শয়তানের ডায়েরি : মোছাঃ উম্মে হাবিবা [কাফেলা- ০০৭]

ec95_polar_ice_crystal_clear_ice_cube_tray_ice

পির আলী- যাহা হউক. সমস্ত মুর্খ মুনশী মুছল্লীদের কাহিনী শুনিয়া লাভ নাই। কারণ ইহার মধ্যে শিক্ষার কোন বস্তু নাই বলিলেই চলে।
শয়তান- তবে হুজুর শিক্ষিত ও বিচক্ষণ লোকের কাহিনী শুনুন। ইতিপূর্বে যাহার শুধু পরিচয়খানা দিয়াছি তাহার কথাই প্রথমে দুই এক কলেমা বর্ণনা করি। তিনি হলেন মৌলবী মোহাম্মদ ইনশা আল্লাহ। ইনি ইন্ডিয়া কয়েকবার ঘুরিয়া আসিয়াছেন। কোন সনদ লাভ করিতে পারিয়াছেন কিনা সঠিক বলা কঠিন। তবে আরবী ভাষায় দক্ষতা অর্জ্জন করিতে না পারিলেও উর্দ্দু ভাষায় বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়া থাকেন। যে কোন মছলা বাতানের সময় একবার উর্দুতে মছলাটি আওড়াইয়া তাহার পরে অনুবাদ করেন। এইভাবে মুর্খ সমাজে তিনি বিরাট সম্মান সম্ভারের অধিকারী হইয়া সগৌরবে কালাতিপাত করিতেন। মৌলভী সাহেব একজন নিঃস্বার্থ সমাজসেবক, তবে নজর নেওয়াজ ও দাওয়াত আহ্বান গ্রহণের বেলায় তিনি খুব বেশি আগ্রহশীল। দাওয়াত নিয়া কেহ হাজির হইলে মৌলভী সাহেব তাহার হাজার অপরাধও মুহুর্তের মধ্যে ভুলিয়া যান। আর নেওয়াজের ব্যাপার হইলেতো আর কথাই নাই। একদিন মৌলভী সাহেব তাহার বাড়ির রাস্তায় দাড়ানো ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি মৌলভী সাহেবের ধান ক্ষেতের ভিতর দিয়া হাটিয়া আসিতেছে দেখিয়া মৌলভী সাহেব তাহাকে বে আকল, বে তমীয, বে দানা বে ওকুফ ইত্যাদি বলিয়া খুব গালি দিলেন। তখন  আগন্তুক কোন প্রতিবাদ না করিয়া মৌলভী সাহেবের নিকটে পৌঁছিয়া বলিল- হুজুর আজ সন্ধ্যায় গরীবের বাড়িতে কিছু ডাল ভাত গ্রহণ করিয়া আমাদিগকে ভাগ্যবান করিবেন। মৌলভী সাহেব দাওয়াতের কথা শুনিয়া হাসি দিয়া- আসুন জনাব, বাড়ির ভিতরে আসুন। প্রথমে একটু চা পান  গ্রহণ করুন, পরে কথা বলিব, এই বলিয়া আগন্তুককে বাড়ির ভিতর নিয়া গেলেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ করিতে লাগিলেন। আপনার বাড়ির সকলে কেমন আছে? আপনি কেমন আছেন, শস্যাদি কেমন হইয়াছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
পির আলী- ইনশা আল্লাহ ও মাশা আল্লাহর কাহিনী শুনিয়া বিরক্ত হইয়াছি। এখন এদের কথা ক্ষান্ত করিয়া তোর নিজ জীবনের দুই একটা কহিনী বর্ণনা কর।
শয়তান- হুজুর একটু সময় দিন, ছোট একটি ঘটনা বলিয়া আসল কথা আরম্ভ করিতেছি। একদা মৌলভী সাহেবের দেশে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে কোন একটি বিষয় নিয়া খুব বাধাবাধি হয় এবং কিছুটা হাঙ্গামাও সেখানে হয়। তখন মৌলভী সাহেব দেশের মুসলমানদিগকে ডাকিয়া বলিলেন- হে মুসলমানগণ! আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফে পরিষ্কার বর্ণনা করিয়াছেন যে হিন্দুদিগকে যেখানে পাও সেখানেই হত্যা কর। অতএব এই মূহুর্তে তোমাদের ছওয়াব কামাই করার এইটা বড় সুযোগ আসিয়াছে। তোমরা এই সুযোগ ছাড়িওনা। যদি একটি হিন্দুকে কেহ হত্যা করিতে পারে তাহা হইলে আল্লাহর কুরআন অনুসারে সে নিশ্চই বিনা হিসাবে বেহেস্তে দাখিল হইবে। মুসলমানেরা মৌলভী সাহেবের কথা শুনিয়া খুবই উৎসাহিত হইল এবং বেহেস্ত লাভের আশায় সকলে সঙ্গবদ্ধ হইয়া হিন্দুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের সংকল্প গ্রহণ করিল। এই সময় কতিপয় নেতৃস্থানীয় হিন্দুভদ্রলোকেরা মৌলভী সাহেবের  এই ফতোয়ার কথা শুনিয়া একটু আতঙ্কিত হইলেন এবং গভীর রাত্রিতে তাহারা কয়েকজন নিম্নক্লাশের মুসলমানের সঙ্গে মৌলভী সাহেবর বাড়িতে আসিয়া পৌঁছিলেন। মৌলভী সাহেব তখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলেন তাই আগন্তুকেরা তাহাকে ডাকিয়া জাগরিত করিলেন এবং বলিলেন দয়া পূর্বক একটু আপনার দরজাখানি খুলুন। মৌলভী সাহেব জানালা দিয়া হিন্দুভদ্রলোকদিগকে দর্শন করতঃ ভীত হইয়া পড়িলেন এবং দরজা খুলিতে অস্বীকার করিলেন। তখন  হিন্দু ভদ্রলোকেরা বলিলেন, হুজুর আমরা আপনার কোন ক্ষতি করিতে আসি নাই বরং আমরা দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শুধু আত্মরাক্ষার জন্যই আপনার সরণাপন্ন হইয়াছি। আপনি দয়া করিয়া আমাদিগকে রক্ষা করুন। এই বলিয়া তাহারা দরজার নীচ দিয়া কয়েকখানি একশত টাকার নোট ভিতরে দিয়া বলিলেন, হুজুর আমরা আপনার জন্য কিছু নজর নিয়া আসিয়ছি উহা এই রাখিয়া গেলাম। ইহার পরে তাহারা কাকুতির স্বরে আরো কিছু কথা বলিয়া বিদায় হইলেন। মৌলভী সাহেব কিছুক্ষণ পরে দরজার নিকটে আসিয়া হাসি দিয়া বলিলেন, আল্লাহ জেসকো চাহতা হায় উসকো দেতা হায়। এই টাকাগুলো নিয়া ঘরে ফিরিলেন এবং পরের দিন অতি প্রাতে মসজিদে গিয়া ফরজ নামাজ অন্তে সকল মুছল্লিকে বসাইয়া বলিলেন ভাই আমি গতদিন মস্ত ভুল করিয়াছি। স্বাধীন দেশে পরাধীন দেশের আয়াত পাঠ করিয়া উহার হুকুম তোমাদিগকে শুনাইয়া দিয়াছি। প্রকৃত কথা হইল এই যে, স্বাধীন দেশে সকল জাতির সকল ধর্মে সমান অধিকার ভোগ করিবে ইহাই আল্লাহর বিধান। তাই আল্লাহ কুরআন শরীফের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, হে নবী তুমি বিধর্মীকে বলিয়া দাও- তোমরা তোমাদের ধর্মে থাক আর আমরা আমাদের ধর্মে থাকি। কাহারও সাথে কাহারও কোন বিবাদ নাই, হিংসা নাই, সকলে আল্লাহর নিকট সমান। কেহকে কেহ হিংসা করিলে বা অত্যাচার করিলে আল্লাহর নিকট কিয়ামতের দিন জওয়াব দিতে হইবে। তাই হে ভাই মুসলমানেরা! তোমরা হিন্দুদিগকে ক্ষমা করিয়া দাও। যে ব্যক্তি মানুষকে ক্ষমা করে আল্লাহ তাআলা তাহার জীবনের সকল অপরাধ ক্ষমা করিয়া দেন। অতএব জীবনের সকল পাপ তাপ মোচন করিতে চাহিলে হিন্দুদের সাথে বিবাদ করিতে উদ্ধত হইওনা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight