সীরাতুন্নবীর আলোয় আলোকিত হোক আমাদের জীবন : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

মহানবীর সা. ব্যক্তিত্ব কোন সাধারণ ব্যক্তিত্ব নয়; বরং তা এক অনুপম আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। যে অনুপম আদর্শ ব্যক্তি জীবন, সামাজিক জীবন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলসহ সকল ক্ষেত্রেই পরিব্যপ্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক বিষ্ময়কর মহা-মানবের সন্ধান পাওয়া যায় যাদের চিন্তা-চেতনা ও দর্শন সারা বিশ্বে বিষ্ময়করভাবে বিস্তার লাভ করেছে এবং তাদের সুমহান আদর্শ ও কৃতিত্বের কারণে মানুষ আজও শ্রদ্ধা ও ভক্তি ভরে স্মরণ করে থাকে। এই সকল মহামনিষীর কারো কারো গ্রহণযোগ্যতা স্বীয় প্রতিভা, নিজস্ব চিন্তা, দর্শন ও প্রজ্ঞার ফসল আর কারো কারো গ্রহণযোগ্যতা সরাসরি ওহীয়ে এলাহী থেকে আহরিত ও উৎসারিত প্রজ্ঞা ও প্রতিভার ফসল। নবীয়ে রহমত দুজাহানের সর্দার মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. ঐ সব মহামানবের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ। তার পূর্ণতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশ্বজনীনতা অন্যদের চেয়ে আলাদা ও স্বতন্ত্র। যা কোন যুগ, কাল, জীবন কিংবা ভৌগলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। সকল সীমা ছাড়িয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিসৃত ও বিরাজিত। জলে-স্থলে, পাহাড়ে-জঙ্গলে, আপন-পর সকলে তার থেকে উপকৃত হয়েছে, হচ্ছে এবং কিয়ামত অবধি হতে থাকবে। যে মহামানবের  শান ও মর্যাদা এ পর্যায়ের এবং যার করুণা ও ভালবাসায় সিক্ত কুল মাখলুক। সেই মহামানবের সীরাত তথা জীবনচরিত অধ্যয়ন সকল মানবের জন্য মানবতার দাবী-আর মুমিনের জন্য ঈমানের দাবী। এই সত্য বাস্তবতাকে যারা উপলদ্ধি করেনা তারা কেবল নিজেরই দুশমন নয় গোটা মানবতারও দুশমন। কারণ মানব-দানবসহ সকল সৃষ্টির কল্যাণ ও মঙ্গলকামী যদি কেউ থেকে থাকেন তাহলে রহমতের মূর্তপ্রতিক সেই সত্ত্বাই যার উপরে শত-সহস্র দুরুদ-সালাম। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- “আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরুপই প্রেরণ করেছি।” [সূরা আম্বিয়া: ১০৭]মানব-দানব, জীবজন্তু, জড়পদার্থসমূহ সবই উক্ত আয়াতে ব্যবহারিত “আলামীন” শব্দের অন্তর্ভূক্ত।” [মাআরিফুল কুরআন: ৬/২৪৫] এক হাদীসে মহানবী সা. বলেন- “আমি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে প্রেরিত রহমত।” [মাআরিফুল কুরআন: ৬/২৪৫] হযরত ইবনে উমরের রা. বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ্ সা. আরও বলেন- আমি আল্লাহ্র প্রেরিত রহমত, যেন আল্লাহ্র আদেশ পালনকারী সম্প্রদায়কে গৌরবের উচ্চ আসনে আসীন করি। আর আল্লাহ্র নির্দেশ অমান্যকারী সম্প্রদায়কে অধঃপতিত করে দেই। [ইবনে কাসীর, মাআরিফুল কুরআন: ৬/২৪৫] এতদ্ভিন্ন সীরাত পাঠে রয়েছে ইহকাল-পরকালের প্রভূত কল্যাণ। এখানে বলে রাখি, সীরাত পাঠের সাধারণ দৃষ্টিকোণের সাথে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। কারণ অমুসলিমগণ সীরাত অধ্যয়ন করে কেবল মাত্র তাদের জ্ঞানবৃদ্ধি ও জাগতিক প্রয়োজনে। পক্ষান্তরে একজন মুসলমানের জন্য রাসূলুল্লাহ্র সা. সীরাত পাঠ শুধুই জ্ঞানবৃদ্ধি ও জাগতিক প্রয়োজনেই নয়, বরং এটা তার জ্ঞানবৃদ্ধি ও জাগতিক প্রয়োজনের পাশাপাশি দ্বীনী প্রয়োজন ও পবিত্র ইবাদত। আমরা যখন সীরাত পাঠ করব তখন দেখতে পাব যে, তাঁর কর্মজীবনের সকল ক্ষেত্রেই তিনি একজন সফল পুরুষ। তিনি যেমন ছিলেন একজন সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষ, তেমনি ছিলেন একজন রহমদিল দায়ী ও অভিভাবক। তিনি যেমন ছিলেন একজন সীমাহীন ধৈর্য্যশীল ও কৃতজ্ঞ বান্দা তেমনি ছিলেন বিরাট শানদার ও মর্যাদাবান এক মহাপুরুষ। যেমন ছিলেন একজন উত্তম ও অকৃত্রিম বন্ধু, তেমনি ছিলেন একজন আদর্শ পিতা ও স্বামী। যেমন ছিলেন রাতে জাগরণকারী মহাসাধক, তেমনি ছিলেন দিনে মুজাহিদ ও সফল সেনানায়ক। যেমন ছিলেন এক অতুলনীয় ন্যায়পরায়ণ শাসক ও লিডার, তেমনি ছিলেন একজন অকৃত্রিম সমাজসেবক ও রাজনৈতিক ময়দানের বিচক্ষণ সিপাহ্সালার। সর্বোপরি তিনি ছিলেন গভীর চিন্তাশীল ও উম্মাহ্র দরদে দরদী এক মহামানব। এক কথায় বলা যায়, একজন মানুষ অনুকরণীয় হওয়ার জন্য যতগুলো দিক ও গুণ প্রয়োজন সবই ছিল তাঁর মাঝে পূর্ণ-মাত্রায়। এ জন্যই কুরআনে কারীমে তাঁকে উসওয়ায়ে হাসানা বা উত্তম মডেল বলে তাঁর আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন- “যারা আল্লাহ্ ও পরকালে আশা রাখে আর আল্লাহ্কে স্মরণ করে অধিক পরিমাণে, তাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহ্ সা. এর মাঝে উসওয়ায়ে হাসানা তথা উত্তম আদর্শ।” [সূরা আহযাব: ২১] “তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্ ও রাসূলের। আর যদি তাদের আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল মাত্র সুষ্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।” [সূরা তাগাবুন: ১২] তাঁর এই উসওয়ায়ে হাসানাকে যারা জীবন চলার পথের পাথেয় বানাবে, নিজের জীবনে প্রতিফলিত করবে তাঁর দর্শন ও মতাদর্শকে এবং অনুসরণ করবে তাঁর পদাঙ্ক, তার জীবন হবে সুশোভিত ও সাফল্যমণ্ডিত। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- “যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করবে, সে অবশ্যই “মহাসাফল্য” অর্জন করবে।” [সূরা আহযাব: ৭১] কি সেই মহাসাফল্য? সেই মহাসাফল্য হলো, দুনিয়াতে “হায়াতে তাইয়্যিবা” তথা দুনিয়ায় পবিত্র ও আনন্দময় জীবন এবং আখেরাতে পরম শান্তির নিবাস জান্নাত ও জান্নাতের তুলনাহীন নিয়ামতরাজী লাভ। [তাওবা: ১০০ ছফ: ১২] তাইতো দেখি তেইশ বছরের অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে মহানবীর সা. তুলনাহীন জীবন-পদ্ধতি ও সীরাতে তাইয়্যিবার অনুসরণ করে আরব ভূখণ্ডের অশিক্ষিত বর্বর, অশৃঙ্খল, দ্বন্দ্ববাজ, যুদ্ধবাজ, মানুষের অধিকার হরণকারী এবং কন্যা সন্তানকে জ্যান্ত কবরদানকারী মানুষগুলোই পরিণত হলেন একটি সুশিক্ষিত, সুসভ্য, নজীরবিহীন সুশৃঙ্খল, শান্তিপ্রিয়, চরিত্রবান, আদর্শবান, মানুষের অধিকার রক্ষাকারী, নারী-জাতির ইজ্জত-আব্রু ও অধিকার হেফাজতকারী জাতিতে। সর্বোপরি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সা. দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করলেন এই সুমহান জামাত আগত প্রজন্মের “রোল মডেল” ও “নির্দিধায় অনুসরণীয়” জামাত। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন- “অতএব তারা যদি ঈমান আনে তোমাদের (রাসূল সা. ও সাহাবা রা.) ঈমান আনার মত তবেই তারা হিদায়াত পাবে। আর যদি ঈমান না এনে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই চরম ভ্রষ্ঠতায় রয়েছে।” [বাকারা. ১৩৭] “যারা প্রথম অগ্রগামী অর্থাৎ আনসার ও মুহাজিরগণ এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, তাদের প্রতি আল্লাহ্ সন্তুষ্ট হয়েছেন। সে সমস্ত লোকদের জন্য আল্লাহ্ প্রস্তুত রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় প্রসবনসমূহ। তথায় তারা থাকবে চিরকাল; এটা মহাসাফল্য।” [সূরা তাওবা: ১০০] সাহাবায়ে কিরামের শ্রেষ্ঠত্বের সার্টিফিকেট দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন “সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ হলো আমার যামানার মানুষ অর্থাৎ সাহাবাগণের সুমহান জামাত।” [বুখারী- হাদীস: ৩৬৫১; তিরমিযী: ২/২২৫] অপর বর্ণনায় মহানবী সা. বলেন, যে ভূখণ্ডেই আমার কোন সাহাবীর মৃত্যু হবে, কিয়ামত দিবসে আমার সেই সাহাবী সেই ভূখণ্ডের অধিবাসীদের জন্য নূর ও লিডার হয়ে উত্থিত হবে।” [তিরমিযী: ২/২২৫] সুবহানাল্লাহ্! কি সুমহান মর্যাদা ও অভাবনীয় শান! সেই মহাপুরুষের পরশে পৃথিবীর এই চরম নিন্দিত মানুষগুলো পরম নন্দিত ও বরণীয় মানুষে পরিণত হলো তাঁর উপর আমার পিতা-মাতা কুরবান। এ যুগ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগ। পৃথিবী এগিয়ে চলছে লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার মতো। নিত্য-নতুন আবিষ্কার আর উদ্ভাবনে পৃথিবী ঝলমল করছে। আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে সারা দুনিয়াকে। চারদিকে ভোগ্য-সামগ্রীর সয়লাব। শহর তো শহর, অজপাড়াগাঁও আধুনিকতার সাজে সজ্জিত। শুধু উন্নতি হয়নি মানবতার। চরিত্র ও নৈতিকতা বিদায়ের পথে। সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন ছিন্নপ্রায়। শান্তি ও নিরাপত্তা স্বপ্নবিলাস। চারিদিকে শুধু ভয় ও শংকা। কখন কোথায় কি হয়ে যায় কারোরই জানা নেই। সর্বোপরি অশান্তি ও অনিরাপত্তা এভাবে জেঁকে বসেছে যে, শান্তির হাজার উপকরণ উদ্ভাবন করেও শান্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। ইতিহাস সাক্ষি, এমনই অবর্ণনীয় অবস্থা দেড় হাজার বছর আগেও একবার পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছিল। যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিল মানবিকতা। শুধুই আরব ভূখণ্ড নয়, সারা বিশ্বেই চলছিল ত্রাসের রাজত্ব। সর্বত্রই বিরাজিত ছিল ভয় ও আতংক। ন্যায়নীতি ও নিরাপত্তা বলতে কিছুই ছিলনা। মানুষের কোন মূল্য মানুষের কাছে ছিলনা। জ্যান্ত কবর দেয়া হতো কন্যাসন্তানদের। দাস-দাসীরা ছিল পশুতুল্য। মদ, জুয়া, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানিসহ সকল প্রকার অন্যায়-অপরাধ ও অশ্লীলতা ছিল সাধারণ বিষয়। পৃথিবীব্যাপী কায়েম হয়েছিল “জোর যার মুল্লুক তার” এর ন্যায় ভ্রষ্ট নীতি। পৃথিবীর সেই কঠিনতম সময়েই আরবের মাটিতে আগমন করেন মানবতার মুক্তির দিশারী রাহমাতুল্লিল আলামীন। তিনি ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে আপন অনুপম চরিত্র মাধূরী ও পবিত্র জীবন পদ্ধতি দিয়ে গোটা আরব ভূখণ্ডের রুপ পাল্টিয়ে দিলেন। পৃথিবীকে উপহার দিলেন মানবতার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম জামাত। যাদের নাম শোনলে মনের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে “রাযিয়াল্লাহু আনহুম”। সেই মহান জামাত রাসূলুল্লাহ্র সা. তিরোধানের এক দশকের মধ্যেই আরব ভূখণ্ডের সেই আলো ছড়িয়ে দিলেন গোটা বিশ্বে। সীরাতে তাইয়্যিবার আলোকে এমন রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করলেন যার নজীর পেশ করতে পৃথিবীর ইতিহাস অক্ষম। যার বিস্তারিত বিবরণ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ। তাই আজো প্রয়োজন সেই সীরাতে তাইয়্যিবার বাস্তব অনুশীলন। যদি বর্তমান বিশ্ব বাস্তবিক পক্ষেই বস্তুগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি চারিত্রিক, নৈতিক ও আত্মিক উৎকর্ষতা চায় এবং স্বপ্ন দেখে মানুষকে একটি নিরাপদ, শান্তিময় ও সুন্দর জীবন ব্যবস্থা উপহার দিতে তাহলে অবশ্যই রাসূলের অনুপম আদর্শ ও সীরাতে তাইয়্যিবাকেই আকড়ে ধরতে হবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে। আলোকিত হতে হবে সেই আলোতেই। কারণ রাসূলুল্লাহ্র সা. সীরাতে তাইয়্যিবাহ্ সর্বকালের সর্বপ্রকার মানুষের জন্য কল্যাণময় এক আদর্শ। এজন্য হলফ করে বলতে পারি বর্তমান সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে একমাত্র সীরাতে নববীতেই। তাই আমাদের সকলের জীবন আলোকিত হোক সীরাতুন্নবীর আলোতে।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া মিফতাহুল উলুম, নেত্রকোণা।

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ সীরাতুন্নবীর আলোয় আলোকিত হোক আমাদের জীবন : মুফতী পিয়ার মাহমুদ

  1. Mahmuda Rahman says:

    সত্যিই রাসূলের জীবনে আমাদের শিক্ষার বিষয় রয়েছে। রাসূলের জীবনে কিভাবে আমাদের আদর্শ রয়েছে কুব চমতকার ভাবে ফুটিয়েছেন জনাব লেখক। আপনাকে ধন্যবাদ। আল্লাহ উত্তম বদলা দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight