হতাশা এক হন্তারক ব্যাধি

 

সুন্দর ও চমৎকার জীবন এবং নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বেগ মন সবারই কাম্য, প্রতিটি মানুষের চাওয়া। তারা বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন পন্থায় এর জন্য চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু তা কেবল এক শ্রেণির মানুষই লাভ করে : আল্লাহ তাআলার হেদায়েতের ওপর অবিচল সৎকর্মপরায়ণ মুমিন। তার চিত্ত নিরুদ্বেগ, তার আত্মা প্রশান্তিময়।
এ-ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—“আমার প থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের নির্দেশ এলে (তবে এ-সম্পর্কে আমার বিধান মনে রেখো) যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না (কখনো সে সৎপথ থেকে বিভ্রান্ত হবে না) এবং দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে না।” [সুরা তোয়া-হা : আয়াত ১২৩]
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন—‘যে-কোনো পুরুষ বা নারী সৎকাজ করবে এবং সে মুমিন, অবশ্যই আমি তাকে উত্তম জীবন দান করবো। আর তাদের সৎ কাজের বিনিময়ে অবশ্যই আমি তাদেরকে প্রতিদান দেবো।’ [সুরা নাহ্ল : আয়াত ৯৭]
ইমাম ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ রহ. আয়াতে বর্ণিত ‘হায়াতে তায়্যিবাহ’ বা ‘উত্তম জীবন’-এর উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, সঠিক ব্যাখ্যা এই যে, তা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আত্মার জীবন, তার শান্তি, তার আনন্দ, তার উচ্ছ্বাস। ঈমান, আল্লাহর পরিচয় ও ভালোবাসা, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তাঁর প্রতি ভরসার মাধ্যমে আত্মার শান্তি ও পুলক অর্জিত হয়।
এরপর তিনি বলেছেন, আত্মিক জীবন যখন প্রশান্তিময় ও পুলকিত হয়, বাহ্যিক জীবনও সুন্দর ও চমৎকার হয়। এ-কারণেই আল্লাহ তাআলা যারা তাঁর স্মরণ (যিকির) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের জীবনকে সঙ্কুচিত করে দিয়েছেন। সঙ্কুচিত জীবন উত্তম জীবনের বিপরীত বিষয়।
আল্লাহ তাআলা যাকে উত্তম জীবন দান করেন তাকে আমলের সৌভাগ্য ও দৃঢ়তা দান করেন। ফলে সে অন্যান্য মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাস অর্জন করে। তার অন্তরে আশা-প্রত্যাশার ¯্রােত প্রবাহিত হয়। ফলে হতাশা কিছুতেই তার কাছে ঘেঁষতে পারে না।
হতাশা এক ভয়ঙ্কর বিষ। তা অন্তরকে মেরে ফেলে, আত্মাকে খুন করে ফেলে, বকে সঙ্কুচিত করে তোলে। হতাশা জীবনের চেহারাকে অন্ধকারময় করে দেয়, জীবনের যা-কিছু ভালো তা কলুষিত করে দেয়, জীবনের সঙ্কট ও জটিলতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। জীবনকে একটা বিরান ও চোরা পথে পরিণত করে। হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি পদেেপ মৃত্যুকে অনুভব করে। প্রতিমুহূর্তে দুর্বৃত্তি-আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তার কাছে টাকা-কড়ি না থাকলেও।
এ-কারণেই হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি তার জীবনে অস্থির ও উদ্বিগ্ন। কোনো কাজেই সে দৃঢ় হতে পারে না। কোনো সিদ্ধান্তেই তার মত অটুট থাকে না। কোনো পরিকল্পনাতেই সে সফলতার মুখ দেখে না। প্রতিটি কাজ গোড়াতেই শেষ হয়ে যায়। সে সংকল্প করে, পরপরই নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সে দাঁড়ায়, পরপরই বসে পড়ে। সবসময়ই সে থাকে বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট এবং বিষাদগ্রস্ত ও অবসাদকান্ত। তার মুখে মধু ধৈর্য থেকেও তিক্ত, তার হাতে মখমল কাঁটা থেকেও খসখসে, তার চোখে পৃথিবী সূচের ছিদ্র থেকেও সঙ্কীর্ণ।
এই ধরনের মানুষ তাদের জীবনকে তৃষ্ণার্ত বানিয়ে ফেলে, যদিও সে বাস করে নদীতে; সময়সময় থাকে ুধার্ত, যদিও তার জন্য আকাশ থেকে হাজারো খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ হয়, সবসময় থাকে উদ্বিগ্ন, অস্থির, আতঙ্কিত, যদিও থাকে স্বর্গে, যাবতীয় ঐশ্বর্যে। বড় স্বপ্ন ও বড় প্রত্যাশার জন্য চাই দৃঢ়প্রত্যয়ী ও শক্তিমান ব্যক্তিত্ব, সত্য সংকল্প, জেদি মন, প্রখর বুদ্ধিমতা, বিনিদ্র চোখ, সজীব কোমলতা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা এবং অসীম ধৈর্য।
সুতরাং এখানে আমরা আমল ও কর্ম এবং স্বপ্ন ও প্রত্যাশার বিচারে মানুষের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। যার স্বপ্ন ও প্রত্যাশা বড় সে দৃঢ়সংকল্প ও অসম্ভব পরিশ্রমী। সে অনেক ব্যয় করে এবং সহজেই ত্যাগ-তিতিা স্বীকার করে। আর যার স্বপ্ন ছোট, যার কোনো প্রত্যাশা নেই, সে সবকিছুতেই নতি স্বীকার করে, সবকিছুতেই ব্যর্থ ও ভীরু।
পাপাচারী বান্দার পাপ যখন বেড়ে যায়, তার সামনে যখন তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং সে ভাবে যে, তার প্রতিপালকের কাছে ফিরে আসার পথ একেবারেই বন্ধ, তখন সে হতাশায় আক্রান্ত হয়। অন্ধকারাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে সে তার জীবনের দিকে তাকায়। তার অন্তরে ঈমানের শেষ আলোকবিন্দুটিও নিভে যায়। যে-মনুষ্যত্ব দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মানিত করেছেন সেই মনুষ্যত্ব থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পশুত্বেরও নিম্নস্তরে চলে যায়। তার চারপাশে যারাই থাকে তাদের বিরুদ্ধে সে ব্যাপক অনিষ্টরূপে আবির্ভূত হয়। এ-কারণেই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হতাশ ও তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হতে সতর্ক করেছেন। আমাদেরকে তওবা ও অনুশোচনার পথে ছুটে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight