হযরত ইসহাক আ. এর পরিচিতি : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

ইসহাক আ এর জন্ম : আল্লাহ তাআলা পবিত্র কালামে পাকে হযরত ইসহাক আ. সম্পর্কে ইরশাদ করেন- আমি তাকে (ইবরাহীম আ.) সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাকের, সে ছিল একজন নবী, সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম। আমি তাঁকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও। তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক সৎকর্মপরায়ন এবং নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী। [সুরা সাফ্ফাত ১১২-১১৩]
মাদায়েন অঞ্চলের অধিবাসী লুত আ. এর সম্প্রদায়ের কুফরী ও পাপাচারের শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ফেরেশতাগণ সেখানে যাওয়ার পথে হযরত ইবরাহীম আ. সারাহ্ কে এ সুসংবাদ শুনিয়ে যান যা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এভাবে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমার নিকট ইবরাহীমের সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত এসেছে কি? যখন ওরা তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, সালাম, এরা তো অপরিচিত লোক। তারপর ইবরাহীম তার স্ত্রীর নিকট গেল এবং একটি মাংসল গরুর বাছুর ভাঁজা অবস্থায় নিয়ে আসল ও তাদের সামনে রাখল এবং বলল’ তোমরা খাচ্ছ না কেন? এতে ওদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো। ওরা বলল, ভীত হয়ো না। তারপর ওরা তাকে একজ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলো। তখন তার স্ত্রী চিৎকার করতে করতে আসলো এবং গাল চাপড়িয়ে বলল, এই বৃদ্বা বন্ধার সন্তান হবে? তারা বলল, তোমার প্রতিপালক এইরুপ বলেছেন, তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। [সুরা জারিয়াত .২৪-৩০]
এখানে মেহমান অর্থ ফেরেশতা যারা মানুষের আকৃতি ধারণ করে এসেছিলেন। এরা সংখ্যায় ছিলেন তিন জন, ১.জিবরাঈল আ. ২. মীকাঈল আ. এবং ৩. ইসরাফীল আ.। হযরত ইবরাহীম আ. এর বাড়িতে এলে তিনি মেহমানরুপে গণ্য করেন। সুতরাং তিনি তার গোয়ালের সবচাইতে হৃষ্টপুষ্ট একটি বাছুর ভুনা করে তাদের সামনে পেশ করেন। কিন্তু তিনি আহারের প্রতি তাদের কোন আগ্রহ দেখতে পেলেন না। কেননা, ফেরেশতারা আহারের প্রয়োজন হয় না। ইবরাহীম আ. তাদের কে অপরিচিত লোক মনে করলেন। তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতির সঞ্চার হল। তারা বলল, ভীত হয়ো না, আমরা লূতের সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। অর্থাৎ তাদেরকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। এ সময় স্ত্রী সারাহ্ আল্লাহর ক্রোধে লূতের সম্প্রদায়ের শাস্তির কথা শুনে আনন্দিত হন। তারপর আমি তাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তি ইয়াকুবের সু-সংবাদ দিলাম। অর্থাৎ ফেরেশতারা তাকে এ বিষয়ে সুসংবাদ দেন। সারাহ্ তার সংবাদ শুনে চিৎকার করতে করতে সম্মুখে আসল, সে বলল কি আশ্চর্য! আমি জননী হবো? অথচ এখন আমি বৃদ্বা এবং আমার স্বামী বৃদ্ব! অর্থাৎ আমার মত একজন বৃদ্বা ও বন্ধা মহিলা কী করে সন্তান জন্ম দিতে পারে! আর আমার স্বামীও এই বৃদ্ধ! এ অবস্থায় সন্তান হওয়ার সংবাদে তিনি আর্শ্চযবোধ করেন। (ওরা বলল আল্লাহর কাজে আপনি বিস্ময়বোধ করছেন? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসার অধিকারী ও সম্মানের অধিকারী।) হযরত ইবরাহীম আ. এ সুসংবাদ পেয়ে স্ত্রীর খুশীর সাথে শরীক হয়ে এবং স্ত্রীর মনে দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেও আশ্চার্যবোধ করেন। ইবরাহীম বলল, তোমরা কি আমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছ, আমি বার্ধক্যগ্রস্থ হওয়া সত্ত্বেও? তোমরা কি বিষয়ে শুভ সংবাদ দিচ্ছ? তারা বলল, আমরা সত্য সংবাদ দিচ্ছি। সুতরাং আপনি হতাশ হবেন না।
আহলে কিতাবের মতে, ফেরেশতাদের সামনে ভুনা করা বাছুরের সাথে রুটি তিনটা, মশক, ঘি ও দুধ আনা হয় এবং ফেরেশতাগণ তা খেয়েও ছিলেন। কিন্তু ফেরেশ্তাদের খাওয়ার মতটি এক চরম ভূল ছাড়া কিছূ নয়। কারও কারও মতে, ফেরেশতারা আহার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু খাদ্যদ্রব্য তখন বাতাসে মিশে যায়। আহলে কিতাবদের মতে, আল্লাহ ইবরাহীম আ.কে বলেন, তোমার স্ত্রী কে ‘সারা’ বলে ডেকো না, বরং তাকে ‘সারাহ্’ বলে ডেকো। আমি তাকে বরকত দান করব। তার পুত্রকেও বরকত দান করবো। তার বংশ থেকে অনেক গোত্র হবে এবং সে বংশে অনেক রাজা-বাদশা হবে। এ কথা শুনে হযরত ইবরাহীম আ. শুকরিয়া আদায়ের জন্য সিজদায় পড়ে যান। তিনি মনে মনে চিন্তা করে হাসেন এবং বলেন, আমার বয়স যখন একশ এর উপরে এবং সারাহ্ এর বয়স নব্বই-এখন আমাদের সন্তান হবে! আল্লাহ্ বলেন, হে ইবরাহীম! আমি আমার নিজের কসম করে বলছি, তোমার স্ত্রী সারাহ্ অবশ্যই পুত্র সন্তান প্রসব করবে। তার নাম হবে, ইসহাক। সে দীর্ঘজীবী হবে এবং আমার আশিসধন্য হবে সে এবং তার পরবর্তি বংশধররা। ইসমাঈলের ব্যাপারে তোমার প্রার্থনা কবুল করেছি। তাকে বরকত দান করেছি। আমি তাকে বড় করেছি ও যথেষ্ট সমৃদ্ধি দিয়েছি। তার বংশে বারজন বাদশার জন্ম হবে। তাকে আমি বিশাল এক বংশের প্রধান বানাবো। আল্লাহ্ তাআলা বলেন- তারপর  ইবরাহীম যখন তাদের কে এবং আল্লাহ ব্যতীত তারা আর যাদের পূজাঁ করত- তাদের সবাই কে পরিত্যাগ করল, তখন আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুবকে। [সুরা মারয়াম:৪৯]
এ অভিমতটি উল্লেখিত অভিমতকে আরও শক্তিশালী করেছে। বুখারী ও মুসলিমের একটি  হাদীসও এই মতকে সমর্থন করে। আবূ যর রা. সুত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদা জিজ্ঞাস করলাম ইয়া রাসুলুল্লাহ! সর্বপ্রথম নির্মিত মসজিদ কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদুল হারাম। আমি বললাম তারপর কোনটি? তিনি বললেন মসজিদুল আকসা। আমি বললাম এ দু’মসজিদের নির্মাণের মধ্যে ব্যবধান কত? তিনি বললেন চল্লিশ বছর। আমি বললাম এর পরবর্তী মর্যাদাসম্পন্ন কোনটি? তিনি বললেন, এরপর সব জায়গা সমান। যেখানেই সালাতের সময় হয় সেখানেই পড়ে নাও, কেননা সকল জায়গা সালাত আদায়ের জন্য উপযুক্ত। আহলে কিতাবদের মতে হযরত ইয়াকুব আ. মসজিদে আকসা নির্মাণ করেন। এর অপর নাম ঈলিয়া-বায়তুল মুকাদ্দাস। হযরত সুলায়মান ইবনে দাউদ আ. সম্পর্কে হাদীসে যা বর্ণিত আছে- অর্থাৎ তিনি যখন বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণ করেন তখন আল্লাহর নিকট তিনটি জিনিস চেয়েছিলেন। কুরআন পাকে ইরশাদ হয়েছে, সুলায়মান বলল, হে আমার রব! আমাকে মাফ করুন এবং আমাকে আমার সাম্রাজ্য দান করুন, যার অধিকারী আমি ছাড়া আর কেউ না হয়। [সুরা সাদ:৩৫]  সুলায়মান আ. এর আলোচনায়ও আমরা এ বিষয়ে উল্লেখ করব। এর অর্থ তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসকে পুনঃনির্মাণ করেন। কেননা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, উভয় মসজিদের নির্মাণের চল্লিশ বছরের ব্যবধান। কিন্তু সুলায়মান আ. ও ইবরাহীম আ. এর মধ্যে চল্লিশ বছরের ব্যবধানের কথা কেউ বলেন নি। কেবল ইবনে হিব্বান রহ. তার তাকাসীম ও আনওয়া গ্রন্থে এর উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তার আগে বা পরে অন্য কেউ এ মত পোষণ করেন নি। ওয়াল্লাহু আলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight