সম্পাদকীয়…

ইসলামপূর্ব যুগকে মূর্খযুগ বলা হয়। মানবতার ইতিহাসের এক কলংকময় অধ্যায় এটি। সভ্যতা এ সময় পচে-গলে দুর্গন্ধময় হয়ে পড়েছিল। মানুষ ছিল মানুষের শিকার। একের দুঃখ-যাতনা, বিপদ-মৃত্যু অন্যজনের কাছে উপভোগ্য মনে হত, মনে হত এ যেন তাদের মানসিক খোরাক, চিত্তবিনোদনের রসালো পার্টি। সে যুগে মানব জীবনের ভাবনাটাই বদলে গিয়েছিল। মানুষ তখন প্রকৃত অর্থে মানুষ ছিল না। মানবতার শেষ ফরিয়াদ এসে ঠাঁই নিয়েছিল তখন আল্লাহর দরবারে। মানুষ যখন মানবতার বিরুদ্ধে প্রকা- হুংকারে গগন-পবন কাঁপিয়ে তুলল সেই এক কঠিন মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা প্রিয়তম রাসূলকে পাঠালেন, আর ঘোষণা দিলেন, হে মুহাম্মদ! আমি আপনাকে বিশ্ব জাহানের জন্যে শুধু রহমত বানিয়ে পাঠিয়েছি।
বাস্তব কথা হল, আমাদের এই যুগই শুধু নয় বরং কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীটাই প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন, দাওয়াত ও সোনালী সাধনার কাছে ঋণী। তাঁর রহমতের স্পর্শে ধন্য। তিনি পৃথিবীতে আগমন করে সর্বপ্রথম মানুষের রক্ত পিপাসায় কোষমুক্ত তলোয়ারটিকে নামিয়ে নিয়েছিলেন মানুষের হাত থেকে। আর তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এমন এক পাথেয় যার পরশে তারা ফিরে পেল এক নতুন জীবন, নব উদ্যম, নতুন চেতনাশক্তি, নব মর্যাদা। তারা পথ চলতে শুরু করল তখন এক নতুন দিগন্তের পথে অপূর্ব মনযিলের পথে। শুরু হল তখন থেকেই মানবতা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা-শিল্প, আত্ম-সাধনা, নিষ্ঠা ও সততার নবযুগ।
পৃথিবীর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ও অনুগ্রহ হল, তিনি বিশ্ববাসীকে তাওহীদের নেয়ামত দান করেছেন, এটাই ছিল প্রাণশক্তি, মৃতপ্রায় পৃথিবীর সঞ্জীবনী সুধা। এর মত সংগ্রামী, জীবন্ত, বিস্ময়কর কোন শক্তি পৃথিবী পূর্বে কোন দিন দেখেনি, কেয়ামত পর্যন্ত দেখবেও না আর। যে মানব গোষ্ঠী কাব্য, দর্শন ও রাজনীতিতে বড় বড় দাবি করে আছে, যে জাতি বিভিন্ন সম্প্রদায়কে বারবার ক্রীতদাস বানিয়ে ছেড়েছে, আগুন, পানি, মাটি, ও বাতাসে রাজত্ব চালিয়েছে, পাথরে ফুল ধরিয়েছে, পাথরের হৃদয় চিরে নহর প্রবাহিত করেছে, মাঝে মধ্যে নিজেকে খোদা পর্যন্ত দাবি করেছে। আবার তারাই কখনো কখনো অসহায়, লাঞ্ছিত, জড় ও অপদার্থ বস্তুর সামনে মাথা ঠুকেছে। ওই অসহায় জিনিসগুলোকেই ভয় করেছে, খোশামোদ করেছে। সেকালে তারা পাহাড়, সমুদ্র, গাছ-গাছালী, জীব-জন্তু, আর শয়তানকে সেজদা করেই ক্ষান্ত হত না, তারা সেজদা করত দুর্বল পোকামাকড়কেও। এগুলোর প্রতি তাদের প্রশান্তিবোধ ছিল না, ছিল ভয়-ভীতি আর প্রকট আতংক। যে আতংক তাদেরকে সর্বদা হীনমনা করে রাখত, করে রাখত দ্বিধাগ্রস্ত। তারা সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েছিল নিজেদের সম্পর্কে।
প্রিয় রাসূল আগমন করলেন। তাদের খাঁটি তাওহীদ ও সরলপ্রাণ জীবনের সন্ধান দিলেন; সন্ধান দিলেন আত্মপ্রত্যয়ের-আত্মচেতনার। তারা উপলব্ধি করল, আল্লাহ ছাড়া আর কারও অধীন নয় তারা। তাদের দীর্ঘদিনের পূঞ্জীভূত সংশয়ের অন্ধকারে কেটে গেল। ফিরে পেল জীবনের এক নতুন দিগন্ত। শিরায় শিরায় অনুভব করতে লাগল তারা এক নতুন শক্তির আগমন অপূর্ব বীরত্বের শিহরণ আর অশ্রুত একতার স্পন্দন। তারা জানতে পারল, প্রকৃত কর্তা আল্লাহ তাআলা। আল্লাহর ইংগিতের বাইরে কেউ কাউকে উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না। এভাবেই ধীরে ধীরে বদলে গেল তাদের জীবনবোধ। গোলামীর নিগড় থেকে বেরিয়ে এল, কেটে গেল জীবনের সকল অযাচিত আশংকাবোধ। নিজেদের ভেতরে অনুভব করতে লাগল একতার প্রগাঢ় শক্তি এবং বুঝতে শুরু করল, তারা মানুষ, তারা অন্যসব প্রাণীর চাইতে শ্রেষ্ঠপ্রাণী। তারা পরিষ্কারভাবে জানতে পারল, তারা বিশ্বজাহানের পরিচালক আর একমাত্র আল্লাহ তাআলার আজ্ঞাবহ-হুকুমের দাস। আর এ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হারিয়ে যাওয়া মানবতা ও মানুষের মর্যাদা।
আজ তাদের ইতিহাস পড়লে তাদের ভাবনার উর্ধ্বগতি, আত্মিক সূক্ষতা, মেধার তীক্ষèতা আর মার্জিত স্বভাবের অসংখ্য ঘটনা এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তাদের হৃদয় অন্যের জন্যে যেভাবে কাঁদত অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হত, অন্যের বিপদ নিজের কাঁধে তুলে নিত, শাসকরা যেভাবে ছিল দায়িত্বে কঠিন তার তুলনা শুধু তারাই। পারস্পরিক সহযোগিতা, ইবাদত মগ্নতা বর্ণনাতীত ক্ষমতাসম্পন্ন দোয়া, কান্নাকাটি, জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাধুতা সন্ন্যাস্য আর অনুপম চরিতামৃতের অকুণ্ঠ লালন এ যেন শুধু তাদেরই গুণাবলী। লেনদেনের স্বচ্ছতা অন্যের আগে বরং নিজের হিসাব গ্রহণ শত্রুকেও মিত্রবৎ ব্যবহার আর সহমর্মিতার যে অম্লান ছবি ফুটে ওঠেছিল সেই মুহাম্মদী মাধুরিমায় উদ্বাসিত মানব কাফেলায় তা ভাবতে গেলে সাহিত্যিকের কল্পনা আর কবিদের ভাবনার রথ পর্যন্ত হুমড়ি খাবে। হয়তো বা করে বসবে অবিশ্বাস। অবশ্য এ ছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের ফসল।   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight