স্বপ্নজয়িতা: ফাতেমা আক্তার সিক্তু

শৈশব তখনো পার হয়নি মেয়েটির। দলের ছেলেমেয়রা সবাই হৈ-হুল্লোড়ে ব্যস্ত। কিন্তু, মেয়েটি আনমনা, আপন ভাবনার জগতে ঘুরে বেড়ায় সে। সবাই খেলা-ধূলা করে সে চেয়ে দেখে। হট্টগুল তার ভালো লাগে না।
তার বন্ধুত্ব বইয়ের সাথে। পথের পাঁচালীর অপু-দুর্গার সাথে ঘুরে বেয়াড় বন বাদাড়ে, অবাক চেয়ে রেলগাড়ি দেখে। খুঁজে ফেরে বৈচির ফল।
কখনো বাপজী ও ফুফুমার আদরের “জোহরা” হয়ে ওঠে। একের পর এক জীবনের উত্থান-পতন ও কুটিলতায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। আবার ভরে ওঠে গ্ধতায়, লাস্যময়তায়।
শরৎচন্দ্রের হাতে সে হয়ে যায় রোগাক্রান্ত, কুৎসিত, “পোড়া কাঠ”।
বয়সের সীমা পার করে অপার  নিয়ে সেই হয়ে ওঠে মেজদি। এই ছোট্ট মেয়েটি নিজের এক স্বপ্নের পৃথিবী গড়ে নেয় নিজের ভেতর। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভবগুলো তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। ভরা বর্ষায় বাড়ির পাশের ক্ষেত পালান যখন পানিতে থইথই মেয়েটি সেখানে সাঁতার কাটে। আর সাঁতারের এই অবাধ গতিই তার কাছে স্বাধীনতা। পারিবারিক এক অদৃশ্য প্রাচীর সবসময়ই তার চারপাশ ঘিরে থাকে। কখনো কখনো বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায়, পারে না। কারণ, ঐ প্রাচীরের ভেতরে সে নিজের নিরাপত্তা খুঁজে পায়। হঠাৎ তার আগ্রহ জন্মমে কবিতায়। হঠাৎ না অবশ্য। ছোটবেলা থেকেই ছড়া আবৃত্তি শোনাতেন চাচা-ফুফুরা, হয়তো তখন থেকেই অজান্তে হৃদয়ে গেঁথে গেছে ছন্দময়তা।
কৈশোর শুরু। অনেক কিছুই স্বপ্নের মতো লাগে চোখে, মনে। শব্দগুলো ছন্দে রূপ নেয়, প্রকাশগুলো কাব্যিকতায় ছেয়ে যায়। কিন্তু, তার স্বাক্ষী হয় শুধুমাত্র কাগজ-কলম আর অন্তর্যামী। কারণ, শব্দগুলো অধিকাংশ বের হয় প্রার্থনার মতো। ¯্রষ্টার সান্নিধ্য এই বয়সেই যেন তার একান্ত চাওয়া। পরিবারে ধর্মীয় আবহ তাকে যেন করেছে ¯্রষ্টার অধিক নিকটবর্তী। বিভিন্ন ধর্মীয় বই আর সাহাবীদের আত্মত্যাগ ও ¯্রষ্টার প্রতি, ধর্মের প্রতি ভালোবাসায় মেয়েটি আপ্লুত হয়, অনুপ্রাণিত হয়।
এগারো বারো বছর বয়সে সে হামদ লিখে, নাত লিখে। নিজের আকাঙ্খাগুলো প্রভুর দরবারে জানায় মিনতিসহকারে। হয়তো, প্রভুও সাড়া দেন নিভৃতে। মেয়েটির স্বপ্নগুলো সুন্দর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। আরো বেড়ে যায় প্রভুর প্রতি ক্ষুদ্র মেয়েটির ভালোবাসা। ভালোবাসা বাড়ে রাসূলের প্রতি, নিজ ধর্ম ইসলামের প্রতি। আর মেয়েটি লিখে “আল্লাহ তোমার ভালোবাসায় ধন্য আমি”।
অতি রক্ষণশীল একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েটি সাহস করে একদিন বড় চাচার সামনে মেলে ধরে নিজের লেখা একটি ছড়া। ছড়াটি পড়ে অবাক হয়ে যান চাচা। চাচীকে ডেকে বলেন, ‘দেখো, তোমার মেয়ে কবি হয়ে গেছে! চাচার সেই হাস্যোজ্জল মুখ অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে মেয়েটির।
বাবা-মা সমর্থন করেন না। ‘মেয়েদের কিসের লেখালেখি’? থামে না মেয়ে। সে তার স্বপ্নের আকাশ ছুঁতে চায়। কিন্তু তার সাধ্য সীমিত। পাঠ্য বইয়ের বাইরে বই কিনে পড়তে পারে না, ধার করে পড়ে। কোথাও বেড়াতে গেলে নাওয়া-খাওয়া ফেলে বাড়ির বই পড়ে শেষ করে আগে।
একদিন ইসলামী সাহিত্য পত্রিকা “ আদর্শ নারী” তে সদস্য হয়। তারপর ছাপা হয় বেশ কয়েকটি লেখা। আত্মবিশ্বাস আসে নিজের মধ্যে। স্কুল সেকে-ারী দেবার সময় লিখে ফেলে উপন্যাস “অশ্রুজলে”।
অনেক কষ্টে প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ করে। প্রকাশক আশ্বাস দেন প্রকাশ করবেন তার পা-ুলিপি। কিন্তু, ততদিনে মেয়েটির জীবন বদলে গেছে। মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে অন্যের বাড়ির বউ সাজতে হয়েছে। যোগাযোগের অভাবে আলোর মুখ দেখেনি “অশ্রুজলে”।
কিন্তু থেমে থাকেনি কবিতারা। দিনলিপির পাতা জুড়ে থাকে কবিতারা। এরপর বহুদিন ফেসবুকের মাধ্যমে ফিরে আসে মেয়ে। তার লেখা পড়ে উৎসাহ দেন পাঠকেরা। বিভিন্ন সাহিত্য ম্যাগাজিনে ছাপা হয় তার লেখা। মিলে যায় কয়েকটি সাহিত্য সম্মাননা। আর অসংখ্য পাঠকের শুভেচ্ছা, ভালোবাসা। বাবা-মা ও এখন তাকে আদর করে ডাকে “কবি”।
লেখিকা: কবি, সাহিত্যিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight