সিয়াম ও সাস্থ্য : আজমেরী মারিয়ম মেরী

Ram

এখন চলছে সিয়াম সাধনার পবিত্র মাস রমজান মাস। পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনা অর্থাৎ রোযা সর্বশক্তিমান আল্লাহর আনুগত্যের একটি। পবিত্র কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।”[সূরা বাকারা ২: ১৮৩]
রোযা একটি ফরয ইবাদত এবং মানুষ ও তার রবের সাথে একান্ত ব্যক্তিগত একটি সম্পর্ক। রোযার বিনিময় হিসেবে আল্লাহ নিশ্চিত পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে, “আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য, একমাত্র রোযা ব্যতীত। রোযা শুধু আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।”
পবিত্র মাহে রমজানের রোযা আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া তথা খোদা-ভীতি অর্জনের এক বিশেষ প্রশিক্ষণ। এ মাসে বিশ্বাসী মুসলমানগণ এক আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে বিরত হয়ে, কঠোর সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। শুধু তাই নয়, রোযা অবস্থায় হালাল খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা থেকেও  বিরত থাকেন। পবিত্র রমজান মাসে আত্মশুদ্ধি  অর্জনের এই যে বিশেষ প্রশিক্ষণ এতে  যে শুধু আত্মিক উন্নতি সাধিত হয় তাই নয়। আমাদের শারীরিক ও মানসিক উন্নয়নও ঘটে থাকে এই রহমতের রমজানে।
হাজার হাজার বছর আগ থেকেই প্রায় সব ধর্মের অনুসারীরা বিভিন্নভাবে রোযা পালন করে আসছেন। বিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত রোযা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হত। কিন্তু বর্তমান কালের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন রোযার শারীরিক ও মানসিক উপকারিতাও রয়েছে।
রোযার স্বাস্থ্যগত দিক নিয়ে ১৯৯৪ সালে মরক্কোতে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে সারা বিশ্বের মুসলিম এবং অমুসলিম গবেষকদের প্রায় ৫০টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। রোযার স্বাস্থ্যগত উপকারিতার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হলো:
পরিপাকতন্ত্রের বিশ্রাম: রমজান মাস পরিপাকতন্ত্রের জন্য বিশ্রামের সময়। এ সময় খাদ্য পরিপাকের প্রধান ফ্যাক্টরি যকৃতও বিশ্রামে থাকে। ফলে পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশ নতুনভাবে মেরামত করার সুযোগ পায় ।
আংশিক ওজন কমা: স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণের পর খাদ্যের পরিপাক-কৃত অংশ পেশীওযকৃতে জমা থাকে এবং  অতিরিক্ত অংশ চর্বি আকারে শরীরে জমা হয়। আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে শক্তি সরবরাহ আসে রক্তের সুগার থেকে। রোযার সময় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার দরুন রক্তের সুগার লেভেল কমে যায় । রক্তের সুগার লেভেল বজায় রাখার জন্য যকৃতের গ্লাইকোজেন ভেঙে শক্তি সরবরাহ শুরু হয়। যকৃতের গ্লাইকোজেন শেষ হওয়ার পর চর্বি ভেঙে রক্তের সুগার লেভেল বজায় রাখা হয়। অর্থাৎ রোযা রাখলে দেহের অতিরিক্ত চর্বি খরচ হয় এবং শরীরের ওজন আংশিক কমে। তাই যারা স্থূলতা ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন তাদের জন্য রোযা একটি চিকিৎসা স্বরূপ।
শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে:  আমাদের শরীরে প্রতিদিন নানা রকম বিষাক্ত পদার্থ জমা হচ্ছে। দূষিত বাতাস, পানি, খাবারে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ, ঔষধ ইত্যাদি প্রতিদিন আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে আমাদের অজান্তে। আর এই সব বিষাক্ত পদার্থ জমা হয় দেহের চর্বিতে। রোযা রাখলে যেহেতু চর্বি খরচ হয়, তাই চর্বির সাথে এই বিষাক্ত পদার্থগুলোও শরীর থেকে বের হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় উবঃড়ীরভরপধঃরড়হ.
রক্তের কোলেস্টেরল: বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায় যে রোযা রাখলে রক্তের কোলেস্টেরল এর মাত্রা কমে। এর ফলে রক্তবাহী ধমনীতে চাপ কমে যায়। ফলস্বরূপ উচ্চ-রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোক এর ঝুঁকি কমে। রক্তে স্বল্পমাত্রার কোলেস্টেরল পিত্তাশয়ের পাথর হওয়া প্রতিরোধ করে।
কিডনি: গবেষণায় দেখা যায় যে ১০-১২ ঘণ্টা পানি পান না করলে তা কিডনির জন্য ক্ষতিকর নয় বরং উপকারী। এতে শরীরে সামান্য পানিশূন্যতা হয় মাত্র। অপরদিকে বর্জ্য নিষ্কাকনের দায়িত্ব থেকে দুটো কিডনিই কম সময়ের জন্য হলেও রেহাই পায়। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, আমাদের প্রিয় নবীর সুন্নাত হলো শেষ রাতে সাহরী করা। এর মাধ্যমে রোযা রাখলে যে সাময়িক পানিশূন্যতার সৃষ্টি হয় তা অনেক কমে আসে।
মস্তিষ্ক: ঘধঃরড়হধষ ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ অমরহম এর প্রধান বিজ্ঞানী গধৎশ গধঃঃংড়হ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন রোযা মস্তিষ্কের বয়স-জনিত রোগ যেমন অষুযবরসবৎ’ং উরংবধংব ও চধৎশরংড়হ’ং উরংবধংব প্রতিরোধ করে। রোযা রাখলে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের হয়ে যায় । আর তাই মস্তিষ্কের নিউরনেও তার ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া যায়। গধঃঃংড়হ বলেন, যারা উচ্চ ক্যালরীযুক্ত খাবার খেয়ে থাকেন বিশেষ করে ইউরোপ এবং আমেরিকানদের মধ্যে অষুযবরসবৎ’ং উরংবধংব এর হার বেশী হয়ে থাকে তাদের তুলনায় যারা নিম্ন ক্যালরীযুক্ত খাবার খেয়ে থাকেন যেমন চায়নিজ ও জাপানিজ।
হৃদরোগ: ওহঃবৎসড়ঁহঃধরহ গবফরপধষ ঈবহঃৎব এর হৃদরোগ বিভাগের প্রধান ইবহলধসরহ ঐড়ৎহব বলেন, যারা ৪০-৫০ বছর যাবত প্রতিবছর এক মাস রোযা রাখেন তাদের মধ্যে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি কম থাকে।
প্রদাহ জনিত রোগ: কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায় রোযা প্রদাহজনিত রোগ যেমন হাড়ের আর্থ্রাইটিস (বাতরোগ), ত্বক এর সোরিয়াসিসের আরোগ্য লাভে সহায়ক। এছাড়াও পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহজনিত আলসারেটিভ কোলাইটিস এর আরোগ্যের  ক্ষেত্রেও সহায়ক।
খাদ্যাভ্যাস: রোযার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের চেয়ে প্রাকৃতিক খাবার যেমন ফল-মূল ও পানীয়ের প্রতি আগ্রহ থাকে। এতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: রোযার সময় দেহের চর্বি ভাঙনের সাথে সাথে শরীর থেকে ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ বের হয়ে যায় । এর ফলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় হয়। এছাড়াও নবী সা. এর সুন্নাত অনুসারে ইফতারে ফল খেলে শরীর প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ লবণ প্রাপ্ত হয় যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করে।
খারাপ অভ্যাস এবং অপরাধ প্রবণতা : রোযা রাখলে কু-প্রবৃত্তি নিবৃত হয়। খারাপ অভ্যাস ও আচরণ প্রশমিত হয়। রোযার সময় সিগারেট, এলকোহল এমনকি চা-কফির প্রতি আসক্তিও কমে যায়। দীর্ঘ একমাস এই খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে রোযাদারদের মধ্যে একটা স্থায়ী পরিবর্তন আশা করা যায়। বিশেষ কিছু গবেষণায় দেখা যায় রমজান মাসে ইসলামি দেশগুলোতে অপরাধ প্রবণতা কমে যায়।
মনোরোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য: রোযা রাখলে মস্তিষ্ক বিষাক্ত পদার্থ-মুক্ত হয়। এতে মস্তিষ্কের নিউরনগুলো সজীব ও প্রাণবন্ত হয়। মনোরোগের ক্ষেত্রে ঔষধ সাময়িকভাবে কাজ করে। অন্যদিকে রোযা স্থায়ী আরোগ্য দান করে। গত ৫০ বছর যাবত রাশিয়ায় রোযা ছিল সিজোফ্রেনিয়ায় (মানসিক রোগের সবচাইতে জটিল অবস্থা) আক্রান্ত রোগীদের জন্য সর্বাধিক ফলদায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি। ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে গড়ংপড়ি চংুপযরধঃৎরপ ওহংঃরঃঁঃব  এর  ঋধংঃরহম টহর এর পরিচালক উৎ. ণঁৎর ঘরশড়ষধুবা বলেন রোযার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার মানসিক রোগে ভুগছেন এমন  প্রায় ৭০০০ রোগীকে সফলভাবে চিকিৎসা করা হয় । ৩০ বছর মনোরোগ  চিকিৎসার অভিজ্ঞতা থেকে উৎ. ণঁৎর ঘরশড়ষধুবা বলেন “প্রায় ১০০০০ রোগীকে রোযার মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। এদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ রোগী, যাদের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীও ছিল তাদের এতটাই উন্নতি হয়েছিল যে, তারা আবার তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়েছিলেন।” রোযা রাখেন এমন অনেকেই বলেছেন যে রোযা রাখলে তাদের চিন্তাশক্তি শাণিত হয় এবং মনোযোগ বাড়ে। এর কারণ হিসেবে বলা যায় রোযা রাখলে রক্ত পরিশোধিত হয়, মস্তিষ্কের নিউরন পরিচ্ছন্ন ও সজীব হয়। আর এ পরিশোধিত রক্ত সজীব মস্তিষ্কে প্রবাহিত হলে মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। (সুবহানাল্লাহ!)
উপরের এ বর্ণনা থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে, রোযার শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা অতুলনীয়। আর তা কেনই বা হবে না, এযে পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আমাদের গ্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশ।
যদিও রোযা পালনে অনেক রকমের শারিরীক উপকারিতা রয়েছে, তবুও রোযার মূল উদ্দেশ্য এটি নয়, বরং রোযার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া। যেমনটি আল্লাহ আমাদেরকে পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন।
আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়ে তৎকালীন পৃথিবীর কেউ জানতেন না রোযার শারিরীক উপকারিতা কি। তবুও সে সময়কার আল্লাহর অনুগত বিশ্বাসী বান্দাগণ শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সৎকাজস্বরূপ রোযা পালন করেছেন। বিনিময়ে আল্লাহ তাদেরকে ইহকালে দিয়েছেন সুস্থ জীবন এবং পরকালে অনন্ত আনন্দময় জান্নাতের প্রতিশ্রুতি। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,“বিশ্বাসী হয়ে পুরুষ ও নারীদের মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করে, তাকে আমি নিশ্চয়ই আনন্দময় জীবন দান করবো, এবং তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করবো।” [সূরা নাহল ১৬:৯৭)
অফুরন্ত কল্যাণ আর নিয়ামতে পরিপূর্ন এ রমজান মাস যেন আমাদের জীবনে বার বার ফিরে আসে। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে প্রতিবছর রমজানের হক আদায় করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের দ্বারা জান্নাতে ঠিকানা গড়ে নেয়ার তাওফিক দান করেন। [আমীন)
তথ্যসূত্র:
http://www.webmd.com/diet/features/is_fasting_healthy Panjwani, M. [2009) ’11 Health Benefits of Fasting’, Accessed from http://mushpanjwani.com/2009/08/23/11-health-benefits-of-fasting/ Islamic Medicine on Line http://www. Islamicmedine.org.index.html
Utah researchers: Fasting has health benefits related to diabetes
Internal detoxification. Total Health, 18, 42-44; Ehret, A. [1966).
www.fasting.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight