হযরত আবুল আছ বিন রবি রা. : সংকলন: সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

কুরাইশের তিন সন্তান ছিল খুবই ভাগ্যবান। এ তিন ভাগ্যবানের মধ্যে অন্যতম হলেন সাইয়েদেনা হযরত আবুল আছ বিন রবি রা.। তিনজনের অপর দু’জন হলেন হযরত ওসমান জুন্নুরাইন রা. এবং হযরত আলী মুরতাজা রা.। এ তিনজন ছিলেন ফখরে মওজুদাত সারওয়ারে কায়েনাত রহমতে দুআলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতা। ভিন্ন রাওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত আবুল আছ রা. এর নাম ছিল লাকিত, মুহশিম অথবা হিশম। কিন্তু তিনি আবুল আছ কুনিয়াতেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন। কুরাইশের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত বংশ আবদে শামছের সাথে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। তার নছবনামা হলো, আবুল আছ বিন রবি বিন আবদুল উজ্জা বিন আবদি শামছ বিন আবদি মান্নাফ বিন কুসাই। আবদি মান্নাফ পর্যন্ত তার নছব প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নছবনামার সাথে মিলে যায়।
মাতার নাম ছিল হালাহ বিনতে খুয়ালেদ রা.। তিনি ইসলামের প্রথম মহিলা উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. এর আপন বোন। জীবন চরিত লেখকদের সকলেই ঐকমত্য পোষণ করে বলেছেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ ও সাহাবিয়া হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন এবং হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. এর ইন্তিকালের পরও জীবিত ছিলেন।
হাফিজ ইবনে আবদুল বার রা. “আল ইসতিয়াব” গ্রন্থে লিখেছেন, একবার তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাতের জন্য মক্কা মুকাররমা থেকে মদীনা তাইয়িবা গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবাসস্থল পৌঁছে ভেতরে গমনের অনুমতি চাইলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. এর কণ্ঠস্বরের সাথে মিল ছিল। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কানে তাঁর আওয়াজ পৌঁছল। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. এর কথা স্মরণ হলো এবং উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়শা সিদ্দিকা রা. কে বললেন, “খাদিজা রা. এর বোন হালাহ হতে পারেন।” ভেতরে এলে তিনি তাঁকে অত্যন্ত তাজিম করলেন। উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. ভাগিনা আবুল আছ রা. কে অত্যন্ত ¯েœহ করতেন এবং নিজের সন্তান বলে মনে করতেন। আবুল আছ রা. যৌবনকালেই ব্যবসায়ে মশগুল হয়ে গিয়েছিলেন এবং বুদ্ধিমত্তা ও সুন্দর আচরণের জন্যে বিরাট ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এভাবে তিনি কুরাইশদের মধ্যে বিত্তবান বলে পরিগণিত হন। তাঁর দিয়ানতদারী, সুন্দর আচার-আচরণ ও লেন-দেনের ওপর মানুষের খুব আস্থা ছিল। ফলে মানুষ তাঁর নিকট আমানত রাখত। ইবনে আছিরের বক্তব্য অনুসারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরম ত তিনিও “আমিন” খিতাবে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী র. বর্ণনা করেছেন, হযরত আবুল আছ রা. “আমিন” হওয়া ছাড়াও অত্যন্ত সাহসী এবং বাহাদুর ছিলেন। আরববাসী বাহাদুরীর স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে “হেজাযের বাঘ” লকব দিয়েছিল। নবুওয়াত প্রাপ্তির কিছু দিন পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবুল আছ রা. এর সাথে নিজের বড় মেয়ে হযরত যয়নাব রা. এর বিয়ে দেন। হযরত আবুল আছ রা. এর সুন্দর চরিত্রই এ বিয়ের কারণ ছিল। অন্য দিকে হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. এর ইচ্ছা এবং পীড়াপীড়িও বিয়েতে কাজ দিয়েছিল। চরিতকাররা ব্যাখা করে বলেননি যে, বিয়ের সময় যয়নব রা. এর বয়স কত ছিল। তবে, অপ্রাপ্ত বয়স্কা ছিলেন। এ জন্য কিয়াস করা হয় যে, আবুল আছ রা. সাথে তার প্রথম বিয়ে হয়।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুয়াত প্রাপ্তির পর হকের দাওয়াত প্রদান শুরু করলেন। এ সময় উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. এর সাথে হযরত যয়নব রা. ও ইসলাম কবুল করেন। কিন্তু হযরত আবুল আছ রা. বিভিন্ন কারণে পিতৃধর্মের ওপর কায়েম থাকেন। তবে তিনি দ্বীনে হক এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরুদ্ধে কখনো কোন তৎপরতায় অংশ নেননি। ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন যে, একবার কুরাইশের কতিপয় ব্যক্তি হযরত আবুল আছ রা. কে হযরত যয়নাব রা. কে তালাক দেয়ার জন্যে বাধ্য করতে চাইলো এবং কুরাইশের অন্য কোন মেয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিলো। কিন্তু তিনি পরিষ্কারভাবে এ কাজ করতে অস্বীকার করলেন। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই তাঁর কথা সব সময় উল্লেখ করতেন। নবুওয়ত প্রাপ্তির ৭ বছর পর কুরাইশের মুশরিকরা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহায্যকারী ও সমর্থক হাশেমী ও মুত্তালেবীদেরকে শি’বে আবিতালিবে অবরোধ করলো এবং খানা-পিনার কোন বস্তু সেখানে নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিল। এ ভয়ানক অবরোধ তিন বছর অব্যাহত ছিল। এ ঘোর দুর্দিনে মুশরিকদের বিধি-নিষেধ এবং বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও হযরত আবুল আছ রা. জীবন বাজী রেখে খানা-পিনার কিছু সামগ্রি কখনো কখনো শি’ব অভ্যন্তরে পৌঁছে দিতেন। মিরযা মুহাম্মদ তকীর বক্তব্য অনুসারে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ খিদমতের স্বীকৃতি এ ভাষায় দিয়েছিলেন “আবুল আছ জামাইয়ের অধিকার আদায় করেছে।”
নবুওয়াত প্রাপ্তির ত্রয়োদশ বছরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা মুয়াজ্জমা থেকে হিযরত করলেন। এ সময় হযরত  যয়নব রা. শশুর বাড়িতে ছিলেন। হযরত আবুল আছ রা. নিজের বাপ-দাদার ধর্মের ওপর থাকা সত্ত্বেও তার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। দ্বিতীয় হিজরীতে মক্কার মুশরিকরা বদরের যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার সময় হযরত আবুল আছ রা. কেও সাথে নিয়ে গেল। অবস্থা এমনই ছিল যে, কোন সুস্থ ব্যক্তি যুদ্ধ অপছন্দ করলেও পিছে থাকতে পারতো না। মুশরিকরা তাকে ভীরু এবং কাপুরুষ বলে তিরস্কার এবং গালি দিত। আর কোন কুরাইশের জন্য এটা ছিল বড় শরমের ও লজ্জার ব্যাপার। বদরের ময়দানে কুরাইশরা পরাজিত হলো। হযরত আবুল আছ রা. এক আনসারী জানবাজ হযরত আবদুল্লাহ বিন জাবির রা. এর হাতে বন্দী হলেন। তার সাথে অন্যান্য অনেক মুশরিককেও মুসলমানরা গ্রেফতার করলো।
মক্কাবাসী এ খবর শুনলো। বন্দীদের নিকটাত্মীয়রা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আত্মীয়দের মুক্তির জন্য ফিদিয়া বা অর্থ প্রেরণ করলো। হযরত যয়নব রা. ও দেবর আমর বিন রবির মাধ্যমে ইয়েমেনী আকীক পাথরের একটি হার হযরত আবুল আছ রা. এর মুক্তির জন্য পাঠালেন। হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. এ হার কন্যা যয়নব রা. কে বিয়ের সময় উপহার দিয়েছিলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে যখন এ হার পেশ করা হলো তখন হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা. এর কথা মনে পড়লো এবং অশ্রুতে তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। তিনি সাহাবা রা. দেবরকে সম্বোধন করে বললেন, যদি তোমরা ভালো মনে কর তাহলে যয়নব রা. কে এ হার ফেরত পাঠিয়ে দাও। এটা তাঁর মায়ের স্মৃতির নিদর্শন। আবুল আছ রা. মক্কায় ফিরে গিয়ে যয়নব রা. কে মদীনায় পাঠিয়ে দেবে। এটাই তাঁর জন্যে ফিদিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে।
সকল সাহাবী রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশের কাছে মাথা নত করলেন। হযরত আবুল আছ রা. ও এ শর্ত মেনে নিলেন। মুক্ত হয়ে তিনি মক্কা পৌঁছলেন এবং ওয়াদা অনুযায়ী হযরত যয়নব রা. কে নিজের ছোট ভাই কিনানাহ বিন রবি’র সাথে মদীনা রওয়ানা করে দিলেন। কুরাইশ মুশরিকরা যখন খবর পেল যে, হযরত যয়নব রা. মদীনায় যাচ্ছেন তখন তারা কিনানাহ বিন রবি এবং হযরত যয়নব রা. এর পিছু নিল এবং “জি তাওয়া” নামক স্থানে তাদেরকে ঘিরে ফেললো। হযরত যয়নব রা. উটের ওপর সওয়ার ছিলেন। হিবার বিন আসওয়াদ নামক একজন মুশরিক নিযাহ দিয়ে হযরত যয়নবকে মাটিতে ফেলে দিল অথবা উটের মুখ ফিরানোর জন্যে নিজের নিযাহ ঘুরালো। উট খুব দ্রুত পেছনের দিকে মোড় নিল। এতে হযরত যয়নব রা. মাটিতে পড়ে গেলেন। তিনি গর্ভবতী ছিলেন। প্রচ- আঘাত পেলেন ফলে গর্ভপাত হয়ে গেল। কিনানাহ বিন রবি’ অগ্নি শর্মা হয়ে গেলেন। তূনীর থেকে তীর বের করে হুংকার ছেড়ে বললেন, খবরদার! এখন তোমাদের মধ্যে কেউ অগ্রসর হলেই একদম ছাতু ছাতু করে ফেলবো।
কাফিররা থেমে গেল। আবু সুফিয়ান কিনানাহকে সম্বোধন করে বললো, ভ্রাতুষ্পুত্র তীর সংবরণ কর আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।
কিনানাহ বললো: বলো কি বলতে চাও।
আবু সুফিয়ান তার কানে কানে বললো, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে আমরা যেভাবে অপমানিত ও লাঞ্চিত হয়েছি তা তুমি জানো। যদি তুমি তার কন্যাকে এভাবে প্রকাশ্যে আমাদের সামনে দিয়ে নিয়ে যাও তাহলে আমরা বড় অপমানিত হবো।  তার চেয়ে বরং এটাই উত্তম হবে যে, তুমি এখন যয়নবকে সাথে নিয়ে মক্কা ফিরে এসো এবং অন্য কোন সময়ে গোপনে তাকে নিয়ে যেও। কিনানাহ এ প্রস্তাব মেনে নিল এবং হযরত যয়নব রা. কে সাথে নিয়ে মক্কা ফিরে এলেন। কিছুদিন পর সে রাতে চুপিসারে হযরত যয়নব রা. কে নিজের সাথে নিয়ে মক্কা থেকে বের হয়ে মদীনা পৌঁছে দিল। অন্য আরেক রেওয়ায়েতে আছে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবুল আছ রা. এর সাথে হযরত যায়েদ বিন হারিছাকে পাঠিয়ে দিলেন। যাতে তিনি হযরত যয়নব রা. কে নিজের সাথে মদীনায় নিয়ে আসতে পারেন। হযরত যায়েদ রা. “বাতনে ইয়াজজু” নামক স্থানে অবস্থান নেন। কিনানাহ হযরত যয়নব রা. কে এ স্থান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে মক্কা চলে যান এবং সেখান থেকে হযরত যায়েদ রা. হযরত যয়নব রা. কে মদীনা নিয়ে যান।
হযরত যয়নব রা. এর মদীনা গমনের পর কুরাইশের একটি দল হযরত আবুল আছ রা. এর নিকট এসে তাকে তালাক দেয়ার কথা বললো এবং পরিবর্তে কুরাইশের যে মহিলাকে সে পছন্দ করবে তার সাথেই তার বিয়ে দেবে বলে জানালো। হযরত আবুল আছ রা. জবাবে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি যয়নবকে কখনোই পরিত্যাগ করতে পারবো না। কুরাইশের অন্য কোন মহিলা তার বরাবর হতে পারে না। এতে কুরাইশরা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেল।
হযরত যয়নব রা. এর প্রতি হযরত আবুল আছ রা. এর ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি মদীনা চলে যাওয়ার পর থেকে হযরত আবুল আছ রা. নিরানন্দ এবং অশান্তিতে দিন কাটাতে লাগলেন। একবার হযরত আবুল আছ রা. সিরিয়া সফর করছিলেন। এ সময় খুব ব্যথিত স্বরে এরম নামক স্থান অতিক্রম করছিলাম তখন যয়নবের কথা মনে পড়লো। হেরেমে অবস্থানকারী সে ব্যক্তিকে আল্লাহ চিরসবুজ রাখুক। আমিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যাকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিক এবং প্রত্যেক স্বামীই সে কথারই প্রশংসা করে যা সে ভালভাবে জানে।
৬ষ্ঠ হিজরীতে এক বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে হযরত আবুল আছ রা. সিরিয়া গমন করছিলেন। আইছ নামক স্থানে ইসলামের মুজাহিদদের একটি দল কাফিলার ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে সব ধন-সম্পদ কবজাহ করে নিল।
মুসলমানদের প্রত্যাবর্তনের পর হযরত আবুল আছ রা. ও সোজা মদীনা মুনাওয়ারাহ পৌঁছলেন এবং হযরত যয়নব রা. এর নিকট গিয়ে আশ্রয় চাইলেন। নিশ্চিন্তে তিনি তাঁকে আশ্রয় দিলেন। ভোরে মুসলমানরা যখন নামাজ পড়ার জন্যে মসজিদে নববীতে এলো তখন হযরত যয়নব রা. উচৈস্বঃরে বললেন, হে মুসলমানরা! আমি আবুল আছ বিন রবিকে আশ্রয় দিয়েছি।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ থেকে ফারেগ হয়ে বললেন, তোমরা কি কিছু শুনেছ? সবাই আরজ করলেন, আল্লাহর রাসূল হ্যাঁ।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! এর আগে এ ঘটনা আমি জানতাম না এবং আশ্রয় দানের অধিকার তো প্রতিটি নগণ্য মুসলমানেরই রয়েছে।
এরপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে তাশরীফ নিলেন। এ সময় হযরত যয়নব আবুল আছ রা. এর মাল ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে সুপারিশ করলেন। হযরত আবুল আছ রা. মক্কায় হযরত যয়নব রা. এর সাথে ভালো ব্যবহার করেছিলেন। এ জন্যে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সম্মান করতেন। তিনি সাহাবীদের রা. বললেন, তোমরা আমার এবং আবুল আছের আত্মীয়তার ব্যাপারটি অবগত আছ। যদি তোমরা তার মাল ফিরিয়ে দাও তাহলে এটা তোমাদের ইহসান হবে এবং আমি খুশী হবো। আর যদি না দাও তাহলে এ মাল হবে আল্লাহর উপহার এবং তাতে তোমাদেরই অধিকার রয়েছে। তাতে আমার কোন প্রশ্ন বা পীড়াপীড়ি নেই।
সাহাবায়ে কিরাম তো সব সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্তুষ্টিই চাইতেন। অবিলম্বে তারা সকল মাল ও আসবাব হযরত আবুল আছ রা. কে ফিরিয়ে দিলেন। তিনি তা নিয়ে মক্কা পৌঁছলেন এবং সকল লোককে তাঁর নিকট রক্ষিত আমানত ফিরিয়ে দিলেন। অতঃপর মক্কাবাসীদেরকে সম্বোধন করে বললেন, হে কুরাইশরা! এখন আমার জিম্মায় কারো কোন আমানত অথবা মাল তো নেই?
মক্কার সকল লোক এক বাক্যে বললো, অবশ্যই নয়। আল্লাহ তোমাকে ভালো করুন। তুমি একজন নেককার এবং বিশ্বাসী মানুষ।
হযরত আবুল আছ রা. তাদের জবাব শুনে বললেন, “তাহলে শুনে নাও; আমি মুসলমান হচ্ছি। আল্লাহর কসম। পাছে তোমরা আমাকে খিয়ানতকারী মনে না কর শুধু এ কথা ভেবেই আমি মুসলমান হইনি। একথা বলেই কালেমায়ে শাহাদাত পড়লেন এবং তারপর মক্কা থেকে হিযরত করে মদীনা চলে এলেন। এটা সপ্তম হিজরীর মুহাররম মাসের ঘটনা।
মদীনা পৌঁছেই হযরত আবুল আছ রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে ইমান আনলেন। হযরত আবুল আছ রা. এর ইসলাম গ্রহণের পর হজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যয়নব রা. এর সাথে নতুন করে বিয়ে দিয়েছিলেন কি? এ সম্পর্কে দু ধরনের রেওয়ায়েত পাওয়া যায়। প্রথম হলো, নতুন করে বিয়ে দেননি। প্রথম আকদ অনুসারেই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় রেওয়ায়েত হলো, হযরত যয়নব রা. এবং হযরত আবুল আছের মধ্যে শিরকের কারণে বিচ্ছিন্নতা এসেছিল। এ জন্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবুল আছ রা. এর ইসলাম গ্রহণের পর হযরত যয়নব রা. কে প্রথম দফা নির্ধারিত মোহরানায় দ্বিতীয়বার বিয়ে দেন এবং এবং হযরত আবুল আছ রা. এর বাড়ি পাঠিয়ে দেন।
হযরত আবুল আছ রা. মক্কায় বিরাট ব্যবসা-কারবার ছেড়ে এসেছিলেন এবং তাঁর সুন্দর লেনদেন, আমানত ও ধর্মপরায়নতার  কারণে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মুশরিকরা তাঁকে মক্কায় অবস্থানে বাধা দেয়নি। বস্তুতঃ তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুমতি নিয়ে পুনরায় মক্কায় চলে এলেন এবং আগের মত যথারীতি ব্যবসায়ে নিমগ্ন হলেন। মক্কায় অবস্থানের কারণে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের সুযোগ তাঁর হয়নি।
হযরত ইবনে হাজার র. এর বর্ণনা অনুযায়ী তিনি শুধুমাত্র একটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১০ হিজরীতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর নেতৃত্বে একটি বাহিনী ইয়েমেন প্রেরণ করেন। এক রেওয়ায়েতে আছে যে, হযরত আলী রা. ইয়েমেন থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় হযরত আবুল আছ রা. কে সেখানকার গভর্ণর বানিয়ে দিয়েছিলেন।
হযরত আবুল আছ রা. এর স্ত্রী হযরত যয়নব বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অষ্টম হিজরীতে ওফাত পান। তাঁর ইন্তিকালে হযরত আবুল আছ রা. শোকে কাতর হয়ে পড়েন। কিন্তু অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দেন এবং সন্তানদের লালন-পালনে মশগুল হয়ে পড়েন। হযরত যয়নব রা. এর ইন্তিকালের পর তিনি অন্য কোন মহিলাকে বিয়ে করেননি। এমনিভাবে তিনি তাঁর প্রতি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন।
হাফিজ ইবনে আব্দুল বার রা. “আল ইসতিয়াব” গ্রন্থে লিখেছেন, ১৩ হিজরীর যিলহজ্ব মাসে হযরত আবুল আছ রা. ইন্তিকাল করেন। কিন্তু তারিখে ইবনে মানদাহ ওয়াল আকমাল গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত আবুল আছ রা. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর খিলাফতকালে ধর্মদ্রোহীদের উৎখাতে পুরোপুরি অংশ নিয়েছিলেন এবং মাসায়লামাহ কাজ্জাবের বিরুদ্ধে ইয়ামামার লড়াইয়ে বীরত্বের সাথে লড়াই করতে করতে শাহাদাতের পিয়ালা পান করেন। (এ ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন)।
হযরত যয়নব রা. এর গর্ভে হযরত আবুল আছ রা. এর দু’ সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। ছেলেটির নাম ছিল আলী এবং মেয়ের নাম ছিল উমামাহ। হযরত আলী রা. বিন আবুল আছ রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সবচেয়ে বড় নাতি ছিলেন এবং তিনি তাকে খুব ¯েœহ করতেন। তার ব্যাপারে তিন ধরনের রেওয়ায়েত পাওয়া যায়। প্রথম হলো শৈশবে মারা যান। দ্বিতীয় রেওয়ায়েত হলো তিনি মায়ের দুধ পানের দু’বছর বনি গাজিয়াহ গোত্রে কাটান। দুধ পানের সময় শেষ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মদীনা মুনাওয়ারায় চেয়ে নেন এবং স্বয়ং তার লালন-পালন করেন। তিনি হযরত যয়নব রা. এবং হযরত আবুল আছ রা. এর নিকট থেকে তাকে চেয়ে নিয়ে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উটের ওপর তাঁর পিছনে এ আলীই বসেছিলেন। সে সময় তার বয়স ছিল ১৪-১৫ বছর।
পিতার জীবদ্দশায় যৌবনকালে তিনি মারা যান। তৃতীয় রেওয়ায়েত হলো, তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধের (১৫ হিজরী) শাহাদাতের পিয়ালা পান করেন।
হযরত উমামাহ বিনতে আবুল আছ রা. দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খুব ভালোবাসতেন। একবার নাজ্জাশী (হাবশার বাদশাহ) একটি আংটি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোহফা প্রেরণ করেছিল। এ আংটি পেয়ে তিনি বললেন, “যে আমার নিকট সব চেয়ে প্রিয় তাকেই এ আংটি দেব।”
এ কথা যারা শুনেছিল তাদের ধারণা হয়েছিল যে, তিনি আংটিটি হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ রা. কে দেবেন। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল ছোটদের প্রতি। সুতরাং তিনি হযরত উমামাহ রা. কে ডাকলেন এবং তার আঙ্গুলে পরিয়ে দিলেন। অন্যান্য রেওয়ায়েতে আংটির পরিবর্তে স্বর্ণের হারের কথা উল্লেখ রয়েছে। হারটি কেউ তোহফা হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উমামাহ রা. কে ডেকে এ হার তার গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন।
সহিহ বুখারী শরীফে আছে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমামাহ রা. কে এত অধিক ¯েœহ করতেন যে, তিনি তাকে কোন কোন সময়ে মসজিদে নিয়ে যেতেন। একদিন তিনি তাকে কাধের ওপর চড়িয়ে মসজিদে উপস্থিত হলেন। তিনি এ অবস্থাতেই নামাজ পড়া শুরু করলেন। যখন রুকু ও সিজদায় যেতেন তখন শিশু উমামাহ রা. কে আস্তে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতেন যখন দাঁড়াতেন তখন পুনরায় কাঁধের ওপর বসিয়ে দিতেন। এভাবেই তিনি পুরো নামায আদায় করতেন।
অষ্টম হিজরীতে হযরত যয়নব রা. ওফাত পেলে হযরত উমামাহ রা. নানা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অভিভাবকত্বে আসেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তিকালের পর পিতা আবুল আছ তার অভিভাবক হন। তিনি মৃত্যুর (শাহাদাত) পূর্বে হযরত উমামাহ রা. কে হযরত যোবায়ের বিন আওয়াম রা. (মামাতো ভাই) এর অভিভাবকত্বে প্রদান করেন। হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা রা. এর ইন্তিকালের পর তার ওছিয়ত মোতাবেক এবং হযরত যোবায়ের রা. এর ইঙ্গিতে হযরত আলী রা. হযরত উমামাহ রা. কে বিয়ে করেন। ৪০ হিজরীতে হযরত আলী রা. শাহাদাত প্রাপ্ত হলে মুগিরাহ বিন নওফিল রা. তাকে নিকাহ করেন এবং তার জীবদ্দশাতেই ওফাত পান। কতিপয় রেওয়ায়েত অনুসারে হযরত উমামাহ রা. এর কোন সন্তান হয়নি। অনেকে বলেছেন মুগিরাহর ঔরষে ইয়াহিয়া নামক এক পুত্র জন্ম নিয়েছিল।
লেখিকা:  গ্রন্থ প্রণেতা, সম্পাদক ও প্রকাশক ‘মাসিক আল জান্নাত’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight