সুন্নতে নববীর আলোয় আলোকিত হোক আমাদের ঈদ : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর মুসলিম উম্মাহর সার্বজনীন এক ধর্মীয় উৎসব এবং ইবাদত। মূলত পৃথিবীর প্রত্যেক জাতিরই কিছু জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসবের দিন রয়েছে। যাতে তারা সে দিনগুলোতে স্ব স্ব রীতি অনুযায়ী আনন্দ-ফুর্তি করে। ভাল ভাল খাবার পাক করে এবং উন্নত মানের লেবাস-পোশাক পরিধান করে। এটি মানুষের ফিতরতী চাহিদা। এর বাইরে কোন কওম বা জাতিকে পাওয়া যাবে না। ইসলাম যেহেতু ফিতরাতের ধর্ম এবং এর প্রবর্তক অর্ন্তরযামী আল্লাহ তাআলা। তাই ইসালামেও রয়েছে ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর নামে এমন দুটি দিন, যা আমরা পেয়েছি সরাসরি নবীয়ে রহমতের যবান মুবারক থেকে। সাহাবী আনাস রা.বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করলেন, তখন মদীনাবাসীদের উৎসবের জন্য দুটি দিন ছিল। যাতে তারা খেলা-ধূলা, আনন্দ-উৎসব করত। এ আবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, এই যে দুই দিন, যাতে তোমরা আনন্দ-উৎসব করছ, এর বাস্তবতা ও মৌল কি? জবাবে তারা বললেন, আমরা জাহিলী যুগ থেকেই এই উৎসব পালন করে আসছি। সেই রেওয়াজটিই এখনও চালু আছে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে উৎসবের জন্য এই দুই দিনের পরিবর্তে এরচে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন। এখন থেকে এই দুই দিনই হবে তোমাদের ধর্মীয় উৎসবের দিন। একটির নাম হলো ঈদুল আযহা, আপরটির নাম হলো ঈদুল ফিতর। [আবু দাউদ : হাদীস নং ১১৩৪]
এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, আমাদের উৎসবের এই দুই দিন আর অন্যান্য জাতির উৎসবের দিনগুলোর মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। অন্যান্য জাতির উৎসবের দিনগুলোর সিংহভাগই নিজেদের মনগড়া এবং সে দিনগলোতে যা হয় তারও সিংহভাগই ভিত্তিহীন, নিজেদের বানানো এবং তা শ্রেফ একটি উৎসব। এর বাইরে কিছু নয়। পক্ষান্তরে আমাদের উৎসবের এই দুই দিনের রয়েছে প্রামাণিক ভিত্তি এবং তা কেবলমাত্র উৎসবের দিনই নয়। এ দিনগুলোর রয়েছে অশেষ ফযীলত এবং এ দিনগুলোতে আদায় করা হয় বিশেষ বিশেষ ইবাদত। সাহাবী আবু উমামার রা. বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে একমাত্র সওয়াবের আশায় ইবাদত করবে, তার অন্তর কেয়ামতের সেই বিভীষিকাময় দিনে মরবে না, যেদিন সকল মানুষের অন্তর মারা যাবে। [সুনানে ইবনে মাজা : হাদীস নং ১৭৮২]
উক্ত হাদীসের মর্মকথা হচ্ছে, কেয়ামতের বিভীষিকাময় অবস্থায় যখন সকল মানব-দানব অস্থির ও বেকারার থাকবে তখন সে থাকবে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। কোন কোন আলেম বলেন, উক্ত হাদীসের মর্মকথা হচ্ছে, তার অন্তর দুনিয়ার অবৈধ ভালোবাসায় দেওয়ানা হবে না। এক দীর্ঘ হাদীসে সাহাবী ইবনে আব্বাসের রা. বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “ঈদের রাত হলে তার নাম আকাশে “পুরুষ্কারের রাত” বলে ঘোষণা করা হয়। অনন্তর ঈদের দিন সকালে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি শহরে-নগরে ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তারা পৃথিবীতে আগমন করে সকল অলি-গলি ও রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাড়িয়ে যান আর এই বলে ডাকতে থাকেন, (যে ডাক মানব ও দানব ব্যতীত সকল সৃষ্টিই শুনতে পায়) হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মতগণ! তোমরা চল পরম দয়ালু আল্লাহর সান্নিধ্যে। তিনি অসীম দাতা ও বড় বড় গুনাহ ক্ষমাকারী। লোকজন ঈদগাহের দিকে রওনা হলে প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বলেন, যে শ্রমিক আপন দায়িত্ব যথা নিয়মে পালন করেছে, তার বিনিময় কি হতে পারে? এর উত্তরে ফেরেশতাগণ বলেন, হে আমদের মাবুদ! তাকে যেন পরিপূর্ণ বিনিময় ও পারিশ্রমিক দেয়া হয়। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ফেরেশতারা! তোমরাদেরকে সাক্ষী রেখে বলছি, রোযা ও তারাবীহের বিনিময়ে আমি তাদেরকে আমার সন্তুষ্টি ও ক্ষমা দান করলাম। এরপর তিনি বলেন, হে আমার প্রিয় বান্দরা! আমার কাছে প্রার্থনা কর। আমার ইজ্জত ও সম্মানের শপথ! আজ পরকালের ব্যাপারে তোমাদের সকল চাওয়াই পূর্ণ করব। আর দুনিয়ার ব্যাপারে যা তোমাদের জন্য মঙ্গল ও কল্যাণময় তাই মঞ্জুর করব। আমার ইজ্জতের কসম! তোমরা যতক্ষণ আমার প্রতি খেয়াল রাখবে, আমি ততক্ষণ তোমাদের পাপরাশীকে গোপন রাখব এবং তোমাদেরকে পাপিষ্ট কাফেরদের সামনে অপমানিত করব না। এখন তোমরা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে আপন ঘরে ফিরে যাও। তোমরা আমাকে রাজী করেছ, আমিও তোমাদের উপর রাজী হয়ে গিয়েছি। ফেরেশতাগণ উম্মতে মুহাম্মদীর এই অসাধারণ প্রাপ্তি দেখে আনন্দে আটখানা হয়ে যায়।” [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী: হাদীস নং ৩৪২১; আত তারগীব ওয়াত তারহীব : হাদীস নং ১৭৬৮]
এই হলো, ঈদের রাত ও দিনের ফযীলত ও মর্যাদা। কিন্তু আমদের কি আদৌ সেই খবর আছে? দুই ঈদে যে ইবাদতগুলো আদায় করা হয়, তন্মধ্যে দুই ঈদের নামায ও ঈদুল আযহায় কুরবানী তো সকলেরই জানা ও আবশ্যিক আমল। এর বাইরেও দুই ঈদে কিছু আমল রয়েছে, যেগুলো সুন্নত বা মুস্তাহাব পর্যায়ের এবং আমলগুলো বেশ সহজও বটে। কিন্তু আত্মবিস্মৃত মুসলিম উম্মাহর সিংহভাগই সেই মুস্তাহাব আমলগুলো জানে না। অনেকেই আবার জেনেও সেই দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। কেবল খোঁজে ইসলাম ও মুসলমনের দুশমন পশ্চিমাদের লাইফ স্টাইল। সেই আমলগুলো হলো : ১. ভোরে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠা। এ কথার অর্থ হচ্ছে, ফজরের নামাযের পূর্বে অন্য দিনের তুলনায় আগে উঠবে। এই অর্থ নয় যে, অন্য দিন সকাল ১০টায় ঘুম থেকে উঠতো, ঈদের দিন একটু আগে সকাল ৮ টায় উঠল। ২. মিসওয়াক করা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই মহান সুন্নতটি আজ চরমভাবে অবহেলিত। মুসলমানের সন্তানদের দৈনিক দু বেলা ব্রাশ করতে কোন কষ্ট বা অসুবিধা না হলেও প্রাণের নবীর প্রাণ প্রিয় সুন্নত মিসওয়াক করতে বড় কষ্ঠ হয়। মোবাইল, মানি ব্যাগ আর হাবিজাবি দিয়ে পকেট ঠাসা থাকলেও অসুবিধা হয় না, অসুবিধা হয় কেবল মিসওয়াকের মতো ছোট্ট বস্তুটি পকেটে রাখতে। অথচ এই মিসওয়াকের ফযীলত ঈর্ষণীয়, উপকারিতা অতুলনীয়, গুরুত্ব অভাবনীয়। সাহাবী হুযায়ফা রা. বলেন “মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে যখনই ঘুম থেকে উঠতেন, মিসওয়াক করতেন।” [বুখারী : হাদীস নং ২৪৫; মুসলিম : হাদীস নং ২৫৫; নাসাঈ : হাদীস নং ২]
সাহাবী আবু হুরায়রা রা. এর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর হবে, এই আশংকা না হতো, তাহলে প্রতি নামাযের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।” [মুসলিম : হাদীস নং ২৫৩; তিরমিযী : হাদীস নং ২৩]
অন্য বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মিসওয়াক মুখ পরিষ্কার করে ও আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হয়। [নাসাঈ : হাদীস নং ৫]
আম¥াজান আয়েশা রা. এর বর্ণনায় আছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, মিসওয়াক করে দুই রাকআত নামায আদায় করা মিসওয়াক ব্যতীত সত্তর রাকআত নামায হতেও উত্তম। [মাজমাউয যাওয়ায়িদ : ২/২৩৬, হাদীস নং ২৫৫৫]
বুখারী শরীফের এক বর্ণনায় আছে, “আম্মাজান আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পালার দিনে আমার ঘরে আমার হলকুম ও সীনার মধ্যস্থলে ওফাত লাভ করেন। (আমাদের নিয়ম ছিল) তিনি অসুস্থ হলে আমাদের কেউ সূরা ইখলাছ, নাস, ফালাক পড়ে তার শরীর মুছে দিতেন। নিয়ম অনুপাতে আমি তাঁর কাছে গেলাম সূরা ইখলাছ, নাস, ফালাক পড়ে তাঁর শরীর মুছে দিতে। তখন তিনি তাঁর মাথা আকাশের দিকে উঠিয়ে বললেন, “র্ফি রাফীকিল আ‘লা, র্ফি রাফীকিল আ‘লা” (ঊর্ধ্বলোকের বন্ধুর সাথে মিলিত হতে চাই, ঊর্ধ্বলোকের বন্ধুর সাথে মিলিত হতে চাই অর্থ্যাৎ আল্লাহর সাথে মিলিত হতে চাই) এ সময় (আমার ভাই) আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর আগমন করলেন। তার হাতে ছিল তাজা ডালের একটি মিসওয়াক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে দিকে তাকালেন। আমি বুঝতে পারলাম যে, তাঁর মিসওয়াকটির প্রয়োজন। আর্থ্যাৎ তিনি মিসওয়াক করতে চাচ্ছেন। তাই আমি আব্দুর রহমানের হাত থেকে মিসওয়াকটি নিয়ে সেটির মাথা চিবিয়ে পরিস্কার করে নবীজীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে দিলাম। (চিবানোর কারণ হলো, তখন মিসওয়াক চিবানোর মতো শক্তি তাঁর গায়ে ছিল না। যা বুখারীর অন্য বর্ণনায় আছে।) তখন তিনি এর দ্বারা আগের মত (সুস্থ অবস্থার মতো) সুন্দর করে মিসওয়াক করলেন। (বুখারীর অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি এত সুন্দর করে মিসওয়াক করলেন যে, ইতিপূর্বে আর কখনও তাকে এত সুন্দর করে মিসওয়াক করতে দেখিনি। [বুখারী : হাদীস নং ৪৪৩৮]
তারপর তিনি মিসওয়াকটি আমাকে দিলেন। এ অবস্থায় তাঁর হাত হেলে পড়ল বা তাঁর হাত থেকে মিসওয়াকটি পড়ে গেল। এরপর আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহ তাআলা আমার থুথুকে নবীজীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থুথুর সাথে মিলিয়ে দিলেন তাঁর দুনিয়ার জীবনের শেষ ও পরকালের প্রথম দিনে। [বুখারী : হাদীস নং ৪৪৫১]
পাঠক! একটু লক্ষ্য করুন, যে মিসওয়াকের কথা আমদের আত্মার স্পন্দন (তাঁর উপর আমার মা-বাবা উৎসর্গ হোক) মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ বেলায় শেষ নিঃশ্বাশ ত্যাগের মুহূর্তেও ভুলেননি; বরং পরম যতেœ তা করলেন। সেই মিসওয়াকের সুন্নত আজ গাফেল উম্মতে মুহাম্মদী কিভাবে বেমালুম ভুলে বসেছে? ফাতওয়া শামীতে আছে, মিসওয়াকের সত্তরেরও বেশী উপকারীতা রয়েছে। সর্বনি¤œ উপকারটি হলো মুখের অশুচি ও দুর্গন্ধ দূর হয় আর সর্বোচ্চটি হলো মৃত্যুর সময় কালীমা পাঠের তাওফীক হয়। [শামী : ১/১১৫]
৩. খুব ভালোভাবে গোসল করা। ৪. যথা সাধ্য উত্তম পোশাক পরিধান করা। নতুন হওয়া জরুরী নয়। এ ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়। ব্যাপারটি এ পর্যায়ে গড়িয়েছে যে, ধনি-গরিব, সচ্ছল-অসচ্ছল সকলেরই নতুন পোশাক লাগবেই লাগবে। না হলে মন খারাপ করে ঈদের নামাযে যায় না, বাইরে বের হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এ নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি ও মারামারির ঘটনাও ঘটে থাকে। এগুলো কোনমতেই কাম্য নয় এবং ভারসাম্যের ধর্ম ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং যে কাপড়গুলো আছে, সেগুলোর মধ্যে যেটা ভালো সেটাই পরিধান করবে। বড় আক্ষেপ লাগে তখন, যখন মিডিয়ায় খবর বের হয়, ঈদে দাদা-বাবুদের আবিস্কৃত পাখি আর কিরণমালা জামা না পেয়ে মুসলিম মেয়েরা আত্মহত্যা করে। ৫. শরীয়াতের নির্দেশ মুতাবিক সাজ-সজ্জা করা। এ কথার অর্থ হলো, ঈদের দিন সুন্নত তরীকায় চুল, গোঁফ কেটে এক মুষ্টির বেশী শ্মশ্রুম-িত মুখে সুন্নতী লেবাস পরিধান করবে আর মেয়েরা অন্দর মহলে বৈধতার ভিতরে থেকে সাজবে। এটাই কল্যাণের ধর্ম ইসলামের নির্দেশ। কিন্তু চরম হতাশাও আক্ষেপের কথা হলো, আজকের মুসলিম সমাজের অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো। ঈদের আগে কিন শেভ করে চুলগুলো বিখ্যাত কোন নায়কের স্টাইলে কেটে ঈদের দিন পরিধান করবে বিজাতীয় কোন পোশাক আর পাঞ্জাবী-পাজামা পরলে পাজামা থাকবে অবশ্যই টাখনুর নীচে। আর নারীরা অর্ধনগ্ন আবস্থায় রাস্তা-পার্ক ইত্যাদিতে ঘুরতে বের হবে। অথচ এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ ও খতরনাক অপরাধ। শেভ সর্ম্পকে সাহাবী ইবনে উমরের বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা করে দাড়ি লম্বা কর আর মোচ ছোট কর।” নাফে রহ. বলেন, ইবনে উমরের অভ্যাস ছিল, তিনি হজ বা উমরা করার সময় দাড়ির এক মুষ্টির বর্ধিত অংশ কেটে ফেলতেন। [বুখারী : হাদীস নং ৫৮৯২; মুসলিম : হদীস নং ২৫৯]
সাহাবী আবু হুরায়রা রা. এর বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা মোচ ছোট ও দাড়ি লম্বা করে অগ্নিপূজকদের বিরোধীতা কর।” [মুসলিম : হাদীস নং ২৬০; বুখারী : হাদীস নং ৫৮৯৩]
এ জাতীয় হাদীস সমূহের আলোকে চারও মাজহাবের ইমামগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত হয়েছেন যে, অন্তত এক মুষ্টি দাড়ি রাখা ওয়াজিব। শেভ করা বা উপড়ানো কিংবা ছেঁটে এক মুঠের চেয়ে কম করা হারাম এবং এক মুঠের বর্ধিত অংশ কেটে ফেলা জায়েয। উলামাগণ এ কথাও লিখেছেন যে, এক মুঠের কম দাড়ি ওয়ালা ব্যাক্তি সর্বদায় কবীরা গুনায় লিপ্ত থাকে। খেতে বসলেও কবীরা গুনাহ হয়, বাথরুমে গেলেও কবীরা গুনাহ হয়, ঘুমে থাকলেও কবীরা গুনাহ হয়। এক কথায়, সর্বাবস্থায় তার কবীরা গুনাহ হতে থাকে। এ ছাড়াও বর্ণিত হাদীস দুটিতে দাড়ি লম্ব আর মোচ খাটো করে মুশরিক ও অগ্নিপূজকদের বিরোধীতার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথচ আমরা মোচ লম্বা আর দাড়ি কেটে কিংবা দাড়ি শেভ করে তাদের বিরোধীতার পরিবর্তে সাদৃশ্যতা গ্রহণ করছি। অথচ এই সাদৃশ্যতার ব্যাপারেও এসেছে কঠোর হুঁশিয়ারী। সাহাবী ইবনে উমরের বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন “যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্যতা গ্রহণ করবে, কেয়ামত দিবসে সে তাদের দলভুক্ত হবে।” [আবু দাউদ : হাদীস নং ৪০৩১]
টাখনুর নিচে পাজামা বা কাপড় পরিধানের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরশাদ হচ্ছে, “যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে পাজামা, লঙ্গি ইত্যাদি পরিধান করবে, সে জাহান্নামে যাবে।” [বুখারী : হাদীস নং ৫৭৮৭; নাসাঈ : হাদীস নং ২০৭; তারগিব : হাদীস নং ৩১২২]

নারীদের বেপর্দা ও অর্ধনগ্ন অবস্থায় চলা ফেরার ব্যাপারেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানে উচ্চারিত হয়েছে কঠোর বাণী। সাহাবী আবু হুরায়রা রা. এর বাচনিক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, “দুই শ্রেণীর জাহান্নামী এমন আছে যাদেরকে আমি দেখিনি। ১. এমন জাতি, যাদের সাথে থাকবে গরুর লেজের ন্যায় চাবুক। এই চাবুক দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করবে। ২. সেসব নারী যারা কাপড় পরেও নগ্ন। তারা পর পুরুষকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও পর পুরুষের দিকে আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথা (চুল) বুখতী উটের কুঁজের মত হেলে থাকবে। তারা কখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ অনেক অনেক দূর থেকেও পাওয়া যাবে।” [মুসলিম : হাদীস নং ২১২৮]
যে সকল মুসলিম রমণী বিজাতীয় স্টাইল ও ফ্যাশনে অভ্যস্থ ও আসক্ত, তাদের উপরের হাদীসটি ভালভাবে স্মরণ রাখা উচিৎ। ৬. সুগন্ধি ব্যবহার করা। ৭. ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে কোন মিষ্টদ্রব্য খেয়ে যাওয়া। সেমাই বা পায়েশ জরুরী নয়। যে কোন ধরণের মিষ্টান্ন খেলেই সুন্নাত আদায় হবে। আর ঈদুল আযহায় কুরবানীর আগে কোন কিছু না খাওয়া সুন্নত। ৮. সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া। ৯. সদকায়ে ফিতর না দিয়ে থাকলে ঈদগাহে যাওয়ার আগে তা আদায় করা। ১০. ঈদগাহে যেয়ে ঈদের নামায আদায় করা। শরীয়াতসম্মত কোন ওযর ছাড়া এমনিতেই মসজিদে ঈদের জামাত পড়া মাকরুহ। ১১. পায়ে হেটে ঈদগাহে যাওয়া। ১২. ঈদগাহে যাওয়ার সময় ঈদুল ফিতরে আস্তে আর ঈদুল আযহায় উচু আওয়াযে নিচের তাকবীরটি পড়া। “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ”। ১৩. এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া, অন্য রাস্তা দিয়ে আসা। [রদ্দুল মুহতার ২/১৬৮-১৭০, ঈদের নামায অধ্যায়; বাদায়েউস সানায়ে : ১/২৭৯, ঈদের নামায অধ্যায়]
একজন মুমিনের এভাবেই ঈদ উদযাপন করা উচিৎ ছিল। কিন্তু নিদারুণ বাস্তবতা হচ্ছে, আজকের মুসলিম সমাজের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ঈদের দিনে উপরিউক্ত আমলগুলো তো পালিত হয়ই না; অধিকন্তু ঈদ উপলক্ষে পুরো দেশ পরিণত পাপের রাজ্যে। পাপে পাপে ভরে উঠে প্রতিটি ঘর। বিভিন্ন মহল থেকে আয়োজন করা হয় পাপের বিভিন্ন উপলক্ষের । ঈদ সামনে রেখে ভাল মানের নতুন সিনেমা মুক্তি দেয়া সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, টিভি চ্যানেলগুলো তো ঈদ উপলক্ষে মাসব্যাপি বিভিন্ন নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ নিয়ে তারা প্রতিযোগিতায়ও নামে যে, কারচে কে ভাল মানের অনুষ্ঠান পরিবেশন করতে পারে। অথচ ইসলামে সিনেমা, নাটক, গান-বাজনা ইত্যাদি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “এক শ্রেণীর লোক এমন রয়েছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশে ‘লাহওয়াল হাদীস’ তথা অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে করে ঠাট্টা-বিদ্রুপ। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” [সূরা লুকমান : আয়াত ৬]
আব্দুলাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, জাবের রা. ইমাম বুখারী, বায়হাকী, ইবনে জারীর প্রমুখ আয়াতে উল্লেখিত ‘লাহওয়াল হাদীস’ এর তাফসীর করেছেন গান-বাজনা করা। অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও তাফসীরবিদগণ এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেছেন, গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র, অনর্থক গল্প, উপন্যাস ও কিস্যা-কাহিনীসহ যে সকল বিষয় মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, সে সবই ‘লাহওয়াল হাদীস’ এর অন্তর্ভুক্ত। [মাআরিফুল কুরআন : ৭/৪]
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। তাদের সামনে গায়িকারা গান গাবে বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে। আল্লাহ তাআলা এদেরকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিবেন আর কতকের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও শুকরে পরিণত করে দিবেন।” [তাবরানী কাবীব : হাদীস নং ৩৪১৯; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী : হাদীস নং ৪৭৫৯; ইবনে মাজা : ২/৪০২০; ইবনে হিব্বান : হাদীস নং ৬৭৫৮]
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ইবনে আব্বাসের রা. বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা মদ, জুয়া, তবলা ও সারেঙ্গী হারাম করেছেন। [আবু দাউদ : হাদীস নং ৩৬৮৫]
এছাড়াও বহু প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস রয়েছে যাতে গান-বাদ্য হারাম ও নাজায়েয বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে রয়েছে বিশেষ সতর্কবাণী ও কঠিন শাস্তির ঘোষণা। এক শ্রেণীর মানুষ আবার এমন আছে, যারা ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাথেই মেতে উঠবে বিকট আওয়াজে ফটকা ফোটানো আর আতশবাজীতে, যা বিভিন্ন কারণে শরীয়াতে নিষিদ্ধ ও হারাম। এ ছাড়াও ঈদের ফযীলতময় রাতে ইবাদতের পরিবর্তে কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকে সারারাত। এরপর ঘুমাতে যায় শেষ রাতে। ফলে ঘুম থেকে উঠে ঈদের জামাতের পূর্ব মুহূর্তে। অনন্তর কোনমতে গোসল সেরে চোখে রাজ্যের ঘুম নিয়ে উপস্থিত হয় ঈদগাহে। তারপর দায়সারাভাবে নামায শেষ করে মেতে উঠে বিভিন্ন ধরণের গুনাহের কাজে। সিনেমা হলে কিংবা টিভি চ্যানেলে সিনেমা, নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখা এবং জুয়া খেলায় লিপ্ত হওয়া যেন ঈদের দিনের অপরিহার্য রুটিন। এগুলোতে অংশ না নিলে যেন পেটের ভাত হজম হবে না। সিনেমা, নাটকের ভয়াবহতা তো একটু আগেই আলোচনা হলো। আর জুয়াও তো কুরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে ভয়াবহ ও জঘন্যতম অপরাধ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর ঘৃণ্য বস্তু ও শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর। এতে তোমরা (ইহকাল-পরকালে) সফল হবে। নিশ্চয় শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্ধেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে। অতএব তোমরা কি এ কাজগুলো পরিহার করবে? [সূরা মায়েদা : আয়াত ৯০-৯১]
এক হাদীসে আছে, আব্দুর রহমান রহ. বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি জুয়া খেলে অতঃপর নামায পড়তে দাঁড়ায় তার দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যে বমি বা শুকরের রক্ত দিয়ে অযু করে। [আল মুজামুল কাবীর : তাবারানী : হাদীস নং ৭৪৮]
সবশেষে বুকভরা আশা নিয়ে বলি, আপন বিভায় জ্বলে উঠুক ঈদুল ফিতর-ঈদুল আযহা। সুন্নতে নববীর আলোয় আলোকিত হোক আমাদের ঈদ।
লেখক : গ্রন্থ প্রণেতা, ধর্মীয় গবেষক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস জামিয়া মিফতাহুল উলুম নেত্রকোনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight