সুখ / নাঈমা তামান্না

অত্যাধুনিক সাজসজ্জা। বাইরে বর্ণিল আলোকচ্ছটা। ভেতরে আবছা অন্ধকার। অবশ করা আলো-আঁধারির মিলনমেলা। এরই মধ্যে চলে প্রেমিক প্রেমিকা জুটির আড্ডা মাদকতা। সিলিংয়ে ঝোলানো লাখটাকার ঝাড়বাতি মিটমিট করে জ্বলছে। নরম গদির পরিপাটি আরাম কেদারায় দেহ এলিয়ে বসে থাকে তারা। টেবিলের নিচ দিয়ে কখনো পায়ে পা স্পর্শ করে প্রেমও উপভোগ করে। ফিসফিসিয়ে তাদের চলে মধুর প্রেমালাপ। কখনো হাত ছুঁয়ে দেয় ইচ্ছা অনিচ্ছায়
রাজ্যের নিরবতা সবটুকু বিরাজ করে সেখানে। কান পাতলে যেনো নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাবে। কিছুণ পর রেস্টুরেন্ট বয় তাদের ঠিক করে দেয়া মেন্যু নিয়ে হাজির হয়। নীরবতা ভেঙে কাঁটাচামচ-ছুরির ফলা দিয়ে টুংটাং শব্দে মাছ মাংসের গ্রিল কেটে খায়। কিছু খায় কিছু ঝুটা করে টিস্যুতে হাত মুছে পাঁচ-দশটাকা বকশিস গুঁজে প্রেমিকার কোমর জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে। এই হলো এখনকার প্রেম। কতকটা অবৈধ নষ্ট প্রেম। আর কিছু অপচয়।
প্রেম ছিলো তাঁদেরও। ভাঙাচোরা জরাজীর্ণ চার দেয়ালের একটি ঘর।সেই ঘরে তেলের অভাবে বাতি জ্বলে না এমন দিনও যায়। মাটিতে বিছানো এক টুকরো দস্তরখান। কিছু শুকনো রুটি এককৌটা মধু। এইতো ব্যাস! প্রেমিক প্রেমিকার নিশ্চুপ ভালোবাসার দৃষ্টি পরস্পরে প্রেম নিবদেন হয় সে ঘরেও। কখনো ফিসফিসিয়ে নরম গলায় কানেমুখে প্রেমের আলাপও চলে।
আরবের মদীনার সে ঘর। প্রেমিক যুগল সম্মানিত আনসারি সাহাবী সাহাবিয়্যা। সাহাবী একদিন বের হলেন ঘর থেকে প্রিয়তমার কাছে বিদায় নিয়ে। স্ত্রী দুআ পড়ে স্বামীকে বিদায় জানালেন। সাহাবি প্রিয় রাসুলের সান্নিধ্যে যাবেন তাঁর পরশে চক্ষু-হৃদয় শীতল করতে।
রাসুলের দরবারে গিয়ে দেখেন রাসুল এক মেহমানের জন্য খাবার তৈরী করতে অন্দরমহলে খবর পাঠিয়েছেন বিবিদের কাছে। খবর এলো বাড়তে পানি ছাড়া খাবার মত কিছু নেই। রাসুল সাহাবাদের দিকে ঘুরে বললেন – কে আছো এই ব্যক্তির মেহমানদারী করাবে? কে এই আছো মহান পুণ্য হাসিল করবে! রাসুলের মেহমানের মেহমানদারী করবে কেউ আছো?
সেই আনসারি সাহাবির বুকে স্পন্দন বেড়ে গেলো। বুকে তোলপাড় শুরু হলো মহান এই সাওয়াব অর্জনে। সে তো নিশ্চিত বাড়তে তাঁর চোখের মণি প্রিয়তমা স্ত্রী খাবারের কিছু না কিছু ব্যবস্থা করেই ফেলবে। তাই কাল বিলম্ব না করে বলেই ফেললেন, আমি! ইয়া রাসুলাল্লাহ আমাকে এই সুযোগদানে ধন্য করুন।
রাসুল মুচকি হেসে অনুমতি দিয়ে দিলেন। সাহাবি রাসুলের মেহমান সঙ্গে য়ে বাড়ির পথ ধরলেন। দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দে স্ত্রী দৌড় এসে দরোজা খুলে দেন। হাসিমাখা ঠোঁটে স্বামীকে বরণ করেন। স্বামী জানালেন রাসুলের মেহমান আছে সঙ্গে। এদের খানাপিনার এন্তেজাম করো। ঘরে কি আছে না আছে, বা তুমি এখন রাঁধতে পারবে কি পারবে না, এসব কোনো কথা নেই। সরাসরি বলে দিলেন খাবারের ব্যবস্থা করতে। তাঁর চরম আত্মবিশ্বাস বিবি পারবেই।
মুহূর্তে কেঁপে উঠলেন তিনি। সুবহানাল্লাহ, রাসুলের মেহমান? তৎণাৎ দু’চোখ ঘুরিয়ে আনলেন হেঁশেলের দেয়ালে দেয়ালে। কি আছে, কি আপ্যায়ন করাবেন। লজ্জিত কণ্ঠে স্বামীকে জানালেন, বাচ্চাদের আহারটুকু ছাড়া আর কিছু নেই যে ঘরে!
সাহাবি মনমরা হয়ে কিছু সময় চুপ করে রইলেন। একটু পরই হেসে উঠলেন। বউ বুদ্ধি পেয়েছি, তুমি এক কাজ করো, বাচ্চাদের খাবারটাই প্রস্তুত করো আর বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও।
সেই কথা মত বিবি চলে গেলেন বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতে। না একটাবার প্রশ্ন করলেন বাচ্চারা কী খাবে বা একটু অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। ছোট অবুঝ বাচ্চাদেরকে বুকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন ুধার্ত রেখেই। বুক ফেটে যাচ্ছিলো তার। কিন্তু রাসুলের মেহমান তার ঘরে এই ভেবে গর্বে বুক ভরে যাচ্ছিলো। এক তো রাসুলের মেহমান দ্বিতীয়ত স্বামী নিয়ে এসেছেন তাই স্বামীরও মেহমান। কত সৌভাগ্য তাঁর। আনন্দে হৃদয় পূর্ণ হয়ে এলো। কৃতজ্ঞতায় নত হলো শির মহামহীয়ান আল্লাহ সুবহানের কদমে।
বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লে উঠে খাবার প্রস্তুত করলে দস্তরে সাজালেন। না ছিলো দামী ঝাড়বাতির নিয়ন আলো না ছিলো আড়ম্বর নরম গালিচা। না ছিলো সেখানে কোনো বিলাসী আরাম কেদারা। মেহমানদের খেতে বসিয়ে তিনি উঠে গেলেন। নিভু নিভু আলোর বাতিখানা ঠিক করার বাহানায় একদম নিভিয়ে দিলেন। বাতিটা নষ্ট হয়ে গেলো, জ্বালানো যাচ্ছে না এমম একটা ভাব তৈরী করে স্বামী স্ত্রী দুজনেই এসে দস্তরে বসলেন। খাওয়ার মত করে খালি বাসনে হাত নাড়াচ্ছেন যেন মেহমান কিছু বুঝতে না পারে। কারণ মেজবান শরীক না হলে মেহমান খেতে কিছুটা বিব্রত বোধ করে। মেহমান যেন তৃপ্তিপুরে খেতে পারেন তাই এতকিছু করা!
মেহমান পেট ভরে খেয়ে উঠলেন। আর ঘরের সবাই অনাহারে রাত কাটালেন। কিন্তু ত্যাগের স্বাদে সিক্ত হলেন পরিপূর্ণ। ত্যাগের এই সুখ নামী দামী আলিশান রেস্টুরেন্ট রেস্তোরাঁয় এসি ঘরের শীতল হাওয়ায় মিলবে না। এ সুখ, এ তৃপ্তি চাইনিজ, বীফ বার্গার, আর আস্ত মুরগীর গ্রিলেও পাওয়া যাবে না। শুধু সেই জানে এই সুখ আর তৃপ্তি যে আল্লাহর জন্য ত্যাগ করতে পারে। নিজে না খেয়ে অন্যকে খাইয়ে সে তৃপ্ত দুষ্টিতে এ সুখ।
পরবর্তী দিন সকালে রাসুলের দরবারে গেলেন সাহাবি। তাকে আশ্চর্য করে দিয়ে আল্লাহর রাসুল সংবাদ দিলেন, আল্লাহ তোমার কাল রাতের মেহমানদারী ও ত্যাগের কারণে খুব খুশী হয়েছেন।
সাহাবী মাথা নিচু করে কৃতজ্ঞতার আশু মুছলেন।
প্রেম ভালোবাসা ছাড়া এ জীবন রসকষহীন শুষ্ক মরু। ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই আমাদের জীবন আবর্তিত হয়। ভালোবাসা একটি বিমূর্ত বিষয়। এই পৃথিবীতে কেউ একা চলতে পারে না। সমাজ পরিবার পড়শি সবাই সবার প্রতি যদি প্রেম অনুভব না করত তবে একটি সমাজ হত না, পরিবার হত না। পরষ্পরে হৃদ্যতা বলতে কিছু থাকতো না। এই প্রেম ছিলো আসমানেও। আল্লাহ তায়ালা আদমকে সৃষ্টি করে একা ফেলে রাখেন নি। তার ভেতর আবেগ অনুভূতি প্রেম ঢেলে দিয়েছেন আর সেই প্রয়োজনে সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন হাওয়া আ. কে। সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই মানুষ প্রেমে পড়ে। এই প্রয়োজনীয়তা, এই অনুভব আল্লাহ প্রদত্ত, সহজাত এবং চিরন্তন একটি বিষয়। সৃষ্টির সূচনা থেকেই এখন পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষের জীবনে প্রেম সবচে পুরনো এক অনুভূতি। প্রেম ছিলো,
এই প্রেম ছিলো আসমানেও। আল্লাহ তায়ালা আদমকে সৃষ্টি করে একা ফেলে রাখেন নি। তার ভেতর আবেগ অনুভূতি প্রেম ঢেলে দিয়েছেন আর সেই প্রয়োজনে সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন হাওয়া আ.-কে। সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই মানুষ প্রেমে পড়ে। এই প্রয়োজনীয়তা, এই অনুভব আল্লাহ প্রদত্ত, সহজাত এবং চিরন্তন একটি বিষয়। সৃষ্টির সূচনা থেকেই এখন পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষের জীবনে প্রেম সবচে পুরনো এক অনুভূতি। প্রেম ছিলো, আছে থাকবে ধরায় যতদিন সত্যিকার থাকে। কিন্তু আমরা ভালোবাসা বলতে কি জানি? ভালোবাসা মানেই দুজন প্রাপ্তবয়স্ক কপোত কপোতির মন দেয়া নেয়া নয়। ভালোবাসা মানে নামী দামী রেস্টুরেন্টে আয়েশি খাওয়া দাওয়া আর খাবার অপচয় নয়। ভালোবাসা মানে নিত্যনতুন স্যামসাং আইফোনের হিড়িক নয়।
নবী রাসুল সাহাবী, সকলের জীবনেই প্রেমময়। তাঁরাও ভালোবাসতেন মা’কে বাবা ভাই সন্তান পরিবার পড়শী সকলকে। ভালোবাসতেন প্রিয়তমা স্ত্রীকে। ভালোবাসতেন দ্বীন ধর্ম শরীয়ত। প্রাণ বিসর্জন দেয়ার মত দুঃসাহসী ভালোবাসা ছিলো তাঁদের। সবকিছুর উপর তাঁরা ধর্মকে প্রাধান্য দিতেন। দিবেন না-ই বা কেন? যে ধর্ম তাকে পশু থেকে মানুষ বানিয়েছে। ভালোবাসতে শিখিয়েছে। পরস্পরে কাটাকাটি হানাহানি, ক্রোধের আগুনে পানি ঢেলেছে। সেই ধর্মকে, সেই ইসলামকে জানের চাইতে বেশি ভালোবাসবেন না তো কাকে বাসবেন?
অথচ আমরা কোথায়! আমাদের কাছে প্রেমের অর্থ কি! কতটা ত্যাগ করেছি আমরা। আবার আমরা ও কিনা প্রেম পবিত্রের বুলি আওড়াই!
মেয়ে! হয়ত তোমার স্বামীর সামর্থ্য হবে না তোমাকে নিয়ে নামিদামি হোটেল রেস্তোরায় ডেটিংয়ে যাবে। বিলাসবহুল আয়েশি জীবন হয়ত দিতে পারবে না তোমায়। তুমি সে হিসেব কষতে যেও না কি পেলে কি পেলে না। আল্লাহর ফায়সালা মেনে যা পেয়েছো তাতেই কৃতজ্ঞ হও। আল্লাহর জন্য ত্যাগ করো সব। স্বামীর শীতল দৃষ্টিতে যে প্রেম ভালোবাসা পাবে তা তোমার ছোট্ট কুড়ে ঘরকে রাজপ্রাসাদ বানিয়ে দেবে তুমি দেখো! শুধু একবার দেখো-ই না। চারপাশে তখন কেবল সুখ আর সুখ দেখবে এই সাহাবী দম্পতির মতন। না খেয়েও কেমন স্বর্গীয় সুখ ….।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight