শয়তানের ডায়েরি

ec95_polar_ice_crystal_clear_ice_cube_tray_ice

মোছাঃ উম্মে হাবিবা [কাফেলা- ০০৭]
পূর্বে প্রকাশিতের পর।

শয়তান- বাড়ির অনতিদূরে পৌঁছিয়া দেখিতে পাইলাম আইয়ুব নবীর কয়েক সহস্র ভেড়া, বকরি ও দুম্ভা মাঠে চড়িতেছে। তখন দেখে খিয়াল হইল যে, এইখান দিয়াই পরীক্ষা আরম্ভ করিয়া দেয়। তাই মাঠের এক পার্শে বসিয়া মাঠের দিকে অগ্নিবন্যা ছুটাইয়া দিলাম। আল্লাহর রহমতে অগ্নিবন্যা ভীষণ আকারে ধারন করিয়া নিমিষের মধ্যে সকল জীবজন্তু ভস্মীভুত করিয়া দিলাম। এমন কি আইয়ুব নবীর সুশোভিত বাগ-বাগিচাগুলো নিশ্চিহ্ন  হইয়া গেল। আমি তখন একটি ইরানী পাগড়ী ও একটি বাগদাদী কামিছ পরিধান করে, হযরত আইয়ুব নবীর দরবারে গিয়া বলিলাম-হে আল্লাহর নবী! আপনি দিবানিশি যে প্রভুর প্রার্থনা করেন, তিনি আপনার লক্ষাধিক টাকার ভেড়া, বকরী নিমিষের মধ্যে ভস্মিভূত করিয়া দিয়েছেন। হযরত আইয়ুব নবী এই খবর শুনিয়া বলিলেন- আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ মানুষের জন্য যাহা করেন তাহাই মঙ্গলজনক। আমি আইয়ুব নবীর জবাব শুনিয়া ভাবলাম, আরো একটু বড় রকমের ব্যবস্থা করতে হবে, তাই একদিন প্রাতে নবীর দরবারে হাজির হইয়া দেখিলাম-আইয়ুব নবীর বহু সংখ্যক সন্তান-সন্তুতি একটি দালানের কোঠায় বসিয়া শিক্ষা গ্রহণ করিতেছে। তখন আমি বিসমিল্লাহ বলিয়া সজোরে ধাক্কা দিলাম, অমনি দালানের ছাদ ও ইট সুরকী সমস্ত কিছু ভাঙ্গিয়া আইয়ুব নবীর সন্তানেরা চাপা পড়িল ও একত্রে সকলে অপমৃত্যু বরণ করিল। আমি এবার আরবী কায়দায় কোরেশী লেবাস পরিধান করিয়া নবীর দরবারে হাজির হইলাম এবং গম্ভীর গলায় বলিলাম- হে আমার নবী। আপনি দিবানিশি করজোড়ে যে প্রভুর প্রার্থনা করেন তিনি আপনার সমস্ত সন্তান-সন্ততি দেয়াল চাপা দিয়ে শেষ করিয়াছে। অতএব, বুঝিয়া শুনিয়া কাজ করুন। আইয়ুব নবী আমার নিকট এই খবর শুনিয়া বলিলেন- আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ মানুষের জন্য যখন যাহা করেন তাহাই মঙ্গলজনক। তখন আমি বলিলাম- হে নবী! যদি আপনি আমাকে আদেশ করেন তাহলে আমি মুহুর্তের মধ্যে জীবিত করিয়া দিতে পারি। ইহা শুনিয়া তিনি বলিলেন, যে কোন বিপদ আপদে আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারো নিকট কোনরুপ সাহায্য প্রার্থনা করিতে পারিনা। আল্লাহ যেন সে মনোভাব কখনই আমাকে দান না করেন। আইয়ুব নবীর এই উক্তি শুনিয়া মনে মনে ভাবিলাম এইবার আখেরী দাওয়ার ব্যবস্থা না করিয়া আর উপায় নাই।
পির আলীÑ আল্লাহর নবীর উপর এমন কি দাওয়া প্রয়োগ করিতে সক্ষম হইয়াছো?
শয়তান- হুজুর! দাওয়া অন্য কিছু নয়। একদিন হযরত আইয়ুবের নিকটে পৌঁছিয়া তাহার নাকে একটি গরম নিঃশ্বাস দিলাম। ইহাতে কয়েক দিনের মধ্যে তাহার সমস্ত শরীরে বড় বড় ফোস্কা উঠিয়া ভরিয়া গেল। এই কাজ করিয়া কয়েকদিন চুপ করে রহিলাম। দেখিলাম আইয়ুব নবীর ফোস্কা ফাটিয়া ঘা হইয়াছে। তখন গিয়া উহার উপর আরো একটু জোরে ফুৎকার দিলাম। ইহার ফলে তাহার শরীরের গোশ্ত পঁচিয়া যাইতে আরম্ব করিল এবং উহার মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকার জন্ম হইল। গোশত পঁচা গন্ধে মহল্লাবাসী অস্বস্তিবোধ করিতে লাগিল এবং হযরত আইয়ুবকে সত্বর মহল্লা ত্যাগ করার নির্দেশ দিল। হযরত আইয়ুব নবী মানুষের কথার প্রতি লক্ষ্য না করিয়া সর্বদা নিজমনে এবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকিতেন দেখিয়া একদিন আমি ছদ্ববেশে মহল্লাবাসীর নিকট গিয়া বলিলাম ভাইসব! আইয়ুবের শরীরের দুর্গন্ধে মহল্লাবাসীও রোগ-বেমার হইয়া পড়িতেছে, অতত্রব তাহাকে সত্বর মহল্লা থেকে বহিস্কার করিবার ব্যবস্থা করুন, না হয়, সকল মহল্লাবাসীকে ইহার কুফল ভোগ করিতে হইবে। হুজুর! দ্বিতীয় বার আর বনি-আদমকে বলিতে হয় নাই। আমার এই উস্কানিমূলক কথায় সকলে উত্তেজিত হইয়া আইয়ুব নবীর নিকটে গিয়া তাহাকে মহল্লা হইতে বহিস্কার করিয়া দিল। হযরত আইয়ুব নবী মহল্লার বাহিরে এক জনশূন্য মাঠের মধ্যে থাকিয়াও তাহার প্রভুর আরাধনায় রত আছেন দেখিয়া আমি আবার মহল্লাবাসীর নিকট হাজির হইলাম এবং সুধীবৃন্দকে ডাকিয়া বলিলাম ভাই! আইয়ুবকে মহল্লার এত নিকটে রাখার দরুন বাতাসে তাহার রোগের জিবাণু উড়িয়া মহল্লাবাসীকে আক্রমন করিয়াছে। গতদিন মহল্লার দুইটি লোক উক্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। অতএব যদি আইয়ুবকে মহল্লা হইতে অনেক দূরে তারাইয়া না দেওয়া হয় তবে বোধহয়, মহল্লাবাসী কেহই রেহাই পাইবে না। আমার কথা শুনিয়া উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত হইয়া গেল এবং জিজ্ঞাসা করিল, তবে তাহাকে কোথায় তাড়াইব? আমি তখন বলিলাম-ভাই! আমি মনে করি যেখানে মেথরেরা মহল্লার ময়লা ও আবর্জনা নিক্ষেপ করে, আইয়ুবকে সেখানে ফেলিয়া আসিলে বোধ হয় আমরা অনেকটা চিন্তামুক্ত থাকিতে পারিব। আমার প্রস্তাব শুনিয়া সকলে একবাক্যে সম্মতি প্রকাশ করিল এবং সত্তর উহা কার্যকরী করার জন্য মহল্লার মেথরদিগকে ডাকিল। ব্যবস্থা দেখিয়া মনে মনে ভাবিলাম উপযুক্ত দাওয়ারই ববস্থা হইল। হযরত আইয়ুবের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সকলে আইয়ুব কে ময়লা ও আবর্জনার স্তুপের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া অনেকটা নিশ্চিন্ত হইল, কিন্তু আমি নিশ্চিত হইতে পারিলাম না; তাই একদিন হযরত আইয়ুব কে দেখার জন্য গেলাম। গিয়া দেখিলাম তাহার সমস্ত শরীরে একবিন্দু গোশতের চিহৃ নাই। শুধু স্তুপকৃত বড়-বড় পোকা দল বঁধিয়া শরীরের হাড় জড়াইয়া রহিয়াছে। চক্ষের দিকে চাহিয়া দেখিলাম শুধু দুইটি গর্ত দৃশ্যমান হইয়াছে এবং উহার মধ্যে একঝাঁক পোকার জড়াজড়ি করিতেছে। নাকের দিকে চাহিয়া দেখিলাম উহার ছিদ্র হইতে হাজার হাজার পোকা বাহির হইয়াছে। হাত-পায়ের দিকে তাকাইয়া দেখিলাম আঙ্গুলের গিড়া অনেকটা ছুটিয়া পৃথক হইয়া পড়িয়া আছে।
হুজুর, উচিৎ কথা বলিতে কি? হযরত আইয়ুব নবীর এই অবস্থা দেখিয়া আমি স্থির থাকিতে পারিলাম না। হঠাৎ মাটিতে বসিয়া পড়িলাম, অনেকক্ষণ পরে ধীরে ধীরে দাঁড়াইয়া নবীর নিকটে গিয়া বলিলাম- হে আল্লাহর নবী। আপনার এই অবস্থা দেখিয়া আমাদের আর সহ্য হয় না। অতত্রব, যদি আপনি আদেশ দিতেন তাহা হইলে আমরা প্রাণপন আপনার সাহায্য করিতাম। এই কথা শুনিয়া আইয়ুব নবী ফিস-ফিস করিয়া বলিলেন, আল্লাহ যে অবস্থায় রাখিয়াছেন, আলহামদুলিল্লাহ; আমি আল্লাহর সাহায্য ছাড়া অন্য কাহারো সাহায্যের মুখাপেক্ষী নই। হযরত আইয়ুবের উক্তি শুনিয়া মনটা ভারি বিরক্ত হইয়া উঠিল। তাই আর কোন বাক্য ব্যয় না করিয়া চলিয়া আসিলাম। হুজুর! শুনিয়া আর্শ্চযম্বিত হইবেন- হযরত আইয়ুবকে এক এক করিয়া এই ভাবে দীর্ঘ তেরটি বছর যাবৎ মহা যন্ত্রণার মধ্যে রাখিয়া ছিলাম। শেষ পর্যন্ত যখন দেখিলাম কোনক্রমেই আমার উদ্দেশ্য আর সফল হইতেছেনা তখন একদিন আল্লাহর দরবারে হাত উঠাইয়া বলিলাম হে দয়াময়। ,চলবে,,,,….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight