সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব কুরআন মাজীদ / এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

যাবতীয় কল্যাণ, সর্বপ্রকার জ্ঞান-গরিমা, প্রজ্ঞা ও রহস্যের আধার হল আলকুরআন। একে অনুসরণ করেই দুনিয়া ও আখিরাতে পাওয়া যায় সুখের সন্ধান, মেলে সঠিক পথের দিশা। আলকুরআন মহান আল্লাহর বাণীর অপূর্ব সমাহার বিস্ময়কর এক গ্রন্থের নাম। আলকুরআন আল্লাহর প থেকে অবতীর্ণ সংরতি এক সংবিধান। আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে সুদীর্ঘ ২৩ বছরে মানব জাতির হিদায়াত হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তার নাম আলকুরআন। এই কুরআন যেমন সমগ্র মানবজাতির মানসিক সংশয়, সন্দেহ, অস্পষ্টতা, কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসা নামক নানারকম রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের অব্যর্থ মহৌষধ ঠিক তেমনি  দৈহিক রোগ-ব্যাধি, বেদনা, কষ্ট-কেশ এবং জীবন চলার পথের সকল অন্ধকার বিদূরিত করার এক অনবদ্য  নির্দেশিকা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের প্রতিষেধক এবং মুমিনদের জন্য রহমত।’ [সূরা বনী ইসরাঈল : ৮২]
এই কুরআন হল, সত্য-মিথ্যা এবং বৈধ-অবৈধের সীমা-রেখা নির্ধারণের এক সুউচ্চ মাইল ফলক, সুখ সমৃদ্ধ জীবনের বিশ্বস্ত ঠিকানা এবং পশ্চাদপদতা, দুর্ভাগ্য ও হতাশার গ্লানি থেকে মুক্তির অনুপম গাইড লাইন। আল্লাহ তাআলা বলেন,‘অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর প থেকে আলো ও সুস্পষ্ট গ্রন্থ এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন’ [সূরা মায়িদাহ : ১৫-১৬]
কুরআন যাবতীয় বিকৃতি থেকে মুক্ত। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমের সংরণ এর দায়িত্ব নিয়েছেন। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় আমি উপদেশ বাণী তথা কুরআন নাযিল করেছি এবং নিঃসন্দেহে এর হিফাযতকারী আমি নিজেই।’ [সূরা আলহিজর : ৯]
মানব জীবনের  ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবন কীভাবে পরিচালিত হবে, তার প্রতিটি বিষয় কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তোমার নিকট কিতাবটি নাযিল করেছি। এটি এমন যে তা সবকিছুর সুস্পষ্ট বর্ণনা, আর এটা হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।’ [সূরা আননাহল : ৮৯]
কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য রহমাত হিসেবে নাযিল করা হয়েছে। যারা এ কুরআন পড়বে, তা অনুযায়ী আমল করবে তারা আল্লাহর রহমাতপ্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি কুরআন নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত, কিন্তু তা যালিমদের তিই বাড়িয়ে দেয়।’ [সূরা বনী ইসরাঈল : ৮২]
কুরআন  মাজীদ সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের  উৎস। যুগে যুগে বিজ্ঞানের যে সব বিষয় আবিষ্কার হয়েছে, তার সাথে কুরআনের কোন বৈপরীত্ব নেই। কুরআন যে নির্দেশনা দিয়েছে তা নির্ভুল ও বাস্তবভাবে প্রমাণিত হয়েছে।  কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ইয়া-সীন। বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ।’ [সূরা ইয়াছিন : ১-২]
কুরআন রমযান মাসে অবতীর্ণ হয়েছে। কুরআনে বলা  হয়েছে, ‘রমযান এমন মাস যাতে নাযিল হয়েছে মহাগ্রন্থ আলকুরআন। যা বিশ্ব মানবতার জন্য হিদায়েত ও সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা এবং হক ও বাতিলের মধ্যকার পার্থক্য বিধানকারী।’ [সূরা আলবাকারাহ : ১৮৫]
কুরআনের মত কোন কিতাব মানুষ বা কারো পে বানানো সম্ভব নয়। প্রায় চৌদ্দশত বছর আগের চ্যালেঞ্জ এ পর্যন্ত কেউ মুকাবেলা করতে সম হয়নি। আর কিয়ামাত পর্যন্ত তা সম্ভবও হবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বল, যদি মানব ও জ্বিন জাতি সবাই মিলে একত্রিত হয় যে, তারা এ কুরআন অনুরূপ কিছু আনয়ন করবে, তারা এ কুরআনের অনুরূপ কিছুই আনয়ন করতে পারবে না, যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।’ [সূরা বনী ইসরাঈল : ৮৮]
প্রত্যেক মুসলমানই দাবি করে তারা কুরআন বিশ্বাস করে এবং ভালোবাসে। কিন্তু কুরআনের সঙ্গে তাদের আচরণ দেখলে যে কেউ বলতে বাধ্য হবে, নিশ্চয়ই এরা কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে। কুরআন এসেছে মানুষের জীবনকে বদলানোর জন্য। ‘বদলে যাও বদলে দাও’ এটি কুরআনের শ্লোগান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যতণ না তারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে।’ [সূরা রা’দ, ১৩:১১]
আমাদের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, আমরা কুরআনের শিা ও আদর্শ থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থান করছি। অনেক মানুষ আদৌ কুরআন পড়তে জানে না। অনেকে পড়তে জেনেও একটি বারের জন্য কুরআন খুলে পড়তে বসার তাদের সুযোগ হয় না। অনেকে নামাযে যতটুকু পড়ে ততটুকুই। নামাযের বাইরে মোটেও পড়ে না। কেউ আবার বিপদে না পড়লে কুরআনের ধারে কাছেও যায় না। অনেকে কুরআন পড়ে কিন্তু তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করে না, কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না। অনেকে কুরআন পড়ে কিন্তু আমল  নেই। আরও ভয়ানক কথা হচ্ছে, আমাদের সমাজে এমন কতিপয় শিতি-মূর্খ লোকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যারা কুরআনের অনেক আয়াতকে অস্বীকার করতেও কুণ্ঠিত হয় না। এরা বলে, কুরআনের আইন বর্তমান যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটাই হল, সুস্পষ্ট কুফুরী এবং ইসলাম বিদ্বেষীদের পথ। অনেকে কুরআন বাদ দিয়ে অন্য জ্ঞান চর্চায় জীবনের সম্পূর্ণ সময় ব্যয় করে। এ সকল মানুষদের জন্য আফসোস।
যারা কুরআন শিা করতে চান বা দিতে চান, তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআন শিক্ষা করা সহজ করে দিয়েছেন। বুঝমান যে কোন বয়সের মানুষ তা শিখতে পারবে। কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আর আমি তো কুরআন শেখার জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব কোন উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি’? [সূরা আলক্বামার : ১৭]
আল্লাহ তাআলা বান্দাদেরকে কুরআন নিয়ে গবেষণা করার নির্দেশ প্রদান করে বলেছেন, যারা তা করে না তারা অন্ধ এবং বদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী। তিনি বলেন, “তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করে না? না তাদের অন্তর তালাবন্ধ?” [সূরা মুহাম্মাদ : ২৪]
এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে, কুরআনের সম্মান কত  বেশি!  কুরআন পাঠ করা, মুখস্থ করা, কুরআন নিয়ে গবেষণা করা, কুরআনের অর্থ ও মর্মবাণী উপলব্ধি করার চেষ্টা করা, একে নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করার মর্যাদা কত উন্নত!
আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রা:) বলেন, “ক্বারী তথা কুরআন প্রেমিক মানুষের তো এমন হওয়া উচিত, গভীর রাতে মানুষ যখন ঘুমের ঘোরে ডুবে থাকে তখন সে কুরআন তিলাওয়াত করে। দিনের বেলায় সবাই যখন খাবার-দাবারে লিপ্ত থাকে তখন সে কুরআন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সবাই যখন হাঁসি-তামাশায় মত্ত থাকে তখন সে আল্লাহর দরবারে চোখের পানিতে বুক ভাষায়। মানুষ যখন নির্বিঘেœ সবার সাথে মিশে তখন সে পরহেযগারি অবলম্বন করে এবং ভালো মানুষ ছাড়া খারাপ মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকে। মানুষ যখন অন্যের দোষ চর্চা এবং অনর্থক আলাপচারীতায় সময় কাটায় তখন সে নীরবতার ভূমিকা পালন করে। মানুষ যখন দাম্ভিক এবং অহঙ্কারপূর্ণ আচরণ করে তখন সে অতি নম্র ও ভদ্র স্বভাবের পরিচয় দেয়। অন্যেরা যখন আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকে তখন সে বিভোর থাকে পরকালের চিন্তায়।
কুরআন প্রেমিক মানুষেরা কুরআনের প্রচার,  প্রসার ও উন্নয়নের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। কেননা এটি  সেই জ্ঞান যা অর্জন করাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মুসলিম নর ও নারীর জন্য ফরয (আবশ্যক) বলেছেন। তিনি জ্ঞানের েেত্র সাধনাকারীদের আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত, এ পথে প্রচেষ্টারত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীকে শহীদ, পরিশুদ্ধ জ্ঞানী ব্যক্তিদের আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর নিকট সুপারিশকারী এবং তাঁদের কলমের কালিকে শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র বলেছেন।
কুরআন শ্রবণকারী আল্লাহকে ভয় করেন। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী, সাদৃশ্যপূর্ণ একটি কিতাব (আলকুরআন), যা বারবার আবৃত্তি করা হয়। যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের গা এতে শিহরিত হয়, তারপর তাদের দেহ ও মন আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়ে যায়।’ [সূরা আয-যুমার : ২৩]
কুরআনের মধ্যে এমন এক প্রভাব নিহিত আছে যা তার পাঠক কিংবা শ্রোতাকে প্রভাবিত না করে ছাড়ে না। হৃদয়কে করে উত্তাল, চোখকে করে অশ্রুসজল। যে ঈমান গ্রহণে আগ্রহী সে কুরআন কুনামাত্রই তার আনুগত্যের শির নত হয়ে যায়। এমনকি, যে কুফরী ও হঠকারিতায় নিমজ্জিত সে-ও যদি এ কুরআন শোনে তবে তার ওপরও কুরআন প্রভাব ফেলে, কিন্তু সে এটিকে যাদু মনে করে উড়িয়ে দেয়। লোকদেরকে তা শুনতে ও পড়তে বারণ করে। তবু সে এ কুরআনকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহস পায় না। মহান আল্লাহর কুরআনের প্রতিটি আয়াতে ও প্রতিটি অরে রুহানিয়াত, নূরানিয়াতের বিশেষ প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নিহীত রয়েছে। যা তিলাওয়াত করলেই হাসিল হয়। শুধু বুঝে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পৃথিবীর মানুষের পঠন পাঠন ও আমলে নেয়ার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব কুরআন মাজীদ। কুরআনুল কারীমের সাথে সম্পর্ক তৈরির অর্থ হচ্ছে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরি করা। এ কিতাব পাঠের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর ফরমান পাঠ করা। এ কিতাবের উপর আমল করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর হুকুম তামীল করা। এ কিতাবের সাথে থাকার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর সাথে থাকা। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক  তৈরি করা তো সৌভাগ্যের বিষয়। আল্লাহর  যে কোন প্রিয় জিনিষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন তা রণাবেণ এবং আল্লাহর  হুকুম তামীলকারী অবশ্যই আল্লাহর ভালোবাসা, অনুগ্রহ, দয়া ও মা লাভে ধন্য হয়ে থাকে। সুতরাং কুরআন মাজীদ হচ্ছে বিশ্ববাসীর জন্য সৌভাগ্য অর্জনের সেরা মাধ্যম। মহান আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্ক উন্নয়নের টেকসই ও নির্ভযোগ্য মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহীহভাবে কুরআন তিলাওয়াত, শ্রবণ ও এর অনুসরণের তাওফিক দিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight