হযরত ইদরীস আ. : সংকলন : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

University

আল্লাহ তাআলা বলেন, স্মরণ কর, এ কিতাবে  উল্লেখিত ইদরীস আ. এর কথা। সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী এবং  আমি তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়। [১৯: ৫৬]
এ আয়াতে  আল্লাহ পাক ইদরীস আ. এর প্রশংসা করেছেন এবং তার নবী ও সিদ্দীক হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সা. এর বংশ তালিকার অন্যতম স্তম্ভ। আদম আ. ও শীছ আ. এর পরে তিনিই সর্বপ্রথম আদম সন্তান যাকে নবুয়ত দান করা হয়েছিল। ইবন ইসহাক রহ. বলেন, ইনিই সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লেখার সূচনা করেন। তিনি আদম আ. এর জীবন কালের তিনশত আশি বছর পেয়েছেন, কেউ কেউ বলেন, মুআবিয়া ইবন হাকাম সুলামী এর হাদীসে ইদরীস আ. এর প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. কে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, একজন নবী ছিলেন যিনি এ বিদ্যার সাহায্যে রেখা টানতেন। সুতরাং যার রেখা চিহ্ন তার রেখা চিহ্নের অনুরুপ হবে তারটা সঠিক। বেশকিছু তাফসীরকার মনে করেন যে, ইদরিস আ. ই প্রথম ব্যক্তি যিনি এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তারা তাকে দুর্ধষ্য সিংহকুলের জ্যোতিষি বলে অভিহিত করেন এবং তাদের বক্তব্যে অনেক অসত্য তথ্য তার প্রতি আরোপ করা হয়েছে। যেমনটি অন্য অনেক নবী রাসূল দার্র্শনিক পণ্ডিতবর্গ ও ওলীর প্রতি আরোপ করা হয়েছিনল।
আল্লাহ বলেন, আর আমি তাকে সুউচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছিলাম। [১৯/৫৭] এ প্রসঙ্গে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে মিরাজ সংক্রান্ত হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. এর চতুর্থ আসমানে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। ইবন জারীর রহ. হিলাল ইবন য়াসাফ রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবন আব্বাস রা. আমার উপস্থিতিতে কাব রা. কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, ইদরীস আ. সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার উক্তি ওয়া রাফানাহু মাকানান আলিয়্যা এর অর্থ কি? উত্তরে কাব রা. বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা ইদরীস আ.এর কাছে ওহী প্রেরণ করেন যে, প্রতিদিন আমি আদম সন্তানদের সমস্ত আমলের সমপরিমান প্রতিদান দেবো। সম্ভবত তার সমকালীন মানব সন্তানদেরকেই বুঝানো হয়েছে। এতে তিনি তার আমল আরো বৃদ্ধি করতে আগ্রহান্বিত হয়ে পড়েন। এরপর তার এক ফেরেশতা বন্ধু তার নিকট আগমন করলে তিনি তাকে বললেন, আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি এরুপ ওহী পাঠিয়েছেন আপনি মালাকুল মউত এর সঙ্গে কথা বলুন যাতে আমি আরো বেশি আমল করতে পারি। ফলে সেই ফেরেশতা তাকে তার দুডানার মধ্যে বহন করে আকাশে নিয়ে যান। তিনি চতুর্থ আসমানে পৌঁছলে তার সঙ্গে মালাকুল মউতের সাক্ষাত ঘটে। ফেরেশতা তার সঙ্গে ইদরীস আ.  এর বক্তব্য সম্পর্কে আলাপ করেন, মালাকুল মউত বললেন, ইদরীস আ. কোথায়? জবাবে তিনি বললেন, এই তো তিনি আমার পিঠের উপর। মালাকুল মউত বললেন, আশ্চর্য! চতুর্থ আকাশে ইদরীস আ. এর রুহ কবয করার আদেশ দিয়ে আমাকে প্রেরণ করা হলে আমি ভাবতে লাগলাম যে, কিভাবে আমি চতুর্থ আকাশে তার রুহ কবয করব? অথচ তিনি পৃথিবীতে রয়েছেন, যা হোক মালাকুল মউত সেখানেই তার রুহ কবয করেন।
আল্লাহ তাআলার কালাম ওয়া রাফানাহু মাকানান আলিয়্যা এর অর্থ এটাই। ইবন আবূ হাতিম রহ. এ আয়াতের তাফসীরে এ তথ্যটি বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, তখন আমার আয়ূ আর কতটুকু বাকি আছে ? ফেরেশতা তাকে তা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি না দেখে বলতে পারব না। তারপর দেখে তিনি বললেন, তুমি আমার নিকট এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছ যার আয়ূর এক পলক ব্যতীত আর কোন সময় অবশিষ্ট নেই। তারপর ঐ ফেরেশতা তার ডানার নীচের দিকে ইদরীস আ.  এর উপর দৃষ্টিপাত করে দেখেন যে, তার মৃত্যু হয়ে গেছে অথচ তিনি তা টেরই পাননি। এ তথ্য ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে গৃহীত হয়েছে। এর কিছু কিছু অংশ মুনকার পর্যায়ের। ওয়া রাফানা…. এর ব্যখ্যায় ইবন আবু নাজীহ মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন যে, ইদরীস আ. কে তুলে নেয়া হয়েছে তার মৃত্যু হয়নি যেমন তুলে নেয়া হয়েছে হযরত ঈসা আ. কে। তার এ কথার অর্থ যদি এই হয় যে, তিনি এখন পর্যন্ত মৃত্যু বরণ করেননি, তাহলে এতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আর যদি তার অর্থ  এই হয় যে, তাকে জীবিতাবস্থায় তুলে নেয়া হয়েছে। তারপর সেখানে তার মৃত্যু হয়, তাহলে কাব আহবারের পূর্ব বর্ণি+ত অভিমতের সঙ্গে এর কোন বিরোধ নেই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
আওফী বলেন, ওয়া রাফানা…… এর ব্যখ্যায় ইবন আব্বাস রা. বলেন, ইদরীস আ. কে ষষ্ঠ আকাশে তুলে নেয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। যাহহাক রহ. এর অভিমতও তাই। ইদরীস আ. এর চতুর্থ আকাশে থাকা সম্পর্কিত ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. বর্ণিত হাদীসটিই বিশুদ্ধতর। মুজাহিদ রহ. প্রমুখের অভিমতও তাই হাসান বসরী রহ. বলেন,  ওয়া ……. এর অর্থ তাকে আমি জান্নাতে  তুলে নিয়েছি। অনেকের মতে ইদরীস আ. কে তার পিতা য়ারদ ইবন মাহলাইল এর জীবদ্দশাতেই তুলে নেয়া হয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। কারো কারো মতে ইদরীস আ. নূহ আ. এর পূর্বসূরি নন বরং বনী ইসরাঈলের আমলের লোক।
ইমাম বুখারী রহ. বলেন, ইবন মাসউদ ও ইবন আব্বাস রা. এর বরাতে বলা হয়ে থাকে যে, ইলিয়াস আ. ও ইদরীস আ. অভিন্ন ব্যক্তি। মিরাজ সম্পর্কে আনাস রা. থেকে বর্ণিত যুহরীর হাদীসের বক্তব্য দ্বারা তারা এর প্রমাণ পেশ করেন যে, উক্ত হাদীসে আছে, নবী কারীম সা. যখন ইদরীস আ. এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন, তখন তিনি বলেছিলেন, পূণ্যবান ভাই ও পুণ্যবান নবীকে খোশ আমদেদ। আদম আ. ও ইবরাহীম আ. এর ন্যায় এ কথা বলেননি যে, পুণ্যবান নবী ও পুণ্যবান পুত্রকে খোশ আমদেদ। তারা বলেন, ইদরীস আ. যদি রাসূলুল্লাহ সা. এর বংশের উর্ধ্বতন পুরুষের অর্ন্তভুক্ত হতেন তাহলে আদম আ. ও ইবরাহীম আ,. এর মত তিনিও তাই বলতেন। কিন্তু এতে তাদের দাবি সপ্রমাণিত হয়না। হাছাড়া বর্ণনাকারী হাদীসের বক্তব্য সুষ্ঠুভাবে মুখস্থ রাখতে না পারার সম্ভাবনাও রয়েছে। অথবা বিনয় স্বরুপ তিনি পিতৃত্বের পরিচয় না দিয়ে এরুপ বলেছেন, আদি পিতা আদম আ. এবং আল্লাহর বন্ধু ও মুহাম্মদ সা. ব্যতীত সর্বশ্রেষ্ঠ মহান নবী ইবরাহীম আ. এর মত নিজের পিতৃত্বের উল্লেখ করেননি।
সমাপ্ত।

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ হযরত ইদরীস আ. : সংকলন : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

  1. মাহবুব আলম says:

    আম্বিয়ায়ে কেরাম হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ট সন্তান। তারা হলেন মানুষের পথপ্রদর্শক। তাই তাদের জীবনী বেশি বেশি পড়া আমাদের কর্তব্য। হযরত নূহ আ. এর জীবনী পড়ে অনেক কিছু শিখলাম এবং আল্পুত হলাম। লেখককে ধন্যবাদ জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight