সমাজজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দৃষ্টির হেফাজতের গুরুত্ব // মুফতি আব্দুল্লাহ

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল।
হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন : হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগুনতি পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচ্ঞা করে থাক এবং আত্মীয়-জ্ঞাতীদের ব্যাপারে সতর্কতা অবল¤¦ন কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। [সূরা নিসা : আয়াত ১]
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন : অতঃপর আল্লাহ্ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উম্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন- যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ্ তাদের উপর আযাব বর্ষণ করেন। [সূরা আন’আম : আয়াত ১২৫]
আল্লাহ তা’আলা  ইরশাদ করেন : হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। [সূরা আলে-ইমরান : আয়াত ১০২]
মুসলিম ভাইয়েরা !
চোখ হলো মনের আয়না। যে কোনো গোনাহের কাজ করার আগে চোখ প্রথমে তা দেখে এবং পরে মনকে প্রলুব্ধ করে। তাই চোখের হেফাজত করা মানেই মনের হেফাজত করা। অশ্লীল, হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে চোখের দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখা এবং নেক ও ভালো কাজের প্রতি চোখ খুলে রাখা ও দেখাই হচ্ছে চোখের কাজ। আল্লাহ তা’আলা  ইরশাদ করেন :- বলুন, তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং দিয়েছেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর। তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (সূরা মুলক : আয়াত-২৩]
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আরো ইরশাদ করেন :- যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে। [সূরা ইসরাঈল : আয়াত ৩৬]
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা রাস্তায় বসে থাকা থেকে বিরত থাক। সাহাবীগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল ! আমাদের প্রয়োজনীয় কথার জন্য রাস্তায় বসার বিকল্প নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমাদের একান্ত বসতেই হয়, তাহলে রাস্তার হক আদায় কর। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক কি? তিনি বললেন, চক্ষু অবনত করা, কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের উত্তর প্রদান করা, সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করা। [বুখারী-মুসলিম]
হাদীসের শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ : ১. ইসলামের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হল সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিকে কুরুচিপূর্ণ আচার-আচরণ ও কর্মকা- থেকে নিষ্কলুষ করে সৎ-চরিত্র ও আদর্শবান সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। যাতে সমাজের প্রতিটি মানুষের মাঝে বিরাজ করে পারস্পরিক মায়া-মমতা ও সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি। মনে হবে, যেন তারা একে অন্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ২. ইসলাম সর্বাঙ্গ সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। নীতিমালা নির্ধারণ ও অন্যের হক সংরক্ষণ ইত্যাদিতে তা পরিপূর্ণ ও অনন্য। যা অন্য কোন ধর্মে কিংবা মতাদর্শে বিরল, নেই বললেই চলে। ৩. এই হাদীস প্রমাণ করে, রাস্তাঘাট তথা মানুষের গমনাগমনের স্থানসমূহ প্রকৃত পক্ষে বসার আসন বা এ কাজে ব্যবহারের জন্য নয়। অন্যথায় অনেক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন : ক. অন্যায় ও অসামাজিক এবং অশ্লীল কাজের বিস্তার ঘা; খ). আকার ইঙ্গিত ও গালি মন্দের দ্বারা পথচারীকে কষ্ট দেয়া; গ. অনর্থক মানুষের গোপন রহস্য উদ্ঘাটন করা; ঘ. অযথা সময়ের অপচয়; ৪. এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাস্তার কয়েকটি আদবের কথা বলেছেন। যথা : ক. চক্ষুদ্বয়কে হারাম দৃষ্টি থেকে সংযত রাখা। রাস্তায় যেহেতু নারী সম্প্রদায়কে তাদের প্রয়োজনের তাগিদে আসতেই হয় এবং এর কোন বিকল্প নেই, সুতরাং এ ক্ষেত্রে তাদের প্রতি স্বেচ্ছায় না তাকাতে বলা হয়েছে। কেননা, স্বেচ্ছায় কোন পরনারীর দিকে তাকানোকে ইসলাম হারাম করেছে।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা  ইরশাদ করেন: মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ্ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে। [সূরা নূর : আয়াত ৩০-৩১]
খ. পথচারীদেরকে যে কোন প্রকার কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা। যেমন: গালমন্দ, ঠাট্টা, তিরস্কার ইত্যাদি। এমনিভাবে যেকানো উপায়ে মুসলমানকে কষ্ট দেয়া, যেমন কারো ঘরে উঁকি দিয়ে দেখা বা কারো বাড়ির পাশে বল খেলা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। সব ধরনের কষ্টই হারাম ও পরিত্যাজ্য।
গ. সালামের উত্তর দেওয়া। এর উপর আলেমগণ একমত যে সালামের উত্তর ওয়াজিব। মহান আল্লাহ তাআলা  ইরশাদ করেন : আর যদি তোমাদেরকে সালাম পেশ করে তবে তোমরাও তার জন্য এর চেয়ে উত্তম সালাম পেশ কর অথবা তার সমপরিমাণ কর। [সূরা নিসা : আয়াত ৮৬] তবে হ্যাঁ, সালাম দেয়া ওয়াজিব নয়। বরং সুন্নত, পুণ্যের কাজ। কেননা, তা মুসলমানের জন্য রহমত, বরকত, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া।
ঘ. সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। সাধারণত রাস্তা ঘাটে অন্যায় বা অসৎ কাজের আধিক্য ঘটে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসৎ কাজের নিষেধ রাস্তার হক হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এবং এই কাজ যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ এই যে, কুরআনের বহু আয়াত আর রাসূলের বহু হাদীস এ প্রসঙ্গে বিবৃত। মহান আল্লাহ তাআলা  ইরশাদ করেন : তোমাদের এমন একটি দল থাকা উচিত যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে। এক সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে। [সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১০৪]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :- তোমাদের কেউ যখন কোন মন্দ কাজ দেখবে, তখন সামর্থ্য থাকলে শক্তি প্রয়োগ করে তা প্রতিহত কর। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে কথার দ্বারা তার প্রতিবাদ কর। তাও যদি না পার তাহলে অন্তরে ঘৃণা করতঃ তা প্রতিহতের চিন্তা ভাবনা করতে থাক। আর এ হল ঈমানের সর্বশেষ দাবি বা স্তর। [মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজা, নাসায়ী]
ঈমানদার ভাইয়েরা! পরকালে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোই তার অন্যায়ের সাক্ষ্য দেবে। আল্লাহ তা’আলা  ইরশাদ করেন : আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেবো। তাদের হাতগুলো আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা-গুলো তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। [সূরা ইয়াসিন : আয়াত ৬৫]।
আলোচ্য আয়াতে যে মানুষের পার্থিব জীবনের বিভিন্ন অপকর্মের সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে হাত ও পায়ের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। কুরআনের অন্য আয়াতে মানুষের কর্ণ, চক্ষু ও চর্মের সাক্ষ্যদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। হাশরের বিভীষিকাময় ময়দানে উপস্থিত হওয়ার পর সব মানুষ তার পরবর্তী অবস্থা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়বে। প্রকৃত অপরাধীরা সেদিন আল্লাহর ভয়াবহ আজাব থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাবে। প্রথমে প্রত্যেকেই আত্মরক্ষার্থে যা কিছু বলার ও ওজর পেশ করার তা করতে পারবে এবং নিজেদের অপরাধ আড়াল করার উদ্দেশ্যে অপরাধীরা মিথ্যার আশ্রয় নেবে। মুশরিকরা সেখানে কসম করে কুফর ও শিরক অস্বীকার করবে। কেউ কেউ বলবে, ফেরেশতারা আমাদের আমলনামায় যা কিছু লিখেছে আমরা তা থেকে মুক্ত। তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের মুখে মোহর এঁটে দেবেন। যাতে তারা কোনো কিছুই বলতে না পারে। অতঃপর তাদেরই হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ, চর্ম ও অন্য অঙ্গগুলোকে রাজসাক্ষী করে কথা বলার যোগ্যতা দান করা হবে। এসব অঙ্গ-প্রতঙ্গ একটা একটা করে পার্থিব জীবনে অপরাধী কর্তৃক সম্পাদিত সব অন্যায় কার্যাবলি উন্মোচিত করে দেবে। অপরাধীরা তখন হতবাক হয়ে যাবে এই ভেবে যে, পার্থিব জীবনে যে হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ, চর্ম কখনো কথা বলতে পারত না, তারাই আমাদের অপরাধগুলো এভাবে আল্লাহর সামনে প্রকাশ করে দিচ্ছে! আজকের এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবনে আমরা একবারও ভেবে দেখি না যে, আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলোই এক সময় আমাদের শত্রু হিসেবে আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য দেবে। যদি ভাবতাম তাহলে আমাদের দ্বারা কি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, জেনা, ব্যভিচার, মাদক সেবন, দুর্নীতি, অন্যের হক নষ্ট প্রভৃতি অন্যায় কাজ করা সম্ভব হতো? পৃথিবীর এই সংক্ষিপ্ত জীবনকে একটু আরামদায়ক করার জন্য, স্ত্রীর মন জয় করার জন্য কিংবা সন্তানদের ভবিষ্যৎ জীবনকে শান্তিময় করার উদ্দেশ্যে আমরা আমাদের হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ, মুখ, জিহ্বা ব্যবহার করে কতই না অন্যায় কর্ম করে যাচ্ছি। কিন্তু হাশরের ময়দানে আমি নিজে যখন কঠিন মসিবতে পড়ব, আমার এসব অঙ্গ যখন আমাকে জাহান্নামে নেয়ার জন্য আমার অপরাধগুলো প্রকাশ করে দেবে তখন আমাকে কে রক্ষা করবে? অতএব, পরকালীন জীবনের লাঞ্ছনা এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত আল্লাহ প্রদত্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হুকুম অনুযায়ী ব্যবহার করা।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সবাইকে দৃষ্টি অবনত করে চলার তাওফীক দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight