স্বাস্থ্যসমাচার: শীতের মজা টাটকা সবজিতে

25550438_348474918950537_8690578151091005352_n

পছন্দের অনেক সবজিই পাবেন এ মৌসুমে। শীতের সবজি আর পিঠা এ দুটোই শীতের মজার খাবার। পুরো শীতকালে সবজির বাজার নানা রকম সবজিতে থাকে ঠাসা। ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, গাজর, শালগম, টমেটো, শিম, চিনা বাঁধাকপি, লাল বাঁধাকপি, কত না সবজি! এর সঙ্গে রয়েছে শীতের মজাদার পালংশাক।
ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি:
শীতকালীন তরকারির মধ্যে কপির সমাদর খুবই বেশি। প্রাচীনকালে গ্রিক ও রোমানরা কপি খেতেন। কপি সেইজন্যে অতি প্রাচীন তরকারী। ইংরেজরা ভারতে প্রথম কপি নিয়ে এসেছিলেন। বলা হয়ে থাকে উইলিয়াম কেরি ১৮২০ সালে প্রথম ফুলকপি, বাঁধাকপি প্রভৃতি এনে বাংলায় এই সবজির চাষ করিয়েছিলেন।
ভারতে প্রচলিত কপি সাধারণত তিন রকমের, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ওলকপি (ওলকপিকে গাঁট কপিও বলা হয়)।
সুস্থ থাকতে কপি:
১। কপি স্তনের দুধ বাড়িয়ে দেয়, মধুর, বীর্যবর্ধক, শীতল, গরিষ্ঠ। সহজে হজম হয়, বাত সৃষ্টি করে এবং পিত্ত ও কফ নাশ করে।
২। ফুল কপি ও বাঁধাকপি রসে মধুর, বিপাকে তিক্ত, শরীর শীতল করে, লঘু, দীপন (উদ্দীপ্ত করে) পাচন (সহজে হজম হয়) কামোত্তেজক, হার্টের পক্ষে ভাল, মলমূত্র প্রবর্তক এবং বাতকারক।
৩। কপি কফ, পিত্ত, জ্বর, প্রমেহ  (যৌনব্যাধি) মূত্রকৃচ্ছ (প্র¯্রাব কম হওয়া) কুষ্ঠ, কাশি, শ্বাসকষ্ট, রক্তের দোষ (রক্তবিকার) লিভার বেড়ে যাওয়ার রোগ, পিত্তের প্রকোপ শরীরের ভেতরের ফোঁড়া বা দুষ্ট ব্রণ নাশ করে।
৪। গর্ভাশয়ের বল বৃদ্ধি করে।
৫। গাঁকপি বা ওলকপি ইংরেজিতে যাকে নলকল বলা হয় রসে মধুর, উষ্ণবীর্য, সারক (মলমূত্র বায়ূ নিষ্কাষণ করে), রুচিকর গুরু (হজম দেরিতে হয়) কফ নাশক, বাতকারক, এবং পিত্ত প্রকোপক।
৬। ওলকপি প্রমেহ, শ্বাসের অসুখ, কফ ও কাশিতে উপকার দেয়।
৭। কপির বীজ সারক (বায়ু মল মূত্র নিষ্কাশনে সাহায্য করে), কর্মে উদ্দীপ্ত করে (দীপন), পাচন (সহজে হজম হয়) এবং কৃমিনাশক।
৮। যাঁরা রক্তপিত্ত (স্কার্ভি) রোগে ভুগছেন তাঁদের কপি খাওয়া ভালো।
৯। কুষ্ঠ রোগের ফোঁড়ার ওপর বাঁধাকপির পাতা বেঁধে রাখা হয়।
খাওয়া-দাওয়ায় কপি:
বাঁধাকপির কচি পাতা কুচিয়ে ও ফুলকপির টাটকা ফুল ছোট ছোট করে ভেঙ্গে সালাদ তৈরি করা হয়।
তিন রকমের কপিই বাঙালি রসনায় প্রিয়। ফুলকপির ডালনা, ছেঁচকি, দম, স্টু, ভাজা ও বেসন-ভাজার তুলনা নেই। ফুলকপির ডালনায় টোম্যাটো ও মটরশুটি যোগ করলে স্বাদ আরও বাড়ে।
বাঁধাকপির ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। ঘি গরম মশলা দিয়ে ওলকপির দম ও স্বাদে কিছুটা খাটো নয়।
বাঁধাকপিতে পাতার পরে পাতা মোড়া থাকে বলে একে শতপর্বাও বলা হয়।
বৈজ্ঞানিক মতে: কপিতে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেটস, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস ও লোহা আছে। ভিটামিন এ বি আর সি আছে। আছে অল্প মাত্রায় তামা, আয়োডিন, পোট্যাশিয়াম।
শাকের রাজা পালং:
আমাদের দেশে প্রাচীন কাল থেকে পালং শাক খাওয়া হয়ে আসছে। পালং শাকের অনেক গুণ। পালং শাক অনেক অসুখ সারায়। শরীরের ভেতরকার অর্থাৎ, কিডনি বা গলব্লাডারের পাথর গলিয়ে বের করে দেয় এটাই পালং শাকের সবচেয়ে বড় গুণ। ফুসফুসের অসুখেও পালং শাক উপকারী। প্রায় সব শাকেই ক্ষার পদার্থ (অ্যালক্যালি) বেশি আছে বলে অর্থাৎ ক্ষারক বলে শরীরের বেশি উপকার করে আন্ত্রিক রোগে বা অসুখে, পেটের অসুখে, একটানা পেটের অসুখে ইত্যাদিতে পালং শাক খেলে উপকার পাওয়া যায়। টোম্যাটোকে বাদ দিলে অন্য সব তরকারির মধ্যে পালং শাকই সবচেয়ে বেশি শক্তিবর্ধক। পালং শাকে লোহা ও তামা আছে।
এই শাক জনডিস রোগীর পথ্য। এই শাকে শরীরে রক্ত বাড়াবার গুণ বেশি আছে। পালং শাক শুধু রক্ত বৃদ্ধিই করে না বরং রক্ত শুদ্ধিও করায় অর্থাৎ, রক্তের দোষ নাশ করে, হাড় মজবুত করে। সত্যি কথা বলতে কি পালং শাকের টাটকা সবুজ পাতা হল জীবনশক্তির মূল। যদি আর্থিক অসুবিধের জন্যে বাচ্চাকে বেশি দুধ না খাওয়ানো যায় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে অল্প পরিমাণে যতটা সহ্য করতে পারে টাটকা পালং শাকের রসও খাওয়ানো যেতে পারে সেই সঙ্গে অবশ্য দুধও খাওয়াতে হবে।
গুণগত দিক থেকে দেখতে গেলে পালং শাক ভাজা, পালং শাকের চচ্চড়ি সব তরকারির মধ্যে শ্রেষ্ঠ। পালং শাক রান্নার ব্যাপারে কয়েকটি কথা পরে বলা যাবে। এই শাক প্রশ্বাসের কষ্ট দূর করে পিত্তের পক্ষে উপকারী, কফের কষ্ট দূর করে, জমে থাকা মল মুক্ত করে। এই শাক শীতল। বিখ্যাত বৈদ্য সুশ্রুতের মতে পালং শাক রুক্ষ এবং পিত্ত ও কফের পক্ষে হিতকর।
পালং শাক রুচি বৃদ্ধি করে, প্র¯্রাবের মাত্রা বৃদ্ধি করে। শোথ (শরীর ফোলা) রোগের পক্ষে উপকারী, সব রকম ব্যাধি নিবারণ করে শরীরে সামঞ্জস্য বিধান করে ও মন শান্ত রাখে। তাড়াতাড়ি হজম হয়।
পালং শাক খাওয়ার নিয়ম:
১। পালং শাক ভাজায় জল দেবেন না, পালং শাকের জলেই যেন তা সেদ্ধ হয়ে যায়। প্রয়োজন হলে বা সেদ্ধ না হলে খুব অল্প পরিমাণে জল দেবেন। রান্নার পর যেন বাড়তি জল ফেলে না দেওয়া হয়। জল ফেলে দিলে সেইজলেই শাকের পোষকতত্ত্ব বা উপকারিতা বেরিয়ে যাবে।
২। পাঁচমিশালি তরকারির সঙ্গে মিশিয়ে পালং শাক, শিম পালঙের চচ্চড়ি, (পালং শাকের ডাটা ও নরম বীজ সহ) খেলে পালং শাকের উপকারিতা তো পাবেনই সেইসঙ্গে অন্য তরকারির গুণ এবং ভিটামিনও যুক্ত হবে।
৩। ডালের প্রোটিন অ্যামিনো অ্যাসিড নেই কিন্তু পালং শাকে আছে। কাজেই ডালও পালং শাক মিশিয়ে রান্না করলে তা শরীরের পক্ষে বেশি উপকারী।
টক পালং (চুকো পালং) শাককে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় চুক্রিকা বা চুক্রক। এই পালং শাক দেখতে সাধারণ পালং শাকের মতই কিন্তু টক আস্বাদযুক্ত অর্থাৎ, খেতে টক। এই শাক বাত কফ ও পিত্ত (ত্রিদোষ) নাশ করে। সহজে হজম হয়, খাওয়া রুচি বাড়ায়। বায়ুজনিত অস্বস্তি (গুল্ম বা বায়ুগুলক) দূর করে, বিষ নাশ করে, মল রোধ করে।
চিনির রস মিশিয়ে খেলে পিত্তের আধিক্য সারাবার পক্ষে বেশি উপকারী। দাঁতের ব্যথা সারে বমি বন্ধ হয়, খিদেও বাড়ে। চুকো পালং এর রসের প্রলেপ লাগালে বিছের কামড়ের বিষ দূর হয়। ব্যথা সেরে যায়। রস গরম করে কানে সেই রসের ফোঁট দিলে কানের ব্যথা সারে। টক পালঙের বীজ ঘিয়ে ভেজে খেলে আমাশার উপশম হয়।
নানান শাকে নানান পুষ্টি:
কথায় বলে ‘শাকে বৃদ্ধি মল’ অর্থাৎ শাক খেলে মল বাড়ে, পেট পরিষ্কার হয়। শাক দামে সস্তা এবং সহজে পাওয়া যায় বলে হেলায়ফেলার বস্তু নয়। শাকের অনেক গুণ, ভিন্ন ভিন্ন শাকের ভিন্ন ভিন্ন রকম। বৈদ্য শাস্ত্রে এক এক রকম শাকের এক এক রকম গুণ বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি শাক সুষণি থানকুনিকে রসায়ন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রসায়ন অর্থে শরীরে সপ্তধাতু, রস, রক্ত, মাংস, মেদ, মজ্জা, অস্থি ও বীর্যের পোষক।
শাকে লবণ জাতীয় উপাদান ও ক্ষারক পদার্থ (অ্যালকলি) বেশি পরিমাণে আছে। এগুলি হল ক্যালসিয়াম, সোডা ও কোরিন প্রভৃতি। এ ছাড়াও শাকে আছে প্রচুর ভিটামিন। কাজেই আমাদের রোজকার খাওয়ার সামান্য শাকান্ন বা শাক-ভাতের গুণ অশেষ।
পালং ও নটে শাকের কথা আলাদাভাবে বলা হয়েছে। আয়ুর্বেদ মতে বাকি সব শাকবর্গের গুণাবলীর বা অপকারিতার বিবরণ দেওয়া হবে এই অধ্যায়ে।
আমরুল: স্বাদে টক, খেতে রুচিকর খিদে বাড়ায়, পিত্ত বাড়িয়ে দেয়, কফ, বায়ু, একটানা পেটের অসুখ, কুষ্ঠ, অর্শ, পুরোনো পেটের অসুখে উপকারী। আমরুল শাক-ভাতে, আলু দিয়ে আমরুল শাকের ছেঁচকি সবই খেতে ভাল লাগে।
কলমি: শুক্র ও স্তন্যবর্ধক, মুখে রুচি উৎপন্ন হয়। কফ সৃষ্টি করে, রক্ত পরিষ্কার করে, যৌন ব্যাধিতে উপকার দেয়। কলমি শাকের ডাঁটা ও পাতার রস (প্রায় ১ টেবিল চামচ) পরিমাণে খাওয়ালে শরীর থেকে বিষের দোষ দূর হয়। কলমি শাক ফোঁড়া পাকাতেও সাহায্য করে। বসন্তের বা জল বসন্তের গুটি বেরোবার সময় খেলে উপকার পাওয়া যায়। মাথার রোগে (মস্তিষ্ক বিকৃতিতে) ও হিস্টিরিয়ায় উপকার দেয়। ফোড়া বা ক্ষত স্থান থেকে যখন পুঁজ পড়তে আরম্ভ করে তখন কলমি শাক খাওয়া উচিত নয়। শরীর ঠা-া রাখতে ও পেট গরম দূর করে পেট ঠা-া রাখতে এর জুড়ি নেই।
এই শাক ভেজে, ভাতে অর্থাৎ সেদ্ধ করে সর্ষের তেলে মেখে ও আলু বেগুন কুমড়ো বড়ি দিয়ে তরকারি রান্না করে খাওয়া হয়। রাঁধুনি বাটা ও তার সঙ্গে বেগুন কাঁচকলা বড়ি দিয়ে কলমি শাকের ও ডাঁটার ঝোল ও শুক্তোও শরীরের পক্ষে উপকারী। অনেকে কাঁচা লঙ্কা কালজিরে ফোড়ন দেন। তেল লাগে সামান্য। গ্রামাঞ্চলের পিটুলি গোলা (চাল বাটা) দিয়ে ঝোল ঘন করা হয়। অনেকে পাতলা ঝোলই পছন্দ করেন। হিন্দিতে এই শাককে বলা হয় কুলফা।
মায়ের বুকের দুধ কম হলে সকালে বিকালে দুবার করে চার চামচ কলমি শাকের রস ঘিয়ে সাঁতলিয়ে নিয়ে খেলে উপকার পাবেন। এতে স্তনের দুধ বেড়ে যাবে।
যে বাচ্চা কোষ্ঠবদ্ধতায় ভুগছে এবং সেই কারণে রাত্তির ভাল করে ঘুমোয় না কাঁদে বা ঘ্যান ঘ্যান করে সেই বাচ্চাকে রাত্তিরে অল্প গরম দুধের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা কলমি শাকের রস মিশিয়ে খাওয়ালে উপকার পাওয়া যাবে। কোষ্ঠ পরিষ্কার হয়ে যাবে, সে কারণে স্বস্তি পেয়ে বাচ্চা ঘুমোবেও ভাল।
গিমে শাক: আয়ুর্বেদ মতে জনডিস রোগে উপকারী, জ্বর, লিভারে অসুখ, পিত্ত ও কফ রোগ উপশম করে। এই শাক স্বাদে একটু তেতো তেতো। খেলে মুখের অরুচি সারে। বেগুন আলু দিয়ে চচ্চড়ি, বেসন বা ডাল বাটা দিয়ে এই শাকের বড়া খেতে ভাল লাগে।
ছোলার শাক: আয়ুর্বেদ মতে অরুচিকর, সহজে হজম হয় না, কফ ও বায়ু বৃদ্ধি করে, মর রোধ করে, পিত্ত ও দাঁতের রোগে অপকারী।
পাট শাক: আয়ুর্বেদ মতে কৃমি, কুষ্ঠ ও রক্তপিত্ত (নাক, মুখ থেকে রক্ত পড়া) নাশ করে। শুকনো পাতা (যাতে নালিতা বা চলতি বাংলা নালতে বলা হয়) বায়ু বৃদ্ধি করে কিন্তু জর চর্মরোগ, কফ ও পিত্তের রোগ সারায়।
পুঁই শাক: আয়ুর্বেদ মতে শরীর ঠা-া করে, ¯িœগ্ধ করে, গুরুপাক, মল বহিষ্কার করে, মেদ বৃদ্ধি করে, (খেয়ে হজম করলে মোটা হওয়া যায়) শরীরে আলস্য সৃষ্টি করে। এই শাক নালচে ভাব অর্থাৎ পিচ্ছিল। বল, পুষ্টি, শুক্র বৃদ্ধি করে। খেলে ঘুম বেশি পায়।
মুলোর শাক: মুলোর কচি পাতা বা কচি মুলোর শাক লঘুপাক অর্থাৎ সহজে হজম হয়। তেলে বা ঘিয়ে ভেজে মুলোর শাক খেলে শরীরের ত্রিদোষ অর্থাৎ বাত, পিত্ত ও কফের দোষ নাশ হয়। কিন্তু ভালো করে সেদ্ধ না করে খেলে কফ ও পিত্ত বাড়িয়ে দেয়।
লাল শাক: এতে ক্ষারের (লবণ) গুণ আছে, খুব তাড়াতাড়ি হজম না হলেও খুব ঘুরপাকও নয় অর্থাৎ, অল্প ঘুরপাক, মল ও প্র¯্রাব নিঃসরণ করে, কফ বৃদ্ধি করে।
সর্ষের শাক: আয়ুর্বেদ মতে গুরুপাক, মল ও মূত্র বৃদ্ধি করে, শরীরের পক্ষে গরম, শরীরে প্রদাহ জন্মায়। অন্য শাকের চেয়ে এই শাকের গুণ কম। পাঞ্জাবীদের ‘সরষে কা সাগ’ বা সর্ষের শাক এবং সেই সঙ্গে মকাই কি রোটি (ভুট্টার আটার রুটি) খুবই প্রিয়।
সংগ্রহে: সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight