সম্পাদকীয়

আমরা পৃথিবীতে যত ভাষার কথা শুনি এ সবই আল্লাহর সৃষ্টি এবং সকল ভাষার শিাদাতাও আল্লাহ তা‘আলা। কেননা, সূরা আর-রাহমানে আল্লাহ যে মানুষকে বর্ণনাজ্ঞান শিাদানের অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন তাতে ‘বয়ান’ বা বর্ণনার অর্থ ব্যাপক।
মৌখিক বর্ণনা, অর্থাৎ মুখের ধ্বনির মাধ্যমে বর্ণনা, লিখিত বর্ণনা, চিঠিপত্রের মাধ্যমে বর্ণনা তথা একের মনের ভাব ও আকুতি অপরের কাছে পৌঁছানোর যত উপায় ও ব্যবস্থা রয়েছে সবই এই বর্ণনাজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন ভূখ-ের কালো, ধলো, লাল, গোলাপী বহু রকম মানুষের- আরবী, বাংলা, উর্দূ, হিন্দী, ফারসী, ইংরেজী ফরাশী, তুর্কি, চাইনিজ, জাতীয়, আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক যত ধরনের ভাষা ও বাকপদ্ধতি রয়েছে সবই আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত বর্ণনাজ্ঞানের বিভিন্ন রূপ।
তবে মানুষ ভাষার চর্চাকারী। মানুষের চেষ্টায়ই ভাষার উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে, হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
পৃথিবীর সকল ভাষার স্রষ্টা এবং শিাদাতা আল্লাহ তা‘আলা, ল ভাষার মাঝে তিনি লুকায়িত রেখেছেন তার পরিচিতির নিদর্শন। আরবী, বাংলা, ইংরেজী, উর্দু, হিন্দী, ফারসী, পর্তুগিজ, চাইনিজ এবং অপরাপর প্রসিদ্ধ প্রত্যেকটি ভাষার মাঝে রয়েছে নানা রকমের ভিন্নতা। প্রতিটি ভাষার আঞ্চলিক রূপও বহুধা বিভক্ত।
এক বাংলা ভাষার কথাই ধরুন : বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ভাষা ৬৪ রকম। অথচ প্রত্যেকটিই বাংলা। বাংলার মত অন্যান্য ভাষার বিভিন্নতাও বহু রকমের। এই বহু রকমের ভাষার বহু রকম ভিন্নতার স্বাদ যে কত মধুর তা প্রত্যেক আঞ্চলিকভাষীই অনুভব করে থাকেন। হ্যাঁ, প্রত্যেক অঞ্চলের অধিবাসী-ই সেই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত থাকেন এবং তৃপ্তি লাভ করেন।
আমাদের বাংলা ভাষাভাষীদের কুশল বিনিময়ের বাক্যটির কথাই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায় :
‘কেমন আছেন? ভাল আছেন তো?’ এ কথা দুটি বিভিন্ন জেলার লোকেরা বিভিন্নভাবে, ভিন্ন শব্দে, ঢংয়ে উপস্থাপন করে থাকেন। যেমন : ঢাকার আদিবাসীদের ভাষায়, ‘কেমুন আছেন, বালা আছেন তো’? ময়মনসিংহের ভাষায় : ‘হুজুর কেমন আছুইন? বালা আছুইন?’ নোয়াখালীর ভাষায় : ‘বালা আছেননি ক্যান?’ চট্টগ্রামের ভাষায় : ক্যান আছোরে বা? গম আছোনি?’ ইত্যাদি।
এ ধরনের সকল আঞ্চলিক ভাষা-ই কথ্যা ভাষা। আর এ আঞ্চলিক ভাষার অধিকারী হওয়ার কারণে কাউকে নিন্দা করা যায় না।
সত্যিই এই বহুরূপী ভাষা নিয়ে, ভাষার এই বিস্ময়কর বৈচিত্র্য নিয়ে আমরা যদি একটু ভাবতে বসি, তাহলে আমরা চিনতে পারবো আমাদেরকে, চিনতে পারবো আমাদের জীবনদাতাকে। সারা জগৎময় কেন এত বৈচিত্র্যের সমাহার? কেন এত বিচিত্র হয় মানুষের চেহারা, রঙ-বর্ণ-চরিত্র-ব্যবহার? বিচিত্র সব রঙ-বর্ণ ও গন্ধের ফুলের সমাহার, বিচিত্র সব পাখিকুলের মাতামাতি আমাকে কোন দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে? চোখ-বোজা ভোরে বিহঙ্গকুলের উড়ে চলা, পূর্বাকাশে রক্তিম সূর্যের উদয়… নির্জন দুপুরে কোকিলের কুহুতান, সন্ধ্যায় গোধূলির লাজরাঙা আভা, রাতের আকাশে জোনাক জ্বলা আলোর নিঃশব্দ বিচ্ছুরণ, এসব কিছু আমাকে কোন কথা বলে যায়? দিনের প্রশান্ত স্বচ্ছ আকাশে কখনও নীলের খেলা, আবার কখনও মেঘের মেলা, মৃদুমঞ্জুরিত বাতাসে হাস্নাহেনা, রজনীগন্ধা কিংবা রাতের রানীর স্নিগ্ধ সুরভি, কখনো তটিনীর বুকে মৃদু ছন্দ, কখনও সাগরে উত্তাল ঊর্মিমালার গর্জন, বাতাসের শনশন গুঞ্জন, এতসব বিচিত্র ধারাপ্রবাহ কার নির্দেশে প্রাণবন্ত?
চাঁদ নামী গ্রহের নির্দিষ্টকাল আলোদান এবং পূর্ণতাপ্রাপ্তি, আবার এক কালে তার ক্রমশ য়ে যাওয়া, বায়ুধারার কখনও দণিমুখী মাতামাতি, আবার কখনও উত্তরীয় চঞ্চলতা, নদীর বুকে কখনও জোয়ার যৌবন, কখনও ভাটার ভাঙন, এমনতর বিচিত্র গতিময় চঞ্চলতা, এহেন বিচিত্র দৃশ্যমানতা আমাকে কেবলই ভাবতে শেখায় অদৃশ্য এক সত্তার কথা। কেবলই বিশ্বাসী করে তোলে তার অবিনাশী উদার ভালবাসার প্রতি। এইসব দৃশ্যমান বিচিত্র প্রবাহের চির ঔজ্জ্বল্য তাঁর সুস্পষ্ট পরিচিতি তুলে ধরে আমার বোধ-দর্পণে, প্রস্ফুটিত করে এক নিরাকার অথচ সুষ্পষ্ট সত্তাকে।
সব বৈচিত্র্যের মাঝে যেমন তিনি অস্তিত্বময়, ঠিক তেমনি ভাষার বৈচিত্র্যের মাঝেও তিনি সমুজ্জ্বল; তাঁর নিদর্শন সেখানেও স্বচ্ছ-প্রোজ্জ্বল। ইরশাদ করেছেন : ‘আর আকাশসমূহ ও জমীনের সৃষ্টি, তোমাদের বিচিত্র রঙ ও বর্ণের অবয়ব এবং তোমাদের ভাষা বৈচিত্র্যের মাঝে রয়েছে তাঁর (আল্লাহর) নিদর্শনাবলী’। [সূরা রূম : আয়াত ২২৭]
যা দ্বারা তাঁকে চেনা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight