সাংবাদিকতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ : আতিকুর রহমান নগরী

সংবাদপত্রকে একটি জাতির দর্পণ বলা হয়। দর্পণ অর্থ আয়না। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে দেশ জাতি ও সামজের চিত্র তুলা ধরা হয় বলে তাকে দর্পণ নাম দেয়া হয়েছে। এছাড়া মুদ্রণজগৎ, প্রচারমাধ্যম, সম্প্রচারকেন্দ্র, ইন্টারনেট কিংবা গণমাধ্যমের উপস্থাপিত বর্তমান ঘটনা প্রবাহের একগুচ্ছ নির্বাচিত তথ্যের সমষ্টি, যা যোগাযোগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাকে সংবাদ বলে। আর ইসলামী সংবাদ হলো মানবিক ও মনের কুপ্রবৃত্তির বশীভূত না হয়ে মানবকল্যাণে সত্য সংবাদ পৌঁছে দেওয়া। তবে গতানুগতিক সাংবাদিকতার পরিবর্তে শাশ্বত ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামে এর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বিধিনিষেধ রয়েছে। ইসলামে সাংবাদিকতা একটি আমানত। আর এ আমানত হচ্ছে যে কোনো তথ্য ও সংবাদ অবিকৃত অবস্থায় গণমাধ্যমে তুলে ধরা। নিজস্ব চিন্তা কিংবা দল-মতের রংচং মাখিয়ে সংবাদকে আংশিক বা পুরোপুরি পরিবর্তন করে উপস্থাপন করা কিছুতেই ইসলাম সমর্থিত নয়। এ েেত্র করণীয় হলো, কোনোরূপ সংযোজন-বিয়োজন ছাড়াই সংবাদ পরিবেশন করা এবং সংবাদের অঙ্গসজ্জায় কেবল নিরেট সত্যকেই তুলে ধরা। আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’ [সূরা আহযাব : আয়াত ৭০]
সংবাদের তথ্য যাচাই ও সত্যতা নিরূপণ করা সাংবাদিকের অপরিহার্য কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তোমরা তা পরীা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের তি সাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে যাতে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হতে না হয়।’ [সূরা হুজরাত : আয়াত ৬]
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যা শুনবে, তা (যাচাই করা ছাড়া) বর্ণনা করা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ [মুসলিম শরিফ]
ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ কিংবা নিজস্ব চিন্তাচেতনাবিরোধী হওয়ায় অনেকে প্রাপ্ত তথ্য গোপন করে থাকে। বলা হয়, নিউজ রুমে অনেক নিউজ ‘কিল’ করা হয়। এমনটি কিছুতেই কাম্য নয়। সত্য গোপন করাকে ইসলাম পাপ হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্যা গোপন করো না, আর যে ব্যক্তি তা গোপন করে, অবশ্যই তার অন্তর পাপী।’ [সূরা বাকারা : আয়াত ২৮৩]
ব্যক্তিগত আক্রোশে কাউকে হেয় করার মানসে কারো একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই গর্হিত কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের কখনো যেন সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে।’ [সূরা মায়েদা : আয়াত ৮] হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি নিজ ভাইয়ের দোষত্রুটি গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন।’ [বুখারি ও মুসলিম]
কোনো বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা সাংবাদিকতার অন্যতম শর্ত। সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা সম্ভব নয়।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ ওই ব্যক্তির চেহারা উজ্জ্বল করুন; যে আমার কথা শুনে অতঃপর তা হুবহু ধারণ করে অবিকল অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়’ [তিরমিজি শরিফ]
হীন স্বার্থে কারো চরিত্রে কালিমা লেপন নিষিদ্ধ। ব্যক্তিগত আক্রোশে কাউকে হেয় করার মানসে কারো একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই গর্হিত কাজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের কখনো যেন সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। [সূরা মায়েদা : আয়াত ৮]
হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কারো দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে সে জীবন্ত প্রোথিত কন্যাসন্তানকে পুনর্জীবিত করার সাওয়াব পাবে। [আত-তারগিব ওয়াত্ তারহীব]
তবে ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি যদি এমন পর্যায়ের হয় যে তার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি, মানব সমাজ কিংবা রাষ্ট্র তিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার অত্যাচার, দুর্নীতি ও প্রতারণা থেকে জনগণকে সচেতন করার ল্েয তার আসল চেহারা তুলে ধরতে অসুবিধা নেই। এ বিষয়ে ইসলাম বিশেষ ছাড় দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ মন্দ কথার প্রচার-প্রসার পছন্দ করেন না, কিন্তু যার ওপর জুলুম করা হয়েছে (তার কথা ভিন্ন) [সূরা নিসা : আয়াত ১৪৮]
প্রখ্যাত তাফসিরবিদ আল্লামা মুজাহিদ রহ. বলেন, ‘এ আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, নিপীড়িত জনতার স্বপে গিয়ে জালিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা এবং বিষয়টি জনসম্মুখে প্রকাশ করা বৈধ।
ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষ সংবাদ : সাংবাদিকতা ইসলামী দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর তা কিছুতেই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি বলো, হে মানব সমাজ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবার কাছে আল্লাহর রাসুল’ [সূরা আরাফ : আয়াত ১৫৮] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফোরকান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে’ [সূরা আল- ফোরকান : আয়াত ১]
শব্দচয়ন ও বাক্যের ব্যবহার : সাহিত্য ও সাংবাদিকতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গণমাধ্যমে ভাষাকে কেবল লালনই করে না; বহু নতুন নতুন শব্দের সৃষ্টিও করে। ভাষাকে সহজ, সাবলীল ও সমৃদ্ধ করার মহৎ দায়িত্বটি গণমাধ্যমই নিরলসভাবে পালন করে। উদ্দিষ্ট বক্তব্য উপস্থাপনে যথাযথ শব্দচয়ন বক্তব্য হৃদয়ঙ্গমে সহযোগিতা করে। অন্যদিকে যথার্থ শব্দ ও বাক্য ব্যবহারে ব্যর্থ হলে ভুল বোঝাবোঝি ও জনমনে ুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষত অশীল, কদর্য ও ব্যঙ্গাত্মক শব্দ পরিহার করা উচিত। ভাষিক আগ্রাসন ও শব্দ সন্ত্রাস রোধ করাও সাংবাদিকের দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনের বাচনভঙ্গিমা, ভাষারীতি ও বাক্য বিন্যাস পদ্ধতি এ েেত্র আমাদের জন্য অনুকরণের মডেল হতে পারে। পবিত্র কুরআনের শব্দশৈলী ও ভাষিক উৎকর্ষতা তৎকালীন আরবকে কেবল মুগ্ধই করেনি; সবার কাছে অলৌকিক ও অপার বিস্ময়কর হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। মিডিয়ায় দাওয়াতি কার্যক্রমে হেকমত অবলম্বনের পন্থা হলো, যুগের ভাষা রপ্ত করে সঠিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ শব্দ চয়ন করা। কেননা ইসলামী সাংবাদিকতা দাওয়াত ছাড়া কিছুই নয়। তাই নানা প্রোপটে, পরিবর্তিত সমাজ বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে সদুপদেশের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথে আনতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের মাধ্যমে। [সূরা নাহল : আয়াত ১২৫]
দাওয়াতের ভাষা হতে হবে ন¤্রতা ও কোমলতা মিশ্রিত। আল্লাহ বলেন, (হে মুসা ও হারূন) ফেরাউনের সঙ্গে নরম কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে। [সূরা ত্ব-হা : আয়াত ৪৪]
তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে সংবাদ প্রচার করা সাংবাদিকের অপরিহার্য কর্তব্য। এ বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য এরূপ : ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তর এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ [সূরা বনি ইসরাইল : আয়াত ৩৬]
বর্তমানে পৃথিবী চলছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তথা ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে। ইসলামের এ ক্রান্তিলগ্নে পৃথিবীতে দ্বীন প্রচার যখন একেবারেই দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মুসলমানদের যে বিষয়টি কঠিন শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে তা হলো, আধুনিক গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির ব্যবহার। বর্তমানে বিভিন্ন মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক ও আলেম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight