শয়তানের ডায়েরি : মোছাঃ উম্মে হাবিবা

পির আলী: এই মুনশী সাহেব এতখানি শঠতামূলক কার্য্য করিয়া পুনরায় কার্য্য করিয়াও পরহেজগারীর দাবী করিল?
শয়তান- হুজুর ইহা তাহার শঠতামূলক কার্য্য নহে। কারণ তিনি জানেন যে, মোমেনের অন্তরে আল্লাহ পাক থাকেন। তাই মোমেনের অন্তরে যে কথা জাগরিত হয় উহা আল্লাহ তাআলারই কথা। সেই হিসাবে মুনশী সাহেবের অন্তরে যে কথা জাগরিত হয় তখন তিনি তাহাই ব্যক্ত করেন ও উহার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়া থাকেন। মুনশী সাহেব যে একজন পাকা পরহেজগার, তাহাতে আদৌ সন্দেহ নাই।
কারণ একদিন এক প্রবল বন্যায় মুনশী সাহেবের ঘরখানি উত্তর দিকে হেলিয়া পড়ে তখন মুনশী সাহেব সেই বন্যার মধ্যে বাহিরে নামিয়া দক্ষিণ দিকে একখানি খুটি লাগাইয়া উত্তর দিকে ঠেলিতে থাকেন। মুনশী সাহেবের এই অবস্থা দেখিয়া পাশ্বর্স্থ একটি লোক জিজ্ঞাসা করে, হে মুনশী সাহেব, আপনার কি মাথা খারাপ হইয়াছে? না হইলে ঘরখানি যেদিকে পড়িতেছে আপনিও সেইদিকে ঠেলিতেছেন কেন? তখন মুনশী সাহেব বলিলেন, বেটা আমার মাথা খারাপ হয়নাই বরং তোর মাথা খারপ হইয়াছে। কারণ আল্লাহ তাআলা যেদিকে ঘর ঠেলিতেছেন তাহার বিপরীত দিকে গিয়া খুটি ধারিলে আল্লাহ বেজার হইতে পারেন ও ফেরেস্তাদের কষ্ট হইতে পারে তাই আল্লাহর রেজামন্দির আশায় ও ফেরেস্তাদের দোয়া লাভের উদ্দেশ্যে তাদের কার্য্যে কিছুটা সাহায্য করিতেছি। পার্শ্বস্থ লোকটি মুনশী সাহেবের কথা শ্রবণ করত হতবুদ্ধি হইয়া দাড়াইয়া রহিল। এইভাবে একদা মুনশী সাহেব তাহার বৃদ্ধ বিধবা মাতাকে নিয়া নৌকায় করিয়া তাহার কোন আত্মীয়ালয়ে বেড়াইতে যাইতেছিলেন। পথিমধ্যে তাহার বৃদ্ধা মাতা নৌকার একটি ছোট ছিদ্র দ্বারা একবার বাহিরে তাকাইলেন। মুনশী সাহেব তাহার মাতার এই কাণ্ড ভাল করিয়া লক্ষ্য করিলেন। যখন তাহারা বাড়িতে ফিরিলেন তখন মুনশী সাহেব তাহার মাতাকে ডাকিয়া বলিলেন, আম্মা আপনার বিবাহ বসিতে হইবে। তখন বৃদ্ধা কাকুতির স্বরে বলিলেন, একি বলো বাবা? আমি ঠিকমত হাটিতে চলিতে পারি না, আমার খেদমত করিতে লোকের প্রয়োজন। এছাড়া এই সুখের সংসার আমার হাতেই গঠিত হইয়াছে। অতএব এই সমস্ত জিনিষ ছাড়িয়া আমাকে কোথায় যাইতে বল? এই জাতীয় কথা মানুষে শোনলেই বা কি বলিবে। ইহা কখনই আমার দ্বারা সম্ভব হইবে না। এই কথা আর কখনও মুখে আনিও না। ইহা শুনিয়া মুনশী সাহেব বলিলেন, ওসব কথায় কোন ফল হইবে না, বিবাহ আপনাকে বসিতেই হইবে। কারণ আমার চক্ষে যে আলামত পড়িয়াছে তাহাতে আপনাকে বিবাহ দেওয়া আমার জন্য ফরজ। বৃদ্ধা এই সমস্ত কথা শুনিয়া কাঁদাকাটি করিলেন, কিন্তু মুনশী আর তাহাকে ছাড়িলেন না। অবশেষে আর এক অচল বৃদ্ধ খোঁজ করিয়া তাহার নিকট নিজ মাতাকে বিবাহ দিয়া দিলেন।
পির আলী- থাক, মানুষের অপরাধজনিত ঘটনাদি যেমন ব্যক্ত করাও উচিত নয় তদরুপ উহা শ্রবণ করাও উচিৎ নয়।
শয়তান- হুজুর মুনশী সাহেবের আর একটি রহস্যজনক কার্য্যের কথা শোনুন। মুনশী সাহেব প্রথম জীবনে বাড়িতে স্ত্রীকে রাখিয়া একাধারে চৌদ্দমাস যাবৎ গিয়া পীরের দরবারে কাটায়। তখন তাহার স্ত্রী খাদ্যভাবে বস্ত্রাভাবে বিশেষভাবে কষ্ট পাইতে থাকে। তবুও যতদিন সম্ভব স্বামীর ঘর পাহারা দিয়া অবশেষে একদা রাত্রি বেলায় পিত্রালয়ে চলিয়া যায় এবং সেখানে গিয়া মুনশী সাহেবের এই আচরণের কথা তাহার পিতাকে জ্ঞাত করে। তিনি মুনশীর এই সমস্ত অপকর্মের কথা শুনিয়া সঙ্গে সঙ্গে কোর্টে গিয়া একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় মুনশীর নামে ওয়ারেন্ট বাহির হয় এবং অল্পদিনের মধ্যে তাহাকে বন্দি করিয়া হাজতে রাখা হয়। মামলার নির্দিষ্ট তারিখের দিনে মুনশীকে কোর্টে হাজির করিয়া জবানবন্দী লওয়া হইলে মুনশী স্ত্রীর পিতার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। কোর্টের বিচারপতি বিশেষ ধর্মপরায়ন লোক ছিলেন তাই মুনশীর কাকুতি মিনতি দেখিয়া তিনি মুনশীর পক্ষে রায় দিয়ে বলিলেন, এবারের জন্য মুনশী সাহেবকে ক্ষমা করিয়া তাহার স্ত্রী তাহাকে দেয়া হইল। মুনশী সাহেব এই কথা শুনিয়া আনন্দে আত্মহারা হইয়া গেলেন এবং সজোরে টেবিলের উপরে একটি চাপড় দিয়া বলিলেন, সাবাস হাকিম, বাপের পূতের ন্যায় কাজ করিয়াছো? বিচারপতি মুনশী সাহেবের এই আচরণ দেখিয়া সঙ্গে সঙ্গে রায় কাটিয়া বলিলেন। মুনশীর মাথায় গণ্ডগোল আছে। অতএব তাহার স্ত্রীকে কখনই তাহার হাতে দেওয়া সম্ভবপর নয়। কোর্ট তাহাদের বিবাহ বিচ্ছেদ করিল এবং মুনশীকে হাজত হইতে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার অর্ডার করিল। মুনশী সাহেব বিচারপতির দ্বিতীয় অর্ডার শুনিয়া হতভম্ভ হইয়া রহিলেন এবং মনে মনে ভাবিলেন হায়। ভাল করিতে গিয়া মন্দ হইয়া দাড়াইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight