সম্পাদকীয়

পবিত্র মাহে রমযান শেষে আমরা এখন শাওয়াল মাসে উপনীত। রমযান মাস ছিল ঈমানদারদের প্রশিক্ষণের মাস। কিসের প্রশিক্ষণ? সহজ সরল জবাব হবে, তাকওয়ার প্রশিক্ষণ। পুলিশ ও সেনাবাহিনী ছাড়াও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে নানা কিসিমের প্রশিক্ষণ হয়। বাংলা প্রশিক্ষণের চেয়ে ইংরেজী ট্রেনিং বললেই আমরা ভালো বুঝি। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে কোনো বিশেষ যোগ্যতার বিকাশ ঘটানোই হয় এসব ট্রেনিং এর উদ্দেশ্য। এ হিসেবে রমযানের কৃচ্ছতার প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল তাকওয়ার গুণ অর্জন। যাদের তাকওয়া আছে তাদের আমরা বলি মুত্তাকী পরহেযগার লোক। তাকওয়া অর্থ তাহলে কী? তাকওয়া মানে ভয়। আল্লাহকে ভয় করে সংযমী জীবন যাপন করার নাম তাকওয়া। তাকওয়ার এমন অর্থও যথার্থ হবে না। কারণ, আল্লাহকে ভয় করার সাথে আল্লাহর প্রতি মহব্বতও থাকতে হবে। তবেই হবে তাকওয়া। আল্লাহর ভয় ও ভালবাসা মিশ্রিত মন নিয়ে সংযমী জীবন পরিচালনা করার নামই তাকওয়া।
সংযম কাকে বলে তার জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যায়। এক লোক জঙ্গলের মাঝ দিয়ে মেটোপথে হেঁটে যাচ্ছে। দুই পাশে ঝোপঝাড় কাঁটাগুল্ম। তখন হাঁটতে হবে জামা কাপড় হাতে গুটিয়ে, যাতে কাঁটায় না লাগে। কাপড় না ছিঁড়ে, শরীর যখম না হয়। তাকওয়ার এমন ব্যাখ্যাটি নেয়া হয়েছে হাদীস শরীফ হতে। এ ধরনের জীবন যাপনের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্যই রমযান এসেছিল মুমিনের ঘরে ঘরে, সারা জগত জুড়ে। আমরা এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলাম। রোজা রেখেছিলাম। প্রশ্ন হল, এই প্রশিক্ষণে কতখানি সফল হয়েছি।
রমযানের পরের দিন ঈদুল ফিতরে প্রশিক্ষণের সমাপনি কুচকাওয়াজ ছিল। কি পেয়েছি এই আনুষ্ঠানিকতা হতে? এক দুষ্ট প্রকৃতির লোক রমযানের আগে বলেছিল, রমযানে রোযা কেন রাখব? গত বছর অনেক কষ্ট করে রোযা রেখেছি। তার ফলাফলের খবর তো পাইনি। আসলে সে লোক রোযা রাখেনি। রাখলেও উপোস ছিল, রোযা রাখেনি। নচেৎ কোনা মুসলামনের মুখে এমন কথা উচ্চারিত হতে পারত না। তাকে বলেছিলাম রমযানের রোযার কৃচ্ছসাধনার ফল তো প্রকাশ হয়েছিল, তুমি তার খবর রাখনি। কারণ, যে ছেলে পরীক্ষা দিয়েছে সে-ই তো ফলের জন্য উদ্গ্রীব থাকে। যে আদৌ পরীক্ষা দেয়নি, খাতায় কিছু লিখেনি। সে তো জানে রেজাল্ট কী হবে। খবর রাখবে কেন। তোমার রমযানের প্রশিক্ষণও ছিল পরীক্ষার হলে আসা আর যাওয়া। এটুকুই সার।
গেল রমযানে আমরাও প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তাকওয়ার প্রশিক্ষণ। আমরা কতখানি তাকওয়া অর্জন করেছি বা আল্লাহকে ভয় করে ও ভালোবেসে পথ চলার মনোবৃত্তি অর্জন করেছি তা মনের মিটারে দেখেই বলতে পারি। বলতে পারি আমি কতখানি সফল বা ব্যর্থ হয়েছি। কিছু লোককে দেখেছি সিগারেটে আসক্ত। হুযুরদের অনেকে পান খান। তাদের ঠোঁট ও জিহ্বা লাল টুকটুকে দেখায়। তবে মুখের সৌন্দর্যের ঐশ^র্র্য যে দাঁত, সে দাঁতগুলো হয়ে যায় কালো কুচকুচে। সবচে ভয়াবহ সংবাদ হল, সেই পানের সাথে মিশানো থাকে সাদা পাতা। কিংবা এর বিকল্প জর্দা। সিগারেট আর জর্দার মধ্যে পার্থক্য আছে কিনা ডাক্তাররা বা হুযুররা ভাল বলতে পারবেন। তবে জর্দা যে সিগারেটের চেয়ে মারাত্মক তা পরীক্ষা না করেই বলা যায়।
রমযানে সারাদিন থাকতে হয় আল্লাহর ধ্যানে। কিন্তু সিগারেট জর্দাসেবীরা থাকেন, কখন ইফতারের পর মাদকের ছোট ভাইকে মুখে তুলে আদর করা যাবে সেই ভাবনায়। যাইহোক, দীর্ঘ একমাস কাল দিনের বেলা সব পানাহার, স্ত্রী সংসর্গ এর মতো অনেক বৈধ কাজ ত্যাগ করতে হয়েছে। অবৈধ জর্দার পান বা চুরুটের কথা তো আছেই। প্রচ- গরমে এক মাসকাল উপবাসব্রত পালনের পর এখন যদি সেই বদ অভ্যাস ফিরে আসে তাহলে বুঝতে হবে পরীক্ষার হলে আসা যাওয়াই সার হয়েছে। আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। সিগারেট জর্দার কথা বললাম উদাহরণ হিসেবে। নচেৎ সব বদ অভ্যাসের বেলায় কথাটি প্রযোজ্য। এখনো সময় আছে। ইচ্ছা শক্তি থাকলে নিজেকে শুধরে নিতে পারি। কথায় বলে হিম্মতে মর্দ মদদে খোদা। বান্দা হিম্মত করলে মনে সাহস বাধলে আল্লাহ মদদ করবেন, সাহায্য দেবেন। আমরা কে কে সেই সাহায্য পেতে চাই? আল্লাহ তাওফীক দিন।
রমযানের আরেকটি পরিচয় ছিল তা কুরআনের মাস। রমযানের শেষ ভাগে শবে কদরের রাতে কুরআন মজীদ নাযিল হয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা নগরীর উপকণ্ঠে হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন তখন ফেরেশতা জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম পবিত্র কুরআনের বাণী নবীজিকে পাঠ করে শোনান। তখন নবীজির বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তিনি তেষট্টি বছর বয়সে ইহজগতের অন্তরালে চলে যান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তেইশ বছরে ত্রিশ পারা কুরআন নাযিল হয়েছিল। এক হিসেবে রমযান ছিল কুরআন নাযিলের বর্ষবরণ। হাদীস শরীফে আছে, প্রতি বছর রমযানে ফেরেশতা জিব্রাঈল আ. নবীজির কাছে আসতেন। সে পর্যন্ত কুরআনের যতখানি অবতীর্ণ হয়েছে তা তাকে পড়ে শুনাতেন। নবীজিও আবার জিব্রাঈলকে পড়ে শোনাতেন। মাদ্রাসা বা হেফযখানার ছাত্ররা এভাবে পড়াকে দাউর বলে। তার মানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিব্রাইল আ এর সাথে রমযানে কুরআন দাউর করতেন। কুরআনের এই চর্চা মুসলিম জাহানে মাসব্যাপী হয়েছে। তারই অনুকীর্তিতে তারাবীহ নামাযে হাফেয সাহেবগণ কুরআন খতম করেছেন।
কুরআন খতম ও তারাবীহ নামায রমযানের ডেকোরেশন ছিল। বিয়ে বাড়িতে বা কোনো আনন্দময় অনুষ্ঠান স্থলে ডেকোরেশন করা হয়। আলোকসজ্জাটা দিনের বেলায় করতে হয়। তবে রাতেই সুন্দর দেখা যায়। ঝিকিমিকি আলোর খেলা। রমযানের ডেকোরেশনের ব্যাপরটিও দেখুন। সারাদিন রোযা রেখে শরীর কান্ত। ইফতারে সামান্য খাবার গ্রহণের পর শরীর বিছানায় পড়ে থাকতে চায়। পরক্ষণে ইশা ও তারাবীহ নামাযের ডাক আসে। মুমিন বান্দা রাতের আঁধারে সারীবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় আল্লাহর সামনে। হাফেয সাহেব সবচে পবিত্র অবস্থায় ও পবিত্র চেতনায় কুরআন পড়েন আর মুসল্লীরা প্রাণমন একাগ্র করে শোনেন।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি কুরআন নাযিল করেছি। আমিই তার হেফাযত করব।’ অভিজ্ঞতা বলে, এই হেফাযত আল্লাহর তাআলা সরাসরি এসে করেন না। হাফেযদের মাধ্যমে করেন। হাফেযগণ সারা বছর বুকের সিন্ধুকে কুরআন মজীদ সযতেœ সংরক্ষণ করেন। রমযানে মানুষের আগের কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহকে পড়ে শোনান। সেই পড়া আমরাও শুনেছি। এভাবেই আল্লাহর কুরআনের হেফাযত হয়ে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। বাস্তবতা বলে, পৃথিবীকে একমাত্র কুরআনের হাফেয আছে। অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থের হাফেয বা মুখস্তকারী নেই। কারণ তাদের তারাবীহ নামায নেই। মূলত ত্রিশ পারা কুরআনের হেফাযত ও চর্চা জীবন্ত রাখার জন্যেই বিশ রাকাত তারাবীহর সুন্নাত। তারাবীহ ৮ রাকাত বা অন্য রকম হলে পুরো কুরআন রমযানে নামাযে তেলাওয়াত করে খতম করা সম্ভব ছিল না।
আসলে নিজের ধর্মগ্রন্থকে এভাবে শোনার ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির বা সভ্যতার নেই। কবি গোলাম মোস্তফা বিশ^নবী গ্রন্থে দলীল প্রমাণ সহ বলেছেন, হিন্দুদের কোনো কোনো সম্প্রদায়ের বেদবাণী শোনার অধিকার নেই। শ্রবণ করলে তাকে বিশেষ এক নরকে অগ্নিদগ্ধ হতে হবে। তার কানে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে শাস্তি দিতে হবে। খ্রিস্টানদের বা ইহুদীদের বাইবেল চর্চারও এমন ব্যবস্থা নাই। বৌদ্ধরা তো আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ^াস করে না। তাদের ত্রিপিটক তো বড়জোর গৌতম বুদ্ধের বাণী। কাজেই পৃথিবীর বুকে একমাত্র মুসলমানরাই দাবি করতে পারে যে, আল্লাহর পক্ষ হতে যে কিতাব নাযিল হয়েছে দীর্ঘ দেড় হাজার বছর পরও বিন্দু বিঃসর্গে হেরফের ছাড়াই এখনো সংরক্ষিত আছে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের কোনো কুরআনের মধ্যে আশ্চর্য ধরনের মিল আছে। এটি কুরআনের অবিস্মরনীয় মুজিযা বা অলৌকিকত্ব।
গেল রমযানে এই অলৌকিক কুরআনের ব্যাপক চর্চা আমরা করেছি। তারাবীহ ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে কুরআন তেলাওয়াত করেছি। রমযানের ফলাফল জানতে আগ্রহীদের জ্ঞাতব্য হল, রমযানে যেভাবে কুরআন তেলাওয়াত করেছি সেভাবে কি এখন সকালবেলা উঠে কুরআন তেলাওয়াত করি বা তার অভ্যাস আমার মধ্যে গড়ে উঠেছে? উত্তর হ্যাঁ হলে প্রশিক্ষণের নম্বর হবে এ প্লাস। দ্বিতীয় কথাটি হল, রমযানে কুরআনের তেলাওয়াতের চর্চা ব্যাপকভাবে হয়েছে সত্য, কিন্তু যে উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন নাযিল হল তা কতখানি আমরা বোধগম্য করতে সক্ষম হয়েছি?
আমার এক আপনজন সৌদী আরব গেছেন। অনেকদিন কোনো লাইন করতে পারেননি। পরে শোনা গেল একজন আরবি শেখের প্রিয়ভাজন হয়েছেন। তারপর থেকে অনেকদিন খবর নেই। ছেলে মেয়ে আত্মীয় স্বজনের মনে নানা চিন্তা, আশা নিরাশার দোলা, বেঁচে আছেন কি নাই। এরিমধ্যে একদিন ডাকপিয়ন একটি চিঠি নিয়ে এল। এসেছে সৌদী হতে। খাম খুলে দেখে আরবি ভাষায় লেখা। এখন কি আমরা আত্মীয় স্বজনরা নির্বিকার থাকতে পারব। চিটি আরবি ভাষায় লেখা, আরবি আমরা বুঝি না, একথা বলে কি হাল ছেড়ে দেব? নাকি তা বুঝার জন্য দৌঁড় ঝাঁপ দেব? উত্তর সবার জানা। আল্লাহর পক্ষ হতে লৌহে মাহফুয হতে যে চিঠি এসেছে যেখানে আমাদের জীবন চলার সঠিক পথ কোনটি বাৎলে দেয়া হয়েছে। যে চিঠিখানা আরশের মালিকের বাণী বহন করছে, তা বুঝার জন্য কি আমাদের কোনো দৌঁড়ঝাপ আছে?
সুযোগ নাই বলে দায়িত্ব এড়ানো সুযোগ কারো নেই। বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে সবকিছু পাওয়া যায় নেটে। যারা শিক্ষিত তারা ইচ্ছা থাকলে নেট এর সাহায্য নিয়ে কুরআন তেলাওয়াত এবং এর তরজমা বুঝার চেষ্টা করতে পারেন। কারো কারো বাতিক আছে, কুরআনের সামান্য জ্ঞান আয়ত্ব করতে পারলে নিজেকে বড় প-িত ভাবেন। এই বাতিকটা এক শ্রেণীর রিটায়ার্ড মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। সাবধান, অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্কর। নিজেরা পড়ে বুঝবেন, আমল করবেন। অন্যকে বুঝানোর দায়িত্ব কোনো বিদগ্ধ আলেমের।
সাধারণভাবে সবার উদ্দেশ্যে বলতে চাই। রমযানের শিক্ষা এবং কুরআন মজীদের আলোতে জীবনকে আলোকিত করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তা হল,
প্রথমে পবিত্র সূরা ফাতেহার অর্থ বুঝব। যে করেই হোক, প্রতিদিন প্রতি রাকাত নামাযে সূরা ফাতেহায় কি পড়ি, আল্লাহর কাছে কী অঙ্গীকার করি, তার কাছে কী চাই তা বুঝব। দেখবেন আলোর জগতের প্রথম দুয়ারটি আপনার সম্মুখে খুলে গেছে।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ হল, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে যে ১০টি সূরা বারবার পড়ি তার অর্থ বুঝব। তফসীরের মধ্যে মুফতি মুহাম্মদ শফী রচিত তাফসীরে মাআরেফুল কুরআনে আপনার জ্ঞান চাহিদা পূরণ হয়ে যাবে। শুধু তরজমার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আল কুরআনুল করীম খুবই সুন্দর।
তৃতীয় আরেকটি পদক্ষেপ, নামাযে দাঁড়িয়ে, রুকুতে, সিজদায় ও বসায় আমরা যেসব তাসবীহ ও দোয় পড়ি, এগুলোর অর্থ কি আমরা বুঝব। তখন দেখবেন মধুর সাগরের সাথে আপনার সংযোগ হয়ে যাচ্ছে, যা কেবলা নামাযে দাঁড়িয়ে, রুকুতে অবনত মস্ককে ও সিজদায় গিয়ে অনুভব করা যায়।
মাসিক আল জান্নাতের অগণিত পাঠক পাঠিকার খেদমতে রইল আমাদের প্রাণ উজাড় করা শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক আস সালাম।
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী, উপদেষ্টা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight