সভ্যতা ও সংস্কৃতি: মীযান মুহাম্মদ হাসান

সভ্যতা সংস্কৃতি আচার আচরণ সঙ্গত কারণেই মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। সভ্যতা ও সংস্কৃতির মানদ-েই একটি জাতির উন্নয়ন উৎকর্ষ ও সফলতা নির্ভর করে। ঘটে উন্নত চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ব্যক্তি জীবন থেকে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিফলন ঘটে এর সুফল। তবে এই সভ্যতা ও সংস্কৃতিই যদি হাত ছাড়া হয়ে যায় কোনো জাতির কাছ থেকে। তবে  নিশ্চিত সে জাতির পতন ঘটে। কখনও পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যায় সে জাতির নাম ও ইতিহাস।
আর যদি কোনো জাতি ধরে রাখে তার নিজস্ব সভ্যতা সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও অবদান। পৃথিবীর বুকে সে বেঁচে থাকে। ইতিহাস তাকে ঠাই দেয়। সগৌরবে আপন মহিমায় সে জাতি টিকে থাকে যুগের পর যুগ। ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে গেছে। তার কোনো নাম-নিশানাও ইতিহাস রাখে নি! যদিও আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ‘সংস্কৃতি’র সুন্দর ব্যাখ্যাটা দেওয়া আছে। বাকি তা আমলে আসাটাই এখন বড় মারাতœক এবং কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সাদরে গ্রহণ করছি পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতি। বিলেতি সভ্যতা আজ আমাদের মেধা মনন ও  মস্তিষ্ককে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। প্রগতি ও আধুনিকতার নামে আমরা ছুটে চলেছি কেবল পশ্চিমাদের অনুকরণে অনুসরণে । চারদিকে মিডিয়ার লাগামহীন আগ্রাসন। কি প্রিন্ট আর কি ইলেকট্রিক। সর্বত্র নেতিবাচক চিত্রটাকেই মুখ্য করে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই এখন টিভি-টকশোর নেতিবাচক ধারায় প্রভাবিত। অনেকটা নিজের অজান্তে অনিচ্ছায়।
ইতিবাচক তেমন কোনো সাড়া কোথাও নেই বললেই চলে। সংস্কৃতির নামে সর্বত্র অপসংস্কৃতির ছয়লাভ। আর এ অপসংস্কৃতিগুলোই দিন দিন মিশে যাচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতির নামে। ভারতীয় টিভি চ্যানেলের কল্যাণে, তাদের সংস্কৃতিটাই আজ প্রাধান্য পাচ্ছে। কোমলমতি শিশুরাও আনন্দচিত্তে রপ্ত করছে কার্টুনসিরিয়ালগুলো থেকে প্রিয় হিন্দিভাষা। কতক তো অনর্গল হিন্দি বলতে সক্ষম। অথচ এদের অনেকেই এখনো শেখে নি মাতৃভাষা বাংলা! সর্বশেষ ১৫/১৬ইং অর্থ বছরে ছাপা বাংলা একাডেমি অভিধান এর ভাষ্য মতে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি সংস্কৃত ভাষা। এর অর্থ লেখা হয়েছে, ১.শিল্প-সাহিত্য আচার-আচরণ বেশভূষা প্রভৃতির দ্বারা কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর যে পরিচয় ফুটে ওঠে, কৃষ্টি কালচার। ২.অনুশীলনী বা চর্চার দ্বারা লব্ধ শিক্ষা শিল্প রুচি প্রভৃতি বিষয়ক উৎকর্ষ। ৩.সংস্কার। সুতরাং, অভিধানের এ ব্যাখ্যার আলোকে এখন আপনিই যাচাই করুন , আমরা সংস্কৃতির নামে কোন মরিচীকার পিছে ছুটে চলেছি অবিরত?
সংস্কৃতির নামে আমরা দিন দিন কেবল ভারতীয়দের কিংবা পশ্চিমাদের অনুসরণ করছি। মিডিয়া ও গণমাধ্যমগুলোতেও তাদেরকেই অনুসরণীয় বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। টিভি-ড্রামা, ম্যাগাজিন বা পত্রিকায়ও খুব আকর্ষণীয় করে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে, তাদের অনুষ্ঠানগুলো। চলনে-বলনে পোষাক-পরিচ্ছদে; শিক্ষাদীক্ষায় দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি কেবল আজ আমরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছি না। বরং স্বজাতির ভাষা সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি চরম বিমাতাসূলভ আচরণ করছি। তাই বিশ্বায়নের এ যুগে নিজেদের সভ্যতা সংস্কৃতিকে জিইয়ে রাখতে চাইলে এখনই আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। এখনও যদি আমরা নিজস্ব ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব আরোপ না করি। তবে সে দিন বেশি দূরে নয়! হয়তো খুব শিঘ্রই আমাদেরকে চরম মূল্য দিতে হবে, নিজস্ব ভাষা সভ্যতা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight