হযরত খালেদ ইবনে ওলীদ রা. এর ইসলাম গ্রহণ, সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

হযরত খালেদ ইবনে ওলীদ রা. বলেন, আল্লাহ তাআলা যখন আমার মঙ্গলের ইচ্ছা করলেন তখন আমার অন্তরে ইসলামের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করলেন এবং আমার সামনে হেদায়েতের পথ উন্মুক্ত করে দিলেন। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম যে, আমি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি, কিন্তু যুদ্ধ হতে ফেরার পর প্রত্যেক বারই মনে হয়েছে যে, আমার এই দৌড়-ঝাপ একটি নিরর্থক কাজ। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই বিজয় লাভ করবেন। তারপর যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন তখন আমিও মুশরিকদের একদল ঘোড় সওয়ারের সাথে রওয়ানা হলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের সাথে ‘উসফান’ নামক স্থানে আমার মুখামুখী হলেন। আমি তাঁর মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে গেলাম এবং তাঁকে কিছু উত্যক্ত করতে চাইলাম (কিন্তু পারলাম না)। তিনি আপন সাহাবীদেরকে নিয়ে আমাদের সামনে যোহরের নামায আদায় করতে লাগলেন। আমরা ইচ্ছা করেছিলাম যে, নামাযরত অবস্থায় তাদের উপর আক্রমণ করি, কিন্তু আমরা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি বলে আক্রমণ করতে পারিনি। আর এই না পারার মধ্যেই আমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুরভিসন্ধির কথা (ওহীর মাধ্যমে) জানতে পারলেন। অতএব তিনি সাহাবীগণ সহ আসরের নামায ‘সালাতুল খাওফের’ পদ্ধতিতে আদায় করলেন। এই ব্যাপারটি আমাদের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করল। আমি মনে মনে বললাম, এই ব্যক্তিকে (গায়েবীভাবে) হেফাজত করা হচ্ছে। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের পথ হতে এক পার্শ্বে সরে গেলেন এবং আমাদের ঘোড়ার রাস্তা ছেড়ে ডান দিকের রাস্তা ধরে অগ্রসর হলেন। তারপর তিনি যখন হুদায়বিয়াতে কুরাইশদের সাথে সন্ধি করলেন এবং কুরাইশগণ তাঁকে (বিনা যুদ্ধে) ফিরিয়ে দিয়ে নিজেদের প্রাণ বাঁচাল তখন আমি মনে মনে বললাম, (এখন) আর কি বাকি রইল? আমি কোথায় যাব? নাজাশীর নিকট কি? সেখানেই বা কি করে যাই! নাজাশী তো স্বয়ং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসারী হয়ে গেছে এবং তাঁর সাহাবীগণ সেখানে নিরাপদ আশ্রয়ে কালাতিপাত করছে। নাকি হেরাকল এর নিকট চলে যাব? সেখানে গেলে তো নিজের ধর্ম ছেড়ে খৃষ্টান নচেৎ ইহুদী ধর্ম অবলম্বন করতে হবে এবং অনারব দেশে জীবন কাটাতে হবে। আর না অবশিষ্ট যারা আছে তাদের সাথে নিজ বাড়িতেই থেকে যাব? আমি এরূপ চিন্তা-ভাবনা করতেছিলাম। ইতিমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (গত বৎসরের) কাযা ওমরা আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করলেন। আমি গা-ঢাকা দিলাম এবং তাঁর মক্কায় প্রবেশকালে উপস্থিত থাকলাম না। আমার ভাই ওলীদ ইবনে ওলীদ রা. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ওমরা আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করে আমাকে তালাশ করলেন। আমাকে না পেয়ে এই মর্মে চিঠি লিখলেন,
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, আম্মাবাদ, এখনও ইসলাম গ্রহণে তোমার মত হলো না, এটা অপেক্ষা বিস্ময়কর বিষয় আমি আর দেখি না। অথচ তুমি একজন বুদ্ধিমান লোক। ইসলামের ন্যায় দ্বীন সম্পর্কেও কি মানুষ অজ্ঞ থাকতে পারে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে বলেছেন, খালেদ কোথায়? সে যদি তার সকল প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম মুসলমানদের সাথে সংযুক্ত করত তবে তার জন্য অনেক ভাল হত এবং আমরা তাকে অন্যের উপর প্রাধান্য দিতাম। হে আমার ভাই! এযাবৎ নেক কাজের যে সকল সুযোগ তুমি হারিয়েছো, এখন তো অন্তত তা পূরণ করে লও।
হযরত খালেদ রা. বলেন, ভাইয়ের চিঠি পাওয়ার পর মদীনায় যাওয়ার জন্য আমার মন উগ্রীব হয়ে উঠল এবং ইসলামের প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেল। আরো খুশি লাগল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন। এমন সময় একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, যেন আমি দুর্ভিক্ষ কবলিত কংকীর্ণ একস্থানে রয়েছি। অতঃপর সেখান হতে আমি এক সবুজ-শ্যামল ও প্রশস্ত একস্থানে বের হয়ে আসলাম। ভাবলাম, এটা নিশ্চয় সত্য স্বপ্ন হবে।
অতএব মদীনায় পৌঁছে ভাবলাম, হযরত আবু বকর রা. কে এই স্বপ্নের কথা বলব। তিনি শুনে বললেন, তোমাকে যে আল্লাহ তাআলা ইসলামের প্রতি হেদায়েত দান করেছেন এটাই তোমার সবুজ-শ্যামল ও প্রশস্ত এলাকায় বের হয়ে আসার ব্যাখা। আর নিজেকে যে সংকীর্ণ স্থানে দেখেছ, তা তোমার পূর্বেকার শিরকের অবস্থা।
হযরত খালিদ রা. বলেন, আমি যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যাওয়ার দৃঢ়সংকল্প তখন চিন্তা করলাম, কাকে সঙ্গে নিব? এই ব্যাপারে সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নিকট সাক্ষাৎ করে বললাম, হে আবু ওহব! তুমি কি আমাদের অবস্থা দেখতেছ না? বর্তমানে আমাদের সংখ্যা মাড়িদাঁতের ন্যায় কমে গেছে। অপরদিকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরব অনারব সকলের উপর জয়ী হয়ে গেছেন। অতএব আমাদেরও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যেয়ে তাঁর অনুগত হয়ে যাওয়া উচিত। কারণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মান আমাদেরই সম্মান। সফওয়ান আমার প্রস্তাব অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রত্যাখান করে বলল, আমি যদি একাকীও থেকে যাই তবুও তার আনুগত্য কখনই করবো না। এই কথার পর আমি তার নিকট হতে চলে আসলাম এবং ভাবলাম, লোকটির পিতা ও ভাই বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছে। এই জন্য সে মানতে পারছে না। অতঃপর ইকরামা ইবনে আবি জাহলের সাথে সাক্ষাৎ হল। তাকেও সেরূপ বললাম, যেরূপ সফওয়ানকে বলেছিলাম। ইকরামাও সফওয়ানের মতই জবাব দিল। আমি তাকে বললাম, আমার কথাগুলো গোপন রেখো। সে বলল, আচ্ছা কাউকে বলবো না। তারপর আমি ঘরে এসে আমার সওয়ারি প্রস্তুত করতে বললাম এবং সওয়ারি নিয়ে বের হয়ে গেলাম। চলার পথে ওসমান ইবনে তালহার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। মনে মনে ভাবলাম, সে তো আমার বন্ধু। তার কাছেই মনের কথা খুলে বলব। কিন্তু (মুসলমানদের হাতে) তার বাপ-দাদা নিহত হওয়ার কথা স্মরণ হওয়ায় তার সাথে আলোচনা করা সমীচীন মনে করলাম না। আবার মনে হল, আমার কি আর ক্ষতি হবে? আমি তো এখনই রওয়ানা হয়ে যাব। সুতরাং তার সাথে বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি সম্পর্কে আলোচনা করে বললাম, আমাদের অবস্থাতো গর্তের ভিতর আত্মগোপনকারী সেই শৃগালের ন্যায় হযে গেছে যে, এক বালতি পানি গর্তের মুখে ঢেলে দিলেই বের হয়ে আসবে। কথা প্রসঙ্গে উপরিউক্ত দুজনের সাথে যা বলেছিলাম তাও বললাম। শুনে সে তৎক্ষণাত রাজি হয়ে গেল। আমি বললাম, আমি তো আজই রওয়ানা হতে ইচ্ছা করেছি। আমার সওয়ারি ‘ফাজ্জ নামক’ স্থানে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। তারপর আমরা উভয়ে স্থির করলাম যে, ইয়াজুজ নামক স্থানে আমরা পরস্পর মিলিত হব। সে আগে পৌঁছে গেলে আমার জন্য এবং আমি আগে পৌঁছে গেলে তার জন্য অপেক্ষা করব।
হযরত খালেদ রা. বলেন, আমরা ভোররাত্রে ফজরের পূর্বেই রওয়ানা হয়ে গেলাম এবং ফজর পর্যন্ত ইয়াজুজে পৌঁছে আমরা পরস্পর মিলিত হলাম। সেখান হতে আমরা ভোরে রওয়ানা হলাম এবং হাদ্দায় পৌঁছে হযরত আমর ইবনে আস রা. এর সাথে আমাদের সাক্ষাত হল। তিনি আমাদেরকে দেখে বললেন, তোমাদেরকে মারহাবা! আমরা বললাম, আপনাকেও মারহাবা! তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কোথায় যাচ্ছ? আমরা জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন? তিনি বললেন, তোমরা কি উদ্দেশ্যে এসেছো? আমরা বললাম, ইসলাম গ্রহণ ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্যে এসেছি। তিনি বললেন, আমাকেও এই একই উদ্দেশ্য এখানে এনেছে।
অতঃপর আমরা তিনজন একসঙ্গে মদীনায় আসলাম এবং হাররায় আমাদের উটগুলিকে বসিয়ে অবতরণ করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আগমন সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন। আমি আমার (সফরের পোশাক পরিবর্তন করে) ভাল পোশাক পরিধান করলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে চললাম। পথে আমার ভাইয়ের সাথে দেখা হলে সে বলল, তাড়াতাড়ি যাও, তোমার আগমন সংবাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দিত হয়েছেন এবং তিনি তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা দ্রুত চললাম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি দূর হতে নজর পড়তেই দেখলাম যে, তিনি আমার প্রতি চেয়ে মুচকি হাসছেন। আমি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, আসসালামু আলাইকা ইয়া নবীআল্লাহ! তিনি হাসিমুখে আমার সালামের উত্তর দিলেন। আমি বললাম, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল।’

তিনি বললেন, কাছে আস। তারপর বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য যিনি তোমাকে হেদায়েত দান করেছেন। তোমার বুদ্ধি বিবেচনা দেখে আমি এরই আশা করেছিলাম যে, তুমি ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করবে। হযরত খালেদ রা. বলেন, আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি হকের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে আপনার বিরুদ্ধে যে সকল যুদ্ধ করেছি আমার তা স্মরণ আছে। আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন যেন আমাকে মাফ করে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইসলাম পূর্বেকার সকল গুনাহ মিটিয়ে দেয়। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তবুও আপনি দুআ করুন। তিনি দুআ করলেন, হে আল্লাহ! খালেদ ইবনে ওলীদ আপনার পথে বাধা প্রদানের যত প্রচেষ্টা করেছে তা সবই আপনি ক্ষমা করে দিন।
হযরত খালেদ রা. বলেন, অতঃপর হযরত ওসমান ও হযরত আমর রা. অগ্রসর হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাইআত হলেন। হযরত খালেদ রা. বলেন, আমরা অষ্টম হিজরীর সফর মাসে মদীনায় গিয়েছিলাম। আল্লাহর কসম, যে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন সাহাবীকে আমার সমকক্ষ মনে করতেন না। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া]
লেখিকা: গ্রন্থ প্রণেতা, সম্পাদক ও প্রকাশক ‘মাসিক আল জান্নাত’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight