সম্পাদকীয় : রবিউল আউয়াল মাস উম্মতের করণীয়

Sampadokia-150x150

সকল প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্ব মহান আল্লাহর জন্য যিনি সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক। অজস্র দরূদ ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রিয়নবী মোহাম্মদ সা.-এর প্রতি। কুরআন-সুন্নাহর পর্যালোচনায় দেখা যায়, আল্লাহ তায়ালা কিছু ইবাদতকে তারিখের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন আর কিছু ইবাদতকে জুড়ে দিয়েছেন দিনের সঙ্গে। তারিখের সঙ্গে স¤পৃক্ত ইবাদতের ক্ষেত্রে দিন কোনটি হচ্ছে, তা দেখার বিষয় নয়। যেমন হজের নির্ধারিত তারিখ হচ্ছে ৯ জিলহজ। সর্বদা ওই তারিখেই হজ পালিত হবে। তেমনি রোযার সম্পর্কও তারিখের সঙ্গে। রমজানের প্রথম তারিখ থেকে রোযা শুরু হবে। তবে বার হিসেবে যেকোনো দিন হতে পারে। সপ্তাহের যেকোনো দিন রমজানের প্রথম তারিখ হতে পারে। প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের নফল রোযার ব্যাপারটিও তারিখের সঙ্গে এসব ইবাদত স¤পৃক্ত, দিনের সঙ্গে নয়।
পক্ষান্তরে কিছু ইবাদত রয়েছে দিনের সঙ্গে স¤পৃক্ত, যেখানে তারিখ কোনটি, তা দেখার বিষয় নয়। নির্দিষ্ট দিনেই তা পালন করতে হবে। যেমন শুক্রবারের বিভিন্ন আমল। যার মধ্যে রয়েছে ফজরের নামাযের প্রথম রাকাতে সূরায়ে আলিফ লা-ম মী-ম সিজদা ও দ্বিতীয় রাকাতে সূরায়ে দাহর-এর তিলাওয়াত।
উত্তমরূপে গোসল করে সকাল সকাল মসজিদে যাওয়া, সূরা কাহাফের তিলাওয়াত, আসর নামাযের পর স্থান ত্যাগের আগে ৮০ বার বিশেষ দরুদ শরীফ পাঠ করা এবং সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্তে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া মুনাজাত করা ইত্যাদি।  দিনের সঙ্গে স¤পৃক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে সোমবারের রোযা। প্রতি সপ্তাহের এ দিনে নফল রোযা রাখার অনেক ফজিলত রয়েছে। দিন হিসেবে এটা পরিপালিত হয়ে থাকে, তারিখ দেখে নয়। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘নবীজি সা.-কে সোমবারের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনে আমাকে নবুয়াত দান করা হয়েছে।’ [মুসলিম : ১১৬২]
মুসলিম শরীফে বর্ণিত বিশুদ্ধ এই হাদীস দ্বারা মহানবী সা. তাঁর জন্মদিনে উম্মতের করণীয় কী, তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অন্য হাদীসে নবীজি সা. বলেন- সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়ে থাকে। অতএব রোযা অবস্থায় আমার আমলনামা পেশ করা হোক, এটা আমি পছন্দ করি। [তিরমিযী : ৭৪৭]
নবীজির সা. জন্মের কারণে বছরের প্রতিটি সোমবার অতি মূল্যবান হয়ে গেছে। তাই এ দিনে নফল রোযার বিধান রাখা হয়েছে। এ দিনে রোযা রাখা প্রকৃত নবী-প্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য হবে। সোমবার নবীজির সা. জন্ম দিন, এটা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
তবে ১২ রবিউল আওয়াল তাঁর পবিত্র জন্মদিন হওয়ার কথা লোকমুখে প্রশিদ্ধ, কিন্তু তা কুরআনেও নেই, হাদীসেও নেই। ঐতিহাসিকরাও ১২ তারিখে জন্মের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে সোমবারই হচ্ছে তাঁর পবিত্র জন্ম দিন, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।
এ ক্ষেত্রে তারিখ দেখার বিষয় নয়, ১২ তারিখও হতে পারে, ভিন্ন তারিখও হতে পারে। প্রকৃত নবী- প্রেমিক হতে হলে প্রতি সোমবার রোযা রাখা চাই। সঙ্গে বৃহস্পতিবারও রাখা উচিত। বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা এগুলো প্রমাণিত। এর বিপরীত দিনের প্রতি লক্ষ না করে তারিখের ভিত্তিতে ১২ তারিখকে জন্মদিন ধরে নিয়ে জশনে-জুলুস বা মিছিল বের করা একটি মনগড়া কাজ বৈ কিছু নয়।
ইসলামের সঙ্গে এসব জশনে-জুলুসের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা ইসলামের স্বর্ণযুগে এমন মিছিলের বা জন্মদিন পালনের প্রথা খুঁজে পাওয়া যায় না। নবীজি সা. তাঁর পবিত্র যুগে জশনে-জুলুস বা জন্মদিন পালনের নিয়ম ছিল না। পরবর্তী সময়ে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগেও পালিত হয়নি। সাহাবাদের যুগেও কেউ পালন করেননি। চার ইমামসহ মুহাদ্দিসীনের কেউ তা পালন করেননি। বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানি রহ., খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি আজমীরি রহ., শাহজালাল ইয়ামেনি রহ.-এর মতো বুজর্গদের কেউ তা পালন করেননি।
তাই আসুন, প্রকৃত নবী-প্রেমের বহিঃপ্রকাশ করতে আমরা প্রতি সোমবার নফল রোযা রাখার অভ্যাস গড়ে তুলি। রোযা অবস্থায় আল্লাহর দরবারে আমাদের আমলনামা পেশ করার সৌভাগ্য অর্জন করি। যদি সময়-সুযোগের অভাবে বা অন্য কোনো কারণে সারা বছর এ রোযা পালনের তাওফিক না হয়, তবে কমপক্ষে রবিউল আওয়াল মাসে এ ইবাদতটি আমরা পালন করতে পারি। হয়তো চারটি রোযা রাখা লাগবে। এতে নবীজির সা. আদর্শ বাস্তবায়িত হবে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সা.-এর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।’ [সূরা আল আহযাব : ২১] অতএব রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শ মোতাবেক প্রতিটি ইবাদত পালন একজন নবী-প্রেমিক বান্দার একান্ত কাম্য হওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight