সোনালি ফায়সালা / সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

আযানের অলৌকিক ক্ষমতা: কাজী আবুল হাসান মোহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহেদ হাশেমী এক ব্যবসায়ী সম্পর্কে বর্ণনা করেন, তিনি নিজের সম্পর্কে নিজেই বলেন, বাগদাদের এক আমীরের (গভর্ণর) কাছে আমার অনেক সম্পদ আমানত স্বরূপ ছিল। আমি তার কাছে আমার মাল চাইলে সে টাল-মাটাল করতে লাগল; বরং আমার হক্ব দিতে অস্বীকার করল। আমি সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করলাম। কিন্তু তাতে কোন ফল হল না। আমি অনেকের মাধ্যমে চেষ্টার পর নিষ্ফল ও নিরাশ হয়ে ভাবতে লাগলাম যে কোথায় যাব? কার কাছে অভিযোগ করব? আমার দুঃখ কে শুনবে? আমি এই ভাবনায় ছিলাম, এক ব্যক্তি আমাকে বলল, তুমি অমুক দর্জির কাছে কেন যাচ্ছো না যে মসজিদের ইমামতিও করে? হতে পারে তোমার এই সমস্যার সমাধান সে করতে পারবে। আমি তাকে বললাম, আচ্ছা বলতো সে একজন দর্জি সেই অত্যাচারী শাসকের কি করতে পারবে অথচ সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও তার অত্যাচার ও অন্যায় থেকে মুক্তি দিতে পারেনি?
সেই ব্যক্তি আমাকে বলল, তুমি যাদের কাছে অভিযোগ করেছ তারা সবাই এই দর্জি ইমামের সামনে তুচ্ছ। আর আমীর অন্যান্য লোকদের থেকে এই ইমামের কাছে বেশি ভীত। তুমি তার কাছে গেলে হতে পারে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
সুতরাং আমি সেই দর্জি ইমামের কাছে গিয়ে আমি আমার বিষয় সব খুলে বললাম। তিনি আমার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনে আমাকে নিয়ে সেই জালেম আমীরের কাছে পৌঁছলেন। আমীর তাকে দেখামাত্র তাকে স্বাগত জানানোর জন্যে দাঁড়িয়ে গেল এবং অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে তাকে অভ্যর্থনা জানাল। দর্জি ইমাম গভর্ণরকে শুধু এতটুকু বলল, এই ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দাও, আর না হয় আমি এক্ষণি আযান দিয়ে দিব।
একথা শোনামাত্র আমীরের চেহারার রং পাল্টে গেল, তার শরীরে কম্পন শরু হল। তার চেহারায় ভয়-ভীতির লক্ষণ দেখাচ্ছিল। কারণ না দর্শিয়ে আমার সমস্ত মাল দিয়ে দিল। এখন সে আর টাল-মাটাল কিছুই করল না।
মূল কথা হল আমি মাল পাওয়ার পর ইমামকে কিছু দিতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বললেন, যদি আমার এই সম্পদের লোভ থাকত তবে আমার কাছে অসংখ্য পরিমাণে সম্পদ থাকত।
আমি দর্জি ইমামকে বললাম, আচ্ছা জনাব! আপনি এটাতো বলেন, সেই জালিম আমীর আপনাকে দেখামাত্র আমার মাল কি করে দিয়ে দিল, অথচ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ এই জুলুম থেকে আমাকে মুক্তি দিতে পারেনি?
দর্জি ইমাম আমাকে এক ঘটনা শোনাল, যা এর চেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক।
ইমাম বললেন, কিছুকাল আগে এখানে এক তুর্কি আমীর (গভর্ণর) ছিলেন, যুবক ও সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন। এক দিনের ঘটনা এক মহিলা গোসলখানা থেকে গোসল করে বের হল। তার গায়ে অনেক মূল্যবান পোশাক ছিল এবং তার সাজ-সজ্জায় ও সৌন্দর্যে তাকে পরীর মতই দেখাচ্ছিল। তর্কী আমীর মদ পান করে বেহুশ অবস্থায় ছিল। তার দৃষ্টি যখন এই নারীর প্রতি পড়ল, সে তার জন্য পাগল হয়ে গেল। মহিলাকে জোর করে তার ঘরে নিয়ে যেতে চাইল। মহিলা তার সম্ভ্রম রক্ষার্থে চিৎকার করে ফরিয়াদ করল।
হে মুসলিম জনতা! আমি এক বিবাহিতা মহিলা, এই আমীর তার ঘরে নিয়ে আমার সম্ভ্রম হানি করতে চায়। আমার স্বামী আমাকে কসম করে বলেছিল, যদি আমি তাকে ছাড়া অন্য কারো ঘরে রাত কাটাই তবে আমি তালাক। এমতাবস্থায় আমীরের ঘরে যদি আমি যদি সারা রাত থেকে যাই তবে আমি তালাকপ্রাপ্তা হব। এছাড়া আমি এক কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হব যা সারাটি জীবন আমার বদনাম অসম্মানীর কারণ হবে। আর এই অসম্মান ও বদনামকে সারাটি জীবন আমার চোখের অশ্রু দিয়েও মুছে দিতে পারবো না।
ইমাম আরো বললেন, মহিলা চিৎকার করে কান্নাকাটি করতে লাগল; কিন্তু কেউ তার ফরিয়াদে তাকে রক্ষার জন্য আসার সাহস করেনি। ওদিকে অত্যাচারী আমীর মহিলাকে নিজের ঘরে নিতে চেষ্টা করতে লাগল। আমি মহিলার প্রতি তুর্কী আমীরের জুলুম দেখলাম। যাতে আমার চেতনা জেগে উঠল এবং আমি মহিলাকে উদ্ধারে দৃঢ় সংকল্প করলাম। আমি গিয়ে আমীরকে অনুরোধ করলাম যে, সে যেন মহিলাকে ছেড়ে দেয় যাতে মহিলা ঘরে চলে যায়। সেই জালেম আমার কথায় কোন গুরুত্ব দিল না; বরং সে তার লাঠি দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করে মাথা ফাটিয়ে দিল এবং সেই সময়ের ভেতরে সে মহিলাকে ঘরে নিয়ে যেতে সফল হল। আমি মার খেয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম রক্ত ধুয়ে নিলাম এবং মাথায় পট্টি লাগিয়ে নিলাম। অতঃপর এশার নামাযের পর লোকজনের উদ্দেশ্যে বললাম: এই আমীর যা কিছু করছে তা সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন। আপনারা সকলেই আমার সাথে চলুন যাতে আমরা তাকে বাধা দিতে পারি এবং সেই মহিলাকে তার থেকে মুক্ত করতে পারি।
অতঃপর সকল মুক্তাদী আমার সাথে চলল। সুতরাং আমরা আমীরের ঘর ঘেরাও করলাম। আমীর নিজের সিপাহী ও চাকরদের নিয়ে বের হল যাদের প্রত্যেকের লাঠি ও লোহার অস্ত ছিল। তারা আমাদেরকে মারতে লাগল। আমীর বিশেষ করে আমাকে খুব মারতে লাগল, যার ফলে আমি খুব রক্তাক্ত হয়ে গেলাম। আমাদেরকে সেখান থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করা হল। এসব আমাদের জন্য চরম অপমান জনক ছিল।
মূল কথা আমাদেরকে সেখান থেকে নিষ্ফল ও অপমানিত হয়ে সেখান থেকে ফিরে আসতে হল। আমাকে এতবেশি মেরেছিল যে, কঠিন ব্যথা ও রক্ত যাওয়াতে বাড়ীর রাস্তাও ভুলে গিয়েছিলাম। আমি কোন রকমে বাড়ি পৌঁছলাম এবং বিছানায় শুয়ে পড়লাম; কিন্তু ঘুম কি আসতে পারে? আমি সীমাহীন পেরেশানীতে ছিলাম এবং ভাবছিলাম, কোন পদ্ধতি গ্রহণ করলে সেই মজলুম মহিলাকে জালেম আমীরের হাত থেকে মুক্তি দেয়া যাবে, যাতে মহিলা নিজের বাড়ি ফিরে যেতে পারে এবং তালাক না হয়। আমি এই দ্বিধা-দ্বন্দে ছিলাম, হঠাৎ আল্লাহ তাআলা আমার অন্তরে এক ফন্দি জাগিয়ে দিলেন। আর তা হল, আমি এই সময়ে আযান দিয়ে দিই যাতে আমীর তা শুনে ভাবে যে সকাল হয়ে যাচ্ছে এবং মহিলাকে তার ঘর থেকে বের করে দিবে । অতঃপর মহিলা রাতের মধ্যেই তার বাড়ি ফিরে যাবে এবং তালাক থেকে মুক্তি পাবে।
সুতরাং আমি মিনারায় উঠলাম এবং আমীরের ঘরের দিকে দেখলাম যে, দরজা খোলা কিনা। আর মহিলাটি ঘর থেকে বের হল কিনা? এরপর আমি আযান দিয়ে দিলাম, এরপরও মহিলা ঘর থেকে বের হতে দেখা গেল না।
এবার আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, একামতও বলে দিই যাতে আমীর দৃঢ় বিশ্বাস করে যে, ফজর হয়ে গেছে এবং ঘর থেকে মহিলাকে বের করে দেয়। আমি তখনো ভাবছিলাম একামত দেয়ার জন্যে এরই মধ্যে অশ্বারোহীগণ ও পদাতিক সিপাহীরা রাস্তায় ভরে গেছে। আর তারা সবাই এক বাক্যে বলছে, এসময় আযান দিল সে কোথায়? আমি বলতে লাগলাম, আমি আযান দিয়েছি। আমি আযানের মধ্যে তোমাদের সাহায্য পেতে চেয়ছিলাম। সুতরাং তোমরা আমাকে সাহায্য কর। সিপাহীরা বলল, প্রথমত মীনার থেকে নীচে নেমে আস এবং আমীরুল মুমিনীন মুতাযিদ বিল্লাহর কাছে কৈফিয়ত দেয়ার জন্য চল।
যখন আমি খলীফা মুতাযিদ বিল্লাহর কাছে পৌঁছলাম তখন তিনি খেলাফতের সিংহাসনে আসীন ছিলেন। আমি তাকে দেখে কেঁপে উঠলাম। খলীফা আমাকে কাছে যেতে বললেন। আমি কাছে গেলাম, আমি তখন কাঁপছিলাম। খলীফা বললেন, তোমার ভীতি দূর হতে হবে আর তোমার অন্তর স্থীর হতে হবে।
অতঃপর খলীফা আমার ভীতি দূর করার জন্যে খুব ন¤্রতার সাথে কথা বললেন। এরপর আমার ভয়-ভীতি দূর হলে আমি স্বাভাবিক অবস্থায় আসলাম। অতঃপর খলীফা বললেন, এ সময় আযান কি তুমিই দিয়েছ?
আমি আরজ করলাম, জী হ্যাঁ, হে আমীরুল মুমিনীন!
খলীফা জিজ্ঞেস করলেন কি ব্যাপার? এ সময় আযান কেন দিয়েছো? অথচ এখনো ফজরের আযানের সময় অনেক বাকী। তোমার এই আযানে না জানি কত রোজাদার ও মুসাফির এবং নামাযীরা ধোঁকায় পড়েছে।
আমি আরজ করলাম, আমীরুল মুমিনীন! যদি আমার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেন, তবে আমি প্রকৃত বিষয় সম্পর্কে জানাতে পারি।
খলীফা বললেন, আমি তোমাকে নিরাপত্তা দিলাম। তুমি তোমার কথা নির্দ্বিধায় বলতে পার।
অতঃপর আমি খলীফাকে সব ঘটনা খুলে বলি। শোনা মাত্র খলীফা রাগে লাল হয়ে গেলেন এবং তার সীপাহীদের নির্দেশ দিলেন যে, এ মুহূর্তে অপরাধী আমীর এবং তার জালে আবদ্ধ নারীকে হাযির করা হোক।
তৎক্ষণাত তাদের উভয়কে হাযির করা হল। খলীফা কতিপয় বিশ্বস্ত মহিলাদের সাথে সেই মহিলাটিকে তার বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন এবং তার স্বামীকে বলতে বলেছেন, নিজের স্ত্রীকে মাফ করে দিতে এবং তার প্রতি যেন দয়া করে কেননা সে অপারগ ও নির্দোষী।
এরপর খলীফা সেই তুর্কী যুবক আমীরের উদ্দেশ্যে বললেন, তোর কাছে প্রচুর ধন-সম্পদ রয়েছে, সাথে সাথে অনেক স্ত্রী ও দাসীও রয়েছে। অতঃপর আমীর তা স্বীকার করে।
খলীফা বললেন, তুই ধ্বংস হয়ে যা! আল্লাহ তাআলা তোকে এত কিছু দিয়েছেন, এরপরও তুই আল্লাহর সমীলংঘন করলি এবং এমন মারাত্মক অপরাধ করলি, যে ব্যক্তি তোকে অপরাধ থেকে বাধা দিয়েছে এবং সৎ উপদেশ দিয়েছে তাকে মেরে রক্তাক্ত করলি। তাকে অপমান ও অপদস্থ করলি?
অপরাধী আমীরের কাছে খলীফার কথার কোন উত্তর ছিল না। খলীফা সিপাহীদের নির্দেশ দিলেন, এর হাত-পা বেঁধে বস্তার ভেতরে ঢুকাও এবং লাঠি দিয়ে খুব পিটাও। সিপাহীরা খলীফার নির্দেশ কার্যকর করল। অপরাধী আমীর জোরে জোরে চিৎকার করতে লাগল; কিন্তু কেউ তার প্রতি দয়া করতে প্রস্তু ছিল না। এক সময় তার প্রাণবায়ু চলে গেল।
এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পর খলিফা মুতাযিদ বিল্লাহ তার সেই সব সম্পদ যা অন্যায়ভাবে আত্মসাত করেছিল তা বায়তুল মালে সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দিলেন।
অতঃপর পরহেযগার ও ন্যায়ের প্রতীক দর্জি ইমামের উদ্দেশ্যে বললেন, ইমাম সাহেব! আপনি যান! এরপর যদি কোন প্রকার অন্যায় অপরাধ দেখতে পান অপরাধী যে ব্যক্তিই হোক যদি আপনি আমার কাছে পৌঁছাতে পারেন, তবে আমার কাছে এসে অভিযোগ করবেন। আর যদি পৌঁছা সম্ভব না হয়, তবে সেই মুহূর্তে আযান দিয়ে দিবেন যেমন আপনি এই পরিস্থিতিতে আযান দিয়েছেন।
ব্যবসায়ী বর্ণনা করেন, এই বিস্তারিত ঘটনা শোনানোর পর দর্জি ইমাম আমাকে বললেন যে, এই ঘটনার পর যদি আমি কোন সরকারী কর্মকর্তাদের ভাল কাজের কথা বলি তবে তা গ্রহণ করে। আর কোন অপরাধ থেকে বাধা দিই তৎক্ষণাত থেমে যায়।
কেননা, তার উপর খলীফা মুতাযিদ বিল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়। তবে আজ পর্যন্ত দ্বিতীয়বার আযানের পরিস্থিতি আসেনি। আর এই আযানের যে কত মূল্য তা তুমি দেখেছ।  [বেদায়া ওয়ান-নেহায়া: ১৪/৭০৪-৭০৭ ও ইবনে জাওযীর আল-মুনতাজেম: ১২/৩১৭]
শরীয়ত ও আদবের দাবী:
আব্বাসী বংশের তৃতীয় খলীফা মাহদী কূফার জন্যে এমন এক বিচারকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন, যিনি শরীয়ত সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান রাখেন এবং পরহেযগার, যিনি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। লোকজন শরীক বিন আবদুল্লাহর কথা বলল যে, তিনি উল্লেখিত যোগ্যতার অধিকারী। এরপর খলীফা তাকে আহ্বান করে বললেন, আমি আপনাকে কূফার প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দিতে চাই।
তিনি উত্তরে বললেন, বিচারক হওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। আর না আমি এই পদ গ্রহণ করব।
মাহদী জিজ্ঞেস করলেন, মূলত আপনি কি কারণে তা গ্রহণ করবেন না?
শরীক: আমার ভয় হয় যে, পরিপূর্ণ ন্যায় বিচার আমি করতে পারব কিনা? ফায়সালার ভুলের জন্যে আল্লাহ আমার প্রতি নারাজ হবেন। যার ফলে আমি জাহান্নামের পথিক না হয়ে যাই।
আর দ্বিতীয় কারণ হল, যখন আমি গভর্ণর, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আমীরদের বিরুদ্ধে ফায়সালা করব তখন তা গ্রহণ করা হবে না।
খলীফা মাহদী বললেন, শুনুন যদি আপনি আপনার বিবেক-বুদ্ধি বিচক্ষণতা ও পারদর্শিতার সাথে এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণাদি শোনার পর সত্যের উপর ভিত্তি করে ফায়সালা দেন; আর এমন অবস্থায় আপনার ফায়সালায় ভুল হয়ে গেলেও আপনি হাদীস অনুযায়ী এক পুণ্য লাভ করবেন। আল্লাহর কাছে দোষী ও শাস্তিযোগ্য তখনই হবেন যখন আপনি ইচ্ছা করে ভুল ফায়সালা দিবেন। আর যে কথা আপনার ফায়সালা ও নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয় আমি আপনার সাথে ওয়াদা করছি, আপনার সকল ফায়সালা বাস্তবায়ন করা হবে। যদিও সেটা আমার বিরুদ্ধে হয়। অতঃপর খলীফা খুব আবেগের সাথে বললেন, হে উলামায়ে দ্বীন, উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তিবর্গ! যদি আপনারা এই পদ গ্রহণ না করেন, তাহলে এর জন্য লোক কোথা থেকে আসবে? এই পদের জন্য কি অজ্ঞ, জালিম পথভ্রষ্ট লোকদের নির্বাচন করা হবে? শুনুন! যদি আপনারা আমার কথা না মানেন তবে কাল ক্বিয়ামতের দিনে আপনাকে আল্লাহর নিকটে জবাবদিহি করতে হবে যে, সত্যের ময়দান থেকে আপনারা পলায়ন করেছেন।
শরীক বিন আবদুল্লাহ খলীফা মাহদীর আকর্ষণীয় ও সত্য বক্তব্যের কূফার বিচারপতি পদ গ্রহণ করতে রাজী হলেন। সে সময়ে কূফার গভর্ণর খলীফার চাচা মূসা বিন ঈসা ছিলেন। বিচারপতি শরীক বিচারকের পদ গ্রহণ করে অত্যন্ত ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেন।
কূফার ফোরাত নদীর তীরে এক সুন্দর বাগান ছিল, যার মালিক কূফার এক ব্যক্তি। সেই বাগানের সাথেই কূফার গভর্ণর মূসার ভবন ছিল। মূসার ইচ্ছা ছিল, যে কোন মূল্যে সেই বাগান কিনে নিতে, যাতে তার ভবন আরো প্রশস্ত ও খোলামেলা হয়। সুতরাং তিনি বাগানের মালিককে প্রস্তাব দিলেন, বাগান তার কাছে বিক্রি করে দিতে; কিন্তু সে তা দিতে অস্বীকার করল। কিছুকাল পর সেই বাগানের মালিকের মৃত্যু হয়। তার উত্তরাধিকারীদের কয়েক ছেলে এবং এক মেয়ে ছিল। এখন মূসা বিন ঈসা দ্বিতীয়বার উত্তরাধীকারীদের কাছে বাগান কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিলেন এবং এর জন্যে অনেক বেশি মূল্য নির্ধারণ করলেন। ছেলেরা তাদের অংশ বিক্রি করতে একমত হলেও মেয়েটি নিজের অংশ বিক্রি করতে অস্বীকার করল। তাকে অনেক বুঝানো হয়েছে এবং চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে কিন্তু সে বলল, যেই যমীন আমার বাবা বিক্রি করেননি আমি তা কখনো বিক্রি করব না। সে তার অংশের চারিদিকে বাউ-ারী তৈরী করল।
গভর্ণর মূসা বিন ঈসার খুবই ইচ্ছা ছিল, এই অংশও যেন তার ভবনের অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি অনেকগুণ বেশি মূল্য পেশ করলেও মেয়েটি তা গ্রহণ করল না।
যখন সমস্ত চেষ্টা বিফল হল তখন গভর্ণর একদিন তাঁর কর্মচারীদের নির্দেশ দিলেন দেয়াল ভেঙ্গে সেই যমীন ভবনের অন্তর্ভুক্ত করে দিতে। কর্মচারীরা তাই করল।
এদিকে সেই মেয়েটি কূফার গভর্ণর মূসা বিন ঈসার বিরুদ্ধে বিচারক শরীকের আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করে দেয়। বিচারক শরীক কূফার গভর্ণরের বিরুদ্ধে সমন জারী করে দেন। তাকে আদালতে হাজিরার নির্দেশ দিলেন, যাতে তার বক্তব্য আদালতের সামনে পেশ করেন। গভর্ণর আদালতে হাজিরা দেয়াটা নিজের জন্য অপমানজনক মনে করলেন, তিনি গভর্ণর হয়ে এক সাধারণ নারীর বিরুদ্ধে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে। তিনি পুলিশ প্রধানকে ডেকে বললেন যে, বিচারককে বুঝিয়ে বল, সে এক সাধারণ নারীর মামলা সাক্ষ্য ছাড়া কিভাবে গ্রহণ করলেন?
পুলিশ প্রধান আদালতে হাজির হয়ে গর্ভণরের বক্তব্য পেশ করলে, বিচারক বললেন, আমি তো তোমাকে আদালতে হাজির হতে বলিনি; বরং গভর্ণরকে হাজির হতে বলেছিলাম। তাকে নিজে হাজির হয়ে তার বক্তব্য পেশ করা উচিত ছিল। সে পুলিশ অফিসারকে পাঠিয়ে আদালতের উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। বাস্তব হল এই যে, তোমার আদালতকে পরামর্শ দেয়া আদালতের বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল, আর এটা আদালতকে অবমাননা করা। যেহেতু তুমি আদালতের কাজে হস্তক্ষেপ করেছ এজন্য তোমাকে জেলে যেতে হবে। সাথে সাথে বিচারক আদালতের পুলিশকে ইঙ্গিত করলে সে পুলিশ প্রধানকে হাজতে বন্দী করে।
এদিকে গভর্ণর যখন জানতে পারেন; পুলিশ প্রধানের সাথে কি ব্যবহার করা হল, তখন তিনি অত্যন্ত নারাজ হলেন, বিচারকের এত সাহস, আমার পুলিশ অফিসারকে জেলে পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি শহরের মানগণ্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ডেকে বললেন, তারা যেন আদালতে গিয়ে বিচারককে বুঝায়, গভর্ণর কোন সাধারণ ব্যক্তি নয়, যে তার সাথে সাধারণ লোকদের মত আচরণ করা হচ্ছে। শহরের একদল প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ বিচারকের কাছে এসে গভর্ণরের বার্তা পৌঁছালেন এবং তার অসন্তুষ্টির বিষয়টিও অবহিত  করলেন। বিচারক শরীক তাদের উত্তর দিলেন, আদালতের দৃষ্টিতে সাধারণ ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গ সকলেই সমান। আর তোমরাও আদালতের নীতিতে হস্তক্ষেপ করেছ যা আদালতকে অবমাননার শামিল। সুতরাং তোমাদেরকেও জেলে পাঠানো হচ্ছে। সুতরাং তাদেরকেও পুলিশ গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেয়।
গভর্ণর এসব কিছু জানতে পেরে খুবই উত্তেজিত হল, এক বিচারক আমার বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে এ ধরণের আচরণ করার সাহস কিভাবে পেল? তিনি নিজের সাথে পুলিশ ফোর্স নিয়ে সোজা জেলে পৌঁছে সকলকে মুক্তি দিয়ে দিলেন।
এদিকে জেলার সোজা বিচারক শরীকের কাছে এসে সব ঘটনা শোনাল। বিচারক শরীক বললেন, আমি এই পদ না চেয়েছিলাম আর না তাতে আমার আগ্রহ ছিল। এটাতো খলীফা আমাকে বাধ্য করেছেন। আর আমি এ শর্তে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম যে, আমার সব ফায়সালা বাস্তবায়ন করা হবে। বিচারক নিজের ব্যক্তিগত কাগজপত্র এবং নিজের আসবাবপত্র গোছালেন, বাহনের উপর উঠলেন এবং বাগদাদ অভিমুখ যাত্রা করলেন।
অন্যদিকে গর্ভণর যখন জানতে পারলেন, বিচারক শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তখন তিনি খুব হতাশ ও পেরেশান হলেন। তিনি ভাল করেই জানতেন, যদি খলীফা আমার সব ঘটনা জানতে পারে তাহলে আমার গর্ভণরী শেষ হয়ে যাবে। সুতরাং তিনি বিচারক শরীককে কূফার বাইরে যেতে বাধা দেন। বিচারককে রাজী করাতে চেষ্টা করেন, তিনি যেন কূফায় ফেরত না যান। ওয়াদা করলেন, আপনি যা বলবেন আমি তাই মানব।
বিচারক বললেন, এক শর্তে আমি ফিরে যেতে পারি।
গভর্ণর জিজ্ঞেস করলেন, সেই শর্ত কি?
বিচারক বললেন, যেসব লোকদের আপনি মুক্তি দিয়েছেন, তাদের সকলকেই আবার বন্দী করতে হবে। আর আপনাকে সেই মহিলার সাথে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
গভর্ণর বিচারকের সমস্ত শর্তাবলী মেনে নিলেন। সুতরাং মুক্তিপ্রাপ্ত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও পুলিশ প্রধানকে আবার জেলে বন্দী করা হল। আর গভর্ণরও আদালতে হাজির হলেন।
বিচারক আরজী শোনার পর ফায়সালা দিলেন, যে বাউ-ারী ভাঙ্গা হয়েছে তা আবার তৈরি করতে হবে । মহিলার যমীন ফেরত দিতে হবে এবং তাকে যমীন বিক্রি করতে বাধ্য করা যাবে না।
যে মুহূর্তে গভর্ণর ফায়সালা মেনে নিলেন সেই মুহূর্তে বিচারক ফায়সালা জারি করলেন, যে সমস্ত বন্দীদেরকে আদালত অবমাননার জন্য জেলে রাখা হয়েছে তাদের সকলকেই মুক্তি দেয়া হোক। সুতরাং সকর বন্দীদের মুক্তি দেয়া হল। মহিলা তার যমীন ফেরত পেল। ন্যায় নীতির বিচারে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হল। পরের দিন বিচারক শরীক গভর্ণরের দরবারে হাজির হলেন। গভর্ণর তাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন এবং নিজের পাশে বসালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন কি উদ্দেশ্যে আসা হয়েছে?
বিচারক শরীক বললেন, হে আমীর! এখন যদি আপনি কোন নির্দেশ করেন, তবে আমি তা পালন করতে প্রস্তুত।
গভর্ণর এক দৃষ্টিতে বিচারকের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তিনি যেন বলতে চাচ্ছেন, কাল আপনি আমার সাথে কি আচরণ করেছেন আর আজ আপনি আমাকে কি বলছেন?
বিচারক শরীক বললেন: যা আমি কাল করেছি তা শরীয়তের বিধান ছিল যা বাস্তবায়ন করা আমার দায়িত্ব ছিল। আর আদবের বিষয় ভিন্ন। আপনি শহরের গভর্ণর আপনাকে সম্মান করা জরুরী। সুতরাং এটা আদবের হক্ব আর সেটা শরীয়তের হক্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight