শয়তানের ডায়েরী : উম্মে হাবিবা আকলিমা

পূর্ব প্রকাশিতর পর…
ফেরাউন আমার কথা শুনিয়া একটি হাসি দিয়া বলিল, ভাই! তুমি তো অতি প্রাচীন মনোভাবের লোক। তাই তোমার মধ্যে এখন পর্যন্ত ধর্ম ভীতি বিরাজ করিতেছে। আজকাল আধুনিক যুগে ঐ ধরণের প্রাচীন বুলি আর উচ্চারণ করিওনা। যুগের সাথে পা ফেলিয়া একটু চলিতে শিখ। ফেরাউনের নছিহত শুনিয়া আমার সমস্ত আক্কেল ঠান্ডা হইয়া তমিজে পরিণত হইল। দ্বিতীয়বার আর কোনো কথা বলিতে সাহস পাইলাম না। ইহার পরে ফেরাউন আমাকে আরো বলিল যে, দেখ বন্ধু! কালেমা তৌহিদ পাঠ করিয়া আজ পর্যন্ত কেহ মহাপ্রভু আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করিতে পারে নাই। কারণ জগতে হাজার হাজার কালিমা পাঠকারী আসিয়াছে ও গিয়াছে কিন্তু আজ পর্যন্ত তাহাদের নাম ঠিকানা আল্লাহর দরাবারে একখানা সাদা কাগজেও উঠে নাই। আর সেখানে আমি আল্লার বিরোধিতা করিয়া সর্বশ্রেষ্ট মহা কিতাব কোরান শরীফে নাম উঠাইতে সক্ষম হইয়াছি। উচিৎ কথা বলিতে কি? হযরত মুছা দিবানিশি আল্লাহর ইবাদত করিয়া তৌরিত, জাবুর, ইঞ্জিল, কোরানে যত বার নাম উঠাইবার ভাগ্য লাভ করিয়াছে আমি সেই আল্লার সঙ্গে মহাশত্রুতা করিয়া নিজ রহমতে ততবার কোরান পাকে নিজ নাম খোদাই করার ভাগ্য লাভ করিয়াছি। এখন ভাবিয়া দেখ, আমি আর হযরত মুছার মধ্যে পার্থক্য কি?
হুজুর: ফেরাউনের এই লম্বা মন্তব্য শুনিয়া একটি লম্বা ছালাম দিয়া বিদায় হইলাম।
পির আলী: আল্লার জমিনে এতবড় নাফরমান কি করিয়া সুখ-সাচ্ছন্দে বসবাস করিল?
শয়তান: হুজুর! ফেরাউন সুখ সাচ্ছন্দে জগতে একদিন কালও বসবাস করিতে পারেন নাই! জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত মুস্কিল ও বিপদের সাথে সংগ্রাম করিয়া অতিবাহিত করিয়াছে। সেই সমস্ত ঘটনা যদি এক এক করিয়া বর্ণনা করি তাহা হইলে বহু সময়ের প্রয়োজন। তাই অন্য এক সময়ে যদি সম্ভব হয় তবে উহা আলোচনা করিব।  এখন অযথা আলোচনা করিয়া সময় নষ্ট করা ঠিক হইবে না।
পির আলী: ফেরাউন জীবনের ঐরুপ দুই একটি ঘটনা শুনা দরকার। কারণ উহার মধ্যে উপদেশ গ্রহণের বহু ব্যাপার রহিয়াছে। অতএব যদি বিরক্ত না হও তবে সংক্ষেপে কিছু বর্ণনা করিতে পার।
শয়তান: হুজুর! আমার বিরক্ত হওয়ার কোনো কারণ নাই বরং আপনাকে নিয়াই বেশি ভাবিতেছি। যেহেতু এক একবার হঠাৎ বলিয়া ফেলেন যে একটু নামায আদায় করিয়া আসি। তাই চিন্তা করিতেছি লম্বা ঘটনা আরম্ভ করিব কিনা? যাহা হোক হুজুর! ফেরাউনের শেষ ব্যাপারটি সংক্ষেপে বলিতেছি শুনুন।
হযরত মুছা আ. কে ফেরাউন যখন খুব অত্যাচার করিতে আরম্ভ করিল তখন আল্লাহতাআলা তাহাকে হুকুম করিল, হে মুছা! সত্বর তোমার ভক্তবৃন্দকে নিয়া নীল নদ পার হইয়া ওপারে চলিয়া যাও। হযরত মুছা  আল্লাহর আদেশ পাইয়া সঙ্গে সঙ্গে রওয়ানা করিলেন। যখন তিনি নীল নদের নিকটে পৌঁছলেন, তখন আল্লাহর নিকট হাত উঠাইয়া বলিলেন, হে খোদা! এই বিশাল নদী কিরুপ পার হইব? তখন আল্লাহ তাআলা নদীর পানির ভিতর দিয়া এক প্রশস্ত রাস্তা করিয়া দিলেন। হযরত মুছা আ. মহা আনন্দে ভক্তবৃন্দ নিয়া সেই রাস্তা ধরিলেন।  ব্যাপারটি দেখিয়া আমার আর সহ্য হইল না। আমি তখন বন্ধু ফেরাউনকে হযরত মুছার পালায়নের খবর জানাইলাম। ফেরাউন এই খবর শুনা মাত্রই আর কাল বিলম্ব না করিয়া অসংখ্য সৈন্য সহ নীল নদের নিকটে আসিয়া পৌঁছিল। নদী বক্ষের প্রশস্ত রাস্তা দিয়া হযরত মুছাকে যাইতে দেখিয়া নিজ সৈন্য সামন্ত সহ সেই রাস্তা ধরিল। ইহার পর ফেরাউন অর্ধপথে পৌঁছিল এবং হযরত মুছা সম্পূর্ণ ওপারে পৌঁছিলেন তখন মুছার খোদা উভয় পার্শ্বের পানি দ্বারা বন্ধু ফেরাউনকে চাপিয়া ধরিলেন। ইহার ফলে হাজার হাজার সৈন্য সহ বন্ধু ফেরাউন অকালে প্রাণ ত্যাগ করিলেন।
পির আলী: হযরত মুছার পরদেশ গমনের খবর ফেরাউনের নিকট জানাইয়া কি স্বার্থ পাইয়াছ?
শয়তান: হুজুর! স্বার্থ নিঃস্বার্থের কোনো কথা নয়, প্রধান কথা হইল খেদমত। খেদমতের বেলায় যেখানে যতটুকু পারি করিয়া যাই, ফল দিবার মালিক আল্লাহ। তবে আপনার নিকট হক কথা গোপন করিয়া লাভ কি?  তাই বলিতেছি, আল্লাহর নবিগণের বিরুদ্ধে যে সমস্ত স্থানে খেদমত করিতে অগ্রসর হইয়াছি তাহার অধিকাংশ ক্ষেত্রে লজ্জিত হইয়া বাড়ী ফিরিয়াছি।
আল্লাহর আদেশক্রমে হযরত নূহ তাহার উম্মতের জন্য যখন একখানি বিরাট নৌকা তৈরী করিলেন, তখন উহা দেখিয়া আমর মনের নরম হিংসা গরম হইয়া উঠিল। তাই কয়েকদিন যাবৎ খেদমতের রাস্তা অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম। একদিন হঠাৎ আমার যোগ অংক মিলিয়া গেল, তখন তাড়াতাড়ি করিয়া শহরে নামিয়া পড়িলাম এবং বৃদ্ধের বেশে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে গিয়া বলিলাম, ভাইসব! তোমরা অবশ্য এখন পর্যন্ত হযরত নূহের কথা গ্রাহ্য করিতেছ না কিন্তু তাহার কথা চির সত্য। তিনি যে প্রবল এক বন্যার পূর্বাভাস দিতেছেন তাহা অবশ্যই আসিবে। এহেন সময় তোমাদের প্রত্যেকের আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করা উচিৎ। এই কথা শুনিয়া সকলে জিজ্ঞেস করিল আমরা কিরুপে আত্মরক্ষা করিবো? তখন আমি বলিলাম, হযরত নূহের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া তোমাদের আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়। তবে হেকমতের সঙ্গে কাজ করিতে হইবে, যেন উহার মধ্য দিয়া আত্মরক্ষাও করা যায় এবং হযরত নূহকেও দমন করা যায়। তাই আমি ভাবিয়াছি যে, প্রথমে নূহের কায্যবলির প্রতি জগণ্য ঘৃণা প্রদর্শন করিতে হইবে। পরে ধীরে ধীরে মনোবল নিস্তেজ করিয়া দিতে হইবে। সকলে জিজ্ঞেস করিল উহা কি রুপ? আমি বললাম সে বুদ্ধি আমি ঠিক করিয় রাখিয়াছি। কিন্তু কর্বত্য কাজে শিথীলতা করো নাকি তাহা ভাবিতেছি। তখন সকলে বলিল, আপনি বৃদ্ধ জ্ঞাণী মানুষ। আমরা সবাই আপনার কথা অবশ্যই মনিয়া লইব। চলবে….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight