তোমার পরিবার পরিজনকে তাদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে পূর্বে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাদের ব্যতীত। জালিমদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বলো না, তারা তো নিমজ্জিত হবে।
যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবে, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে উদ্ধার করেছেন জালিম সম্প্রদায় থেকে।
আরো বলিও, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও যা হবে কল্যাণকর; আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতারণকারী। এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। আমি তো তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম। [২৩ : ২৩-২৯]
সূরা তাহরীমে মহান আল্লাহ বলেন, “ আল্লাহ কাফিরদের জন্য নূহ ও লূতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছেন, তারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল; ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলা হলো, জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সঙ্গে তোমরাও তাতে প্রবেশ কর। [৬৬ : ১০]
কুরআন হাদীস ও বিভিন্ন রেওয়ায়েতের তথ্য মোতাবেক আপন সম্প্রদায়ের সঙ্গে নূহ আ. এর যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল তার সারমর্ম উল্লেখ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী রহ. কর্তৃক বর্ণিত ইবন আব্বাস রা. এর হাদীসে পূর্বেই আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, আদম আ. ও নূহ আ. এর মধ্যে ব্যবধান ছিল দশ করন। তাঁরা সকলেই ইসলামের অনুসারী ছিলেন। আর আমরা এও উল্লেখ করেছি যে, করন বলতে হয় তো যুগ বুঝানো হয়েছে। তারপর এ সৎকর্মশীলদের করনসমূহের পর এমন কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়; যার ফলে সে যুগের অধিবাসীরা মূর্তিপূজার দিকে ঝুকে পড়ে এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস রা. সূত্রে ইমাম বুখারী রহ. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী তাঁর করন ছিল এই যে, (ওয়াদ, সূওয়া, য়াগূছ ইত্যাদি) এসব হলো নূহ আ. এর সম্প্রদায়ের কয়েকজন পুণ্যবান ব্যক্তির নাম। এদের মৃত্যুর পর শয়তান তাদের সম্প্রদায়ের প্রতি মন্ত্রণা দেয় যে, এঁরা যে সব স্থানে বসতেন তোমরা সে সব স্থানে কিছু মূর্তি নির্মাণ করে তাদের নামে সে সবের নামকরণ করে দাও। তখন তারা তাই করে। কিন্তু তখনও এগুলোর পূজা শুরু হয়নি। তারপর যখন তাদের মৃত্যু হয় এবং ইলম লোপ পায় তখন থেকে এসবের পূজা শুরু হয়। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নূহ আ. এর সম্প্রদায়ের এ দেব-দেবীগুলো পরে আরবেও প্রচলিত হয়ে পড়ে। ইকরিমা, যাহ্হাক, কাতাদা এবং মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. ও অনুরূপ মত প্রকাশ করেছেন। ইবনে জারীর রহ. আলোচ্য আয়াতের তাফসীরে মুহাম্মদ ইবনে কায়স রহ. এর বরাতে বলেন, তারা ছিলেন আদম আ. ও নূহ আ. এর মধ্যবর্তী কালের পুণ্যবান ব্যক্তিবর্গ। তাদের বেশ কিছু অনুসারী ছিল। তারপর যখন তাদের মৃত্যু হয়, তখন তাদের অনুসারীরা বলল, আমরা যদি এঁদের প্রতিকৃতি তৈরি করে রাখি, তাহলে তাঁদের স্মরণ করে ইবাদতে আমাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। তখন তারা তাদের প্রতিকৃতি নির্মাণ করে রাখে। তারপর যখন তাদের মৃত্যু হয় এবং অন্য প্রজন্ম আসে; তখন শয়তান তাদের প্রতি এ বলে প্ররোচনা দেয় যে, লোকজন তাঁদের উপাসনা করত এবং তাঁদের ওসীলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করত। তখন তারা তাঁদের পূজা শুরু করে দেয়। ইবনে আবু হাতিম উরওয়া ইবনে যুবায়ের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, উরওয়া ইবনে যুবায়ের বলেন, ওয়াদ য়াগূছ, য়াঊক, সূওয়া ও নাসর আদম আ. এর সন্তান। ওয়াদ ছিলেন এদের বয়সে সকলের চাইতে প্রবীণ এবং সর্বাধিক পুণ্যবান ব্যক্তি। ইবনে আবূ হাতিম বর্ণনা করেন যে, আবুল মুতাহ্যার বলেন, একদা আবূ জাফর আল বাকির সালাতরত অবস্থায় ছিলেন। তখন লোকজন য়াযীদ ইবনে মুহাল্লাবের কথা আলোচনা করছিল। সালাত শেষে তিনি বললেন, তোমরা য়াযীদ ইবনে মুহাল্লাবের কথা বলছ। সে এমন স্থানে নিহত হয়, যেখানে সর্বপ্রথম গায়রুল্লাহর পূজা হয়েছিল। আবুল মুতাহ্যার বলেন, তারপর তিনি ওয়াদ সম্পর্কে বলেন, তিনি একজন পুণ্যবান এবং জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। মৃত্যুর পর বাবেলে জনতা তাঁর কবরের চতুর্পাশ্বে সমবেত হয়ে শোক প্রকাশ করতে শুরু করে। ইবলীস তা দেখে মানুষের রূপ ধরে তাদের কাছে এসে বলল, এ ব্যক্তির জন্য তোমাদের হা-হুঁতাশ আমি লক্ষ্য করছি। আমি কি তোমাদের জন্য তাঁর অনুরূপ প্রতিকৃতি তৈরি করে দেব? তা তোমাদের মজলিসে থাকবে আর তোমরা তাঁকে স্মরণ করবে। তারা বলল, হ্যাঁ, দিন। ইবলীস তাদেরকে তার অনুরূপ প্রতিকৃতি তৈরি করে দিল। বর্ণনাকারী বলেন, আর তারা তা তাদের মজলিসে স্থাপন করে তাকে স্মরণ করতে শুরু করে। ইবলীস তাদেরকে তাঁকে স্মরণ করতে দেখে এবার বলল, আচ্ছা, আমি তোমাদের প্রত্যেকের ঘরে এর একটি করে মূর্তি স্থাপন করে দেই? তাহলে নিজের ঘরে বসেই তোমরা তাঁকে স্মরণ করতে পারবে। তারা বলল, হ্যাঁ দিন! বর্ণনাকারী বলেন, তখন ইবলীস প্রত্যেক গৃহবাসীর জন্য তাঁর একটি করে মূর্তি নির্মাণ করে দেয় আর তারা তা দেখে দেখে তাঁকে স্মরণ করতে শুরু করে। বর্ণনাকারী বলেন, এভাবে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে দেবতা সাব্যস্ত করে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাঁকে পূজা করতে শুরু করে। এ ওয়াদই সেই দেবতা; আল্লাহর পরিবর্তে সর্বপ্রথম যার পূজা করা হয়।
উপরোক্ত বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এর প্রতিটি মূর্তিকেই কোন না কোন মানব গোষ্ঠী পূজা করেছিল। তাছাড়া বর্ণিত আছে যে, কালক্রমে তারা সে প্রতিকৃতিগুলোকে দেহবিশিষ্ট মূর্তিতে পরিণত করে। তারপর আল্লাহর পরিবর্তে তাদেরই উপাসনা শুরু হয়ে যায়। এসবের উপাসনার অসংখ্য পদ্ধতি ছিল। তাফসীরের কিতাবে যথাস্থানে আমরা তা উল্লেখ করেছি। সকল প্রশংসা আল্লাহরই জন্য।
সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে যে, উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে তাদের হাবশায় দেখে আসা ‘মারিয়া’ নামক গির্জা এবং তার রূপ-সৌন্দর্য ও তাতে স্থাপন করে রাখা প্রতিকৃতির কথা উল্লেখ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তাদের নিয়ম ছিল তাদের মধ্যে সৎকর্মপরায়ণ কেউ মারা গেলে তাঁর কবরের উপর তারা একটি উপাসনালয় নির্মাণ করত। তারপর তাতে তাঁর প্রতিকৃতি স্থাপন করে রাখত। আল্লাহর নিকট তারা সৃষ্টির সব চাইতে নিকৃষ্ট জাতি।”
মোটকথা, বিকৃতি যখন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দা ও রসূল নূহ আ. কে প্রেরণ করেন। তিনি এক লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানান এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের উপাসনা করতে নিষেধ করেন। এ নূহ আ.-ই সর্বপ্রথম রাসূল যাঁকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীবাসীর কাছে প্রেরণ করেন। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণিত শাফা‘আতের হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তারা আদম আ. এর কাছে এসে বলবে, হে আদম! আপনি মানব জাতির পিতা। আল্লাহ তাআলা আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, আপনার মধ্যে তাঁর রূহ সঞ্চার করেছেন, তাঁর আদেশে ফেরেশতারা আপনাকে সিজদা করে এবং তিনি আপনাকে জান্নাতে বসবাস করতে দেন। আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য একটু সুপারিশ করবেন কি? আমাদের অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছেন। তখন আদম আ. বলবেন, আমার প্রতিপালক এতবেশি রাগাম্বিত হয়েছেন যে, এত বেশি রাগাম্বিত তিনি কখনো হননি এবং পরেও কখনো হবেন না। তিনি আমাকে বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি তা অমান্য করি। নাফসী! নাফসী! তোমরা অন্য কারো কাছে যাও, তোমরা নূহের কাছে যাও। তখন তাঁরা নূহ আ. এর নিকট গিয়ে বলবে, হে নূহ! আপনি পৃথিবীবাসীর কাছে প্রেরিত প্রথম রাসূল এবং আল্লাহ আপনাকে ‘কৃতজ্ঞ বান্দা’ আখ্যা দিয়েছেন। আমরা কী অবস্থায় এবং কেমন বিপদে আছি তা কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন না? আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য একটু সুপারিশ করবেন কি? তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এত বেশি রাগাম্বিত হয়েছেন যে, এত রাগ তিনি ইতিপূর্বে কখনো করেননি এবং পরেও করবেন না। নাফসী! নাফসী! বর্ণনাকারী এভাবে হাদীসটি সবিস্তারে বর্ণনা করেন যেমনটি ইমাম বুখারী রহ. নূহ আ. এর কাহিনীতে তা উল্লেখ করেছেন।
যা হোক, আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে প্রেরণ করলে তিনি সম্প্রদায়কে একমাত্র লা-শরীক আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাঁর সঙ্গে কোন প্রতিকৃতি, মূর্তি ও তাগূতের ইবাদত না করার এবং তাঁর একত্ব স্বীকার করে নেয়ার আহ্বান জানান এবং ঘোষণা দেন যে, তিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, কোন রব নেই। যেমন আল্লাহ তাআলা তাঁর পরবর্তী সকল নবী-রাসূলকে এ আদেশ দান করেন, যারা সকলেই তাঁরই বংশধর ছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “আর তার বংশধরদেরকেই আমি বংশ পরম্পরায় বিদ্যমান রেখেছি।” [৩৭ : ৭৭]
হযরত নূহ আ. ও ইবরাহীম আ. সম্পর্কে বলেন, “এবং তাঁর বংশধরদের মধ্যে আমি নবুওয়ত ও কিতাব রেখেছি।” [৫৭ : ২৬]
অর্থাৎ, নূহ আ. এর পরে যত নবী এসেছিলেন, তাঁরা সকলেই তাঁর বংশধর ছিলেন। এমনকি ইবরাহীম আ. ও।
লেখিকা : গ্রন্থ প্রণেতা, সম্পাদক ও প্রকাশক ‘মাসিক আল জান্নাত’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight