সম্পাদকীয় : স্বাগতম জান্নাতের প্রস্তুতি মাস রমযান

পবিত্র মাহে রমযান উপলক্ষে মাসিক আল-জান্নাতের অগণিত পাঠক-পাঠিকা, মু‘মিন মুসলমান ভাইবোনদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানাচ্ছি। মাহে রমজানের সাথে আল- জান্নাতের একটি সম্বন্ধ আছে। এই সম্বন্ধ তার নামের কারণে। হয়তবা প্রতিমাসে তাতে যে লেখাগুলো ছাপা হয়, তারও কারণে। কেননা, আল-জান্নাত পাঠকদের সামনে জান্নাতে যাওয়ার সুন্দর পথ রচনার সাধনায় নিয়োজিত। এখানে যত লেখা ছাপা হয় তা জান্নাতের পথিকদের জন্য। মাহে রমযানের সাথে এই সম্পর্কের তাৎপর্যও এখানেই। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, মাহে রমযান যখন আসে তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। রমযান না শেষ হওয়া পর্যন্ত সে দরজা আর বন্ধ হয় না। রমযানে যারা আল্লাহর মহব্বতে রোযা রাখে, সেহেরী খায়, ইফতার করে, কুরআন তেলাওয়াত করে, তারাবীহ নামায পড়ে, ঠিকমত যাকাত ফিতরা দেয় তাদের মনে জান্নাতের সুবাতাস বয়ে যায়। হাদীসে আরো আছে, ‘রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন : বছরের প্রথম হতে পরবর্তী বছর পর্যন্ত রমযানের জন্য জান্নাতকে সাজানো হয়।’ কাজেই জান্নাতের সাথে মাহে রমযানের এক বিশেষ ও গভীর সম্বন্ধ রয়েছে। নামের এতটুকু মিল থাকায় আল জান্নাত পত্রিকা নিজেকে পুলকিত মনে করছে। আমরা আল্লাহ পাকের দরবারে শোকরিয়া জানাচ্ছি, এত সুন্দর একটি নাম নিয়ে আমরা পত্রিকার জগতে হাজিরা দিতে পারছি। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে যেন জান্নাতি করেন। জান্নাতে যাওয়ার মতো সুন্দর জীবন গঠনের তওফীক যেন আমাদের সবাইকে দান করেন।
রমযান আমাদের জন্য অনেক নেয়ামত নিয়ে আসে। সেই নিয়ামত দুনিয়ার ভোগ সম্ভোগ বা ধন সম্পদের নয়। বরং আল্লাহকে রাজি করার উদ্দেশ্যে তার হুকুম পালনে নানা কষ্ট সহ্য করার নেয়ামত। সারাদিন উপোস থাকলে আমরা বুঝতে পারি অভাবে অনাহারে বা দূঃখ কষ্টে যাদের জীবন যায়, তারা কত কষ্টের মধ্যে আছে। এই দূঃখ কষ্ট উপলব্ধি করার জন্যই আল্লাহ পাক রমযানে দিনের বেলা উপোস থেকে আবার রাতে অনেক বেশি ইবাদত করার বিধান দিয়েছেন। আসলে যদি ধৈর্য ধরে দূঃখ কষ্ট মোকাবিলা করা যায়, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ মানুষের জীবনে সুখ দিবেন। কারণ, আল্লাহ তাআলা কাউকে চিরকাল দূঃখে রাখেন না বা সুখের মধ্যেও রাখেন না। আজ যাদেরকে আমরা সুখি মানুষ বলে মনে করি, খোঁজ নিলে দেখা যাবে যে, তারা দূঃখের কঠিন দিন পার হয়ে এ পর্যন্ত এসেছেন। সবসময় আল্লাহর প্রতি শোকরগুযার থাকা ও দূঃখ কষ্টকে জয় করার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার বিরাট সুযোগ রমযান মাস।
হাদীসে আছে, হাশরের দিন আল্লাহ বলবেন, বান্দা আমি অসুস্থ ছিলাম তুমি আমার সেবাযতœ করো নি, বান্দা বলবে, প্রভুহে তুমি মহামহিম সারা জাহানের প্রতিপালক তুমি কীভাবে অসুস্থ হও বা আমার পক্ষে কীভাবে তোমার সেবা করা সম্ভব ছিল। আল্লাহ বলবেন, তোমার জানাশোনার মধ্যে আমার অমুক বান্দা অসুস্থ পড়ে রয়েছিল, তুমি তার খোঁজ খবর নাও নি, তার সেবাযতœ করো নি, তুমি যদি তার সেবা করতে তাহলে তার কাছেই আমাকে পেতে। অভুক্ত মানুষকে খাবার দেয়া বা পিপাসার্ত মানুষকে পানি পান করানোর অভাবনীয় সওয়াবের ব্যাপারে বান্দার সাথে আল্লাহর এ ধরনের কথোপকথনের কথাও এই হাদীসে আছে। কাজেই রমযানে আমাদেরকে বিশেষভাবে এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।
রমযান কুরআন নাযিলের মাস। শুধু কুরআন মজীদ নয়, অন্যান্য আসমানী গ্রন্থও এই মাসে নাযিল হয়েছে। রমযানের গুরুত্বের কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে ওহীবাহক ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ) প্রতি রমযানে নবী করিম (সা) কে ঐ পর্যন্ত নাযিল হওয়া পুরো কুরআন পড়ে শোনাতেন, আবার নবী করিম (সা)ও পাঠ করে শোনাতেন। অর্থাৎ দওর করতেন। এর অনুসরণে মুসলিম উম্মাহ পবিত্র তারাবিহ নামাযে এক খতম কুরআন তেলাওয়াতের নিয়ম মুসলিম সমাজে চালু রয়েছে। এটি আল্লাহর  খাস রহমত। এই নেয়ামত জীবন ভরে নেয়ার সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া পুরো রমযানে এক খতম কুরআন তেলাওয়াত করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর কর্তব্য। হাদীস শরীফে আছে, হাশরের দিন কুরআন মজীদ আল্লাহর আদালতে সুপারিশ করে বলবে, হে আল্লাহ তোমার অমুক বান্দা রাত জেগে আমাকে তেলায়াত করেছিল। কাজেই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ তুমি কবুল কর। মনে চেতনা রাখতে হবে যে, কুরআন যেন কাল কিয়ামতে আমার পক্ষে সুপারিশকারী হয়। যাদের পক্ষে সম্ভব, কুরআন মজীদ অর্থসহ তেলাওয়াত করতে পারলে সোনায় সোহাগা হবে। কেননা, কুরআন মজীদ মানুষের হেদায়তের জন্য নাযিল হয়েছে। হেদায়ত পেতে হলে অবশ্যই তার অর্থ বুঝতে হবে। সে অনুযায়ী আমল করতে হবে।
ইচ্ছা করলে রমযানে মহিলারা অনেক কাজ কমিয়ে দিতে পারে। রোযা রেখে ইফতার করা সুন্নত। অন্য রোযাদারকে ইফতার করানোরও অনেক সওয়াব। অনেকে ইফতারে রুচি বৃদ্ধির জন্য দিনের অর্ধেক সময় কাটিয়ে দেয়। দিনে উপোস থাকলেও রাতে ভুরি ভোজন করে। এমন আচরণ রমযানের কৃচ্ছ সাধনার সম্পূর্ণ বিরোধী।
রমযানে শেষ রাতে সেহেরী খাওয়ার জন্য জাগতে হয়। একটু সতর্ক হলে আমরা মূল্যবান সময়টিকে বিরাট নেয়ামত লাভের জন্য কাজে লাগাতে পারি। অর্থাৎ তাহাজ্জুদের নামায। সেহেরীর আগে বা পরে সময় বুঝে তাড়াতাড়ি তাহাজ্জুদের নামায পড়ে নিতে পারি।
রমযানের বিশেষ নেয়ামত শবে কদর। শবে কদর রমযানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোর কোনো একটিতে হওয়ার সম্ভাবনার কথা হাদীস শরীফে বলা হয়েছে। শবে কদরের ফযিলত এত অধিক যে, পবিত্র কুরআন মজীদ নাযিল শুরু করা হয়েছে লাইলাতুল কদরে। এই কথা সূরা কদরÑএ বিস্তারিত রয়েছে। বলা হয়েছে, এই একটি রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। অর্থাৎ এক হাজার মাস বা তার চেয়ে বেশি কাল একটানা নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের মধ্যে কাটিয়ে দিলে যে সওয়াব পাওয়া যাবে, যা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়, শবে কদরের এক রাতে ইবাদত করলে তার চেয়ে অধিক সওয়াব পাওয়া যাবে। আমার ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমযানের পাঁচটি রাত সতর্কতার মধ্যে কাটাতে পারলে এই মহান নেয়ামত লাভ করা সম্ভব।
শবে কদর লাভ করার জন্য তার সন্ধানের চেতনা থাকাই সবচে বড় প্রয়োজন। হাদীস শরীফে আছে, নবী করিম (সা) শবে কদর লাভ করার উদ্দেশ্যে রমযানে ইতিকাফ থাকতেন। মুসলমানদেরকেও এই উদ্দেশ্যে ইতিকাফ পালনের হুকুম দিয়েছেন। আমরা সবাই আল্লাহর নৈকট্য চাই। এর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রমযানে ইতিকাফের মাধ্যমে তা তালাশ করার যে সুযোগ তার প্রতি অনেকেই গুরুত্ব দেই না। ইতিকাফ পুরুষরা মসজিদে পালন করবে। মহিলাদের জন্য ইতিকাফের হুকুম বাড়ির মধ্যে একটি নির্ভৃত জায়গায়, যেখানে প্রায় সময় নামায পড়া হয়। ইতিকাফের মূল সাধনা হল, সম্পূূর্ণ আল্লাহর হৃেয় যাওয়া। নামায শুরু করলে যেমন একমাত্র আল্লাহর সাথে সম্পর্ক হয়ে যায় এবং দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখা চলে না, ইতিকাফও অনেকটা সেরকম। তার জন্য নির্দিষ্ট মাসয়ালা আছে। এগুলো জেনে নিতে হবে। না জেনে ইবাদত করার চেয়ে ভালোভাবে জেনে ইবাদত করার গুরুত্ব হাজার গুণ বেশি।
আজকের মুসলিম জাহান বহু সমস্যার সম্মুখীন। এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে হলে আমাদেরকে জাগতে হবে। জাগ্রত হওয়ার জন্য প্রথম প্রয়োজন নিজের চেতনাকে জাগ্রত করা। চেতনা জাগ্রত হলেই অমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে পারব। আল্লাহ পাক যেন সংকট উত্তরণের মতো বুদ্ধি বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা মুসলিম নেতৃবৃন্দকে দান করেন। আমরা গভীর বেদনা নিয়ে দোয়া করব মুসলিম উম্মাহর জন্য। আমাদের মজলুম ভাইদের জন্য। মায়ানমারে আমাদের মুসলমান ভাইয়েরা যেভাবে কষ্টের মধ্যে রয়েছে, তাদের জন্য প্রতি ওয়াক্ত নামাযে দোয়া করতে হবে। দোয়া করতে হবে, মধ্য প্রাচ্যে যেন শান্তি স্থাপিত হয়। মাহে রমযান আমাদের প্রিয় মাতৃভূূমি বাংলাদেশের জন্য যেন শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক । রমযান মাস সবার জন্য মোবারক হোক।
সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight