পবিত্র কুরআন-হাদীসে কেয়ামত প্রসঙ্গ : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কেয়ামত নিকৃষ্ট মানুষের উপর সংঘটিত হবে। তিনি আরো ইরশাদ করেন, কেয়ামত এমন কারো উপর সংঘটিত হবে না, যারা আল্লাহ আল্লাহ বলতে থাকবে। তিনি আরো ইরশাদ করেন, আল্লাহ আল্লাহ বলছে, এমন কারো উপর কেয়ামত সংঘটিত হবে না। [মুসলিম]
একটি দীর্ঘ হাদিসে রয়েছে, যেহেতু কোন মুসলমান বেঁচে থাকা অবস্থায় কেয়ামত হবে না, তাই এ রাতদিন যথারীতি বহাল থাকাবস্থায়ই আল্লাহ তা’আলা এক উত্তম শীতল বাতাস ছাড়বেন, তা প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের বগলে লেগে তাদের রূহ কবজ করে নিবে। তখন নিকৃষ্টতর লোকেরা থেকে যাবে, যারা প্রকাশ্যে (সবার সামনে) নির্লজ্জভাবে গাধার ন্যায় মহিলাদের সাথে পাপ কর্মে লিপ্ত হবে। [মিশকাত]
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দাজ্জালকে হত্যা করার পর হযরত ঈসা আ. সাত বছর মানুষের মাঝে থাকবেন। সে সময় মানুষের মাঝে বিন্দু পরিমাণ দুশমনি থাকবে না। তারপর আল্লাহ তা’আলা শামের (সিরিয়ার) দিক থেকে এক শীতল বাতাস প্রবাহিত করবেন, যাতে সব মুমিন শেষ হয়ে যাবে এবং জমিনে এমন কোন মানুষ বেঁচে থাকবে না, যার অন্তরে বিন্দুমাত্র ভাল (ঈমান) থাকবে। ঈমান আছে এমন কোন মানুষ যদি পাহাড় পর্বতের গুহায়ও প্রবেশ করে, সেখানেও বাতাস প্রবেশ করে তার জান কবজ করে নিবে।
এরপর শুধু খারাপ লোকেরাই থেকে যাবে, যারা মন্দ কর্ম, দুষ্কৃতি এবং দুষ্ট কর্মের প্রতিই হালকা পাতলা গাধাগুলোর মত (দ্রুতবেগে) অগ্রসরমান হবে অন্যের রক্ত প্রবাহিতকরণে ও জীবন হরণে তারা হিংস্র জানোয়ারের স্বভাবসম্পন্ন হবে। তারা ভাল কিছু চিনবে না এবং খারাপকে খারাপ মনে করবে না। তাদের এ অবস্থা দেখে শয়তান মানুষের রূপ ধরে এসে তাদের বলবে, হায় আফসোস, তোমরা কেমন হয়ে গেলে, তোমাদের কি লজ্জা হয় না, (তোমরা তোমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম ছেড়েছুড়ে বসেছ)? তারা শয়তানকে বলবে, তুমিই আমাদের বল, আমরা এখন কি করতে পারি? সুতরাং শয়তান তাদেরকে মূর্তিপূজা শিা দিবে। তারাও শয়তানের শেখানো মতে মূর্তিপূজায় লেগে যাবে। তখন তারা প্রভূত ধন-সম্পদ পেতে থাকবে। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার খুবই উন্নতি হবে এবং সুখী সমৃদ্ধশালী জীবন কাটাতে থাকবে। এ অবস্থাতেই শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে, যার আওয়াজ সবাই শুনতে পাবে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে সর্বপ্রথম শিংগার আওয়াজ শুনতে পাবে, সে উটের পালের পানির হাউজ লেপতে থাকবে। শিংগার আওয়াজ শুনে সে বেহুঁশ হয়ে পড়বে। এরপর সব মানুষই বেহুঁশ হয়ে পড়বে। তারপর আল্লাহ তা’আলা তুষারের মত এক প্রকার বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে মানুষ সতেজ হয়ে গজিয়ে উঠবে (কবরে মাটির শরীর গঠন হবে)। অতঃপর দ্বিতীয় বার শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে, তখন হঠাৎ করে সবাই নিজেকে দাঁড়ানো দেখতে পাবে। এরপর ঘোষণা হবে, হে লোকসকল! তোমরা তোমাদের মালিকের কাছে চল। ফেরেশতাদের হুকুম করা হবে, তাদের দাঁড় করাও, তাদের প্রশ্ন করা হবে। আবার ঘোষণা করা হবে, তাদের থেকে জাহান্নামীদের পৃথক কর।
ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে আরজ করবেন, কতজনের মধ্যে কতজন বের করা হবে। ফেরেশতারা জবাব পাবে, প্রতি হাজারে ৯৯৯ জন জাহান্নামী বের করে নাও। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এটা সেদিন হবে, যেদিনের বিভীষিকা ও ভয়ঙ্কর অবস্থার কারণে শিশুও বৃদ্ধ হয়ে যাবে। সেদিন হবে এক মহাবিপদের দিন। [মুসলিম শরীফ]
উল্লেখিত হাদিসগুলো থেকে জানা গেল, কেয়ামতের সময় দুনিয়াতে কোন মুসলমান থাকবে না। এ মহা মসিবত হতে আল্লাহ তা’আলা যে সব মানুষকে রা করবেন, তাদের অন্তরে বিন্দু পরিমাণেও ঈমান থাকবে।

কেয়ামতের তারিখ জানানো হয়নি
কেয়ামতের নির্দিষ্ট ণ, তারিখ শুধু আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতই জানেন। কুরআনে বলা হয়েছে, কেয়ামত হঠাৎ করে এসে যাবে। তবে তার নির্দিষ্ট দিন তারিখ কিছুই জানানো হয়নি।
একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মজলিসে হযরত জিবরাঈল আ. মানুষের রূপে আগমন করেন এবং উপস্থিত সকলের সামনেই তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কেয়ামত কখন হবে? তখন তিনি জবাব দিলেন, যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে সে এ ব্যাপারে প্রশ্নকর্তা থেকে বেশি জানে না। [বুখারি]
অর্থাৎ এ ব্যাপারে আপনি ও আমি সমান। কেয়ামত সংঘটিত হবার সময় আমার আপনার কারোই জানা নেই। লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জানতে চাইল, কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে? তখন আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাজিল করেন,
‘আপনাকে জিজ্ঞেস করে, কেয়ামত কখন অনুষ্ঠিত হবে? বলে দিন এর খবর তো আমার পালনকর্তার কাছেই রয়েছে। তিনিই তা অনবৃত করে দেখাবেন নির্ধারিত সময়ে। আসমান ও জমিনের জন্য সেটি অতি কঠিন বিষয়। যখন তা তোমাদের উপর আসবে অজান্তেই এসে যাবে। আপনাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, যেন আপনি তার অনুসন্ধানে লেগে আছেন। বলে দিন, এর সংবাদ বিশেষ করে আল্লাহর নিকটই রয়েছে। কিন্তু তা অধিকাংশ লোকই উপলব্ধি করে না।’ [সূরা আ’রাফ : আয়াত ১৮৭]

কেয়ামত হঠাৎ করেই এসে যাবে
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘বরং তা আসবে তাদের উপর অতর্কিত ভাবে, অতঃপর তাদেরকে তা হতবুদ্ধি করে দেবে, তখন তারা তা রোধ করতেও পারবে না এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হবে না।’ [সূরা আম্বিয়া : আয়াত ৪০]
এ আয়াত এবং পূর্বে উল্লিখিত আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, কেয়ামত হঠাৎ করেই এসে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কেয়ামত অবশ্যই এমন সময় সংঘটিত হবে যে, দু’জন লোক (বেচাকেনার জন্য) কাপড় দেখাদেখি করছে। তারা বেচাকেনা সমাপ্ত এবং কাপড় ভাঁজ করার সময়টুকু পাবে না, এ সময়ের মধ্যেই কেয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, অবশ্যই কেয়ামত এমন সময় সংঘটিত হবে, একজন লোক তার উটগুলোর দুধ দোহন করছে, কিন্তু দুধ খাওয়ার সময় পাবে না। আর কেয়ামত সংঘটিত হবে, একজন মানুষ পানির হাউজ লেপছে, এখনো সে পশুগুলোকে তা থেকে পানি পান করাতে পারেনি। একজন মানুষ খাদ্য গ্রহণ করার সময় লোকমা মুখে দিবে, কিন্তু তা খোলার সময়ও পাবে না। এমতাবস্থায় কেয়ামত হয়ে যাবে। [বুখারি ও মুসলিম]
আজকাল যেমন লোকজন কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে, এমনিভাবে কেয়ামতের দিনও ব্যস্ত থাকবে। তাদের ব্যস্ত থাকাবস্থায় হঠাৎ করে কেয়ামত চলে আসবে। যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন হবে শুক্রবার।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সবদিন থেকে শুক্রবার শ্রেষ্ঠ। এদিনে হযরত আদম আ. কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে স্থান দেয়া হয়েছে, এ দিনেই তাকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে এবং এ দিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে। [মিশকাত]
অন্য হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, জুমার দিন কেয়ামত সংঘটিত হবে। আল্লাহর নিকটবর্তী সব ফেরেশতা, আসমান-জমিন, পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র সবকিছু জুমার দিন খুবই শংকিত থাকে, আজই কেয়ামত সংঘটিত হয়ে যায় নাকি।

শিংগা এবং শিংগায় ফুঁ
শিংগায় ফুঁ দিলে কেয়ামত শুরু হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, শিংগা হলো একটি শিং, তাতে ফুঁ দেয়া হবে। [মিশকাত]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কিভাবে আরাম-আয়েশের জীবন যাপন করব, অথচ শিংগায় ফুঁ দেয়ার জন্য (ফেরেশতা) শিংগা মুখে নিয়ে কান খাড়া করে অপো করছে, কখন ফুঁ দেয়ার হুকুম হবে।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘যেদিন শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে; সেদিন হবে কঠিন দিন, কাফেরদের জন্যে এটা সহজ নয়।’ [সূরা মুদ্দাসসির : আয়াত ৮-১০]
আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে, ফলে আসমান ও যমীনে যারা আছে সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন। অতঃপর আবার শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে, তৎণাৎ তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে।’ [সূরা যুমার : আয়াত ৬৮]
কুরআন এবং হাদিসে দু’বার শিংগায় ফুঁ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথমবার যখন শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে তখন সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে, সেসময় জীবিত সবাই মৃত্যুবরণ করবে। তারপর দ্বিতীয়বার শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে। তখন মৃতদের রূহ তাদের দেহে এবং যারা বেহুঁশ ছিল তাদের হুঁশ ফিরে আসবে। সে সময়ের আশ্চর্যজনক অবস্থা দেখে সবাই চতুর্দিকে তাকাতে থাকবে এবং তাদের আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। এ ব্যপারে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
‘শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে চলবে। তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভোগ! কে আমাদেরকে নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল? রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রসূলগণ সত্য বলেছিলেন। এটা তো হবে কেবল এক মহানাদ। সে মুহূর্তেই তাদের সবাইকে আমার সামনে উপস্থিত করা হবে।’ [সূরা ইয়াসিন : আয়াত ৫১-৫৩]
অর্থাৎ না কেউ লুকাতে পারবে না আত্মরা করতে পারবে। সবাইকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমবার এবং দ্বিতীয়বার শিংগায় ফুঁ দেয়ার মাঝে চল্লিশ সংখ্যা বলেছেন। উপস্থিত সবাই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, চল্লিশ বলতে কি চল্লিশ দিন, চল্লিশ মাস না চল্লিশ বছর? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনটা বলেছিলেন?
হযরত আবূ হুরায়রা রা. অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, চল্লিশ বলতে তিনি চল্লিশ দিন, না চল্লিশ মাস, না চল্লিশ বছর না শুধু চল্লিশ বলেছেন, সেটা আমার জানা নেই। দ্বিতীয়বার শিংগায় ফুঁ দেয়ার পর আল্লাহ তা’আলা আসমান হতে পানি বর্ষণ করবেন, যার ফলে মানুষ কবর থেকে তেমনিভাবে উঠবে যেমনিভাবে জমিন থেকে সব্জি উঠে। তিনি আরো ইরশাদ করেন, মানুষের শরীরের মেরুদন্ড ব্যতীত সব হাড় মাটির সাথে মিশে যাবে। কেয়ামতের দিন সেই হাড্ডি থেকে তার পূর্ণ শরীর গঠিত হবে। বুখারি ও মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, সরিষার দানার ন্যায় অবশিষ্ট হাড্ডি থেকে পুনরায় শরীর গঠিত হবে। [আত-তারগীব ওয়াত তারহীব]
সূরা যুমারের এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে, তবে যাদের আল্লাহ চান তারা ব্যতীত। এ ব্যাপারে তাফসিরবেত্তাদের অভিমত বিভিন্ন।
কেউ বলেছেন, “আল্লাহ যাদের চান তারা ব্যতীত” বলে শহীদদের বুঝানো হয়েছে। কেউ বলেছেন, এর দ্বারা জিবরাঈল, মিকাঈল এবং আজরাঈল উদ্দেশ্য। আবার কেউ বলেছেন, যে সকল ফেরেশতা আরশ বহন করে রেখেছেন তারা উদ্দেশ্য। এ ছাড়া আরো অনেক অভিমত রয়েছে। আল্লাহই ভাল জানেন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বেশি বেশি নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight