সকল প্রাণীর বিচার হবে আমলের ভিত্তিতে সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

Bichar

আমলনামা  :
কেয়ামতের দিন  আমলনামা পেশ করা হবে। দুনিয়াতে বান্দা যে কাজ করে, কেরামান কাতেবীন তা লিপিবদ্ধ করে রাখেন। কেয়ামতের দিন সেটাই পেশ করা হবে।
সূরা জাসিয়ায় উল্লেখ হয়েছে- “এবং (সেদিন) আপনি প্রত্যেক দলকে (ভয়ের কারণে) নতজানু হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পাবেন, প্রত্যেক দলকে তার আমলনামার দিকে ডাকা হবে এবং তাদের বলা হবে, আজ তোমাদের কৃতকর্মের প্রতিফল দেয়া হবে। এ হল আমাদের দফতর, এটা তোমাদের বিরুদ্ধে ঠিক ঠিক বলে দিবে, আর আমরা তোমাদের আমলসমূহ লেখে রাখতাম।”
সূরা বনী ইসরাঈলে রয়েছে- “আর আমি প্রত্যেক মানুষের আমল তার গলার হার করে রেখেছি। কেয়ামতের দিন আমি তার আমলনামা বের করে তার সামনে রেখে দিব, তা সে খোলা অবস্থায় দেখতে পাবে। (তাকে বলা হবে,) পড়ে নাও তোমার নিজের আমলনামা, আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাব নেয়ার জন্য যথেষ্ট।”
আমলনামায় দুনিয়ায় যা করেছে তার সবকিছুই থাকবে
আমলনামায় সবকিছু থাকবে, তা দেখে বদ আমলকারীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। কারণ, তারা যা কিছু করেছিল তার সবকিছুই আমলনামার মধ্যে লিপিবদ্ধ দেখতে পাবে। সূরা কাহফে রয়েছে- “আর আমলনামা রেখে দেয়া হবে, তখন আপনি আপরাধীদের দেখবেন, তাতে যা লেখা রয়েছে তা দেখে  তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে এবং বলতে থাকবে, হায়! আমাদের দুর্ভাগ্য! এ আমলনামার তো আশ্চর্যজনক অবস্থা, এতে ছোট বড় কোন গুনাহই লেখা বাদ পড়েনি এবং তারা যা কিছু করেছে তার সবকিছু বিদ্যমান পাবে, আর আপনার রব কারো ওপর জুলুম করবেনা না।”
আমলনামা বন্টন
প্রত্যেক ব্যক্তির আমলনামা তার কাছে সমর্পণ করে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি নেক আমল করেছে এবং নাজাত প্রাপ্ত হবে, তার আমলনামা ডান হাতে, আর যে ব্যক্তি বদআমল করেছে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, তার আমলনামা পিছন দিক দিয়ে বাম হাতে দেয়া হবে।
সূরা ইনশিকাকে রয়েছে- “হে মানব! তুমি তোমার রবের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত কাজে চেষ্টারত ছিলে। তারপর তুমি সে চেষ্টার ফল পাবে। তখন যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে তার সহজ হিসাব নেয়া হবে, আর সে হিসাব থেকে অবসর হয়ে আনন্দের সাথে নিকটজনদের কাছে আগমন করবে। পক্ষান্তরে যার আমলনামা পিঠের পিছন থেকে বাম হাতে দেয়া হবে, সে মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করবে। দুনিয়াতে তার অবস্থা ছিল, সে (আখেরাতে চিন্তামুক্ত হয়ে) নিজ পরিবার-পরিজনদের মধ্যে আনন্দ ফুর্তিতে থাকত, তার খেয়াল ছিল, (আল্লাহর নিকট) তার আর ফিরে যেতে হবে না, তার রব তাকে খুব ভাল করেই দেখছিলেন।”
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে আনন্দ ফূর্তিতে জীবন কাটিয়ে দেয় এবং দুনিয়াকেই আসল ঠিকানা মনে করে, আখেরাতের বিন্দুমাত্র চিন্তা ফিকিরও করেনা এবং আখেরাত মিথ্যা মনে করে, কেয়ামতের দিন সে ভয়ানক মসিবতের সম্মুখীন হবে। এর বিপরীতে যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আখেরাতের চিন্তায় পেরেশান এবং মৃত্যুর পরের জীবনে চিন্তায় চিন্তিত ছিল, কেয়ামতর দিন তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে। এতে সে যারপর নাই আনন্দিত হবে। বদআমলকারী লোকেরা দুনিয়াতে আর নেক আমলকারীরা আখেরাতে আনন্দ করবে।
আমলনামা হাতে পাওয়ার পর নেককারদের আনন্দ আর বদকারদের দুঃখ
আমলনামা সম্পর্কে সূরা হাক্কায় অধিক আলোচনা করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে- ‘সেদিন তোমাদের (সামনে) পেশ করা হবে এবং তোমাদের কোন বিষয়ই লুকায়িত থাকবে না।’
এরপর ডান হাতে আমলনামাপ্রাপ্তদের সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে- “সুতরাং যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, সে (খুশিতে) বলবে, নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখ, আমার তো বিশ্বাস ছিল অবশ্যই আমার হিসাব হবে; সে ব্যক্তি এক পছন্দনীয় জীবনে প্রবেশ করবে, তা হবে উঁচুমানের জান্নাত। যার ফলসমূহ ঝুলানো থাকবে, আর তাদের বলা হবে খাও, পান কর, এটা হল সে (নেক) কাজের পুরস্কার, যা তোমরা পূর্ববর্তী দিনগুলোতে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছ।
ডান হাতে আমলনামা লাভ নাজাত এবং মকবুল হওয়ার আলামত হবে। যে ব্যক্তি ডান হাতে আমলনামা পাবে সে খুশিতে তা অন্যদের দেখাতে থাকবে আর বলবে, নাও, দেখ আমার আমলনামা পড়। আর বলবে, আমি দুনিয়াতেই বোঝে ছিলাম আমার হিসাব নেয়া হবে। এ ভয়ে আমি ভীত ছিলাম এবং চিন্তা-ফিকিরে দুনিয়ায় জীবন অতিবাহিত করেছি। আর তাই আনন্দদায়ক সুফল পেয়েছি। যারা বাম হাতে আমলনামা পাবে তাদের সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে- আর যার বাম হাতে আমলনামা দেয়া হবে সে বলবে, হায়! আমাকে যদি আমলনামা না-ই দেয়া হত এবং আমি যদি হিসাবের খবরই না জানতাম যে, আমার কি হিসাব হয়েছে। হায়! মৃত্যুই যদি আমার সব কাজ শেষকারী হত। আমার দ্বিতীয় জীবন না আসতো। আমার ধন-সম্পদ আমার কোন কাজে আসল না, আমার রাজত্ব কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে গেল।
সূরা ইনশিকাকে বলা হয়েছে, বদ আমলকারীদের আমলনামা পিছন দিক থেকে দেয়া হবে। আর সূরা হাক্কায় রয়েছে বাম হাতে দেয়া হবে। উভয় আয়াত মিলালে বুঝা যায়, বদ আমলকারীদের আমলনামা তাদের পিছনের দিক দিয়ে বাম হাতে দেয়া হবে। কেননা ফেরেশতারা তাদের চেহারা দেখা পছন্দ করবে না। আর এও হতে পারে, তাদেরে হাত বাঁধা অবস্থায় থাকবে। এজন্য পিছন দিক থেকে বাম হাতে আমলনামা দেয়া হবে।
আমলের ওজন
আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত সর্বদাই সমস্ত মাখলুকের সব কর্ম সম্পর্কে জানেন। যদি কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহ পাক শুধু তাঁর জানার ভিত্তিতে আমলের শাস্তি বা পুরস্কার দেন, তাও দিতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ পাক এমন করবেন না; বরং বান্দাদের সামনে তাদের আমলনামা পেশ করা হবে, ওজন করা হবে, সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। অপরাধীরা তাদের অপরাধ অস্বীকার করবে। তখন তাদের অপরাধ দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে সাব্যস্ত করা হবে। যাতে করে অপরাধীরা এটা না বলতে পারে, তাদের ওপর জুলুম করে শাস্তি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
সূরা আনআমে আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর সেদিন সঠিকভাবে ওজন করা হবে, যাদের ওজন ভারী হবে তারা হবে সফলকাম। আর যাদের ওজন হালকা হবে তারা হবে এমন ব্যক্তি, যারা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করেছে।”
হযরত সালমান রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন (আমল মাপার) পাল্লা স্থাপন করা হবে। সে পাল্লা এত লম্বা ও চওড়া হবে, যদি তাতে আসমান এবং জমিন ওজন করার জন্য রাখা হয় তাহলে পুরোটাই তার মধ্যে এসে যাবে। সে পাল্লা দেখে ফেরেশতারা আল্লাহর দরবারে আরজ করবে, এই পাল্লা কার জন্য? আল্লাহ জাল্লা শানুহু এরশাদ করবেন, আমি আমার মাখলুকের মধ্যে যার হিসাব নিব তার জন্য এ পাল্লা স্থাপন করা হয়েছে। একথা শুনে ফেরেশতারা বলবে, হে আল্লাহ, আপনি পূত-পবিত্র, আপনার যে রকম এবাদত করা আমাদের দায়িত্ব ছিল সে রকম এবাদত আমরা করিনি। [তারগীব ওয়া তারহীব]
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, (কেয়ামতের দিন) পাল্লার জন্য একজন ফেরেশতা নির্ধারণ করা হবে (উদ্দেশ্য আমল ওজন করা), মানুষদের সেই পাল্লার নিকট আনা হতে থাকবে। যে ব্যক্তিকে উভয় পাল্লার মাঝখানে দাঁড় করানো হবে, যদি তার পাল্লা ভারী হয় তাহলে সে ফেরেশতা এত উচ্চ স্বরে চিৎকার দিয়ে ঘোষণা করবে, যা সকল মানুষ শুনতে পাবে। সে বলবে, অমুক ব্যক্তি সর্বদার জন্য সৌভাগ্যশালী হয়েছে। এরপর সে আর কখনও দুর্ভাগা হবে না। আর যদি তার পাল্লা হালকা হয় তাহলে ফেরেশতা এত উচ্চ স্বরে ঘোষণা করবে যাতে সকল মানুষই তা শুনতে পাবে। সে বলবে, অমুক ব্যক্তি চিরদিনের জন্য হতভাগা হয়েছে, আর কখনও সে সৌভাগ্যশালী হবে না। [তারগীব ওয়া তারহীব]
হযরত শাহ আবদুল কাদের রহ. তাঁর ‘মোযেহুল কুরআন’ গ্রন্থে লেখেন, প্রত্যেক ব্যক্তির আমল তার ওজন অনুপাতে লিপিবদ্ধ করা হবে। কোন কাজ যদি এখলাস এবং মহব্বতের সাথে শরীয়তের হুকুম অনুযায়ী করা হয় তাহলে তার ওজন বেড়ে যাবে, আর যদি সে কাজই লোক দেখানের জন্য করা হয় এবং জায়গামত করা না হয়, তাহলে তার ওজন হালকা হয়ে যায়।
আখেরাতে সে কাজই ওজন করা হবে, যার ওজন ভারী হবে, যার নেক কাজের পাল্লা ভারী হবে সে ভালয় ভালয় পার হয়ে যাবে; আর যার ওজন হালকা হবে তাকে পাকড়াও করা হবে।
ওলামায়ে কেরামের কেউ কেউ বলেন, কেয়ামতের দিন আমলকে শরীর দিয়ে  উপস্থিত করা হবে, আর সেই শরীররূপী আমলই ওজন করা হবে এবং তার হালকা ও ভারী হওয়ার ওপর ভিত্তি করেই ফয়সালা হবে।
আসল কাজ ওজন বা শরীর দ্বারা ওজন করা সবই তাঁর দ্বারা সম্ভব, কোনটাই অসম্ভব নয়। আজকের এ আধুনিক পৃথিবীতে এটা বুঝা খুবই সহজ। যেমন থার্মোমিটার দ্বারা দেহের তাপমাত্রা মাপা হয়। এ ধরনের বহু যন্ত্রই আছে যা দ্বারা বিভিন্ন জিনিস মাপা যায়। তাহলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার কুদরতের কথা বলার অবকাশই রাখে না। যদি কারো সন্দেহ হয়, আমল তো অস্তিত্বহীন, যা কেউ করার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে কিভাবে আখেরাতে তা একত্রিত এবং ওজন করা হবে? এ সন্দেহ এবং প্রশ্নের জওয়াব বুঝতে আজকে আর বেশি কষ্ট করতে হয় না। কেউ কথা বলছে তো সাথে সাথে তা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছে। কথা রেকডিং করা হচ্ছে। শত শত বছর রেকর্ড থাকার  নিশ্চয়তা পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে। রেডিওতে রেকর্ডিং করে কক্তৃতা ইত্যাদি শোনানো হচ্ছে। এক শব্দ এক শব্দ করে শোনতে চাইলে তাও পারা যাচ্ছে। পুনরায় শোনতে চাইলে পুনরায় শুনা যাচ্ছে। অস্তিত্বই নেই তারপরও তো কথাগুলো শুনা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে। যে আল্লাহ মানুষকে এই বুদ্ধি ও শক্তি দিয়েছেন, সে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার বান্দাদের সমস্ত কাজকর্ম, কথাবার্তা রেকর্ডিং তথা সংরক্ষণ করতে পারবেনা এটা কিভাবে হয়? একটুখানি চিন্তা করলেই পুরো বিষয়টা বুঝা খুবই সহজ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের বুঝার ও আখেরাতের জন্য আমাল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।             চলবে…….

3 মন্তব্য রয়েছেঃ সকল প্রাণীর বিচার হবে আমলের ভিত্তিতে সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. তানজিল আহমেদ (ছানি) says:

    আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রত্যেকটি কাজের ব্যপারে সঠিক চিন্তা করার তাওফিক দান করুন। এবং ইসলামের পথে চলা আমাদের জন্য সহজ করেদিন। আমিন।।

  2. জুনাইদ আহমেদ says:

    হাশরের ময়দানে আল্লাহ যখন বলবেন “আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাব নেয়ার জন্য যথেষ্ট।” তখন আমাদের কী হবে? হে আল্লাহ আমাদেরকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।।।

  3. এম,সামি says:

    তথ্যসূত্র প্রয়োজন ছিল ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight