হযরত আদম আ. ও মূসা আ.-এর বাদানুবাদ : সংকলন : আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

q

পূর্ব প্রকাশিতের পর..
ইমাম বুখারী রা. বর্ণনা করেন যে, আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ‘মূসা আ. আদম আ.-এর সাথে বাদানুবাদের লিপ্ত হন। তিনি তাঁকে বলেন, আপনিই তো মানুষকে আপনার অপরাধ দ্বারা জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে দুর্বিপাকে ফেলেছেন।’ আদম আ. বললেন, হে মূসা! আপনি তো সে ব্যক্তি যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর রিসালাত ও কালাম দিয়ে আপনাকে বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছেন। আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য তিরস্কার করছেন, যা আমাকে সৃষ্টি করার পূর্বেই আল্লাহ আমার নামে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন? রাসূলুল্লাহ সা. বলেন : এতে আদম আ. তর্কে মূসা আ.-এর উপর জয়লাভ করেন। [মুসলিম, নাসাঈ]
রাসূলুল্লাহ সা. বলেন : এভাবে আদম আ. যুক্তি প্রমাণে মূসা আ.-এর উপর জয়লাভ করেন। একথাটি তিনি দু’বার বলেছেন।
ইবনে মাজাহ রহ. ব্যতীত সিহাহ সিত্তার সংকলকগণের অবশিষ্ট পাঁচজনই হাদীসটি দশটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে রিওআয়াত করেছেন। ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেছেন যে, আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ‘মূসা আ.-এর সংগে আদম আ.-এর সাক্ষাৎ হলে মূসা আ. তাঁকে বললেন, আপনি সে আদম আ. যে, আল্লাহ তা’আলা আপনাকে তাঁর নিজ হাতে সৃষ্টি করেন, তাঁর ফেরেশতাদেরকে আপনার সামনে সিজদাবনত করান এবং আপনাকে জান্নাতে স্থান দেন।  তারপর আপনি একটি কাজ করে বসেন। আদম আ. বললেন, আপনি তো সে মূসা আ. যে, আল্লাহ তা’আলা আপনার সাথে কথা বলেছেন, তাঁর রিসালতের জন্যে আপনাকে মনোনীত করেছেন এবং আপনার উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন। আচ্ছা, আপনি বলুনতো আমার সৃষ্টি আগে হয়েছে, নাকি আমার কর্মের উল্লেখ আগে হয়েছে? মূসা আ.- বললেন, না বরং আপনার এ কর্মের উল্লেখ আগে হয়েছে। এভাবে আদম আ. মূসা আ.-এর উপর জয়লাভ করেন।’
ইবনে আবু হাতিম রহ. বর্ণিত এ হাদীসের শেষাংশে আদম আ.-এর উক্তিসহ অতিরিক্ত এরূপ বর্ণনা আছে : আল্লাহ আপনাকে এমন কয়েকটি ফলক দান করেছেন, যাতে যাবতীয় বিষয়ের সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে এবং একান্তে নৈকট্য দান করেছেন। এবার আপনি বলুন, আল্লাহ তা’আলা তাওরাত কখন লিপিবদ্ধ করেছিলেন? মূসা আ. বললেন, সৃষ্টির চল্লিশ বছর পূর্বে। আদম আ. বললেন, তাতে কি আপনি (ওয়া আছা  আদামু রাব্বুহু ফাগাওয়া) কথাটি পাননি? মূসা আ. বললেন, জী হ্যাঁ। আদম আ. বললেন, তবে কি আপনি আমাকে আমার এমন একটি কৃতকর্মের জন্য তিরস্কার করছেন যা আমার সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগেই আল্লাহ তা’আলা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন যে, আমি তা করব? বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : এভাবে আদম আ. মূসা আ.-এর উপর জয়লাভ করেন।
ইমাম আহমদ রহ. বর্ণিত এ সংক্রান্ত বর্ণনা মূসা আ.-এর বক্তব্যে অতিরিক্ত একথাটিও আছে: ‘আপনি আপনার সন্তানদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন।’ তবে এ অংশটি হাদীসের অংশ কি না তাতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
হাফিজ আবু ইয়ালা আল-মূরিলী তাঁর মুসনাদে আমীরুল মু’মিনীন উমর ইবনে খাত্তাব রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ‘মূসা আ. বললেন, হে আমার রব! আপনি আমাকে সে আদম আ.-কে একটু দেখান, যিনি আমাদেরকে এবং তাঁর নিজেকে জান্নাত থেকে বের করিয়ে দেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে আদম আ.-কে দেখালেন। মূসা আ. বললেন, আপনিই আদম আ.? তিনি বললেন হ্যাঁ। মূসা আ. বললেন, আপনি সে ব্যক্তি যার মধ্যে আল্লাহ তা’আলা তাঁর রূহ সঞ্চার করেখেছেন, যাঁর সামনে তাঁর ফেরেশতাদেরকে সিজদাবনত করিয়েছেন এবং যাঁকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিয়েছেন। জবাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ। মূসা আ. জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদেরকে এবং আপনার নিজেকে জান্নাত থেকে বের করে দিতে কিসে আপনাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল? উত্তরে আদম আ. বললেন, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি মূসা আ.। আদম আ. বললেন, আপনি কি বনী ইরাঈলের নবী মূসা যে, আল্লাহ তা’আলা পর্দার আড়াল থেকে আপনার সাথে এমনভাবে কথা বলেছেন যে, আপনার ও তাঁর মধ্যে কোন দূত ছিল না? মূসা আ. বললেন, জী হ্যাঁ। এবার আদম আ. বললেন : আপনি আমাকে এমন একটি বিষয়ে তিরস্কার  করছেন, যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ তা’আলা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন : এভাবে আদম আ. মূসা আ.-এর উপর জয়যুক্ত হন।
উল্লেখ্য যে, এ হাদীসের ব্যাপারে বিভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। কাদরিয়া সম্প্রদায়ের একটি দল এ হাদীসটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ এ হাদীসে পূর্ব সিদ্ধান্ত তথা তাকদীরের প্রমাণ রয়েছে। আর বাহ্যিক দৃষ্টিতে তা প্রমাণিত হয়ও। কারণ, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : পূর্ব সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে আদম আ. মূসা আ.-এর উপর জয়যুক্ত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight