সত্যের অভাবিত বরকত : মুহাম্মদ শরীফুল আলম

মুসলিম জাতি দীর্ঘ সাতশ বছর শাসন করেছিল এই ভারত উপমহাদেশ। কিন্তু কালের আবর্তনে বৃটিশদের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে তারা। গোটা ভারত উপমহাদেশে ইংরেজরা নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। তাদের শাসন-শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয় আপামর জনতা। কতিপয় রাজার ভোগ-বিলাসিতা ও গাদ্দারদের বেইমানির কারণে মুসলমানরা নেতৃত্ব- কর্তৃত্ব-ক্ষমতা সব হারায়। হয়ে যায় একেবারে নিঃস্ব।
তবু খাঁটি ঈমানদারগণ বিধর্মীদের সামনে মাথা নত করেন নি। কারণ তাদের অন্তরে রয়েছে ঈমানের জ্বলন্ত অগ্নিশিখা। তাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও সত্যকণ্ঠকে তারা সমুন্নত করতে তারা আন্দোলন আব্যাহত রেখেছিলেন। সত্যের সংগ্রামে তারা ছিলেন অকুতোভয়।
বৃটিশরাও ছলে-বলে-কৌশলে, প্রয়োজনে হিন্দুদের সহযোগিতা নিয়ে মুসলমানদেরকে উৎখাত করতে চেয়েছে, কিন্তু পারে নি। আল্লাহর দীন আল্লাহ রক্ষা করেছেন। ঘোরতর দুর্দিনেও এবং কঠিন থেকে কঠিনতম মুহূর্তেও আল্লাহ তার দীনকে তার কিছু প্রিয় বান্দার মাধ্যমে রক্ষা করেছেন-যাঁরা ছিলেন ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ। দ্বীনের সেই অতন্দ্র প্রহরীগণকে দেখে সত্যানুসন্ধানীরা আঁধার থেকে আলোর পথে এসেছেন। সত্যের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে চিরধন্য হয়েছেন। এ দ্বীনের রাহবারগণের সংখ্যা  পরিমাণে কম হলেও সব যুগেই তাদের উপস্থিতি ছিল এবং চিরদিন থাকবে বলে হাদীস শরীফে রয়েছে। বৃটিশ শাসনামলের এমন একটি ঘটনাই এখানে উল্লেখ করছি।
এদেশে তখন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছিল প্রায় নিত্য দিনের ঘটনা। প্রভুত্ব কায়েম করতে ইংরেজরাই এর পিছনে ইন্ধন যোগাত। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এদেশের মানুষ তাদের কাছে খুব দুর্বল হয়ে থাকতো। একখ- জমি নিয়ে একবার হিন্দু ও মুসলমনদের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। হিন্দুদের দাবী জমিটি মন্দিরের। আর মুসলমানদের দাবি, এটা মসজিদের জমি। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বিচারক হলেন একজন ইংরেজ। তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনলেন। কিন্তু এ জমির মূল মালিক কে তা বের করতে পারলেন না। তাই জমিটি মসজিদের না মন্দিরের তা নির্ণয় করা গেল না। বিচারক ভাবতে লাগলেন, এখন কী করা যায়? কী ভাবে জমির আসল মালিককে বের করা যায়। অনেক চিন্তা ভাবনার পর ঠিক করলেন, এ বিষয়ে মাওলানা ইয়াহইয়ার সাক্ষ্য অনুযায়ী ফায়সালা হবে। মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. ছিলেন শাইখুল হাদীস মাওলানা জাকারিয়া রহ.- এর পিতা। তিনি এলাকায় খুবই গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন।
বিচারকের এমন সিদ্ধান্তে মুসলমানরা খুব খুশি হলেন এবং তাদের মনে এক অপূর্ব আনন্দ দোলা দিয়ে গেল। তারা ভাবলেন, এখন আর কোনো চিন্তা নেই। রায়টা আমাদের পক্ষেই অসবে। কিন্তু মাওলানাকে যখন আদালতে তলব করা হলো, তখই দেখা দিল বিপত্তি। তিনি আদালতে যেতে সরাসরি  অস্বীকৃতি জানালেন। কঠোর ভাষায় তিনি বলে দিলেন, “আল্লাহর কসম, কোনো ইংরেজ বিচারকের চেহারা আমি দেখবো না।”
যে জাতি মুসলমানদের ইজ্জত-আযাদী লুণ্ঠন করেছে, রাজত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে এবং তাদের উপর একের পর এক নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়েই যাচ্ছে, তাদেরকে তিনি কেন শ্রদ্ধা দেখাবেন?
মুমিন যখন ঈমানী গায়রতের পরিচয় দেন, তখন স্বয়ং আল্লাহ তাকে মদদ করেন। এখানে তা-ই হলো। মাওলানার শপথের কথা শুনে ইংরেজ বিচারক শান্তভাবে আবার খবর পাঠিয়ে বললেন, মিমাংসায় সাহায্য করাতো ইসলামেরই শিক্ষা। আপনি যদি ভাল মনে করেন, তাহলে বিচারকের দিকে পিঠ দিয়েই সাক্ষ্য দিন। তবু একটি গুরুতর বিবাদের মীমাংসা হোক।
বিচক্ষণ বিচারক মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. কে ভালোভাবেই চিনতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন, মাওলানা কখনও মিথ্যা কথা বলেন না। এমনকি স্বজাতির বিপক্ষে হলেও না। পরবর্তী প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. সাক্ষ্য দিতে সম্মত হলেন। তারপর ধীরপদে আদালতে হাজির হলেন।
মূহুর্তের মাঝে জনাকীর্ণ আদালত পিনপত নীরবতায় ছেয়ে যায়। অপলক নেত্রে সবাই তাকিয়ে থাকে মাওলানার দিকে। টানটান উত্তেজনা ও রুদ্ধশ্বাস এ মূহুর্তে উভয় পক্ষ মনে মনে প্রার্থনা করছে, রায় যেন আমাদের পক্ষে হয়।
মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. তখন নিজের শপথ অনুযায়ী বিচারকের দিকে মুখ না ফিরিয়ে পিঠ রেখে সাক্ষ্য দিলেন, “ এ জমির মূল দাতা কে- তা এ মূহুর্তে স্মরণ আসছে না। তবে আমার জানা মতে, এ জমি মসজিদের নয়।” সংগে সংগে হিন্দুদের মূহুর্মুহু জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো আদালত প্রাঙ্গন। কিন্তু মুসলমানগণ হতবাক হয়ে গেলেন। বিমর্ষ হয়ে মাথা নত করে রাখলেন। সাধারণ মুসলমানগণ কল্পনাও করতে পারেন নি যে, মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. স্বজাতির বিপক্ষে এভাবে সাক্ষ্য দিবেন। তিনি মসজিদের পক্ষে কথা বলার এতো বড়ো সুযোগ পেলেন, অথচ সাক্ষ্য দিলেন মসজিদের বিপক্ষে। এ জন্য তারা মাওলানার প্রতি রুষ্ট হলেন।  তখন ইংরেজ বিচারক হিন্দুদের পক্ষে রায় দিয়ে বললেন, “মাওলানা ইয়াহইয়ার সাক্ষ্যে যদিও মুসলমানদের পরাজয় হয়েছে, কিন্তু এতে ইসলামের বিজয় হয়েছে। কারণ তিনি নিজেদের বিপক্ষে গেলেও সত্য প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন নি। এতে তিনি ইসলামের মহিমা তুলে ধরেছেন।”
হ্যাঁ, সত্যিই এতে ইসলামের বিজয় হয়েছে। সততার প্রশ্নে নিজেদের স্বার্থের কাছে মাওলানা হার মানেন নি। বরং তিনি সত্যবাদিতার উপর অবিচল থেকেছেন। এতে দেখিয়ে দিয়েছেন-ইসলামের শিক্ষা হলো, সকল স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সত্য সাক্ষ্য দেয়া। এরই ফলশ্রুতিতে উক্ত ঘটনায় হিন্দুদের মন জয় করে নেয় মুসলমানদের ধর্ম ইসলাম।
মাওলানা ইয়াহইয়া রহ. এর সত্যবাদিতার উপর অবিচলতার এ ঘটনা নেতৃস্থানীয় হিন্দুদের হৃদয়ে দারুণ রেখাপাত করে। তারা ভাবেন- ইসলামের শিক্ষা এতো সুন্দর! তাহলে এখনো কেন আমরা ইসলাম থেকে দূরে? এ চিন্তা করে সেদিন রাতেই তারা মাওলানার সান্নিধ্যে হাজির হলেন এবং কালিমা পড়ে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন। তারপর এই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাই আদালতের মাধ্যমে মন্দিরের জমি মসজিদের নামে লিখে দিলেন।
লেখক : শিক্ষক, খানকায়ে বাশারিয়া মাদরাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight