স্বাস্থ্যসমাচার

স্বাস্থ্য হলো শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে মানুষকে তার চারপাশের সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। এই উভয় প্রকার পরিবেশ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। স্বাস্থ্য সচেতনতা হলো কিছু অভ্যাসের আচরণ, যার দ্বারা আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারি। ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’ এটি একটি বহু পরিচিত বাক্য। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য সকল নাগরিকের স্বাস্থ্য সচেতনতা দরকার। স্বাস্থ্য সচেতনতার নানা দিকগুলো নিয়ে এভাবে ভাগ করা যায়। ১। খাদ্যাভ্যাসে স্বাস্থ্য সচেতনতা। ২। দৈনন্দিন কাজ-কর্মে স্বাস্থ্য সচেতনা। ৩। অসুখ নিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা। ৪। আচার আচরণে স্বাস্থ্য সচেতনতা।
খাদ্যাভ্যাসে স্বাস্থ্য সচেতনতা: খাদ্যাভ্যাসে স্বাস্থ্য সচেতনতায় থাকবে ক্ষতিকর খাদ্য ও পানীয় ব্যবহার না করা। মাদক সেবন থেকে দূরে থাকা। ভেজাল খাদ্য নিয়ে সচেতন থাকা। এবং স্বাস্থ্যসম্মত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা।
দৈনিক দুধ পানের উপকারিতা: দুধ নামের এই সাদা রঙের তরল বস্তুটি বাচ্চাদের কাছে খুবই অপছন্দের। শুধু বাচ্চারাই নয় অনেক পূর্ণ বয়স্ক মানুষকেও দুধ দেখলে নাক সিটকাতে দেখা যায়। অথচ দুধ আমাদের দেহের জন্য সবচেয়ে উপাদেয় খাবার। এই কথাটি অনেকে জেনেও মানতে চান না। প্রতিদিন খাবার তালিকায় মাত্র এক গ্লাস দুধ আমাদের দেহের যতটা উপকার করে অন্য কোন খাবার তা করতে পারে না। এই কারণেই দুধকে বলা হয় সর্বগুণ সম্পন্ন খাবার অর্থাৎ ‘সুপারফুড’।
মজবুত হাড় ও দাঁত: দুধ ক্যালসিয়ামের সবচাইতে ভাল উৎস। ক্যালসিয়াম আমাদের দাঁত ও হাড়ের গঠন মজবুত করে। এছাড়াও ক্যালসিয়াম ভিটামিন ডি এর সাহায্যে আমাদের হাড় ও দাঁতে শোষিত হয়ে হাড় ও দাঁতের গড়ন দৃঢ় করে এবং দাঁতের ক্ষয়রোধ করে। বাচ্চাদের ছোটকাল থেকেই দুধ পান করার অভ্যাস করানো উচিৎ। এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই অভ্যাসটি অপরিবর্তিত থাকলে দেহে বার্ধক্যও আসবে দেরিতে।
মাংসপেশির গঠন উন্নত করে: দুধে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন যা মাংসপেশির গঠনে অনেক বেশি সহায়তা করে। দুধ মাংসপেশির আড়ষ্টতা দূর করতে সক্ষম। যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন তারা প্রতিদিন ১ থেকে ২ গ্লাস দুধ পান করা অত্যন্ত জরুরী। বাচ্চাদের মাংসপেশির গঠন উন্নত করতেও দুধ পান করা প্রয়োজন।
ওজন কমাতে সহায়তা করে: প্রতিদিন ১ গ্লাস দুধ পান করলে অন্যান্য খাবারের চাহিদা কমে যায়। এবং নাস্তার সময় দুধ পান করলে অনেকটা সময় দুধ পেটে থাকে। ফলে আজেবাজে খাবারের চাহিদা কমে। এতে করে ওজনও কমে যায়। এছাড়াও দুধ একটি সর্বগুণ সম্পন্ন খাবার। দুধ পানের ফলে দেহে অনেক ধরণের পুষ্টিউপাদান পৌঁছায়। যারা ডায়েট করে ওজন কমাতে চান তাদের জন্যও এটি সুপারফুড।
ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে: দুধে রয়েছে নানা ধরণের ভিটামিন মিলারেস ও নানা পুষ্টিগুণ। প্রতিদিন দুধ পান করলে ত্বকে এর বেশ ভালো প্রভাব পড়ে। ত্বক হয় নরম, কোমল, ও মসৃণ। তাই প্রতিদিন খাবার তালিকায় ১ গ্লাস দুধ রাখা প্রয়োজন।
মানসিক চাপ দূর করে: দুধের অন্য একটি বড় গুণ হচ্ছে এটি মানসিক চাপ দূর করতে বড় সহায়তা করে। দুধ পানে ঘুমের উদ্রেক হয়, যার ফলে মস্তিষ্ক শিথিল হয়ে যায় এবং মানসিক চাপ দূর হয়। সারাদিনের মানসিক চাপ দূর করে শান্তির নিদ্রা চাইলে প্রতিদিন রাতে ১ গ্লাস দুধ পান করা উচিৎ।
দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে: দুধকে বলা হয় সুপারফুড। দুধে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি, ভিটামিন, মিনারেল রয়েছে যা দেহের ইমিউন সিস্টেম উন্নত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এটি কলেস্টোরল নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং রক্ত পরিষ্কারের পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে। তাই প্রতিদিন মাত্র ১ গ্লাস দুধ দেহের সুস্থতায় সকলের পান করা উচিত।
প্রতিদিন ডিম খেলে যে ১২ টি উপকার পাবেন: আজকাল অনেকেই ডিম খান না। কেউ ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে, কেউ আবার রক্তে চর্বির পরিমাণ কম রাখতে, কেউ আবার হৃদ রোগকে ভয় পেয়ে। কিন্তু আসলেই কি ডিম এগুলো বাড়ায়? বরং চিকিৎসকেরা আজকাল বলেন উল্টো কথা। তারা বলেন সকালে নাস্তায় একটি ডিম মাসে প্রায় ৩ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন কমাতে পারে। আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক ডিমের ১২ টি উপকারিতা।
১। ছোট্ট একটা ডিম হাজারো ভিটামিনে ভরা। এর ভিটামিন বি ১২ আপনি যা খাচ্ছেন সেই খাবারকে এনার্জি বা শাক্তিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে।
২। এর মধ্যে আছে ভিটামিন এ। যা দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে। ডিমের কেরোটিনয়েড, ল্যুটেন ও জিয়েক্সেনথিন বয়সকালের চোখের অসুখ ম্যাকুলার ডিজেনারেশন হওয়ার সম্ভাবনা কমায়। এই একই উপাদান চোখের ছানি কমাতেও সাহায্য করে।
৩। কেবলমাত্র ডিমেই রয়েছে ভিটামিন ডি। যা পেশীর ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
৪। আছে ভিটামিন ই। এটি কোষ এবং ত্বকে উৎপন্ন ফ্রি র‌্যাডিক্যাল নষ্ট করে দেয়। এবং স্কিন ক্যানসার প্রতিরোধ করে।
৫। ডিমের সবচেয়ে বড় গুন এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে। ব্রেকফাস্টে রোজ একটি ডিম মানে সারাদিন আপনার ক্ষুধা কম হবে, খাওয়া কম হবে। গবেষণায় দেখা যায় শরীর থেকে দিনে প্রায় ৪০০ ক্যালোরি কমাতে পারে সকালে একটি ডিম খাওয়া। তার মানে মাসে ওজন কমানোর পরিমাণ প্রায় ৩ পাউন্ড। সমীক্ষায় বলছে ৬৫% বডি ওয়েট , ১৬% বডি ফ্যাট, ৩৪% কোমরে জমে থাকা মেদের পরিমাণ কমাতে পারে ডিম।
৬। ডিমে আছে আয়রণ, জিঙ্ক, ফসফরাস। মেনস্ট্রুয়েশনের জন্য অনেক সময় অ্যানিমিয়া দেখা দেয়। শরীর তাড়াতাড়ি কান্ত হয়ে পড়ে। ডিমের মধ্যে থাকা আয়রণ এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে সহজেই। জিঙ্ক শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। আর ফসফরাস হাড় ও দাঁত মজবুত করে।
৭। প্রত্যেক নারীর শরীরে রোজ কমপক্ষে ৫০ গ্রাম প্রোটিনের দরকার। একটি ডিমে থাকে ৭০-৮৫ ক্যালোরি বা ৬.৫ গ্রাম প্রোটিন। সুতরাং চাঙা থাকতে রোজ ডিম খেতেই পারেন।
৮। ২০০৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছে অ্যাডোলেশন পিরিয়ডে বা পরবর্তী কালে সপ্তাহে ৬ টি করে ডিম খেলে প্রায় ৪৪% ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। সঙ্গে এটিও জানিয়েছে ডিম হৃদপি-ে রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। ফলে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকটাই কম থাকে।
৯। শরীর সুস্থ রাখার আরও একটি জরুরী উপাদান কোলাইন। কোলাইনের ঘাটতি ঘটলে অনেক সময় কার্ডিওভাসকুলার, লিভারের অসু বা নিউরোলজিক্যাল ডিম-অর্ডার দেখা দিতে পারে। একটি ডিমে প্রায় ৩০০ মাইক্রোগ্রাম কোলাইন থাকে। যা  কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম, ¯œায়ূ, যকৃৎ ও মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
১০। নতুন সমীক্ষায় জানা গিয়েছে ডিম কোলেস্টেরল বাড়ায় না। দিনে দুটো ডিম শরীরে লিপিড প্রোফাইলে কোনও প্রভাব ফেলে না। বরং ডিম রক্তে লোহিতকণা তৈরি করে।
১১। প্রোটিন শরীর গঠন করে। আর প্রোটিন তৈরি করতে সাহায্য করে অ্যামিনো অ্যাসিড। ২১ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড এই কাজে প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আমাদের শরীর অতি প্রয়োজনীয় ৯ টি অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করতে পারে না। তার জন্য আমাদের প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট নিতে হয়। খাবারের মধ্যে এই প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট হলো ডিম। যা ঝটপট শরীরে প্রোটিন উৎপাদন করতে পারে।
১২। নখ ভেঙে যাচ্ছে চটপট? নাকি চোলের স্বাস্থ্য একেবারেই বেহাল? চোখ বন্ধ করে রোজ ডিম খেয়ে যান। ডিমের মধ্যে থাকা সালফার ম্যাজিকের মত নখ আর চোলের মান উন্নত করবে।
মাছ খাওয়ার উপকারিতা: মাখে-ভাতে বাঙালী। পাতে মাছ না থাকলে বাঙালীর রসনাবিলাশ যেন পূর্ণ হয় না। মাখ খেলে বুদ্ধি বাড়ে। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জানালো মাছ খেলে কীভাবে বুদ্ধি বাড়ে। আর সেটা শুরু হয় শৈশব থেকেই।
আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা রিপোর্টে  বলা হয়েছে শিশুদের নিয়মিত মাছ  খাওয়ালে স্বাভাবিকের তুলনায় বুদ্ধি বাড়ে। রোজ নয় শিশুদের সপ্তাহে মাত্র ১ দিন মাছ খাওয়ালে যারা মাছ খায় না তাদের তুলনায় আইকিউ চার পয়েন্ট বেশি হয়।
সংগ্রহে: সৈয়দা সুফিয়া খাতুন


Hit Counter provided by Skylight