সম্পাদকীয় : থার্টি ফাস্ট নাইট বা নববর্ষ একটি বিজাতীয় কালচার

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মদ সা. ও তার সাহবীগণের উপর। আমাদের জীবন থেকে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল ১টি ইংরেজি বছর, ২০১৫ সাল। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্য রাতে বর্ষবরণের নামে বাঙালী মুসলমানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানগণ মেতে উঠে বেপর্দা, বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা আর পটকা ফুটিয়ে জনগণকে আতংকগ্রস্ত করারমত এক হারাম আনন্দে। কিন্তু এই বেপর্দা, বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা আর মাতলামী কি হক্বের উপর দৃঢ় চিত্ত থাকার নমুনা? আর থার্টি ফাস্ট নাইট কি মুসলমানদের জন্য পালনীয় কোন উৎসব? এটা কি দ্বীন ইসলামের কোন অংশ?
মূলতঃ ১লা জানুয়ারী পালনের ইতিহাস ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এটা পালন মুসলমানদের কাজ নয়। ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার সর্বপ্রথম ইংরেজি নববর্ষ উৎসবের প্রচলন করেন। সাধারণভাবে প্রাচীন পারস্যের ক্ষমতাধর সম্রাট জমশীদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিল এবং এ ধারাবাহিকতা এখনো পারস্য তথা ইরানে নওরোজ ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উৎসব পালিত হয়। ইরান হতেই ইহা একটি সাধারণ সংস্কৃতির ধারা বহিয়া মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে।
এ ধরনের কুসংস্কার সম্পর্কে রাসূল সা. হুশিয়ার করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সা. বলেছেন, ‘তোমরা অন্ধকার রাতের ঘনঘটার ন্যায় ফেতনার পূর্বে দ্রুত আমল কর, যখন কোন ব্যক্তি ভোর অতিবাহিত করবে মুমিন অবস্থায়, সন্ধ্যা করবে কাফির অবস্থায়, অথবা সন্ধ্যা অতিবাহিত করবে মুমিন অবস্থায়, ভোর অতিবাহিত করবে কাফির অবস্থায়। মানুষ তার দীনকে বিক্রি করে দিবে দুনিয়ার সামান্য বিনিময়ে।’
আমরা বর্তমান ফেতনার সে অন্ধকারে বাস করছি, আমাদের চারপাশে ঘোর অন্ধকার, মূর্খতার অন্ধকার, কুসংস্কারের অন্ধকার, বিদআতের অন্ধকার, শিরকের অন্ধকার, সঠিক পথ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিশেষ করে পশ্চিমা ও কাফেরদের সংস্কৃতি আমাদের ঘ্রাস করে রেখেছে। আমরা তাতে গভীরভাবে মগ্ন হয়ে পড়েছি। নিজেদের দীন ও আদর্শের পরিবর্তে তাদের কালচারে মেতে আছি। উম্মতের উপর রাসূল সা. যার আশঙ্কা করেছেন এবং যার থেকে তিনি উম্মতকে বারবার সতর্ক করেছেন তাই আমরা করছি। হযরত আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের রাস্তা অনুসরণ করবে বিঘতে বিঘতে ও হাতে হাতে, তারা যদি গুঁইসাপের গর্তে ঢুকে তোমরা অবশ্যই তাদের অনুসরণ করবে; আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, তারা কি ইহুদি ও খৃস্টান? তিনি বললেন, তবে কে?’এ হাদীসে ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহ. বলেন, ‘বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে ও গুঁইসাপের গর্তের উদাহরণ পেশ করার অর্থ কঠিনভাবে তাদের অনুসরণ করা। এ অনুসরণ অর্থ কুফরি নয়, বরং পাপাচার ও ইসলামের বিরোধিতায় তাদের অনুকরণ করা উদ্দেশ্য। এটা নবী সা. স্পষ্ট মুজিজা, তিনি যার সংবাদ দিয়েছেন আমরা তা চাক্ষুষ দেখছি।’
হযরত মুনাব্বিহ রহ. বলেন, ‘এ সংবাদ নবী সা. এর এক মুজিজা। আজ তার উম্মতের বড় এক গোষ্ঠী কৃষ্টি-কালচার, শিক্ষা-দীক্ষা, যানবাহন, ঘর-বাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ ও রাস্তা-ঘাটে পাশ্চাত্যের অনুসরণ করে চলছে। এ যুগে তাদের অন্ধানুকরণ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে পার্থিব শৌর্য-বীর্য ও বৈজ্ঞানিক উন্নতির ফলে তারা রীতিমত অনেক মুসলিমের জন্য ফেতনায় পরিণত হয়েছে। ইলেকট্রিক প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে ঘরে ঘরে নিমিষে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের আচার-অনুষ্ঠান। তারা যাই করে মুসলিমের একাংশ তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তাদের উৎসব, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করে, তাতে যোগ দেয় ও আনন্দ করে। কি নববর্ষ, কি মৃত্যু বার্ষিকী, কি জন্ম বার্ষিকী, কি বিবাহ বার্ষিকী, কি বাবা দিবস, কি মা দিবস, কোন কিছুতেই কুণ্ঠাবোধ নেই। তারা করছে তাই আমরা করছি। ভালো-মন্দ, বৈধ-অবৈধ ও কুফর-শিরক ভেবে দেখার ফুরসত নেই। তারা দীন থেকে দূরে সরে গেছে, ভুলে গেছে ইসলামী আদর্শ ও নবী সা. এর বাণী, ‘যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখল সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।’
অথচ নবী সা. তাদের বিরোধিতা করার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ইব্ন ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, ‘তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা কর।’ ইব্ন কাসির রহ. বলেছেন, কোন মুসলিমের সুযোগ নেই কাফেরদের সামঞ্জস্য গ্রহণ করা, না তাদের ধর্মীয় উৎসবে, না মৌসুমি উৎসবে, না তাদের কোন ইবাদতে। কারণ আল্লাহ তাআলা এ উম্মতকে সর্বশেষ নবী দ্বারা সম্মানিত করেছেন, যাকে পরিপূর্ণ ও সর্বব্যাপী দীন দেওয়া হয়েছে। যদি মূসা ইব্ন ইমরান জীবিত থাকত, যার উপর তাওরাত নাযিল হয়েছে; কিংবা ঈসা ইব্ন মারইয়াম জীবিত থাকত, যার উপর ইঞ্জিল নাযিল হয়েছে; তারাও ইসলামের অনুসারী হত। তারাসহ সকল নবী থাকলেও কারো পক্ষে পরিপূর্ণ ও সম্মানিত শরিয়তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকত না।
অতএব মহান নবীর আদর্শ ত্যাগ করে আমাদের পক্ষে বাংলা নববর্ষ ‘পহেলা বৈশাখ’, ইংরেজি নববর্ষ ‘থার্টিফাস্ট’ কিংবা হিজরি নববর্ষ পালন করা হারাম। তবে হ্যাঁ আমরা বছরের অন্যান্য দিনের ন্যায় নববর্ষের দিনকে গণ্য করব। এতে কোন ধরণের অনুষ্ঠান করব না ও তাতে অংশ নেব না। আমাদের সন্তানদের প্রতি গভীর দৃষ্টি রাখব, যেন তারা বিজাতীয় উৎসবে অংশ গ্রহণ না করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight