হজ্জ সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করুন : মুফতী আব্দুল বারী

হজ্জের শাব্দিক অর্থ- হজ্জ শব্দের আভিধানিক অর্থ, ইচ্ছা করা।

পরিভাষায় হজ্জ বলা হয়, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে কাবা শরীফ ও সংশ্লিষ্ট স্থান সমূহ জিয়ারত করা। ইসলামের পাচঁটি স্তম্ভের অন্যতম হজ্জ। যারা হজ্জে যাচ্ছেন তারা বলা বাহুল্য অনেক সৌভাগ্যবান, সুতরাং আল্লাহর কাছে দোআ করুন- হে আল্লাহ! আমার হজ্জকে সহজ করো এবং কবুল করো। দেখবেন আপনার সকল সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। হজ্জের সফর অনেক গুরুত্বপুর্ণ এবং দীর্ঘ তাই এখানে কোন ব্যাপারে ধৈর্য হারানো যাবেনা। সকল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো সাহস রাখতে হবে। বিচলিত হওয়া যাবেনা।

হজ্জের প্রস্ততি : হজ্জের প্রস্ততিপর্বে পাসপোর্ট তৈরি করা। বিমানের টিকেট সংগ্রহ ও তারিখ নিশ্চিত করা। প্রয়োজনীয় বৈদিশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করা, ম্যনিনজাইটিস টিকা বা অন্যান্য ভেকসিন দেওয়া, এ ক্ষেত্রে দালালের খপ্পরে পরবেন না। সর্বপরি এসব নিয়ম জানার জন্য বিভিন্ন বই পড়তে পারেন। যারা পড়তে পারেন না তারা অন্যের মাধ্যমে জেনে নিন সেখানকার পরিস্থিতি। কোন ব্যাপারে ভিন্নতা দেখা দিলে আপনার আস্থাশীল আলেমের পরামর্শ নিন। অন্যকে আপনার মত পালনে বাধ্য করবেন না। হজ্জের জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্র সংগ্রহ করা দরকার। যেমন- ১. পাসপোর্ট পাস, টিকিট, ডলার, ২. পাসপোট পাস, ভিসা, টাকা রাখার জন্য গলায় ঝোলানো ছোট ব্যাগ। ৩. ইহরামের কাপড় কমপক্ষে দুই সেট: শরীরের নিচের অংশে ব্যবহারের জন্য আড়াই হাত বহরে আড়াই গজ, উপরের অংশের জন্য একই বহরের তিন গজ সাদা কাপড় হবে। সুতি হলে অনেক ভালো। ৪. নরম স্পন্সের স্যা-েল। ৫. ইহরাম বাঁধার বেল্ট। ৬. গামছা বা টাওয়াল। ৭. লুঙ্গি গেন্জিসহ আপনার পোশাক আপনি ব্যবহার করুন। ৮. সাবান, পেস্ট, মেসওয়াক, নখকাটার মিশিন, সুইঁ-সুতা রাখা। ৯. থালা-বাটি গ্লাস। ১০. হজ্জ বিষয়ক বইসহ অন্যান্য ধর্মীয় বই সাথে রাখা। ১১. কুরআন শরীফ ও কাগজ কলম রাখা। ১২. মদীনা শরীফে অনেক ঠা-া তাই শীতের কাপড় নেওয়া। ১৩. প্রয়োজনীয় ঔষধ রাখা। ১৪. চশমা ব্যবহার করলে চশমা নিয়ে যাওয়া। ১৫.বাংলাদেশী কিছু টাকা নিজের সাথে রাখা। ১৬. মালামাল নেওয়ার জন্য সুটকেস নেওয়া যার মধ্যে আপনার ঠিকানা ও মোবাইল নাম্বার লেখা থাকবে।

বি. দ্র. এগুলো হাজি ক্যাম্পে পাওয়া যায়।

আপনি হজ্জে যাচ্ছেন মন সর্বদা স্থির রাখুন। মালপত্র হালকা রাখুন, বৃদ্ধদের প্রতি খেয়াল রাখুন, নামাযগুলো হারাম শরীফে আদায় করুন। সে দেশের মানুষ আরবীতে কথা বলে, রাস্তাঘাট অচেনা আপনি বিচলিত হবেন না। বাংলাদেশের সরকার হাজীদের জন্য অনেক পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।

হাজ্জি ক্যাম্প: এখানে আপনি যতদিন থাকবেন আপনার নিজের মালামালের দিকে খেয়াল রাখুন। টিকা দেওয়া বাকী থাকলে টিকাগুলো দিয়ে নিন। প্রয়োজনীয় বিদেশী মুদ্রা সংগ্রহ করুন।

ইহরাম: জেনে নিন আপনার গন্তব্য মদীনা না মক্কা! যদি মদীনায় হয়, তাহলে ইহরাম বাঁধবেন না, মদীনা থেকে যখন মক্কায় যাবেন তখন ইহরাম বাধবেন। আর যদি ইহরাম মক্কায় হয়, তাহলে হাজী ক্যাম্প থেকে ইহরাম বাধবেন; যদিও বিমানে বাঁধার সুযোগ আছে। কিন্তু এখানে রিক্স নেওয়াটা ঠিক হবে না। কেননা যদি ভূল হয়ে যায় তাহলে দম দিতে হবে। বাংলাদেশীদের জন্য ইহরাম বাঁধার মিকাত হলো ইয়ালামলাম।

ঢাকা বিমানবন্দর: উড্ডয়নের সময় অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে বিমান বন্দরে পৌঁছবেন। আপনার নাম ঠিকানা লেখা ব্যাগে কোন ধরনের পঁচনশীল খাবার রাখবেন না। লাগেজে দেয়া মাল ঠিকমতে বেঁধে নিবেন। বিমানবন্দরে মাল রাখার কোন টোকেন দিলে তা যতœসহকারে রাখুন। কারন এই টোকেন দেখেই জেদ্দায় আপনার মাল বুঝে নিবেন।

আপনার পরিচয় পত্র, পাসপোর্ট, টিকিটসহ গুরুত্বপুর্ণ কাগজপত্র হেফাজতে রাখুন।

জেদ্দা বিমানবন্দর: মুয়াল্লিমের গাড়ি আপনাকে জেদ্দা থেকে মক্কায় যে বাড়িতে আপনি থাকবেন সেখানে নিয়ে যাবে। মুয়াল্লিমের নাম্বার লিখা একটি বেল্ট দেওয়া হবে সেটি লাগিয়ে রাখবেন। চলার পথে তালবিয়া পাঠ করুন।

মক্কায় পৈাছার পর: যদি বেশী ক্লান্ত হন তাহলে বিশ্রাম নিন। নামাযের সময় হলে তা আদায় করুন। তারপর নিয়ত করে থাকলে উমরা করুন। কাবা ঘরে প্রবেশের অনেকগুলো গেইট আছে, যেগুলো দেখতে প্রায় একি রকম, কিন্তু আরবী এবং ইংরেজিতে গেইটের নাম লেখা আছে এগুলো খিয়াল করবেন। জুতা রাখার সময় রেক নাম্বার মনে রাখবেন। আপনি যে আমল করবেন তার নিয়ম কোন আলেমের কাছে জেনে নিবেন। আগে থেকেই জেনে নিন আপনি হারিয়ে গেলে কোথায় থাকতে হবে। কারন ওখানে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাবাভিক, এক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নিতে পারেন।

ক্বাবা শরীফ: প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ সহ দোআ অবশ্যই পড়–ন। হারাম শরীফে কোন নারীর পাশে বা পিছনে নামায পড়া উচিৎ নয়। কোন দরজায় দাঁড়িয়ে নামায আদায় করবেন না, কারণ তাতে পথচারীর কষ্ট হবে। হাজরে আসওয়াদ পাথরে চুমু খাওয়া সুন্নাত, তবে বেশী কষ্ট হলে ইশারা করবেন। আপনি অনেক কে অনেক ধরনের আমল করতে দেখতে পাবেন, তা দেখে আপনি বিচলিত হবেন না। কারণ এখানে অনেক মাযহাবের অনেক লোক কিছুটা ভিন্ন ভাবে আমল করে থাকে। বিভিন্ন স্থানে অবস্থান : মক্কার বিভিন্ন স্থানে (আরাফা, মুযদালিা, মিনায়) কখন কি আমল তা মুয়াল্লিম সাহেবের কাছ থেকে আগেই জেনি নিন। তাওয়াফ ও সায়ী: তাওয়াফের সময় অযু থাকতে হবে, সায়ী করার সময় সাফা থেকে মারওয়া বা মারওয়া থেকে সাফা সায়ী ভিন্ন চক্কর, এভাবে সাতবার হলেই একটি সায়ী পূর্ণ হবে।

কিছু পরামর্শ সৌদিতে অবস্থানকালে চাঁদা উঠানো, সাহায্য চাওয়া এগুলো দ-নীয় অপরাধ।

রাস্তায় চলার সময় ট্রাফিক আইন মেনে চলুন দেখে শোনে পারাপার হন দৌঁড় দিবেন না।

কাবা শরীফে কিছু জায়গা পর পর পবিত্র কুরআন শরীফ রাখা আছে ও ঠা-া পানীয় এর ব্যবস্থা আছে, প্রয়োজন হলে ব্যবহার করুন। ধুমপান সম্পূর্ণ নিষেধ।

শরীরের কোন স্থান কেটে গেলে অ্যন্টিসেপটিড ঔষধ ব্যবহার করুন।

হাচিঁ অথবা কাশির সময় অবশ্যই মুখ ঢেকে রাখুন।

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে মেডিকেল সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করুন।

আপনার যাতে কোন সমস্যা না হয় এ জন্য ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বদ্ধপরিকর, তারপরও -কোন সুবিধা না দিলে মক্কা ও মদীনার বাংলাদেশ হজ্জ মিশনকে জানাতে পারেন। এতেও সন্তুষ্ট না হলে সৌদি হজ্জ মন্ত্রণালয়ে লিখিত ভাবে অভিযোগ করতে পারেন।

দর্শনীয় স্থান: মক্কা ও মদীনায় বহু ইসলামী নিদর্শন আছে, যেমন-মক্কায় হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহীম, গারে হেরা, জাবালে রহমত, মক্কা লাইব্রেরী, জাদুঘর। মদীনাও অনেক কিছু দেখার আছে। রিয়াজুল জান্নাত ছাড়াও আরো অনেক দেখার জায়গা, এ ব্যাপারে আপনার মুয়াল্লিমের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন।

কিছু করণীয়: যদি মদীনা থেকে মক্কায় আসেন তাহলে ইহরামের কাপড় সাথে রাখবেন, আরাফার ময়দানে বিনামূল্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খাবার বিতরণ করে থাকে। মুযদালিফায় রাত যাপনের জন্য প্লাস্টিকের পাটি পাওয়া যায়, কিনে নিতে পারেন। আরাফা থেকে মুযদালিফায় হেটে আসলে টয়লেট সেরে আসুন, এখানে প্রচুর ভিড় থাকে।

হজ্জ মন্ত্রণালয় মিনার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ইলেক্ট্রিক বিলবোর্ডের মাধ্যমে অনেক দিকনির্দেশনা দেয় সে গুলো খিয়াল করবেন।

তাবুর নাম্বার কার্ড যতেœ রাখুন। নিজেকে সচেতন রাখুন যেন না হারিয়ে যান।

সেখানে বিভিন্ন বাঙ্গালী হোটেল পাবেন। যেমনা- ঢাকা, এশিয়া, যমযম, চট্টগ্রাম হোটেল প্রয়োজনে খাবার ও ফলাফলাদী খেতে পারেন। কেনাকাটার সময় তেমন সমস্যা হবে না। কারণ কর্মচারী সাধারণত বাঙ্গালী থাকে, দরদাম ঠিক করেও নিতে পারেন। মনে রাখবেন হজ্জের সময় অনেক হাটতে হয়, আপনার পকেটে টাকা থাকলেও যানবাহন পাওয়া যায় না। চুল কাটার লোক আছে নিজে কাটতে যেয়ে যেন আঘাত না পেয়ে বসেন। এছাড়াও সার্ভিক সহযোগিতা পাওয়ার জন্য সার্বক্ষণিক মোয়াল্লিমের সাথে যোগাযোগ রাখুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের হজ্জে মাবরুর নসীব করুন। আমিন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম, জামিয়া আশরাফিয়া, সাইনবোর্ড।

 

 

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ হজ্জ সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করুন : মুফতী আব্দুল বারী

  1. জয়নুল আবেদীন says:

    হজ্জে যাবার আগে এই লেখাটি পেয়ে যারপরনাই খুশি হলাম। আসলে আল জান্নাত পত্রিকার কর্তৃপক্ষ মানুষেল জন্য দীনি যে খেদমত করছেন তা অস্বীকার করার জো নেই। এই প্রতিদান আমরা দিতে পারব না, তবে শুধু দোয়া করি এই খেদমত কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাক এবং যারা এর আঞ্জাম দিচ্ছে তাদের শেষে ঠিকানা জান্নাতুল ফেরদাউস হোক। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight