সোনালি ফায়সালা / সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

ইনসাফ প্রিয় বাদশাহ
বাদশাহ মালিক শাহ সালজুকী রাজধানী নিশাপুরে অবস্থান করছিলেন। তিনি রাজত্বের সর্বস্থান পরিদর্শন করার পরকল্পনা গ্রহণ করলেন। পবিত্র রমজান মাস ছিল এবং তার শেষ দশ দিন ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন রমজান শেষ হওয়া মাত্রই বের হবেন। রমজান মাসের ২৯ তারিখ। তিনি তার মন্ত্রীবর্গ ও সাথীদেরকে নিয়ে চাঁদ দেখতে লাগলেন। কিছু আমলা হৈ চৈ শুরু করল যে, চাঁদ ওঠেছে। যদিও বাদশাহ ও দায়িত্বশীল লোকজন চাঁদ দেখেননি; কিন্তু বাদশার ইচ্ছা জেনে সবাই আগামীকাল ঈদের ঘোষণা দিল।
ইমামুল হারামাইন আবুল মায়ালী যিনি মুফতী ও প্রধান বিচারপতি ছিলেন। তিনি তা জানতে পেরে এক ঘোষককে ডাকলেন এবং বললেন, একথা বলে ঘোষণা করে দাও আবুল মায়ালী বলছেন, কাল পর্যন্ত রমজান মাস। যে আমার ফতোয়ার প্রতি আমল করতে চায় তাকে অবশ্যই কাল রোজা রাখতে হবে।
প্রধান বিচারপতির এ ঘোষণাকে রোযা ভঙ্গকারীগণ অত্যন্ত খারাপ বাক্যের সাথে বাদশাহ পর্যন্ত পৌঁছালো যে, আবুল মায়ালীর ধারণা রাষ্ট্রের প্রতি ভাল নয়। আর সাধারণ মানুষ তার কথায় বিশ্বাসী।
যদি বাদশাহর নির্দেশানুযায়ী কাল ঈদ না হয়, তবে বাদশাহর জন্যে তা অপমানজনক হবে। সুলতান বদমেজাজের লোক ছিলেন না, এজন্যে ইমামুল হারামাইনের ঘোষণায় দুঃখিত হওয়া সত্বেও নির্দেশ দিলেন যে, তাকে সম্মানের সাথে আমার কাছে হাযির করা হোক। দুষ্ট প্রকৃতির লোক বাদশাহকে উত্তেজিত করার জন্যে বলল, যে ব্যক্তি বাদশাহর নির্দেশের কোন তোয়াক্কা করে না সে সম্মানের অযোগ্য।
বাদশাহ বললেন, যতক্ষণ না আমি সরাসরি তার সাথে কথা বলি এবং প্রকৃত বিষয় জেনে না নেই ততক্ষণ পর্যন্ত এমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির কোনরূপ অসম্মান করা যাবে না।
বিচারকের কাছে যখন শাহী বার্তা পৌঁছল তখন তিনি এই মনে করলেন যে, দরবারী পোশাক পড়তে গেলে দেরী হয়ে যাবে তাই তিনি যেই পোশাকে ছিলেন এবং যে অবস্থায় ছিলেন সে অবস্থায় রওয়ানা দিলেন। রাজভবনের দরজায় দারোয়ান বাধা দিলেন যে, দরবারী পোশাক ছাড়া ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। অন্যদিকে হিংসুক ব্যক্তিরা বাদশাহকে বলল, ইমামুল হারামাইন আগেই এক নির্দেশ অমান্য করেছেন, আর এখন আরেকটি বেআদবী করেছেন, সাধারণ পোশাক পরেই চলে এসেছেন। বাদশাহর মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল কিন্তু ভেতরে প্রবেশের নির্দেশ দিলেন। প্রধান বিচারপতি যেই রাজদরবারে আসলেন বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই অবস্থায় আপনি কেন আসলেন? দরবারী পোশাক কেন পরেননি?
বিচারক বললেন, হে বাদশাহ! এখন আমি যে পোশাকে আছি তা দিয়েই আমি নামায পড়ি আর তা শরীয়তে জায়েয। সুতরাং যখন আমি আল্লাহর দরবারে এভাবে হাযির হতে পারি তখন আপনার দরবারে এভাবে আসা কি অন্যায়? তবে হ্যাঁ, নিয়মানুযায়ী আমার পোশাক দরবারী নয় তবে তা শিষ্টাচার বর্হিভূত নয় এজন্যে যে, আমি ভেবেছি যে আমার আসাতে দেরী হলে ফেরেশতারা আমার নাম নাফরমানের তালিকায় লিখে নেয় আর আমার দ্বারা মুসলিম বাদশাহর নির্দেশ লঙ্ঘন না হয়ে যায়। এজন্যে আমি যে অবস্থায় ছিলাম সে অবস্থায় চলে এসেছি।
বাদশাহ বললেন, যখন ইসলামে বাদশাহর আনুগত্য অবশ্য কর্তব্য তাহলে আবার আমার নির্দেশের বিপরীত ঘোষণা দেয়া হলো কেন?
বিচারপতি বললেন, যেসব বিষয়ের নির্দেশ বাদশাহর উপর মওকুফ সে সবের ব্যাপারে বাদশাহর আনুগত্য অবশ্য করনীয়। আর যে সব নির্দেশ ফতোয়ার উপর ভিত্তি করে হয় সেসব বিষয়ে বাদশাহ হোক অথবা অন্য কেউ হোক আমার কাছে জিজ্ঞেস করা উচিত। কেননা শরীয়তের বিধানাবলীর ফতোয়া শাহী নির্দেশের বরাবর।
যখন বাদশাহ ইমাম সাহেবের এই বক্তব্য শুনলেন তখন তার রাগ থেমে গেল এবং তিনি ইমাম সাহেবের সততা ও সাহসিকতায় খুব খুশি হলেন এবং তিনি ঘোষণা দিয়ে দিলেন যে, আমার আগের ঘোষণা ভুল ছিল। আর ইমামুল হারামাইন প্রধান বিচারপতির ফায়সালা সঠিক।
আজকে এই যুগেও যদি উলামায়ে কেরাম সত্যবাদীতাকে নিজেদের আদর্শ বানিয়ে নেয় তবে সরকার তাদের সম্মান দিতে বাধ্য হবে।
আর এভাবে আমল হলে আকাশের নীচে ন্যায় ও ইনসাফের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।

বাদশাহর সামনে এক বিধবার ফরিয়াদ
বাদশাহ মালিক শাহ সালজুকী একবার ইস্পাহানের জঙ্গলে শিকারে গেলেন। কোন এক গ্রামে অবস্থান নিলেন। সেখানে এক গরীব বিধবার একটি গাভী ছিল, যার দুধে তার তিন শিশু লালিত-পালিত হত। বাদশাহের সৈন্যরা সেই গরু জবাই করে কাবাব বানিয়ে খেল। গরীব বিধাব এই খবর শোনামাত্র নির্বাক হয়ে গেল। সৈন্যদের এই কাজে বাধা দেয়ার কেউ ছিল না। সারাটি রাত পেরেশানীতে কাটাল। সকাল হলে হঠাৎ সে মনে করল, কেউ যখন শুনেনি তবে কি বাদশাহ শুনবে না?
যাকে আল্লাহ তাআলা গরীবদের প্রতি জালেমদের জুলুম থেকে রক্ষা করার জন্যে এত বড় রাজত্ব দিয়েছেন। বাদশাহ পর্যন্ত পৌঁছার চেষ্টা করল; কিন্তু সফল হল না। বিধবা জানতে পারল, বাদশাহ অমুক স্থান দিয়ে শিকারে বের হবেন। সুতরাং ইস্পাহানের প্রসিদ্ধ নদীর পুলের উপর এসে দাঁড়িয়ে গেল। যখন বাদশাহ পুলের উপর পৌঁছিল, তখন বিধবা সাহস ও দাপটের সাথে বলল,
হে আলপ আরসালানের পুত্র! আমার প্রতি ইনসাফ কি এই পুলের উপর করবেন না কি পুলসিরাতে? যা আপনার পছন্দ তা বেছে নিন!
বাদশাহর সাথীরা এই অবস্থা দেখে অবাক হল। বাদশাহ ঘোড়া থেকে নামলেন এবং এমন মনে হল যে, এমন আশ্চর্যজনক প্রশ্নে বাদশাহর উপর ভয়ানক প্রভাব পড়েছে।
বাদশাহ বললেন, পুলসিরাতে সামর্থ নেই, আমি এখানেই ফায়সালা করতে চাই। তুমি কি বলতে চাও বল।
মহিলা সব ঘটনা খুলে বলল। বাদশাহ সৈন্যদের এমন অত্যাচারে খুব আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করলেন, আর তাকে এক গাভীর পরিবর্তে ৭০টি গাভী দিলেন। অতঃপর যখন বৃদ্ধা বললেন, তোমার ইনসাফে আমি খুশি এবং আমার আল্লাহ খুশি। তখন তিনি ঘোড়ায় আরোহন করলেন।
আহ! কি যামানা ছিল! অভিযোগকারী কতই না সাহসী ছিলেন। আর শ্রবণকারীও কত বড় ন্যায়ের প্রতীক ছিলেন। যদি বর্তমান সভ্যতায় কোন ব্যক্তি এভাবে বাদশাহর যাত্রা থামিয়ে দিয়ে তাকে এমন স্বাধীন প্রশ্ন করে তবে হয়ত তাকে পাগলা গারদে পাঠানো হবে।

বাদশাহ কোন সাক্ষী পেলেন না
একবার বিচারক আবূ হাযিমকে খলীফা মুতাযিদ বিল্লাহ (২৭৯হিঃ-২৮৯হিঃ) বার্তা পাঠালেন যে, অমুক ব্যক্তির কাছ থেকে যার উপর কতক লোক নিজেদের মালের দাবী করে পাওনা আদায় করে নিয়েছে, আমাকেও বাদী মনে করেন এবং আমার অংশও সেই ব্যক্তি থেকে ফিরিয়ে দেন।
বিচারক উত্তরে বললেন, বিচারের দায়িত্ব আমার উপর অর্পন করে আপনি কি বলছেন, বিনা সাক্ষীতে, আমি আপনার দাবী মেনে নিব, এটা কি করে হতে পারে? আপনি সাক্ষী পেশ করুন।
খলীফা বলে পাঠালেন, অমুক অমুক সম্মানিত ব্যক্তি আমার সাক্ষী।
বিচারক উত্তর দিলেন, তারা আপনার কাছে সম্মানিত ব্যক্তি হতে পারে কিন্তু আমি যতক্ষণ না যাচাই করব যে তারা সাক্ষ্য দেয়ার যোগ্য কিনা, ততক্ষণ আমি আপনার দাবী মেনে নিতে পারব না। আর না তাদের সাক্ষ্য গ্রহণীয় হবে। খতীব বাগদাদী এবং ইবনে আসাকির আবুল হুসাইন থেকে এই ব্যাপারে যা বর্ণনা করেছেন তা এই, সেই দুই সাক্ষী আমার কাছে সাক্ষ্য দিলে আমি তার তদন্ত করব; যদি তারা সাক্ষী হিসেবে গ্রহণীয় হয় তবে আমি তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করব অন্যথায় যে মোকদ্দমা আমার কাছে প্রমাণিত সে অনুযায়ী ফায়সালা করব।
খলীফার সাক্ষীরা যখন শুনল যে আদালতে আমাদের খুব জেরা করা হবে তখন তারা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করল।
পরিশেষে বিচারক আবূ হাযিম খলীফার মোকদ্দমা খারিজ করে দেন। যার ফলে খলীফা কিছু পেলেন না।

ইনসাফের এক আশ্চর্য ঘটনা
বাদশাহ আজদুদ্দৌলা তার এক গোয়েন্দা পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারলেন যে, প্রধান বিচারকের কাছে এক ব্যক্তি বিশ হাজার দীনার আমানত স্বরূপ রেখেছিল। সেই ব্যক্তি হজ্জের পর রোমীয়দের বিরুদ্ধে জেহাদ করেন এবং আহত হয়ে বন্দী হন। চার বছর পর সে মুক্তি পায় এবং দশ বছর পর নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে আসে এবং বিচারকের কাছে আমানতের দীনার ফেরত চায়। বিচারক তাকে চিনেন বলে অস্বীকার করলেন বরং সে এমনও বলেছেন যে, বেশি বাড়াবাড়ি কর তাহলে পাগল সাব্যস্ত করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেব। বাদশাহ সেই ব্যক্তিকে ডাকলেন এবং তার থেকে সমস্ত ঘটনা শোনলেন। দুশো দীনার দিয়ে বিদায় দিয়ে বললেন, যখন আমি আসতে বলব তখন তুমি যে অবস্থায় থাক আমার কাছে চলে আসবে। সে যাওয়ার পর আজদুদ্দৌলা বিচারককে যাচাইয়ের জন্য একদিন তাকে নির্জনে ডেকে তার সন্তানদের বিষয়ে বললেন, জীবনের কোন ভরসা নেই। শাহজাদাদের পক্ষ থেকে আমি আশঙ্কাবোধ করছি, তারা হয়তো তাদের বোনের অংশ দিবে না। এজন্য আমি চাই যে, আপনার মত পরহেযগার ব্যক্তির কাছে কিছু হীরা মনি-মুক্তা এবং নগদ কিছু অর্থ জমা করে রাখি, যাতে আমি মরার পর শাহজাদারা যদি নিজের বোনদের অংশ না দেয়, তবে আপনি সে সময় যাতে মেয়েদের সহযোগীতা করতে পারেন এবং তাদেরকে এই আমানত দিয়ে দেন। আপনি এজন্যে মাটির নীচে এক গোডাউন তৈরী করুন। আর এই বিষয় যেন আল্লাহ ছাড়া কেউ না জানে। বাদশাহ বিচারককে দু’শ দীনার মাটির নীচে গোডাউন তৈরীর জন্য দিয়ে দিলেন।
বিচারক মনের আনন্দে বিদায় হলেন যে, বৃদ্ধাকলীন সময় আল্লাহ শুনেছেন। এত মাল ফ্রি পাওয়া যাচ্ছে যার কখনো আশা করতে পারিনি। বিশ হাজার দীনার ঘরে বসে পাওয়া গেল। আর আজদুদ্দৌলার মৃত্যুর পরেও তার এ সব সম্পদও আমার, যার কোন কাগজ পত্র থাকবে না।
গোডাউন তৈরি করে বিচারক আজদুদ্দৌলা জানালেন। বাদশাহ একশ চল্লিশ সিন্দুক দীনার দিয়ে ভরলেন। বাদশাহ বললেন, আজ রাতের মাঝে এই আমানত পৌঁছে যাবে। একথা বলে তিনি তাকে বিদায় জানিয়ে দিলেন।
অতঃপর সেই মজলূমকে ডাকলেন এবং বললেন, আজ বিচারকের কাচে গিয়ে কঠিন ভাষায় তোমার আমানত তলব কর। যদি তোমার কথা না মানে তবে তুমি তাকে বল যে, আমি বাদশাহর কাছে বলব যাতে আপনার ইজ্জত সম্মান মাটিতে মিশে যাবে। আর বাদশাহ আমার মালও ফেরত দিতে বাধ্য করবেন।
সেই ব্যক্তি গিয়ে কঠিন ভাষায় বিচারকের কাছে তার আমানত চাইল। বিচারক ভাবল, এই অপদার্থ যদি চিল্লায় তাহলে তা বাদশাহ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, অথচ বাদশাহ আজই মালামাল পাঠানোর ওয়াদা করেছেন। এমন না হয় যে, এই বিশ হাজার দীনারের বদলে সেই লাখ লাখ দীনার ও অলংকারাদি হাত ছাড়া হয়ে যায় আর অবিশ্বাস এবং বেইজ্জতিতো আলাদা আছেই। এই ভেবে বিচারক তার সমস্ত অর্থ তার কাছে সোপর্দ করে দিল এবং বলল, এখ নপর্যন্ত যা হয়েছে তা তোমার লাভের জন্যই। এখন তুমি ধৈর্য ধরছ না তো নিয়ে যাও। সেই ব্যক্তি দীনার নিয়ে সোজা আজদুদ্দৌলার কাছে গেলেন।
আজদুদ্দৌলা জানতে পারলেন যে, বিচারক বাস্তবেই খেয়ানত করেছে। আর যদি সে আমার সেই সম্পদের লোভী না হত তাহলে কখনো তা ফেরত দিত না। অতঃপর তিনি বিচারকের সমস্ত সম্পদ জব্দ করে নিলেন। তাকে বিচারক পদ থেকে বরখাস্ত করলেন। আর তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে অন্য কোন শাস্তি দেননি।

দানিয়াল আ. এর ন্যায় বিচার
আলী বিন আবু তালিব রা. বর্ণনা করেন, দানিয়াল ইয়াতিম ছিলেন। তাঁর মা-বাবা জীবিত ছিলেন না। বনী ইসরাঈলের এক নারী তার লালন-পালন করেন। সেই সময়ে বনী ইসরাঈলের এক বাদশাহ ছিল, যার দুই বিচারক ছিল। সেই মহিলা খুব সুন্দরী ও অভিজাত শ্রেণীর ছিল। সে প্রায়ই বাদশাহর কাছে যেত এবং তাকে নসীহত করত। সেই মহিলা বাদশাহর কাছে যাওয়া-আসাকে উভয় বিচারক খুব গভীরভাবে দেখত। পরিশেষে তার ভালবাসা তাদের অন্তরে স্থান নিয়ে নিল। নীরবে তাকে তারা পেতে চাইল। একবার তারা তাদের ভালবাসাকে এই সতি নারীকে জানিয়ে দিল; কিন্তু সেই নারী তাদেরকে নসীহত করল। তারা অনেক চেষ্টা করেও তাকে কথায় আনতে পারল না। অবশেষে তারা যখন বুঝতে পারল যে, কোনভাবেই এই সতী মহিলাকে নিজেদের কথায় আনতে পারবে না। তখন তারা বাদশাহর কাছে অভিযোগ করল, যেই মহিলা আপনাকে নসীহত করে সে পাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে।
বাদশাহ এই অভিযোগ শুনে সমস্যায় পড়ে গেল এবং তার খুব দুঃখ হল, কেননা সে নিজেই এই মহিলার পবিত্রতা ও সততায় বিশ্বাস করত প্রশংসাও করত; কিন্তু বিচারকদের সাক্ষ্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে পারেন না।
মূল কথা হল, বাদশাহ দুই বিচারকের সাক্ষ্য পাওয়ার পর তদন্ত করার প্রয়োজনীয় অনুভব করেননি। বরং তাদেরকে বললেন, তোমাদের উভয়ের সাক্ষ্য গ্রহণীয়। অতঃপর বাদশাহ সেই মহিলাকে তিন দিনের সময় দিলেন, এরপর তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে। শহরেও ঘোষণা করে দেওয়া হল যে, অমুক দিন অমুক মহিলাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে। লোকজন তা দেখার জন্যে উপস্থিত থাকবে।
বাদশাহ যদিও ঘোষণা দিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু মনে মনে পেরেশান ছিলেন। তিনি তার বিশ্বস্ত মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন কৌশলে কি মহিলাকে বাঁচানো যায়?
মন্ত্রী বললেন, এখন যেহেতু শহরে ঘোষণা দেয়া হয়ে গেছে আর এই ফায়সালাও আপনার নিকটতম বিচারকদ্বয়ের সাক্ষ্যর ভিত্তিতে হয়েছে। এমতাবস্থায় ফায়সালা বাস্তবায়নে কি বাধা থাকতে পারে?
তৃতীয় দিন যেদিন মহিলাকে পাথর নিক্ষেপ করা হবে, বাদশাহর বিশ্বস্ত মন্ত্রী বাড়ি হতে বের হলে দেখতে পান যে, কতক বালক খেলছে। তাদের মধ্যে দানিয়াল আ. রয়েছেন। তিনি দানিয়াল আ. কে চিনতেন না, তবুও দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখতে লাগলেন। দানিয়াল আ. শিশুদের একত্রিত করে বললেন, এই শিশুরা! এসো আমি তোমাদের বাদশাহ হই, আর এই অমুক! সতী এক মহিলা হয়ে যাও। আর দুই বালককে বিচারকের কাজ দিলেন এবং বললেন, তোমরা উভয়েই আমার আদালতে সেই মহিলার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দাও। অতঃপর নিজে মাটির টিলার উপর বসে গেলেন এবং হাতে কাঠের এক তরবারী। এখন দৃশ্যটি ছিল আদালতের। উভয় বিচারক বালক আর সেই বালক যে মহিলার অভিনয়ে ছিল সামনে দাঁড়াল।
দানিয়াল আ. অন্য ছেলেদের বললেন, তারা যেন এক বিচারকের হাত ধরে অমুক স্থানে নিয়ে যায়। যখন সে চলে গেল দ্বিতীয় বিচারককে ধমক দিয়ে বললেন, সত্য সত্য বল, আর না হয় তোমাকে আমি হত্যা করব, তুই কোন ভিত্তিতে এই মহিলার ব্যাপারে পাপের সাক্ষ্য দিচ্ছিস?
বিচারক বলতে লাগল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এই মহিলা পাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে।
দানিয়াল আ. জিজ্ঞেস করলেন কখন? বালক বিচারক উত্তর দিল অমুক দিন।
দানিয়াল আ. জিজ্ঞেস করলেন, কোন পুরুষের সাথে পাপ কাজ করেছে?
বালক উত্তর দিল, অমুকের ছেলে অমুকের সাথে।
দানিয়াল আ. জিজ্ঞেস করলেন, কোন স্থানে?
বালক বিচারক উত্তর দিল, অমুক স্থানে।
দানিয়াল আ. ছেলেদের বললেন, এই বিচারককে নিয়ে যাও আর দ্বিতীয় বিচারককে আমার কাছে নিয়ে এসো। তারা তার নির্দেশ পালন করল। দানিয়াল আ. সেই দ্বিতীয় বিচারককে সে প্রশ্ন করলেন যা প্রথম বিচারককে করেছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় বিচারকের উত্তরসমূহ প্রথম বিচারকের উত্তর থেকে ভিন্ন হল। দানিয়াল আ. উঁচু কণ্ঠে আল্লাহু আকবার বলে ওঠেন। বাদশাহর বিশ্বস্ত মন্ত্রী যে সব দৃশ্য ও অভিনয় দেখছিলেন তিনি কালক্ষেপন না করে বাদশাহর দরবারে পৌঁছলেন এবং তিনি বাদশাহর কাছে বালকদের এই অভিনয় বর্ণনা করলেন। বাদশাহ সচেতন হল এবং তিনি দানিয়াল আ. এর মত দুই বিচারককে ডেকে পাঠালেন এবং তাদের পৃথক করে তাদের জবান বন্দি রেকর্ড করেন। জানতে পারলেন, তাদের বর্ণনা ভিন্ন ভিন্ন।
সুতরাং বাদশাহ লোকজনের মাঝে এই ঘোষণা করে দিলেন যে, বিচারকের হত্যার দৃশ্য দেখার জন্যে লোকজন যেন অমুক মাঠে একত্রিত হয়। অতঃপর সাধারণ জনসমাবেশের সামনে বাদশাহ উভয় বিচারককে হত্যার শাস্তি দিলেন। আর সতী মহিলাকে সসম্মানে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight