সম্পাদকীয়

এটি একটি বাস্তবতা যে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত জাতি হল মানুষ। আর (মানুষের) শান ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং একচ্ছত্র শাসন ও কর্তৃত্বের সামনে সমস্ত পৃথিবী (সকল সৃষ্টি) অবনত মস্তক। কিন্তু (মানুষের) এই শ্রেষ্ঠত্বের মানদ- কী? তা কি আমরা সবাই জানি বা বুঝতে সক্ষম হই? প্রকৃতপক্ষে খুব কম সংখ্যক লোকই বুঝতে পারে, মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা, মহত্ব ও কর্তৃত্বের মাপকাঠি ও কারণ কী? এর প্রকৃত রহস্য বা কারণ হল, অবাধ্য নফসকে আয়ত্বে এনে স্বীয় কুপ্রবৃত্তির ওপর বিজয় অর্জন করে বান্দারা ফরযসমূহ আদায় করবে এবং নিজেকে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পরিচালিত করবে। আল্লাহর পরিচয় লাভ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসন্ধান তার প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ফরয কাজ। যদি একজন মানুষ নিজের ফরজ কাজগুলো থেকে উদাসীন ও অজ্ঞ থাকে, তা হল তার সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এভাবে ইরশাদ করেছেন, “যে নিজের মনকে পবিত্র করল, সে কল্যাণ লাভ করল। আর যে এরূপ করল না সে নিজেকে ধ্বংস করল।” এ থেকে বুঝা গেল, উত্তম মর্যাদাবান এবং ভাগ্যবান ব্যক্তি সেই, যে স্বীয় নফসকে পরাভূত করতে পারে এবং তাকে পবিত্র করতে পারে। আর নফসকে পরাভূত করতে তিনটি বিষয়ের প্রয়োজন। প্রথমত, নফসকে সমস্ত কুপ্রবৃত্তি থেকে বাধা দেওয়া। কেননা যখন অবাধ্য ঘোড়ার খাবার ও ঘাস না জুটে তখন সে বশীভূত হয়ে যায়। দ্বিতীয়, নফসের ওপর ইবাদতের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। যেমনিভাবে প্রাণীর খাবার ও ঘাস কম জুটে এবং তার ওপর অনেক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে সে নমনীয় হয়ে যায়। এমনই অবস্থা নফসের। তৃতীয়ত, সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার নিকট সাহায্য চাওয়া। একটু চিন্তা করলেই বুঝে আসে, এ তিনটি বিষয় রোযার মধ্যে পরিপূর্ণ মাত্রায় রাখা হয়েছে। সুতরাং নফসের শক্তিকে দমন করার জন্য এবং নিজের শক্তিসমূহের মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য আমাদেরকে রোযা রাখার আদেশ করা হয়েছে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা অতীব জরুরী মনে করছি, আর তা হচ্ছে শ্রমিকের অধিকার প্রসঙ্গ। ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। কেননা শ্রমিকই হলো সকল উন্নয়ন ও উৎপাদনের চাবিকাঠি। যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী সে জাতি তত বেশি উন্নত। শ্রম আল্লাহ প্রদত্ত মানব জাতির জন্যে এক অমূল্য শক্তি ও সম্পদ। এ সম্পর্কে আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে শ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছি।” [সূরা বালাদ : আয়াত ৩]
ইসলাম অধীনস্ত কর্মচারী ও শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তাআলা শ্রমকে নেয়ামতের সাথে তুলনা করে বলেন, “যাতে তারা তার ফল আহার করে এবং তাদের হাত যা কাজ করে তা হতে, তারা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না? [সূরা ইয়াসিন : আয়াত ৩৫]
শ্রমিকদের যেন মানুষ ঘৃণা না করে বরং তাদের সম্মানের চোখে দেখে সে ব্যবস্থা ইসলাম করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেটে খাওয়া মানুষের মর্যাদা বর্ণনা করে ঘোষণা করেন, “আল-কাসিবু হাবীবুল্লাহ” অর্থাৎ, শ্রমিক হলো আল্লাহর বন্ধু। [কানযুল উম্মাহ : ৪র্থ খ. পৃ. ১২৭]
ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির চেয়ে শ্রমিকদের মর্যাদা অধিক হিসেবে বর্ণনা করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, “ঐ সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন। তোমাদের কারও পক্ষে এক গাছা রশি নিয়ে বের হওয়া এবং কার্য সংগ্রহ করে পিঠে বোঝাই করে বয়ে আনা কোনো লোকের কাছে গিয়ে ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম। অথচ সে ব্যক্তি তাকে দান করতেও পারে অথবা তাকে বিমুখও করতে পারে।” [সহীহ বুখারী : ১ম খ. পৃ. ৩২৫; তিরমিযী শরীফ : ১ম খ. পৃ. ১৪৭; সুনানুন নাসাঈ : ১ম খ. পৃ. ৩৬২]
ইসলাম শ্রমিকের পারিশ্রমিক ঠিক সময়ে প্রদানের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে, শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই শ্রমিককে তার শ্রম ও যোগ্যতা অনুযায়ী যথাযথ পারিশ্রমিক দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বুঝে বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight